শুক্রবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৮

পদ্মা পারাপারের ভ্রমণ

হঠাৎ করে জাজিরা ক্যান্টনমেন্টের ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একটা কাজ করে দেয়ার জন্য ডাক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং মিটিং করার ডাক পেল। সাথে করে আমাকেও নিয়ে গেল। সেই সাত সকালে মানে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে ৯টার আগেই মাওয়া ঘাটে পৌঁছে গেলাম। ১১টায় মিটিং - সময় ঠিক রাখার ব্যাপারে খুব করে বলেছে। তাই নাস্তা টাস্তা না করেই একটা স্পিডবোট ভাড়া করে ওপারে। সময়ের প্রায় ১ঘন্টা আগেই জায়গামত পৌঁছুলাম।

ওখানে অবশ্য চমৎকার নাস্তা করিয়েছিল। আসার সময়ে, একটু অপেক্ষা করিয়ে ওনাদের চমৎকার বোটে আমাদের এপারে পার করে দিয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার আরিফ ভাইয়ের গাড়িটা ব্যবহার হয়েছিল সেদিন। বহুদিন পর পদ্মা সেতুর কাজ কাছাকাছি থেকে স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেলাম। এসব নিয়েই এই ভ্লগ।


রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৮

বালি ভ্রমণ - ০১

মানুষজনের বালি ভ্রমণের পোস্ট আর ভিডিও ব্লগ (ভ্লগ) দেখে দেখে সেখানে যাওয়ার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল বটে - তবে সেটা কোনদিন বাস্তব হবে ভাবিনি। কিন্তু বিদেশ ভ্রমণ না করলে স্ট্যাটাস বৃদ্ধি ব্যহত হবে ভেবে আমার গিন্নি সেখানে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলো। যথারীতি আমি কিস্যূ বলিনা -- কারণ ওসব ঝামেলায় কে যায়। কাজেই সব দৌড়াদৌড়ি করে প্লেনের টিকিট কাটা, হোটেল বুকিং দেয়া -- ইত্যাদি উনি করে ফেললেন। অন অ্যারাইভাল ভিসার ব্যাপারটা খুবই সুবিধাজনক। আর পুরা ভ্রমণের স্পন্সরও গিন্নি -- কাজেই আমিতো মহা ফূর্তিতে অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করলাম। ঈদের (ইদের) ছুটির সাথে বলে এটাতেও তেমন ঝামেলা হল না।

কাজেই ঈদের আগের দিন রাতে (টেকনিক্যালি ঈদের দিন) আমরাও রওয়ানা দিলাম। ফেসবুকে ছবিটবি পোস্ট দিয়েছি এর আগে। রওয়ানা দেয়ার আগেই কুয়ালালামপুরের এয়ারপোর্টে আট ঘন্টার ট্রানজিট কাটানোর প্লান করলাম। ওখানকার এয়ারপোর্টের ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানলাম, সেখানে কী কী দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট আছে। কাজেই ঐ এয়ারপোর্টে নেমে সকালে একটু বেলা হলেই (পড়ুন দোকান খুলতেই) পছন্দের নির্ধারিত দোকানে খাওয়া দাওয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম।




এয়ারপোর্টের মাঝে একটা চমৎকার বাগানও খুঁজে পেয়েছিলাম।




যা হোক ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে পৌছুলাম সুন্দরভাবেই। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় ল্যান্ড করলাম।

ইমিগ্রেশন:
আমরা জানতাম যে পাসপোর্ট, রিটার্ন টিকিট আর হোটেল বুকিং স্লিপ দেখালেই অন এরাইভেল ভিসা দেয়। যথারীতি ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ালাম। লাইনের মাথায় যখন পৌঁছে গেছি, তখন এক মহিলা পুলিশ এগিয়ে এসে বললো,
- ' হ্যাভ ভিসা? নো ভিসা?'।
আমরা মাথা নাড়লাম। বললাম আমাদের অন অ্যারাইভাল ভিসা। আমাদের পাসপোর্ট চেয়ে নিয়ে বললো
- 'ফলো মি'।
তারপর ইংরেজিতেই বললো - আরো কেউ আছে নাকি এরকম তাহলে আসো।
কেউই আর নাই। কাজেই আমরা ওনাকে ফলো করতে থাকলাম; সবগুলো বক্স পার হয়ে (ঢাকা এয়ারপোর্টের মতই) আরেক লোকের কাছে পাসপোর্ট দিয়ে বললো
- 'গো উইথ হিম'।
আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে পাশের ঘরের ভেতরে চলে গেল। তখন আশেপাশে তাকিয়ে দেখি পেছনে একটা টেবল ছিল - অন অ্যারাইভাল ভিসা লেখা। সেখানে দুই একজন দাঁড়িয়ে কি জানি লিখছে। ভাবলাম -- ধুর্, লোকজনকে ফলো করে এদিকে আসতে গিয়ে এটাই তো চোখে পড়েনি। এই সময়ে ঐ লোক বের হয়ে এসে বললো
- 'ইয়োর টিকেট প্লিজ'
টিকিটগুলো দিলাম। তারপর বিড়বিড় করে গিন্নিকে বললাম 'এরপর হোটেল বুকিঙের কাগজ নিতে আরেকবার আসবে'। ঠিকই একমিনিট পর লোকটা বের হয়ে আসলো। এসে আমাদের হাতে পাসপোর্ট দিয়ে দিল!! অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
- 'এভরিথিং ওকে? ক্যান উই গো'।
লোক হেসে বললো - ইয়েস।

এয়ারপোর্টের বাইরে:
বের হয়ে প্রথম কাজ হলো ট্যাক্সি ঠিক করা। হোটেল থেকে পিক-আপ সার্ভিস বুক দিতে চাইলে ঢাকায় ট্রাভেল এজেন্ট বলেছিলো এতে ৮হাজার টাকা লাগবে, আপনারা বরং এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে নেন। আর বিভিন্ন ব্লগ, ভ্লগ ইত্যাদিতে আরো পরামর্শ শুনে এসেছি। কাজেই বের হয়ে প্রথমে ডলার চেঞ্জ করলাম কিছু। তারপর গিন্নির জন্য পানি কিনলাম - হাফ লিটার মনে হয় প্রায় ৯০ টাকা (বাংলাদেশি টাকায়) দাম নিল!! তারপর মোবাইলের সিম কার্ড কিনতে পাশেই গেলাম। কোন ক্যারিয়ার কিনবো সেটাও আগে স্টাডি করে ঠিক করে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে তারা ৪গিগার প্যাকেজই নাই, আছে সব ১৬ গিগার প্যাকেজ -- দামও একটু বেশি। তাই আর সিম কার্ড নিলাম না -- ভাবলাম রিসর্টে তো ফ্রী ওয়াইফাই পাবই।

এরপর গেলাম ট্যাক্সি ঠিক করতে। এটা এয়ারপোর্ট ভবনেই বের হওয়ার পথের পাশে। আমি জানি, স্ট্যান্ডার্ড ভাড়া হচ্ছে ৩০০ হাজার রুপিয়া - গুগল স্ট্রিট ভিউয়ে সাইনবোর্ডে ভাড়া লেখা দেখেছি, ব্লগ, ওয়েবসাইটেও দেখেছি ঐটাই ভাড়া। তবে সন্ধ্যা ৬টার পর সেটা বেড়ে যায়। ভাল হয় যদি ঐ এলাকার ট্যাক্সি ঠিক করা যায়। ঐরকম বিশাল ঘাটাঘাটির ধৈর্য্য নাই, তাই যা আছে কপালে মনে করে গিয়েছি। উবুদ জায়গাটা বেশ দুরে। সেই উবুদের সেন্টারের খুব কাছেই আমাদের রিসর্ট - পুজি বাংলো। গুগল ম্যাপ বলেছে - এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র(!) ৩৭ কিমি। ট্যাক্সিওয়ালাদের সংগঠনের কাউন্টার থেকে ট্যাক্সি ঠিক করলাম -- একজনকে ডেকে দিল, সে বললো ৫০০ হাজার রুপিয়া লাগবে (=৩০০০ টাকা)। আমি বললাম এ্যতো বেশি? ও বললো, এই রাতে অত দুর থেকে খালি আসতে হবে। তাই রাজি হয়ে গেলাম।

রাস্তা খালিই ছিল  --- খালি ছিল, এই কথাটা অবশ্য বাকী কয়দিন ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতার আলোকে বললাম। তারপরেও পুরা সোয়া এক ঘন্টা লাগলো।

পুজি বাংলো চেক ইন
একটা বারান্দায় টেবিল চেয়ার পাতা অফিস। খুবই ফ্রেন্ডলি স্টাফ। ভেতরটা ফাঁকা - একপাশে ধানক্ষেত। আমাদের রুমটা দোতালায়, সামনে ব্যালকনি। ট্রাভেল এজেন্ট ফোর স্টার বলেছিলো -- তবে ভ্লগে বলেছে এটা এলাকাভেদে কালচার আলাদা।

দারুন রুম। এসিও আছে -- আসার আগে এই বিষয়ে আমাদের কনফিউশন ছিল। স্ট্যান্ডার্ড ওয়াশরুম, বাথটাব সহ। অদ্ভুদ পাথুরে বেসিন। ফ্রী ওয়াইফাই আছে। একটা কমন সুইমিং পুলও আছে।

ডে-ওয়ান ডিনার
একটু ফ্রেস হয়েই খাওয়ার খোঁজে বের হলাম। বাইরে গ্রামের মত আলো আঁধারি। জায়গাটা আসলে পাহাড়ি গ্রামই। রাত দশটার পর, তাই দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। তবে একটু এগোতেই একটা ২৪ ঘন্টা খোলা কনভেনিয়েন্ট স্টোর চোখে পড়লো। কিন্তু সেখানে গরম পানির ব্যবস্থা চোখে পড়লো না (পরের দিনগুলোতে দেখেছি, আসলে গরম পানির ব্যবস্থা ছিল), তাই আরো এগিয়ে সিটি সেন্টারের দিকে গেলাম -- ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। সেখানেও সব বন্ধ, তবে আরেকটা কনভেনিয়েন্ট শপ পেয়ে সেটাতে গরম পানির মেশিনও দেখলাম।

দ্রুত খাবার দাবার কিনলাম। কাপ নুডুলস কিনলাম। গিন্নি সুন্দর করে সব মশলা দিয়ে টিয়ে কাপ নুডুলস বানালো। আমরা দোকানের বাইরে বাধানো গাছের গ‌োড়ায় বসে সেগুলো খাওয়া শুরু করলাম .... কিন্তু ... কে জনতো, অত যত্ন করে সব পেস্টের মত মসল্লাগুলো সবই চিলি-পেস্ট ছিল। মুখে দিয়েই আমাদের অবস্থা শেষ! সুপ বাদ দিয়ে শুধু নুডুলস তুলে তুলে অতি কষ্টে খেলাম। মুখ হাত সব লাল হয়ে গেল। এর মাঝে দুইবার এক মাতাল এসে কি এক ঠিকানা জিজ্ঞেস করে গেসে -- বেচারা টাল হয়ে নিজের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলো না মনে হয়। কেক, চিপস ইত্যাদি মিলিয়ে খাওয়া খারাপ হয় নাই। খাওয়ার পানিও নিলাম। এখানে দেড় লিটারের দাম ৬৬ টাকা (এয়ারপোর্টে আধা লিটার ৯০ নিয়েছিলো)।

মোবাইলের ছবি আর ভিডিও ক্লিপ:
কন্যার চাপাচাপিতে স্মৃতিগুলো নিয়ে কিছু সিলেক্টেড ছবি আর ভিডিওক্লিপ জোড়াতালি দিয়ে বানাতে শুরু করলাম ভ্লগ - আদৌ সেটা ভ্লগের ক্যাটাগরীতে পরে কিনা কে জানে। এই হল প্রথম তিন পর্ব।
একটু বোরিং বর্ণনা আছে - কারণ আমার আম্মাজান এসব পছন্দ করেন বলে আমার ধারণা। প্রথম তিন রাত ছিলাম উবুদ নামক জায়গায়:


পর্ব-২। কুতা এলাকায় থাকা শুরু। এখানকার থাকার জায়গার আশেপাশে ঘুরাঘুরি ---


পর্ব-৩। ৬ নং দিন - বালির দক্ষিণ দিকের অংশটুকু ভ্রমণ করেছি সেদিন।

শেষাংশের ভিডিওগুলো এখনও জোড়াতালি দিয়ে ভ্লগ তৈরী হয়নি। ভাল লাগলে ওটাও পোস্ট করবো।

সোমবার, ৯ জুলাই, ২০১৮

বেতন বিষয়ক হাবিজাবি চিন্তাভাবনা ... ...

১।
বহু বছর পূর্বে আমার স্ত্রী ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত স্বনামধন্য একটা স্কুলে চাকুরীর জন্য আবেদন করছিলেন। বিজ্ঞাপনে ভাল ভাল কথাবার্তা লেখা ছিল। তিনদিন ট্রায়াল ক্লাসও নিলেন। তারপর অফার লেটার পেলেন। অফার ছিল মাসে ৭/৮ হাজার টাকা। সেই অফার দেখে আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সাধারণ অফিসের ভব্যতা তালাবদ্ধ করে রেখে একটা ডিনায়েল লেটার লিখেছিলাম আমরা – যে: আমার বাসার ড্রাইভারকেও আমরা এর চেয়ে বেশি বেতন দেই, এই অফার করে অপমান না করলেও পারতেন। ওনারা মুখে বলেছিলেন, আরে এটা কোনো সমস্যা না, এই চাকুরীটা থাকলে (এটার নাম ভাঙিয়ে) টিউশনি করে মাসে আপনি বেতনের ৩/৪ গুন কামাতে পারবেন। যা হোক ওনারা অফার লেটার ফেরত চেয়ে নিলেন। ব্যাস ঘটনা ঐখানেই সমাপ্তি।

- প্রশ্ন হল, আমাদের সিস্টেমের ডিজাইনই যদি এমন হয় যে টিউশনি করতে হবে তাহলে ক্লাসে লেখাপড়ার মান বাড়বে কিভাবে আর টিউশন বাণিজ্যই বা থামবে কিভাবে?

২।
বাচ্চার স্কুলের বেতন দেখলাম নতুন ক্লাসে উঠার পর বিরাট একটা লাফ দিয়েছে। হিসাব কষে দেখলাম ১০% বেড়েছে। মেনে নিলাম – কারণ মূদ্রাস্ফীতির ঠেলা সামলাতে ঐটুকু বাড়া স্বাভাবিক।

৩।
বছর শেষে নতুন বছরে বেতন বাড়বে, অন্ততপক্ষে মূদ্রাস্ফীতির ঠেলা সামলিয়ে ক্রয়ক্ষমতা আগের মত রাখার জন্য হলেও। তারপর, কর্মী গত একবছরে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলো সেটা তার কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে - সেটার প্রতিফলনের জন্য মূদ্রাস্ফীতি পাশাপাশি আরেকটু অতিরিক্ত বৃদ্ধিও আশা করা উচিত। অনেকে সেটাকে সিনিয়রিটি বললেও বুঝতে হবে বর্তমান কর্ম বাজারে বয়স নয় বরং আউটপুটই আসল অবস্থান নির্ণায়ক হতে চলেছে।

বেতন বৃদ্ধি যদি এমন হয় যে সেটা শুধুমাত্র মূদ্রাস্ফীতি কাভার করে কিন্তু এর অতিরিক্ত কিচ্ছু না, তাহলে বুঝে নিতে হবে গত একবছরে অর্জিত অভিজ্ঞতা কর্তৃপক্ষের কাছে মূল্যহীন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বলতে চায়: তোমার থাকা না থাকায় এই প্রতিষ্ঠানের কিছু এসে যায় না - তুমি একজন একজন নতুন/ফ্রেশ লোকের চেয়ে আলাদা কোন গুরুত্ব বহন কর না।

বেতন বৃদ্ধি যদি মূদ্রাস্ফীতির চেয়ে কম হয়, কিংবা বেতন যদি না বাড়ে – তার অর্থ হল, কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেল। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বলতে চাচ্ছে: তোমাকে আসলে আমার দরকার নাই; রাস্তা মাপতে পারো।

প্রশ্ন হল, প্রতিষ্ঠান আপনাকে কী বলতে চাচ্ছে তা কি বুঝতে পারছেন?
(সম্পুর্ন ব্যক্তিগত অভিমত)

বুধবার, ১৩ জুন, ২০১৮

অন্যরকম ছবি আঁকা - লিব্রে অফিস ড্র

ছবি আঁকা বলতেই ফুল, নদী, পাখি, পাহাড়, সূর্যাস্ত ইত্যাদির কথা মনে পড়ে। এখানে একটু অন্যরকম বলা হল কারণ সেগুলো তেমন একটা নেই। মনের আনন্দের চেয়ে প্রয়োজনে ছবি আঁকতে হয় বেশি -- প্রয়োজনগুলো পেশাগত।


বেশ কয়েক বছর যাবৎ আমি বিভিন্ন প্রয়োজনে চিত্র, নকশার ধারণা ইত্যাদি দ্রুত তৈরী করতে লিব্রেঅফিস ড্র ব্যবহার করছি। এটা একটা মুক্ত সফটওয়্যার, যা লিব্রেঅফিস প্যাকেজের সাথেই থাকে। এটার কার্যক্রম অনেকটা এমএসঅফিসের ড্রইং টুলবারগুলোর মতই। যা হোক চিত্রগুলো দেখলেই বোঝা যাবে .... .... আমার করা কাজগুলো থেকে কয়েকটা এখানে দিলাম ...

১। রেখাচিত্র: বইয়ের চিত্র স্ক্যান করার ঝক্কি এড়াতে নিজেই দেখে দেখে তৈরী করে ফেলা।

২। রিপোর্টে একটা ধারণার নকশা দিতে হবে, সুতরাং ঝটপট তৈরী হয়ে গেল এটা। রিক্সা ভ্যান আর ট্রাক স্ক্যান করা ছবি থেকে কেটে নেয়া ...

মাথায় বিভিন্ন রকম আইডিয়া কিলবিল করে, সুতরাং ওগুলোকে মুক্ত করে মাথা হালকা করতে হয় ...
৩। বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে চাইলে

৪। বৃষ্টির পানি থেকে জলাবদ্ধতাও দুর হবে, ভূগর্ভের পানির লেয়ারও রিচার্জ হবে

৫। রান্নাঘরের, বাথরুমের পানি আর ভাসাবে না ... সোকওয়েল দিয়ে কত ময়লা পানি মাটিতে প্রবেশ করিয়ে দেই ... এটা তার তুলনায় অনেক ভাল হবে

৬। ভবনের বাগানে পানি দেয়ার প্রায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ... এক ঢিলে কয়েক পাখি ... .... বাসায় লোক না থাকলেও পানি দেয়া হবে - গাছ শুকিয়ে মরে যাবে না, কিছু বর্জ্যপানি পরিশোধন হবে, পানির পূণর্ব্যবহার


৭। বন্ধু একটা প্রত্যন্ত উপকূলীয় চরে সাইক্লোন শেল্টারে আপদকালীন পানিসরবরাহ ব্যবস্থায় ঘূর্নীঝড়ের পরে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে চায় (ঝড়ের সাথে বৃষ্টি থাকবে, কিন্তু বিদ্যূৎ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে পারে)।

৮। ক্লায়েন্টকে সেপ্টিক ট্যাংকের চিত্র দেয়া হল

৯। ফিল্ডট্রিপ দিয়ে এসে উচ্চপদস্থ বিশেষজ্ঞগণ বললো এ্যাত পাইপ-টাইপের মাঝে কোথাকার পানি কোনদিকে যাচ্ছে বুঝে নাই। সহজ চিত্র দরকার -- কাজেই ডিজাইনার হিসেবে ....

১০। যমুনা থেকে নিউ ধলেশ্বরী নদীর প্রবেশমুখের কাছে তৈরী সিল্ট বেসিনের চিত্র। ইতিমধ্যে তৈরী করে ফেলেছে। এটা একেবারে ডিজাইন করে এরকম চিত্রসহ দেয়া হয়েছিল:

১১। রিপোর্টে দেয়া ডিজাইনের একটা অংশ




১২। ক্লায়েন্টের সাথে একটা ধারণা শেয়ার করা ... অবশ্য এর আগে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর মতামত নিয়েছি

১৩। ক্লাস লেকচার তৈরী করতে ...






১৪। মেয়ের আব্দার রক্ষা, নিজের কৌতুহলও মেটানো (সম্ভব কি না দেখা)


চিত্রগুলো লিব্রেঅফিস ড্র দিয়ে তৈরী করার পর সেটা থেকেই ছবি (png) হিসেবে এক্সপোর্ট করে এই চিত্রগুলো পেয়েছি।

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

কাউন্সেলিং বিষয়ক চিন্তাভাবনা

বর্তমানে কাউন্সেলিং শব্দটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। সাধারণ ভাবে মনে হয় councelling -এই ইংরেজি শব্দটির অর্থ কাউকে পরামর্শ দেয়া। কিন্তু গুগল আংকেলের কাছে এই বিষয়টির ব্যাপারে জানতে চেয়ে ধারণা হল, এর ব্যাপ্তি আরো অনেক গভীর এবং এটা করতে চাইলে রীতিমত আলাদা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

গুগলে কাউন্সেলিং লিখে সার্চ দিলে এই সংজ্ঞাটি আসে
Counselling is a type of talking therapy that allows a person to talk about their problems and feelings in a confidential and dependable environment. A counsellor is trained to listen with empathy (by putting themselves in your shoes). They can help you deal with any negative thoughts and feelings you have.
অনলাইনে এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম সাহায্যমূলক পোস্টও দেখলাম (বাংলা এবং ইংরেজিতে) – কয়েকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে যে কখন নিজেই বুঝতে পারবো আমার কাউন্সেলিং দরকার। আমার মনে হয়, একজনের পক্ষে নিজে নিজেই এই সমস্যা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারার বিষয়টা হল সবচেয়ে ভাল অবস্থা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অন্যেরা একজনের মাঝে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেও সেই ব্যক্তি নিজে কিন্তু সেটা অনুভব করতে পারেন না; এমনকি কেউ যদি বলে তোমার কাউন্সেলিং দরকার, তাহলে উল্টা মাইন্ড করে বসতে পারে। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আরেকজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ চোখের দরকার হয়, যে শিশুদের আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটা চিহ্নিত করতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা নিবে। আমার ধারণা, শিশুকে সরাসরি কিছু কাউন্সেলিং দেয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিবারকে কাউন্সেলিং দেয়া বেশি জরুরী হয়ে যায়।

অর্থাৎ সকলেরই হয়তো কাউন্সেলিং-এর দরকার নাই। কারো কারো দরকার আছে। কেউ যদি সেটা নিজেই বুঝতে পারে তাহলে তো ভাল, কিন্তু না হলে আরো কিছু চোখ দরকার যারা দেখে শুনে কিংবা তাদের অজান্তেই কিছু মানসিক বিষয় পরীক্ষা করে দেখে কাউন্সেলিং দরকার – এমন ব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারবেন। চিহ্নিত ব্যাক্তিটি প্রতিষ্ঠানের স্টাফ, কর্মকর্তা, শিক্ষক কিংবা ছাত্র হতে পারে।

আপনাদের হয়তো জানা আছে, সরকারী চাকুরীর মৌখিক পরীক্ষা বা সাক্ষাতকারের সময়ে সেই ভাইবা বোর্ডে একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ বসে থাকেন এবং চাকুরীপ্রার্থীর আচরণ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে থাকেন। একই রকম বা এর চেয়েও সিরিয়াসভাবে মানসিক গড়ন পরীক্ষা করা হয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। আমার বাচ্চার স্কুলেও এরকম পূর্ণকালীন সাইক্রিয়াটিস্ট আছে বলে শুনেছি।

কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা আমরা যে কেউ চিহ্নিত করতে পারি – যেমন ক্লাসে অমনোযোগী, বাচালতা, উগ্রতা, মনমরা হয়ে থাকা ইত্যাদি। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর সমাধানও সকলের জানা - যদিও সব ইস্যূতে প্যাঁদানি দেয়া কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না ... ... আবার, এখন তো স্কুলে মারধর করা আইনত নিষেধ (ইস্ আমাদের সময়ে যদি এমন থাকতো! ...); আর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মারধর তো দুরের কথা, বকা দিতেও এখনকার যুগে রীতিমত ভয় লাগে ... ...। আমি যতটুকু বুঝি, বকা দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হয় না। ভারতীয় নায়ক আমীর খানের ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটি হয়তো অনেকেরই দেখা আছে - এটা এবিষয়ে চিন্তার খোরাক যোগাবে।

কাউন্সেলিংএর কথা একটু বাদ থাক ... আমরা যে শিক্ষকতা করি সেটারই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কয় জনের আছে? আমি নিজে প্রকৌশলী হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি, শিক্ষকতা করার জন্য কিছু আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন আছে, যা বিকাশের জন্য কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষন পাইনি – আমাদের পাঠ্য সিলেবাসে ছিল না। সম্ভবত বেশিরভাগ বিষয়ের শিক্ষকগণেরও আমার মত একই অবস্থা – আমরা গান শিখে নয়, বরং গাইতে গাইতে গায়েন হয়েছি। আমার ধারণা, যাঁরা লেখাপড়া বিষয়ে লেখাপড়া করেন অর্থাৎ বি.এড, এম.এড করেন (কিংবা পুরানা আমলের বি.এ.বি.টি) তাঁদেরকে এই বিষয়গুলোর অনেকটাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আবার বিদেশী, বিশেষত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীর কোর্স কনটেন্ট ঘাটাঘাটি করে দেখেছি সেখানে ক্লাস ম্যানেজমেন্ট, প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ, গবেষণার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে রীতিমত কোর্সওয়র্ক করতে হয়। – এর উপরে যুক্ত হচ্ছে কাউন্সেলিং; কাউন্সেলিংকে আলাদাভাবে চিন্তা করছি তার কারণ আছে ...

কার কাউন্সেলিং-এর দরকার আছে সেটা চিহ্নিত করাটা একটা প্রাথমিক কাজ। এটার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার আছে। চিহ্নিত করার জন্য হয়তো কিছু ধাপে ধাপে করার মত প্রক্রিয়া আছে, হয়তো কিছু প্রশ্নপত্র আছে যার অনেকগুলো সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে – সেই উত্তরের প্যাটার্ন থেকে একেকজনের মানসিক গড়নটা বেরিয়ে আসবে, অস্বাভাবিকত্ব থাকলেও বেরিয়ে আসবে। হয়তো কিছু মানসিক পরীক্ষা আছে, যেগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেখে অস্বাভাবিকত্ব চিহ্নিত করা যাবে।

সম্ভবত, এর পরের কাজ হল সেই কাউন্সেলিং দেয়া অথবা তাকে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের কাছে পাঠানো। ছাত্র কাউন্সেলিং নিয়ে গুগল আংকেল ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম বিদেশি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং বিষয়ে রীতিমত আলাদা বিরাট সেটাপ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রকম বিষয়ে কাউন্সেলিং দেয়া হয়; বিষয়গুলোর নামের উদাহরণ দিচ্ছি -যেমন আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির (Iowa State University) কাউন্সেলিং বিষয়ক বিভাগের ওয়েব পেজ অনুযায়ী বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়:

- আত্মপরিচয় এবং নৈতিকতা (exploration of identity and values)
- পেশাগত উন্নয়ন – ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং? (exploration and development of career and majors)
- সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যা (relationship problems)
- হীনমন্যতা (low self-esteem)
- চাপ (stress)
- একাকীত্ব (loneliness)
- মানসিক অবস্থার সমস্যা, মনমরা থাকা (mood disturbances or depression)
- সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য অভিযোজন বিষয়ক (cultural exploration or navigating differences)
- যৌননিপীড়ন থেকে আরোগ্য (sexual assault recovery)
- শরীরবৃত্তীয় অথবা খাদ্যাভাস বিকৃতি বিষয়ক (body image or disordered eating concerns)
- মানসিক আঘাত এবং/অথবা অত্যাচার (trauma and/or abuse)
- যৌনপ্রবৃত্তি বা পরিচয় বিষয়ক (questioning sexual identity or orientation)
- দ্রব্যের অপব্যবহার (substance misuse)
- লেখাপড়া বিষয়ক কিংবা প্রেরণা (academic concerns or motivation)

এ্যাতসব বিষয়ে সম্যক জানা এবং কাউকে সঠিক পরামর্শ দেয়া এবং তাঁর মানসিক পর্যায়ে প্রভাবিত করা যে কোন একজনের পক্ষে বেশ কঠিন কাজ হবে বলেই মনে হয়। আর, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এটা করতে গেলে হীতে-বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে না - এমনটিও নিশ্চিত করা যায় না। ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ছাড়া দলগত কাউন্সেলিংও আছে বলে দেখেছি। এমনকি সমবেত সংগীতে অংশগ্রহণ করলেও কিছু বিষয়ে উপকার হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম। পরিবেশ, শব্দ, রং, সংগীত সবই মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা (এবং অসুস্থতা) প্রভাবিত করে বলে বেশ ভালো গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে। মানুষের মনের অলিগলিতে কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে। আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষিত একটা লোকবল যে কোন প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য একটা মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।

দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় গত ৩১-জানুয়ারী-২০১৬ সালে এ বিষয়ক একটা অসাধারণ উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যা হুবহু নিচে তুলে ধরা হল। এখানে লেখকদ্বয় সরাসরি বলে দিয়েছেন কাউন্সেলিং মানে শুধু পরামর্শ দেয়া নয় …

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং
গ্লোরিয়া রোজারিও ও প্রিয়াংকা শঙ্কর দাস

একটি হাসপাতালের মানসিক বিভাগে আমার ভিজিটিং কার্ড দিতে গিয়েছিলাম, যাদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন তাদের যেন ‘রেফার’ করা হয়। কিন্তু মানসিক ডাক্তারের কথায় আমি হতবাকই হলাম। তিনি বললেন যে ‘আমিই কাউন্সেলিং করি। কারো কাছে আমার ‘রেফার‘ করার প্রয়োজন হয় না। ’

আরেক দিন একটি স্কুলে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছিলাম, যেসব ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকের মানসিক সমস্যার জন্য সাহায্যের দরকার তারা যেন কাউন্সেলিংয়ের জন্য ‘রেফার’ করেন। দুজন শিক্ষক আমাকে মুখের ওপর ফের বলে দিলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের আমরাই কাউন্সেলিং করি। ’ এ তো একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়ে দাঁতের যন্ত্রণায় কাতর রোগীর দাঁতের অপারেশন করার শামিল। একজন স্কুল শিক্ষক যদি মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সেলিং করেন (প্রশিক্ষণ ছাড়া), তাহলে ওই রোগী বা ক্লায়েন্ট কি সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে? তাঁদের কথা শুনে ভাবলাম, সবাই যদি কাউন্সেলিং করেন, তবে যাঁরা কাউন্সেলিংয়ের ওপর পড়াশোনা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাঁদের কাজ কী হবে!

অপ্রিয় হলেও সত্য যে এখনো পর্যন্ত অনেকেরই কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই ভাবেন, কাউন্সেলিং হলো পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু না, কাউন্সেলিং মোটেও পরামর্শ দেওয়া নয়। কাউন্সেলিংয়ে মূলত একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। তাই আমাদের এ লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল প্রাচীন সভ্যতার মিসর, মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক) ও পারস্যে (ইরান)। সেখানকার ধর্মযাজকরা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি দান করতেন। ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতে, সমসাময়িক কাউন্সেলরদের আবির্ভাব ঘটে ১৮০০ শতকের পর। তখনকার কাউন্সেলররা মূলত ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক (বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক), যাঁরা ছাত্রদের শুধু একাডেমিক ফলাফল ছাড়াও তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা, যেমন আবেগীয় ও আচরণগত সমস্যা, এসব ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করে কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতেন। আমেরিকার কংগ্রেস ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স এডুকেশন অ্যাক্ট (এনডিইএ) চালু করে এবং এর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং দেন, তিনিই কাউন্সেলর। একজন ব্যক্তি কাউন্সেলিং পেশায় সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্য তাঁকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি কিংবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর শিক্ষা অর্থাৎ মাস্টার্স, সেই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হয়। আর যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং সেবা নেন তাঁকে বলা হয় ক্লায়েন্ট।

কাউন্সেলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি পেশাগত সম্পর্ক বিরাজ করে এবং ব্যক্তিগত, দলগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। ফলে তাদের মধ্যে নিজেদের ও অন্যদের সম্পর্কে এমন একটা স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যেটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ও দ্বন্দ্বগুলো সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। অনেকেই কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি সমার্থক কিংবা একই অর্থে অদলবদল করে ব্যবহার করে। থেরাপি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেরাপিয়া থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসঙ্গে পথ হাঁটা’। কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কাউন্সেলর ও ক্লায়েন্ট একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তাহলে দুটি বিষয়ই অর্থাৎ কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির কাজ মোটামুটি একই রকম।

কাউন্সেলরের প্রাথমিক কাজ হলো ক্লায়েন্টকে তার নেতিবাচক চিন্তাপদ্ধতি পরিবর্তন, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, জীবনের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সে যেন তার অনুকূল মাত্রায় মনঃসামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় হতে পারে সে ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করা। এ জন্য কাউন্সেলররা মানসিক স্বাস্থ্য, মনোবৈজ্ঞানিক ও মানুষের বিকাশগত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করে চিন্তাভাবনা, আবেগীয়-আচরণীয় অথবা নিয়মতান্ত্রিক বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের ভালো থাকা বা সুস্থ থাকা, ব্যক্তিগত বিকাশ অথবা পেশাগত উন্নয়ন, এমনকি মনোরোগ থাকলে সে ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকেন।

কাউন্সেলরের ভূমিকা অন্যান্য পেশা থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে কাউন্সেলর সমস্যাটির দিকে খেয়াল করেন এই ভেবে যে এই সমস্যাটি ব্যক্তি, নিয়ম ও সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই বেড়ে চলেছে। কাউন্সেলররা রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের তুলনায় বেশি খেয়াল করেন ক্লায়েন্টদের মানসিক বিকাশ ও মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধ, দক্ষতা, গুণাগুণ, মানসিক শক্তির উৎস ও চাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

সাধারণত কাজে অনাগ্রহ, সামাজিক ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, যোগাযোগে অক্ষম, অবিরাম চিন্তা, দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন, যেকোনো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া, শুচিবায়ু, বারবার হাত ধোয়া, হতাশাগ্রস্ততা, একাকিত্ব, আশাহীনতা, পেটে সমস্যা, মাথাব্যথা, অকারণে জ্ঞান হারানো, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, ভাঙচুর করা, মিথ্যা কথা বলা, অতি চঞ্চলতা, অমনোযোগী, অটিজম, মিশতে না পারা, দুঃখজনক ঘটনা থেকে প্রাপ্ত আঘাত, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিদ্রাহীনতা, ঘুমে ব্যাঘাত, মন মরা হয়ে থাকা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করা হয়।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি যখন শুরু হয় তখন ক্লায়েন্ট তার মনের কষ্টের সব কথা খুলে বলতে থাকে। দুঃখের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই সে খুব কান্নাকাটি করে, ভেঙে পড়ে। তখন ক্লায়েন্ট নিজেও হয়তো মনে করতে পারে যে এখানে এসে সব কিছু খুলে বলে তো আমি আবারও আগের সেই আঘাত পাওয়া মুহূর্তের কষ্টটা পাচ্ছি। তাহলে আমার সঙ্গে এটা কী হচ্ছে? এটা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াতে ক্লায়েন্টের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ভয়ের কিছুই নেই; সেই বিপজ্জনক মুহূর্তটিতেও তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই কাউন্সেলররা আছেন। কাউন্সেলরই ওই মুহূর্তটিতে তাকে সহায়তা করবেন স্থির হওয়ার জন্য, ভালো থাকার জন্য।

কাউন্সেলিং সেশনটি সাধারণত হয় ৪৫-৫০ মিনিটের। আর কাউন্সেলিং সেশন সংখ্যার গড় হলো সাত-আটটি। তবে সমস্যার বিষয়ভেদে ও ক্লায়েন্ট অনুযায়ী সেশন সংখ্যা কমবেশি হতে পারে।

কাউন্সেলিং সেশনে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে ক্লায়েন্ট কাউন্সেলরের কাছে যেসব কথা বলবে সেসব কথা গোপন রাখা হয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ভাঙা হবে। প্রথমত, ক্লায়েন্টের যদি আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাহলে ক্লায়েন্টের মা-বাবা বা কাছের মানুষদের তার জীবন বাঁচানোর জন্যই তথ্যটি জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্ট যদি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তৃতীয়ত, যদি কখনো কোর্ট থেকে নির্দেশ আসে। তবে এ তথ্যগুলো জানানোর আগে অবশ্যই ক্লায়েন্টকে এ বিষয়ে বলে নেওয়া হবে।

আমাদের দেশে কাউন্সেলিং করাতে হলে ফি দিতে হয় ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে কিছু কিছু জায়গায় বিনা মূল্যেও কাউন্সেলিংসেবা পাওয়া যায়। যেমন—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিএসসির কাউন্সেলিং ও গাইডেন্স সেন্টারে।

কাউন্সেলিং হলো মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি পেশাগত প্রক্রিয়া। একজন পেশাদার কাউন্সেলরের এ পেশা চর্চা করার জন্য একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কাউন্সেলররা দক্ষতার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে কাজ করেন। কাউন্সেলিং নেওয়ার আগে কাউন্সেলরের যোগ্যতা সম্পর্কে জেনে নিন, যেন সঠিক সেবা পেতে পারেন।


লেখকদ্বয় : গ্লোরিয়া রোজারিও, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
প্রিয়াংকা শংকর দাস, কাউন্সেলর, হিলিং হার্ট কাউন্সেলিং ইউনিট, বসুন্ধরা, ঢাকা

ধৈর্যসহ এ্যাতদুর পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

সহায়কমূলক তথ্যসূত্রসমূহ:
http://www.kalerkantho.com/print-editio … /31/319282 (মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং)
https://bn.thecabindhaka.com.bd/10-sign … -health-2/ (১০ টি সংকেত যা নির্দেশ করে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং দরকার)
http://www.newsbangladesh.com/details/2399 (অনলাইনে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং)