ভাবের কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভাবের কথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

জাপানের রাস্তায় স্পিড ক্যামেরা: উচ্চতর জ্ঞানের প্রয়োগ ও হাবিজাবি

১।
জাপানে একটা বেশ অদ্ভুদ ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম। টোল রোডের কিছু জায়গায় সাইনবোর্ড দেয়া যে কিছুদুর (যেমন: ৩০০ মিটার) সামনে ট্রাফিক ক্যামেরা আছে। তাই না দেখে সমস্ত গাড়িগুলো সব গতি কমিয়ে ৮০ কিমি/ঘন্টার নিচে চলতো, কারণ ঐ রাস্তার স্পিড লিমিট ৮০ কিমি/ঘন্টা। আর যেইনা ক্যামেরা পার হল, আবার আগের মত গতি বাড়িয়ে ১৩০-১৫০ কিমি/ঘন্টায় গাড়ি চালাতো। আমরা বিদেশিগণতো অবাক, আরে এখানকার পুলিশ বেকুব নাকি!! কারণ অন্য জায়গায় হলে ক‌োথায় ক্যামেরা সেগুলো জানানোর প্রশ্নই উঠে না – ওভারস্পিডিং করলে সুন্দর করে বাসায় জরিমানার স্লিপ চলে আসবে। এ আপাত বোকামির ঘটনা বরং জাপানি পুলিশের দক্ষতাতে আমার শ্রদ্ধা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণটা খুবই সাধারণ ---

২।
মানুষকে নিরাপদে এবং দ্রুততর সময়ে গন্তব্যে পৌছানোর লক্ষে প্রকৌশলীগণ প্রতিনিয়ত উন্নততর মসৃন রাস্তা তৈরী করার চেষ্টা করেন। আর সেই রাস্তায় আমাদের দেশে যখন হাতির মত উঁচা স্পিড ব্রেকার দেয়া হয় সেটা দেখে তখন আমার শিক্ষাদীক্ষা হ‌োঁচট খায়! গতি কমাতে চাইলে সেখানে রাস্তা মসৃন ও উন্নত না করে এবড়ো থেবড়ো অবস্থায় ফেলে রাখাই বেশি যুক্তিযুক্ত এবং কম খরচের অপশন। হাতির মত উঁচা স্পিডব্রেকারে একটি গতিময় গাড়ি যদি এসেই পড়ে তাহলে সেটার স্প্রিং ভাঙ্গবে এবং সেটা হটাত ঝাঁকিতে ব্যালেন্স হারিয়ে নিজেই দূর্ঘটনায় পতিত হবে। একান্তই যদি গতিসীমা কমাতে বলা হয় তাহলে সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি স্পিডব্রেকার দেয়া উচিত যেটা গতিতে পার হলেও গাড়ির ক্ষতি হবে না, কিন্তু গাড়ির চালক টের পাবে যে গতি কমাতে বলা হচ্ছে। এর পরে একটু বড় স্পিডব্রেকার দেয়া যেতে পারে। ইদানিং দেশের হাইওয়েতে এরকম গুড়ি গুড়ি গুচ্ছ স্পিডব্রেকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো দেখে কোন কোন ইতর গাড়িচালক দাঁত কেলিয়ে, তারপর আরো জোরে টান দিয়ে চলে যায়।

৩।
যেহেতু রাস্তা নকশা ও তৈরী করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ, তাই সেই রাস্তার স্পিড-লিমিট বা নিরাপদ গতিসীমাও নির্ধারণ করে দেয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। রাস্তায় গতিসীমা দেয়া কিন্তু খুবই ঝামেলার কাজ। কারণ, একটি উজ্জ্বল দিনে একটা নির্দিষ্ট রাস্তায় নিরাপদে যত দ্রুত গাড়ি চালানো সম্ভব, সেই একই রাস্তায় সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে নিরাপদে চলতে হলে একটু কম গতিতে চলতে হবে। এর সাথে যদি যুক্ত হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, অর্থাৎ পিচ্ছিল বা স্লিপারি রাস্তা তাহলে নিরাপদ গতি আরো কম হতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন রকম গাড়ি, এবং তাদের ফিটনেস অনুযায়ীও নিরাপদে যাত্রার গতিসীমা কম বেশি হবে। যেহেতু দিনের বেলা, রাতের বেলা, বৃষ্টির সময় আলাদা আলাদা গতিসীমা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই সবরকম বিপদের কথা মাথায় রেখে একটা রক্ষণশীল গতিসীমা লিখে দেয়া হয়। কিন্তু আসলে, একটি উজ্জ্বল শুকনা দিনে ঐ রাস্তায় ঐ গতিসীমার চেয়ে অনেক বেশি গতিতেও নিরাপদে চলা যায়। উন্নত বিশ্বে কিছু রাস্তায় ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে কন্ডিশন অনুযায়ী নিরাপদ গতিসীমা দেখানো হয়।

৪।
তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, “সামনে ক্যামেরা” সাইনবোর্ডটা দেখে যদি গাড়িচালক গতি কমিয়ে সেই লিমিটের মধ্যে গাড়ি চালায় তাহলে বোঝা যায় সে হুঁশে আছে, সবকিছু খেয়াল করতে পারছে। সুতরাং আগে-পিছে বেশি গতিতে গাড়ি চালালেও রাস্তায় যাত্রী ও গাড়ির নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু কোন ড্রাইভার যদি সেই সাইন দেখে খেয়াল না করে, তখন সেই বেশি গতি অন্যদের ক্ষেত্রে নিরাপদ হলেও, ঐ চালক আসলে বেখেয়ালে গাড়ি চালাচ্ছে - যেটা রাস্তা ব্যবহারকারীগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ – সুতরাং ক্যামেরাতে ধরা পড়ে তার জরিমানা হওয়া যুক্তিযুক্ত।

জাপানি পুলিশ রাস্তার নিরাপত্তার মূল বিষয়টা সঠিকভাবে বুঝে বলেই ও ধরণের একটা সিস্টেম করেছে। সুতরাং তারা আসলেই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। অযথা মানুষকে হয়রানি করার জন্য সিস্টেমকে কাজে লাগাচ্ছে না।

৫।
শুধু রাস্তায় গতিসীমাই নয়, এরকম আরো অনেক সিস্টেম আছে যেগুলো আসলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা আবশ্যকীয় নয়, ব্যাখ্যা জেনে সঠিক প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সেগুলো প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অন্যদেরকে হয়রানি করার জন্য ব্যবহার করে। হতে পারে প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ঐ নিয়মের মূল বিষয়টাই বোঝে না (না বুঝে মুখস্থ বিদ্যা), না হয় বোঝার চেষ্টাও করে না - অর্থাৎ নিপীড়ন করাই তাই মূল উদ্দেশ্য।

[ ইদানিং এরকম বেকুবি/ নিপীড়নের উদাহরণ দেখে পোস্টটির অবতারণা করলাম]

সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১৮

গণপরিবহণ নিয়ে ...

কোনটা চাই:

ধরুন একজন ব্যক্তি টঙ্গি থেকে মতিঝিল নিয়মিত অফিস করেন; আরও ধরুন গাড়িতে/বাসে যাওয়া আর আসাতে ৪৫ মিনিটও লাগতে পারে, আবার কপাল খারাপ থাকলে আড়াই ঘন্টাও লাগতে পারে, তাহলে তিনি ৯টার অফিস ধরার জন্য কখন রওনা দিবেন? কিংবা আগামী পরশুদিন একজনের সাথে সকাল ১০টায় মিটিং করার সময় ঠিক করে নিশ্চিন্ত মনে রওয়ানা দিতে পারবেন কি না?

এবার ধরা যাক সেই ব্যক্তির কাছে আরেকটি বিকল্প আছে, যেটাতে উনি জানেন যে এই পথটা ট্রেনে যাওয়া যায়, আর এভাবে গেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা, একটু হাঁটা সব মিলিয়ে ঠিক এক ঘন্টা ১৫ মিনিট লাগবে যেটাতে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট কম বেশি হতে পারে। তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াবে? উনি কি ৪৫ মিনিটে পৌঁছানোর চান্স নেয়ার জন্য গাড়িতে আসতে বেশি পছন্দ করবেন (ধরা খেলে আড়াই ঘন্টা লাগবে ৫০-৫০ চান্স) নাকি নিশ্চিত ভাবে সোয়া এক ঘন্টার ট্রেনযাত্রা বেছে নিবেন?
.
.
.
.
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে মানুষ যেটা চায় সেটা হল সময়ের নিশ্চয়তা। বিশেষ করে সেই যাত্রাটা যদি অফিস/স্কুল /কলেজ ইত্যাদিতে যাওয়া আসার মত নিয়মিত যাত্রার অংশ হয় তাহলে এই নিশ্চয়তার বিষয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। একই রাস্তা যেতে কোনদিন ৩০ মিনিট আর কোনদিন ৩ ঘন্টা লাগলে সেই আয়োজনের উপর নির্ভর করে কোন কাজের পরিকল্পনা করা যায় না। প্রতিদিনই যদি সেই একই রাস্তায় ঠিক দেড় ঘন্টা লাগে, তাও সেটা অনিশ্চয়তার চেয়ে ভাল। অন্ততপক্ষে সেই দেড় ঘন্টার জন্যও পরিকল্পনা করা যায় (যেমন: গাড়িতে/ট্রেনে/ট্রামে/বাসে ঘুমিয়ে নেয়া, জরুরী ফোনালাপ সেরে নেয়া, গান শোনা, নিউজপেপার পড়া, গল্পের বই পড়া, পডকাস্ট শোনা ইত্যাদি)। কাজেই সময়ের সাপেক্ষে নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা মানুষকে অনিশ্চয়তার হাত থেকে স্বস্তি দিতে পারে।

এ তো গেল যাত্রীর পক্ষের কথা। এবার আসা যাক সার্ভিস প্রোভাইডার বা সেবাদানকারীর কথায় …

সমস্যা কোথায়:

ব্যক্তি মালিকানায় যখন যাতায়াত সিস্টেম থাকে তখন তাঁদের লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ লাভ করা। কাজেই লিজ সিস্টেমে ড্রাইভার নিজ উদ্যোগে আর বেতনভোগী সিস্টেমে মালিকের নির্দেশেই সব সিট না ভরলে গাড়ি ছাড়বে না। আবার অন্যকেও আগে যেতে দেবে না, কারণ তাহলে যাত্রী হারাবে। ফলাফল রাস্তায় গাড়ি বাঁকা করে থামাবে, অন্য গাড়িকে ব্লক করবে, তৈরী হবে ঘন্টার পর ঘন্টা স্থায়ী ইতর যানজট। তৈরী হবে সেই অনিশ্চিত, সময়-অনির্ভরযোগ্য যাতায়াত সিস্টেম। এই ফল অবধারিত; বাস মালিক পক্ষকে লাভ করতে চাওয়ার জন্য দোষারোপ করে এটার সমাধান করা যাবে না। যদি জোর করে তাদের সময় মত বাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়, তাহলে অনেক সময় খালি গাড়ি নিয়ে তাঁদের বেশ কিছু পথ যেতে হতে পারে, ফলে হয়তো লাভ তো দুরের কথা, চলাচলের খরচই উঠবে না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আমরা যেই সিস্টেম চাই সেটা অর্থনৈতীকভাবে টেকসই নয়। আবার অর্থনৈতীক ভাবে টেকসই করতে চাইলে সেই নির্ভরযোগ্য সিস্টেম সম্ভব নয়। আসলেই কি তাই?

সমাধান আছে:

যদি ব্যক্তির লাভের বদলে সামগ্রীক লাভের দিকে তাকাই তাহলে হয়তো সমাধানের জায়গাটা চোখে পড়বে। যেই জায়গায় কোনো পাবলিক যাতায়াত সিস্টেম নাই আর যে জায়গায় আছে তাদের তুলনা করলে এলাকা দু'টির অর্থনৈতীক সমৃদ্ধির মধ্যে চোখে পড়ার মত পার্থক্য থাকবে। একটা এলাকার সাথে যদি অন্য এলাকাগুলোর চমৎকার নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা থাকে তাহলে সেই এলাকাটি সকলের জন্য আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। খুচরা বিক্রেয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন সেখানে আসতে চাইবে, তেমন মানুষজনও বসবাস করার জন্য সেখানে থাকতে চাইবে। ফলে সেই এলাকার জমির দাম বাড়বে, বাসা ভাড়া বাড়বে। চাহিদার উপর ভিত্তি করে সেখানে চমৎকার সব অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এই সব মিলিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় প্রশাসন তথা সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কাজেই সামগ্রীক ভাবে যে উন্নয়ন সেটার ফলে কোনো বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি মালিকের সরাসরি তেমন লাভ হয় না, কিন্তু প্রশাসনের আয় বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্য পরিমানে।

সংক্ষেপে: উন্নয়নের ভিত্তি হচ্ছে চমৎকার নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা - যেটাতে যাত্রী আসুক বা না-আসুক, সময় মত বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি চলতে হবে। কিন্তু এটাতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি মালিকের লাভ নাই, বরং ক্ষতি। কিন্তু এই সিস্টেমে লাভ তো হচ্ছে … কার? প্রশাসনের/সিটি কর্পোরেশনের ….

আর এজন্যই দেখা যায় পৃথিবীর সকল উন্নত শহরে সরাসরি বাসের/ট্রেনের খরচ না উঠলেও ভর্তূকী দিয়ে সময়-নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে প্রশাসন। কারণ প্রশাসনই এখানে অর্থনৈতীকভাবে লাভবান হয়, ব্যক্তি মালিকানার বাস/টেম্পু মালিক নয়।

ছোট স্কেলের উদাহরণ:

ধরুন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস শহর থেকে একটু দুরে, আর সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থাও খুব খারাপ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাবলো, নিজেরাই বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করবেন। এজন্য বেশ কিছু বাসও কিনলেন। বাসে যাতায়াতের টিকেটের খরচটাও সহনীয় রাখলেন। কিন্তু এখন যদি উনারা চিন্তা করেন, বাসের সব সিট না ভরলে ছাড়বেন না তাহলে সেটা সময়-নির্ভরযোগ্য হবে না। তখন কেউই ঐ ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে চাইবে না – করতে বাধ্য হলেও সেই দিন অন্য কোনো কাজের জন্য পরিকল্পনা করতে পারবেন না। কিন্তু টিকেটের টাকা থেকে খরচ তোলার চিন্তা বাদ দিয়ে যদি ভর্তূকি দিয়ে এটাকে সময়-নির্ভরযোগ্য সিস্টেমে পরিণত করা হয়, তাহলে ঐ ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা অনেক বেশি আকর্ষিত হবেন। আর ওখানে সকলেই এভাবে আসা-যাওয়া করলে কাজে-কর্মে আরও গতিশীলতা আসবে, ফলে ছাত্র ভর্তিও বৃদ্ধি পাবে – আর সামগ্রীকভাবে এটার লাভ, ভর্তূকীকে ছাড়িয়ে যাবে বহুগুনে।

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

কাউন্সেলিং বিষয়ক চিন্তাভাবনা

বর্তমানে কাউন্সেলিং শব্দটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। সাধারণ ভাবে মনে হয় councelling -এই ইংরেজি শব্দটির অর্থ কাউকে পরামর্শ দেয়া। কিন্তু গুগল আংকেলের কাছে এই বিষয়টির ব্যাপারে জানতে চেয়ে ধারণা হল, এর ব্যাপ্তি আরো অনেক গভীর এবং এটা করতে চাইলে রীতিমত আলাদা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

গুগলে কাউন্সেলিং লিখে সার্চ দিলে এই সংজ্ঞাটি আসে
Counselling is a type of talking therapy that allows a person to talk about their problems and feelings in a confidential and dependable environment. A counsellor is trained to listen with empathy (by putting themselves in your shoes). They can help you deal with any negative thoughts and feelings you have.
অনলাইনে এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম সাহায্যমূলক পোস্টও দেখলাম (বাংলা এবং ইংরেজিতে) – কয়েকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে যে কখন নিজেই বুঝতে পারবো আমার কাউন্সেলিং দরকার। আমার মনে হয়, একজনের পক্ষে নিজে নিজেই এই সমস্যা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারার বিষয়টা হল সবচেয়ে ভাল অবস্থা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অন্যেরা একজনের মাঝে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেও সেই ব্যক্তি নিজে কিন্তু সেটা অনুভব করতে পারেন না; এমনকি কেউ যদি বলে তোমার কাউন্সেলিং দরকার, তাহলে উল্টা মাইন্ড করে বসতে পারে। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আরেকজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ চোখের দরকার হয়, যে শিশুদের আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটা চিহ্নিত করতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা নিবে। আমার ধারণা, শিশুকে সরাসরি কিছু কাউন্সেলিং দেয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিবারকে কাউন্সেলিং দেয়া বেশি জরুরী হয়ে যায়।

অর্থাৎ সকলেরই হয়তো কাউন্সেলিং-এর দরকার নাই। কারো কারো দরকার আছে। কেউ যদি সেটা নিজেই বুঝতে পারে তাহলে তো ভাল, কিন্তু না হলে আরো কিছু চোখ দরকার যারা দেখে শুনে কিংবা তাদের অজান্তেই কিছু মানসিক বিষয় পরীক্ষা করে দেখে কাউন্সেলিং দরকার – এমন ব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারবেন। চিহ্নিত ব্যাক্তিটি প্রতিষ্ঠানের স্টাফ, কর্মকর্তা, শিক্ষক কিংবা ছাত্র হতে পারে।

আপনাদের হয়তো জানা আছে, সরকারী চাকুরীর মৌখিক পরীক্ষা বা সাক্ষাতকারের সময়ে সেই ভাইবা বোর্ডে একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ বসে থাকেন এবং চাকুরীপ্রার্থীর আচরণ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে থাকেন। একই রকম বা এর চেয়েও সিরিয়াসভাবে মানসিক গড়ন পরীক্ষা করা হয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। আমার বাচ্চার স্কুলেও এরকম পূর্ণকালীন সাইক্রিয়াটিস্ট আছে বলে শুনেছি।

কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা আমরা যে কেউ চিহ্নিত করতে পারি – যেমন ক্লাসে অমনোযোগী, বাচালতা, উগ্রতা, মনমরা হয়ে থাকা ইত্যাদি। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর সমাধানও সকলের জানা - যদিও সব ইস্যূতে প্যাঁদানি দেয়া কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না ... ... আবার, এখন তো স্কুলে মারধর করা আইনত নিষেধ (ইস্ আমাদের সময়ে যদি এমন থাকতো! ...); আর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মারধর তো দুরের কথা, বকা দিতেও এখনকার যুগে রীতিমত ভয় লাগে ... ...। আমি যতটুকু বুঝি, বকা দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হয় না। ভারতীয় নায়ক আমীর খানের ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটি হয়তো অনেকেরই দেখা আছে - এটা এবিষয়ে চিন্তার খোরাক যোগাবে।

কাউন্সেলিংএর কথা একটু বাদ থাক ... আমরা যে শিক্ষকতা করি সেটারই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কয় জনের আছে? আমি নিজে প্রকৌশলী হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি, শিক্ষকতা করার জন্য কিছু আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন আছে, যা বিকাশের জন্য কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষন পাইনি – আমাদের পাঠ্য সিলেবাসে ছিল না। সম্ভবত বেশিরভাগ বিষয়ের শিক্ষকগণেরও আমার মত একই অবস্থা – আমরা গান শিখে নয়, বরং গাইতে গাইতে গায়েন হয়েছি। আমার ধারণা, যাঁরা লেখাপড়া বিষয়ে লেখাপড়া করেন অর্থাৎ বি.এড, এম.এড করেন (কিংবা পুরানা আমলের বি.এ.বি.টি) তাঁদেরকে এই বিষয়গুলোর অনেকটাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আবার বিদেশী, বিশেষত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীর কোর্স কনটেন্ট ঘাটাঘাটি করে দেখেছি সেখানে ক্লাস ম্যানেজমেন্ট, প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ, গবেষণার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে রীতিমত কোর্সওয়র্ক করতে হয়। – এর উপরে যুক্ত হচ্ছে কাউন্সেলিং; কাউন্সেলিংকে আলাদাভাবে চিন্তা করছি তার কারণ আছে ...

কার কাউন্সেলিং-এর দরকার আছে সেটা চিহ্নিত করাটা একটা প্রাথমিক কাজ। এটার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার আছে। চিহ্নিত করার জন্য হয়তো কিছু ধাপে ধাপে করার মত প্রক্রিয়া আছে, হয়তো কিছু প্রশ্নপত্র আছে যার অনেকগুলো সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে – সেই উত্তরের প্যাটার্ন থেকে একেকজনের মানসিক গড়নটা বেরিয়ে আসবে, অস্বাভাবিকত্ব থাকলেও বেরিয়ে আসবে। হয়তো কিছু মানসিক পরীক্ষা আছে, যেগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেখে অস্বাভাবিকত্ব চিহ্নিত করা যাবে।

সম্ভবত, এর পরের কাজ হল সেই কাউন্সেলিং দেয়া অথবা তাকে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের কাছে পাঠানো। ছাত্র কাউন্সেলিং নিয়ে গুগল আংকেল ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম বিদেশি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং বিষয়ে রীতিমত আলাদা বিরাট সেটাপ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রকম বিষয়ে কাউন্সেলিং দেয়া হয়; বিষয়গুলোর নামের উদাহরণ দিচ্ছি -যেমন আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির (Iowa State University) কাউন্সেলিং বিষয়ক বিভাগের ওয়েব পেজ অনুযায়ী বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়:

- আত্মপরিচয় এবং নৈতিকতা (exploration of identity and values)
- পেশাগত উন্নয়ন – ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং? (exploration and development of career and majors)
- সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যা (relationship problems)
- হীনমন্যতা (low self-esteem)
- চাপ (stress)
- একাকীত্ব (loneliness)
- মানসিক অবস্থার সমস্যা, মনমরা থাকা (mood disturbances or depression)
- সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য অভিযোজন বিষয়ক (cultural exploration or navigating differences)
- যৌননিপীড়ন থেকে আরোগ্য (sexual assault recovery)
- শরীরবৃত্তীয় অথবা খাদ্যাভাস বিকৃতি বিষয়ক (body image or disordered eating concerns)
- মানসিক আঘাত এবং/অথবা অত্যাচার (trauma and/or abuse)
- যৌনপ্রবৃত্তি বা পরিচয় বিষয়ক (questioning sexual identity or orientation)
- দ্রব্যের অপব্যবহার (substance misuse)
- লেখাপড়া বিষয়ক কিংবা প্রেরণা (academic concerns or motivation)

এ্যাতসব বিষয়ে সম্যক জানা এবং কাউকে সঠিক পরামর্শ দেয়া এবং তাঁর মানসিক পর্যায়ে প্রভাবিত করা যে কোন একজনের পক্ষে বেশ কঠিন কাজ হবে বলেই মনে হয়। আর, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এটা করতে গেলে হীতে-বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে না - এমনটিও নিশ্চিত করা যায় না। ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ছাড়া দলগত কাউন্সেলিংও আছে বলে দেখেছি। এমনকি সমবেত সংগীতে অংশগ্রহণ করলেও কিছু বিষয়ে উপকার হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম। পরিবেশ, শব্দ, রং, সংগীত সবই মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা (এবং অসুস্থতা) প্রভাবিত করে বলে বেশ ভালো গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে। মানুষের মনের অলিগলিতে কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে। আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষিত একটা লোকবল যে কোন প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য একটা মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।

দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় গত ৩১-জানুয়ারী-২০১৬ সালে এ বিষয়ক একটা অসাধারণ উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যা হুবহু নিচে তুলে ধরা হল। এখানে লেখকদ্বয় সরাসরি বলে দিয়েছেন কাউন্সেলিং মানে শুধু পরামর্শ দেয়া নয় …

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং
গ্লোরিয়া রোজারিও ও প্রিয়াংকা শঙ্কর দাস

একটি হাসপাতালের মানসিক বিভাগে আমার ভিজিটিং কার্ড দিতে গিয়েছিলাম, যাদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন তাদের যেন ‘রেফার’ করা হয়। কিন্তু মানসিক ডাক্তারের কথায় আমি হতবাকই হলাম। তিনি বললেন যে ‘আমিই কাউন্সেলিং করি। কারো কাছে আমার ‘রেফার‘ করার প্রয়োজন হয় না। ’

আরেক দিন একটি স্কুলে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছিলাম, যেসব ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকের মানসিক সমস্যার জন্য সাহায্যের দরকার তারা যেন কাউন্সেলিংয়ের জন্য ‘রেফার’ করেন। দুজন শিক্ষক আমাকে মুখের ওপর ফের বলে দিলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের আমরাই কাউন্সেলিং করি। ’ এ তো একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়ে দাঁতের যন্ত্রণায় কাতর রোগীর দাঁতের অপারেশন করার শামিল। একজন স্কুল শিক্ষক যদি মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সেলিং করেন (প্রশিক্ষণ ছাড়া), তাহলে ওই রোগী বা ক্লায়েন্ট কি সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে? তাঁদের কথা শুনে ভাবলাম, সবাই যদি কাউন্সেলিং করেন, তবে যাঁরা কাউন্সেলিংয়ের ওপর পড়াশোনা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাঁদের কাজ কী হবে!

অপ্রিয় হলেও সত্য যে এখনো পর্যন্ত অনেকেরই কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই ভাবেন, কাউন্সেলিং হলো পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু না, কাউন্সেলিং মোটেও পরামর্শ দেওয়া নয়। কাউন্সেলিংয়ে মূলত একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। তাই আমাদের এ লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল প্রাচীন সভ্যতার মিসর, মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক) ও পারস্যে (ইরান)। সেখানকার ধর্মযাজকরা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি দান করতেন। ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতে, সমসাময়িক কাউন্সেলরদের আবির্ভাব ঘটে ১৮০০ শতকের পর। তখনকার কাউন্সেলররা মূলত ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক (বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক), যাঁরা ছাত্রদের শুধু একাডেমিক ফলাফল ছাড়াও তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা, যেমন আবেগীয় ও আচরণগত সমস্যা, এসব ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করে কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতেন। আমেরিকার কংগ্রেস ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স এডুকেশন অ্যাক্ট (এনডিইএ) চালু করে এবং এর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং দেন, তিনিই কাউন্সেলর। একজন ব্যক্তি কাউন্সেলিং পেশায় সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্য তাঁকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি কিংবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর শিক্ষা অর্থাৎ মাস্টার্স, সেই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হয়। আর যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং সেবা নেন তাঁকে বলা হয় ক্লায়েন্ট।

কাউন্সেলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি পেশাগত সম্পর্ক বিরাজ করে এবং ব্যক্তিগত, দলগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। ফলে তাদের মধ্যে নিজেদের ও অন্যদের সম্পর্কে এমন একটা স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যেটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ও দ্বন্দ্বগুলো সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। অনেকেই কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি সমার্থক কিংবা একই অর্থে অদলবদল করে ব্যবহার করে। থেরাপি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেরাপিয়া থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসঙ্গে পথ হাঁটা’। কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কাউন্সেলর ও ক্লায়েন্ট একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তাহলে দুটি বিষয়ই অর্থাৎ কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির কাজ মোটামুটি একই রকম।

কাউন্সেলরের প্রাথমিক কাজ হলো ক্লায়েন্টকে তার নেতিবাচক চিন্তাপদ্ধতি পরিবর্তন, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, জীবনের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সে যেন তার অনুকূল মাত্রায় মনঃসামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় হতে পারে সে ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করা। এ জন্য কাউন্সেলররা মানসিক স্বাস্থ্য, মনোবৈজ্ঞানিক ও মানুষের বিকাশগত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করে চিন্তাভাবনা, আবেগীয়-আচরণীয় অথবা নিয়মতান্ত্রিক বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের ভালো থাকা বা সুস্থ থাকা, ব্যক্তিগত বিকাশ অথবা পেশাগত উন্নয়ন, এমনকি মনোরোগ থাকলে সে ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকেন।

কাউন্সেলরের ভূমিকা অন্যান্য পেশা থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে কাউন্সেলর সমস্যাটির দিকে খেয়াল করেন এই ভেবে যে এই সমস্যাটি ব্যক্তি, নিয়ম ও সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই বেড়ে চলেছে। কাউন্সেলররা রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের তুলনায় বেশি খেয়াল করেন ক্লায়েন্টদের মানসিক বিকাশ ও মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধ, দক্ষতা, গুণাগুণ, মানসিক শক্তির উৎস ও চাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

সাধারণত কাজে অনাগ্রহ, সামাজিক ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, যোগাযোগে অক্ষম, অবিরাম চিন্তা, দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন, যেকোনো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া, শুচিবায়ু, বারবার হাত ধোয়া, হতাশাগ্রস্ততা, একাকিত্ব, আশাহীনতা, পেটে সমস্যা, মাথাব্যথা, অকারণে জ্ঞান হারানো, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, ভাঙচুর করা, মিথ্যা কথা বলা, অতি চঞ্চলতা, অমনোযোগী, অটিজম, মিশতে না পারা, দুঃখজনক ঘটনা থেকে প্রাপ্ত আঘাত, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিদ্রাহীনতা, ঘুমে ব্যাঘাত, মন মরা হয়ে থাকা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করা হয়।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি যখন শুরু হয় তখন ক্লায়েন্ট তার মনের কষ্টের সব কথা খুলে বলতে থাকে। দুঃখের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই সে খুব কান্নাকাটি করে, ভেঙে পড়ে। তখন ক্লায়েন্ট নিজেও হয়তো মনে করতে পারে যে এখানে এসে সব কিছু খুলে বলে তো আমি আবারও আগের সেই আঘাত পাওয়া মুহূর্তের কষ্টটা পাচ্ছি। তাহলে আমার সঙ্গে এটা কী হচ্ছে? এটা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াতে ক্লায়েন্টের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ভয়ের কিছুই নেই; সেই বিপজ্জনক মুহূর্তটিতেও তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই কাউন্সেলররা আছেন। কাউন্সেলরই ওই মুহূর্তটিতে তাকে সহায়তা করবেন স্থির হওয়ার জন্য, ভালো থাকার জন্য।

কাউন্সেলিং সেশনটি সাধারণত হয় ৪৫-৫০ মিনিটের। আর কাউন্সেলিং সেশন সংখ্যার গড় হলো সাত-আটটি। তবে সমস্যার বিষয়ভেদে ও ক্লায়েন্ট অনুযায়ী সেশন সংখ্যা কমবেশি হতে পারে।

কাউন্সেলিং সেশনে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে ক্লায়েন্ট কাউন্সেলরের কাছে যেসব কথা বলবে সেসব কথা গোপন রাখা হয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ভাঙা হবে। প্রথমত, ক্লায়েন্টের যদি আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাহলে ক্লায়েন্টের মা-বাবা বা কাছের মানুষদের তার জীবন বাঁচানোর জন্যই তথ্যটি জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্ট যদি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তৃতীয়ত, যদি কখনো কোর্ট থেকে নির্দেশ আসে। তবে এ তথ্যগুলো জানানোর আগে অবশ্যই ক্লায়েন্টকে এ বিষয়ে বলে নেওয়া হবে।

আমাদের দেশে কাউন্সেলিং করাতে হলে ফি দিতে হয় ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে কিছু কিছু জায়গায় বিনা মূল্যেও কাউন্সেলিংসেবা পাওয়া যায়। যেমন—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিএসসির কাউন্সেলিং ও গাইডেন্স সেন্টারে।

কাউন্সেলিং হলো মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি পেশাগত প্রক্রিয়া। একজন পেশাদার কাউন্সেলরের এ পেশা চর্চা করার জন্য একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কাউন্সেলররা দক্ষতার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে কাজ করেন। কাউন্সেলিং নেওয়ার আগে কাউন্সেলরের যোগ্যতা সম্পর্কে জেনে নিন, যেন সঠিক সেবা পেতে পারেন।


লেখকদ্বয় : গ্লোরিয়া রোজারিও, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
প্রিয়াংকা শংকর দাস, কাউন্সেলর, হিলিং হার্ট কাউন্সেলিং ইউনিট, বসুন্ধরা, ঢাকা

ধৈর্যসহ এ্যাতদুর পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

সহায়কমূলক তথ্যসূত্রসমূহ:
http://www.kalerkantho.com/print-editio … /31/319282 (মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং)
https://bn.thecabindhaka.com.bd/10-sign … -health-2/ (১০ টি সংকেত যা নির্দেশ করে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং দরকার)
http://www.newsbangladesh.com/details/2399 (অনলাইনে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং)

শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭

এই প্রজন্মের সমস্যাটা কী?

১।
কিছুদিন আগে ঠিক এই ইংরেজি শিরোনামে একটা বক্তব্যের ভিডিও দেখেছিলাম (লিংক শেষে)। অসাধারণ এই বিশ্লেষনটা আমি পরে পরিচিত অনেক জনকেই দেখিয়েছি। এই বক্তব্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নাম Simon O. Sinek – একজন ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা (জন্মসাল: ১৯৭৩)। তাঁর লেখা তিনটা বই আছে। আচ্ছা এবার মূল বিষয়ে ফেরত আসি: এইখানে তাঁর বক্তব্যের একটা কাছাকাছি বাংলা দেয়ার চেষ্টা করছি কারণ: মনে হয়েছে যাদের দেখার সুযোগ হয়নি বা ইংরেজিতে সমস্যা তাঁরা এই বিশ্লেষনটা জানুক।

২।
এবার আসি সংক্ষেপে সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনটিতে:
বর্তমানের যে প্রজন্ম অর্থাৎ ৮৪ সাল বা এর পরে যাদের জন্ম তাঁদের চারটা বৈশিষ্ট আছে যা আগের প্রজন্মগুলো থেকে সম্পুর্ন আলাদা। এঁদের নামে অনেক অভিযোগ – এরা নবাবজাদা মানসিকতার; এদেরকে ম্যানেজ করা কঠিন; এরা আত্নকেন্দ্রীক; লক্ষ্যহীন; অলস ইত্যাদি।

এঁদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: জীবনে কী হতে চাও? এঁদের জবাব হবে - আমি একটা মহৎ কাজ করতে চাই; সবার জীবনে প্রভাব ফেলতে চাই (বিখ্যাত?), ফাও খেতে চাই ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা যা চায় সেগুলো দেয়া হলে, এমনকি ফ্রী খাইতে দিয়েও তাদেরকে খুশি করা যায় না দেখা যায় কিছু একটা বাকী আছে। এরকম হওয়ার পেছনে চারটি মূল কারণ বের করেছেন তিনি।

প্রথম কারণ হল ভুলভাবে বাচ্চা লালন-পালন। এদের বেশিরভাগের বাবা-মাগণ ছোটকাল থেকে এঁদেরকে বার বার বলেছে যে তাঁরা স্পেশাল; বলেছে যে তোমরা যা হতে চাও তাই হতে পারবে - ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এমন যে শুধুমাত্র চাইলেই হবে; কিন্তু এর জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে সে ব্যাপারে কিছুই বলে না। এদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে কারণ এমন নয় যে এরা এর যোগ্য (মানে রেজাল্ট এ্যাত ভাল যে উচ্চতর ডিগ্রী করানো যায়), কারণ হল এটা এঁদের বাবা-মা’ চায় তাই। কেউ কেউ ক্লাসে এ গ্রেড পেয়ে এসেছে - যোগ্যতার কারণে নয়, বরং এই কারণে যে শিক্ষক এঁদের অতি নাক-গলানো স্বভাবের বাবা-মা’কে এড়াতে চায়। কেউ কেউ এমনকি ক্লাসে দেরিতে আসার জন্যও পুরষ্কার পায় – কাজেই যা হয় তা হল যারা সত্যিই পরিশ্রম করে তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে করে - পরিশ্রম করার আগ্রহ কমে যায়। আর যে শেষে আসার জন্য পুরষ্কার পায় সে একটু বিব্রত বোধ করে - কারণ সে জানে সে পুরষ্কারের যোগ্য না; তাই হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু এই গ্রুপের পোলাপানগুলো যখন বাস্তব জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে এঁরা দেখে - তাঁরা ম‌োটেও স্পেশাল নয়; মামা-চাচার লবিং ছাড়া প্রমোশন পাচ্ছে না; দেরিতে বা শেষে আসার জন্য কোন পুরষ্কার নাই; আর শুধুমাত্র চাচ্ছে বলেই কোন কিছু পাওয়া যায় না – ফলে মুহুর্তেই তার নিজেকে নিয়ে গড়া স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। ফলে একটা পুরা প্রজন্ম, তাদের পূর্বসূরীদের চেয়ে অনেক বেশি হীনমন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে।

৩।
দ্বিতীয় কারণ হল বাধাহীনভাবে সামাজিক মাধ্যম যথা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া। লোক-দেখানি ভাব নিতে এগুলোর জুড়ি নাই। অসাধারণ জীবন যাপনের একটা ভূয়া ভাব নেয়া যায় সেখানে, যদিও যে চরম ভাব নিচ্ছে আদতে হয়তো তাঁর মন খারাপ। ফলে এখানে ঘুরলে মনে হয় সবাই কী দারুন জীবন যাপন করছে, আর তাদের কথাবার্তা দেখলে মনে হয় জীবনে তাঁরা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে যা বাস্তবের পুরা বিপরীত। আরেকজনের কাজ কারবার দেখলে মনে হয় আমারও এমনই করতে হবে - কিন্তু আদতে সেরকম হওয়া বা করা সম্ভব না। ফলে হীনমন্যতায় ভোগা একটা প্রজন্ম আরো বেশি হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে - যদিও এতে তাঁদের কোন দোষ ছিল না।

একজনের হয়ত কিচ্ছু করার নাই, বা ভাল লাগছে না - তাই মেসেঞ্জারে গ্রুপকে লিখলো “হাই ...”। একটু পরেই আবার মেসেজ চেক করে দেখে দশটা রেসপন্স এসেছে …. “হাই”, “হাই”, “হাই”, “হাই” … … … … … । এতে আসলে কী হল!? মনে হল কিছুই না, কিন্তু আসলে এটাতে প্রথম ব্যক্তির বেশ ভাল লাগলো। এই যে ভাল লাগা, এই অনুভুতিটার পেছনে একটা হরমোন কাজ করে - যেটার নাম হল ডোপামিন। এজন্যই আমরা বার বার চেক করি, কয়টা লাইক পড়লো, কয়টা রেসপন্স আসলো ইত্যাদি। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের ডোপামিন নিঃসরণ ঘটাতে সাহায্য করে। তবে জেনে রাখা ভাল, এই সামাজিক যোগাযোগের ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া আরো অনেক যে যে জিনিষগুলো আমাদের ড‌‌োপামিন নিঃসরণ ঘটায় সেগুলোর মধ্যে আছে – সিগারেট, মদ, জুয়া এবং অন্যান্য মাদক দ্রব্য। অর্থাৎ মাদকতার আনন্দ যে ডোপামিনে, যা আসক্তি সৃষ্টি করে - ঠিক সেই একই রকম আসক্তি এই সামাজিক মাধ্যম সৃষ্টি করে। ছোটরা যেন অবুঝের মত আক্রান্ত না হয়ে পড়ে সেজন্য বিদেশে মদ, সিগারেট কিনতে এবং জুয়া খেলতে বয়সের বিধিনিষেধ আছে - দোকানে নির্দিষ্ট বয়েসের কমবয়সী কেউ সেগুলো কিনতেই পারে না; অথচ একই রকম আসক্তিদায়ক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বাচ্চাদের কোনো বাধা নাই। এর মানে হল অনেকটা এরকম: একজন কিশ‌োরকে বা বালককে নিজের সিগারেট প্যাকেটে/মদের ভাণ্ডারে বাধাহীন অধিকার দেয়া।

৪।
কাজেই এই প্রজন্ম বিশেষত কৈশ‌োরের মানসিক পরিবর্তনের সময়ে যখন বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক চাপ সামলাতে খাবি খায় তখন তাঁদের সামনে এরকম একটা নেশাদ্রব্য দিয়ে দেয়া হচ্ছে সেই চাপ ভুলে থাকার জন্য। সেই আবেগ মানসিক চাপ ইত্যাদি সামলাতে যখন বাবা-মা কিংবা বন্ধুদের সাহায্য দরকার ছিল, তখন তাঁরা নেশার সাহায্য নেয় – নেশা মানে এই সামাজিক মাধ্যম – ফেসবুক ইত্যাদি। আর এই ব্যাপারটা যখন তাঁদের মাথায় গেঁথে যায়, তখন জীবনের যে কোন পর্যায়ে সামাজিক, অর্থনৈতীক কিংবা পেশাগত চাপ সামলাতে তাঁরা কোন বন্ধু বা গুরুজনের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে নেশার বোতল তথা ফেসবুক টাইপের জিনিষপাতি খুলে বসে। আর এ-তো জানা কথাই, নেশা কখনই দীর্ঘমেয়াদে ভাল কিছু করতে পারে না; এটা জীবন ধ্বংসকারী একটা বস্তু।

আর এই আসক্তির কারণে দেখা যায়, এই প্রজন্মের বড় একটা অংশ সত্যিকারের বন্ধুত্ব, গভীর সম্পর্কের অর্থই বোঝে না। তাদের বন্ধুত্বগুলো ভাসা ভাসা; যে বন্ধুর উপর নির্ভর করা যায় না – আর এমনও হতে পারে যে মজা শেষে তাকে খুব সহজেই আনফ্রেন্ড করে দিতে পারে। বাস্তব জীবনে ঝগড়া, মারামারি, মান অভিমানে যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার কথা সেরকম গভীর বন্ধুত্ব হওয়ার মত সুযোগই তাদের হয়না। বন্ধু তৈরীর যে পথ, যে কৌশল: সেটা শেখারই কোন সুয‌োগ তারা পায় না। আর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন চাপ সামলাতে নেশাতে ডুবে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায়ও থাকে না।

নেশার যে দ্রব্যগুলো - সেগুলো কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারেই নেশা হয়। বুঝে শুনে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সেগুলো কিন্তু আনন্দের উৎস হতে পারে। কিন্তু এই সময়ে যেটা হচ্ছে ২৪ ঘন্টাই সেলফোনের প্রভাবে নেশাগ্রস্থ থাকছে একটা প্রজন্ম। আরেকজনের দিকে মাথা তুলে তাকানোর পর্যন্ত সময় নাই। খুব জরুরী দুই একটা কথার বাইরে যে কেমন আছেন, মুরগী ডিম পারছে কি না, কিংবা বাসায় মশার উপদ্রব – বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরীর শুরুতে জরুরী এই জাতীয় নির্দোষ আলাপচারিতা করার মত সময় বা দক্ষতা তাদের থাকেনা। বন্ধুদের সাথে খেতে বসে যদি সেদিকে মনযোগ না দিয়ে আরেকজনের সাথে ফোনে চ্যাট করতে থাকে কেউ – তাহলে সেটা অবশ্যই একটা নেশা, একটা সিরিয়াস সমস্যা। একটা অফিসিয়াল মিটিংএ যদি মনোযোগটা ফোনের মেসেজে বেশি থাকতে হয়, তাহলে সেটা সমস্যা। ঘুম থেকে উঠে পাশে শুয়ে থাকা প্রিয়জনের খবর নেয়ার আগে যদি ফোনের মেসেজ চেক করে কেউ – তাহলে সেটা নেশা – অবশ্যই একটা সমস্যা।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে যাদের আত্মসম্মানবোধ গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি; আরও দেখা যাচ্ছে চাপ সামলানোর টেকনিকগুলো শেখার সুযোগ আমরা তাদেরকে দেই নাই – নেশাগ্রস্থ হওয়াটা কোন টেকনিক হতে পারে না।

৫।
এবার আসা যাক তৃতীয় কারণে (যেটার সমস্যাটা হল অসহিষ্ণুতা) – তাৎক্ষনিকভাবে চাহিদা মিটে যাওয়ার অভ্যাস। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেউ কিছু কিনতে চাইলে আয়োজন করে টাকা পয়সা জোগাড় যন্ত্র, হাটের দিন কবে ইত্যাদি খোঁজ নিয়ে সময় করে বাজার/হাটে যেতে হয় না; অনলাইনে তখনি কিনে ফেলতে পারে, টাকা না থাকলে অসুবিধা নাই – কারণ এজন্য ক্রেডিট কার্ড আছে, পেমেন্ট অন ডেলিভারি আছে, ইনস্টলমেন্টের সুবিধা আছে; আর একদিনের মধ্যেই সাধারণত জিনিষটা বাসায় চলে আসে। কেউ সিনেমা দেখতে চাইলে ইউটিউব বা অন্য মিডিয়াতে সাথে সাথে দেখতে পারে, কিংবা পে-চ্যানেলে গিয়েও দেখতে পারে। সিনেমাটা কাছের সিনেমাহলে আছে কি নাই, শো-এর টাইমটেবল, টিকেট আছে কি না – এসব নিয়ে কোন ঝামেলাই নাই। একটা টিভি সিরিজ দেখার ইচ্ছা হলে সাথে সাথেই ইন্টারনেটে সেটা দেখে ফেলা যায়। পরের পর্বের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস অপেক্ষার ফলে সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সেটার কোন বিষয়ই আর নাই এখন। কেউ কেউ তো আবার এতই অধৈর্য যে, মাঝের পর্ব বাদ দিয়ে একেবারে সিজনের শেষ পর্ব দেখে ফেলে।

এমনকি, কাউকে প্রপোজ করাটাও এখন এঁরা শিখতে পারে না। কিভাবে হাত ঘষে ঢোক গিলে বোকা বোকা কথা শুরু করবে ডিজিটাল যুগে এধরণের সামাজিকতা শেখারও প্রয়‌োজন নাই। ডেটিং সাইটে গিয়ে শুধু ক্লিক করলেই সব ঠিক। এই যুগে যাই চাওয়া হয়, সাথে সাথে পাওয়া যায়, শুধুমাত্র যা পাওয়া যায়না সেটা হল – পেশাদারিত্ব আর গভীর সম্পর্ক। কারণ, এগুলোর জন্য কোন অ্যাপ নাই। এগুলোর অর্জন হয় ধীরগতির, আঁকাবাঁকা, বন্ধুর পথে – যা পেরোতে দরকার ধৈর্য আর একাগ্রতা। কিন্তু এই প্রজন্মের এই অর্জনগুলোর জন্য যে প্রশিক্ষণের দরকার ছিল তা হয়নি। কর্মস্থলে গিয়ে এরা হতাশ হয়, গভীর সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হয় / পিছিয়ে যায়: কারণ ধৈর্য ধরে সফলতার জন্য অপেক্ষা আর লেগে থাকা, তিল তিল করে সফলতার ভিত্তি গড়ে তোলা বা কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চর্চা - এ ধরণের কোন প্রশিক্ষণই বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এরা পায় না। ব্যাপারটা অনেকটা পর্বতের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে চূড়াতে যাওয়ার কামনার মত – এঁরা শুধু চূড়া দেখে আর সরাসরি সিরিয়ালের শেষ পর্ব দেখার মত স্টাইলে সেখানে যেতে চায়। কিন্তু বাস্তব তো এমন নয়: এর জন্য পাহাড় ডিঙানোর পরিশ্রম, ধৈর্য, পরিকল্পনা, দক্ষতা এইসব দরকারী বিষয়গুলোর কোন ধারণাই এদের মধ্যে থাকে না। ফলাফল আরো বেশি হতাশা, হীনমন্যতা।

এইসব কারণে হতে পারে যে সমাজে আত্মহত্যা, মাদকাসক্তির হার বেড়ে যাবে। ডিপ্রেশনের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার হার বেড়ে যাবে। মন্দের ভাল হিসেবে সবচেয়ে ভাল যেটা হতে পারে, তা হল: পুরা সমাজের একটা বড় অংশ রোবটের মত একঘেয়ে একটা জীবন পার করবে কিন্তু কখনই জীবনের আনন্দঘন দিকগুলো সেভাবে উপভোগ করতে পারবে না। কখনই তাদের মধ্যে জীবনবোধের গভীরতা কিংবা পরিপূর্ণতার অনুভূতি আসবে না।

৬।
শেষ বা চতূর্থ পয়েন্টটা হল পরিবেশ। কর্পোরেট কালচারেও সবকিছু স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে করা হয়। এঁরা যে নতুন কর্মী যোগ দিয়েছে তার কোন উন্নয়ন হল কি না সেটা মোটেও ভাবে না বরং নিজেদের স্বল্পমেয়াদী অর্জনের লক্ষ্য ঠিক আছে কি না সেটা নিয়েই চিন্তিত। এটা এমনই একটা পরিবেশ যেটা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে মোটেই সাহায্য করছে না। এই কর্পোরেট পরিবেশ তাদেরকে পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব স্থাপনের যে কৌশল তা শিখতে সাহায্য করছে না। অসহিষ্ণুতা থেকে বেরিয়ে আসতে যে প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং দরকার – ধৈর্যধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যস্থির করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার – সেটার কোন ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে না এই কর্পোরেট সংস্কৃতি। যে ধরণের অর্জনগুলো করতে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে এক লক্ষ্যে কাজ করতে হয় এবং সেটা অর্জনের পর যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, সেটা অনুভব করার কোন সুযোগই তাদেরকে এখানে দেয়া হয় না। এসব কারণে দিনকে দিন তারা আরও হতাশ হয়ে যায়, মনে করতে থাকে তাঁদের কোন যোগ্যতাই নাই।
বাব-মা’র ভুল, সমাজ-ব্যবস্থার ভুলের ফলে এই প্রজন্ম ক্রমেই আত্মকেন্দ্রীক, অসহিষ্ণু এবং অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে – অথচ তার দায় কেউ নিতে রাজি হয় না। … … … …

৭।
সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনের পরিপ্রেক্ষিতের সাথে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত হয়তো পুরাপুরি মিলবে না। কিন্তু কিছুটা শিক্ষনীয় চিন্তা-জাগানিয়া বিশ্লেষনী দৃষ্টিভঙ্গি যে সেখানে আছে - সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। এই যে আমাদের পোলাপানগুলোকে না চাইতেই গণহারে উচ্চতম জিপিএ দিয়ে পাশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে সেটার দীর্ঘমেয়াদে প্রায় একই রকম খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কথা। কারণ এতে যাঁরা সত্যিকারের পড়াশোনা করতো তাঁরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তেল আর ঘি’য়ের যখন একই মূল্যায়ন হবে তখন কেন কষ্ট করে ঘি উৎপাদন করবে কেউ? আর এই না চাইতেই পাওয়ার ফলে তাঁদের অবচেতন মনে এমন ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে এই ডিগ্রীগুলো ছেলের হাতের মোয়া, সহজলভ্য বস্তু - যা না চাইতেই পাওয়া যায়। এর জন্য পরিশ্রম, অধ্যবসায় এসবের কোন প্রয়োজন নাই। শুধু আসবো যাবো, ফূর্তি করবো, ফেসবুকিং করবো, চকচকে ক্যাম্পাসে ফ্যাশন করে ছবি তুলবো – কয়দিন পর প্রসেসের কারণে ডিগ্রী এমনিই পাওয়া যাবে।

জানি, উচ্চশিক্ষার কিছু জায়গায় এই চর্চাটাই চলছে। কিন্তু অবচেতন মনে হীনমন্যতা ঢুকে আত্মসম্মানবোধহীন যে প্রজন্ম আমরা তৈরী করছি তাতে করে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। কর্মক্ষেত্রে এঁদের বড় অংশ শুধু খাবি খাবে। কোত্থাও টিকতে পারবে কি না জানিনা, তবে হতাশা বাড়তেই থাকবে।

==
ইউটিউবে সাইমন ভাইয়ের ভিডিও লিংক

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৩

উল্টা পাল্টার দেশে

শুরুতে একটা রূপকথার গল্প সংক্ষেপে:
রাজার পুত্র, মন্ত্রী পুত্রের সাথে দেশভ্রমনে বের হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে এক দেশে গিয়ে দেখে সেখানে তেলের যে দাম, ঘিয়েরও একই দাম। বড় বাড়ির যেই ভাড়া ছোট ঘরেরও সেই ভাড়া। রাজার ছেলে বেজায় খুশি --- সেখানেই বিলাস জীবন যাপনের আয়োজন করতে লাগলো। মন্ত্রি পুত্র বললো যে দেশে কোন ন্যায় নীতি নাই সেই দেশ বিপদজনক, আমি চললাম -- এই বলে সে নিজ দেশে ফিরে এল। এদিকে সেই দেশে এক চোর ধরা পড়লো, বিশাল আয়োজনের বিচারে ওখানকার রাজা দেখে যে চোর ব্যাটা শুকনা-পটকা হাড্ডিসার আধমরা চেহারার গরীব লোক। 'এই ব্যাটাকে শুলে চড়ানো দেখতে মজা হবে না -- প্রহরী-ই-ই, যা মোটা তাজা দেখে একটাকে ধরে নিয়ে আয়, এটার বদলে ওটাকে শুলে চড়াই।' ঐখান দিয়ে যাচ্ছিলো সেই রাজার ছেলে, সে আবার এ কয়দিনে ঘি, মাখন খেয়ে খেয়ে গায়ে গতরে দারুন মেদবহুল হয়ে গিয়েছে। প্রহরীরা গিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে আসলো, আর সাইজ দেখে রাজারও ওকে শুলে চড়ানোর জন্য পছন্দ হল ... ...। কোন ওজর আপত্তি অনুনয় বিনয়ে কাজ হল না। দুপুরে তাকে শুলে চড়ানো হবে সেজন্য আয়োজন চলছে, আর ওকে একটা খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘটনাক্রমে রাজার ছেলেকে খুঁজতে মন্ত্রীর ছেলে সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হল। পরিস্থিতি বুঝে সে ওখানকার রাজা মশাইকে গিয়ে বললো -- এই ব্যাটার কাছে আমি অনেক টাকা পাই, একে তাই কষে কিছু কানমলা দিতে চাই। রাজা তো এতে আরো মজা পেলেন -- যাও কানমলা দিয়ে আস। তখন মন্ত্রীর ছেলে রাজার ছেলের কানে কানে বললো, যে দেশে তেল আর ঘিএর একই দাম, নিয়ম নীতি নাই, সেই দেশে চোর আর নির্দোষেও পার্থক্য থাকবে না তা তো স্বাভাবিক, এখন বাঁচতে চাইলে আমার কথামত কাজ কর -- বলে কিছু টেকনিক শিখিয়ে দিল। রাজার ছেলেও কিছুক্ষণ পর পর ব্যাকুল দৃস্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্য দেখতে লাগলো। সেখানকার রাজার কৌতুহলের জবাবে বললো 'দয়া করে ঠিক দ্বিপ্রহরে আমাকে শুলে চড়াবেন কারণ ঐ সময়ে শুলে চড়ে মরলে সোজা স্বর্গে যাওয়া যাবে বলে শাস্ত্রে লেখা আছে' --- --- রাজা সেই ফাঁদে পা দিলো আর স্বর্গের লোভে নিজেই শুলে চড়ে বসলো। রাজার ছেলেও সে যাত্রা রক্ষা পেয়ে তওবা করে নিজ দেশে ফিরে গেল।

রূপকথার অর্থ হল রূপক অর্থে কথা। রূপকথার গল্পগুলোতে রাজা, রাজপুত্রের আড়ালে আসলে আমাদের সমাজের কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। রাজা প্রজা, রাক্ষস ক্ষোক্কস সবই রূপক - আমাদের চারপাশেই থাকে --- শুধু দেখার জন্য কপালে তৃতীয় নয়ন থাকতে হয়। ;-)

যা হোক সেই রূপকথার দেশের মত না হলেও এর চেয়েও উল্টা ঘটনা চারপাশে ঘটতে দেখি -- এখানে তেল আর ঘি এর দাম সমান নয় বরং ঘি এর দাম কম ..... এক এক করে দেখাই:

১। ব্যবহারের আগেই অ্যাডভান্স টাকা দিয়ে সার্ভিস কিনলে দাম বেশি আর ব্যবহারের পর বিল দিলে (তাদের পোস্টাল খরচ করে বিল পাঠাতে হয়, ইচ্ছা করলে কাস্টমার ফাঁকিও দিতে পারে যেটাতে) সেটার দাম কম --- ব্যাপারটা অজিব হলেও সত্য। বিশ্বাস না হলে বিভিন্ন প্রোভাইডারের দেয়া প্রিপেইড আর পোস্ট পেইড ইন্টারনেট প্যাকেজগুলো খেয়াল করুন।

২। বছরের পর বছর থেকে যে আপনার ভক্ত তাকে কোন সুবিধা না দিয়ে যে মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করে তাকে মাথায় তুলে নাচা হয় এখানে। -- এই আজিব ব্যাপার দেখবেন আপনার মোবাইল সেবাদাতার অফারে। আপনি বছরের পর বছর নিয়মিত তার সার্ভিস ব্যবহার করে তাঁর পেট ভরাচ্ছেন অথচ 'ফিরে এস', "আপনার বন্ধ সীম চালু করুন' ইত্যাদিতে উপহারের পর উপহার - লয়াল কাস্টমারের কোন খবর নাই।

৩। গুরুজনে বলে 'কথা কম কাজ বেশি' - এটা উন্নতির পূর্বশর্তও বটে। আর আমাদের এখানের তেনারা নেচে গেয়ে কথা চালিয়ে সকলকে বাচাল বানাতে চায় -- বেশি কথায় নাকি বেশি লাভ। লাভটা কার?

৪। বাইরের দেশে সবসময় ক্রিসমাস উপলক্ষে বিভিন্ন রকম ছাড়ের অফার থাকে সব দোকানেই। দেশে থাকলে ঈদের সময়েই সবখানে ছিল্যা কাইট্যা লবণ ... ... বাসের টিকেট কাটেন কিংবা দোকান থেকে কিছু কিনেন ...

আপাতত ক্ষ্যামা দেই ... ... দেশ ছেড়ে না ভাগলে বরং শুলে চড়ার জন্য প্রস্তুতি নেই ... ...

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০০৯

হীনমন্যতার জুজুবুড়ি

(সচলায়তনে প্রকাশিত)

অস্ট্রেলিয়ার সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচ চলছে। মাত্র দুই/তিনদিন আগে একজন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার বললেন যে বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট না খেলাই ভালো। অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টে দারুন লড়ছে ... বলা যায় না হয়তো হার এড়াতে লড়তে হবে অস্ট্রেলিয়াকেই ...। অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড হল ক্রিকেটে সবচেয়ে প্রফেশনাল এবং হারামি দল, সাথে সাউথ আফ্রিকাকেও যোগ করা যায়। কোনো দেশ ওদের সাথে খেলতে যাওয়ার আগেই মিডিয়াতে বিভিন্ন অকথা, কুকথা বলে আলোড়ন তোলা হয় ... অমুক প্লেয়ারকে ঠেকানোর কৌশল আবিষ্কার করেছি, ওরা তো খেলাই পারেনা ইত্যাদি। এছাড়া বোলিং এ্যাকশন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উঠতি ভালো বোলারদেরকে হেনস্থা করতে এদের জুড়ি মেলা ভার ... ...।

ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে নোংরা কথা বলা কিন্তু প্রফেশনালিজম। স্লেজিং-ও এরকম একটা টেকনিক। ওগুলো বলে তাদের নিজেদের সরাসরি কোনো লাভ না হলেও প্রতিপক্ষের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ ওদের উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের মনে একটা খুঁতখুঁত বা সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে একটু দূর্বল করে দেয়া যেন খেলার সময় ওরা ওদের স্বাভাবিক নৈপূন্য দেখাতে না পারে। এই ধরণের মনের খেলা মোকাবেলা করার জন্য আবার প্রতি দলেই সাইকোথেরাপিস্ট রাখা হয়।

সোজা সাপ্টা কথায়, কাউকে কাবু করতে চাইলে সেটা মনকে কাবু করা দিয়ে শুরু করতে হয়। খেয়াল করে দেখুন: ধার্মীক লোকজনের সামনে আমরা মাথা নিচু করে কথা বলি, দ্বীনের দাওয়াত দিতে আসলে অনিচ্ছা থাকলেও তাদের মুখের উপর না বলতে পারি না ... মাথা নিচু করে পালানোর চেষ্টায় থাকি। কারণ ছোটবেলা থেকেই কৌশলে মনে মধ্যে গেঁথে দেয়া হয়েছে যে ধর্মের রীতিনীতিগুলো পালন করা ভালো, না করা খারাপ/পাপ ... কাজেই পাপবোধটা মনকে হীনমন্য করে তোলে। আর এই হীনমন্যতার সুযোগ নিয়ে কত অযোগ্য বদমাইশ লোক আমাদের উপর কর্তৃত্ব করে বা করার চেষ্টায় রত থাকে।

এই ব্যাপারটা শোষক শ্রেণীর লোকজন সবচেয়ে ভালো বুঝে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। তাই শোষিতদেরকে ভালো শিক্ষা/সংস্কৃতি চর্চা থেকে বিরত রাখতে তাদের চেষ্টার ত্রুটি হয় না ... কারণ শিক্ষা আর সংস্কৃতির চর্চা মানুষের মনকে উৎফুল্ল করে, তাদেরকে একতাবদ্ধ করে, তাঁদের নিজেদের সম্পর্কে গর্ব করতে শেখায়। মানসিকভাবে উঁচু থাকলে তাঁর উপরে সহজে অন্যায় চাপিয়ে দেয়া যায় না, শোষন করা কষ্টকর হয়ে যায়। এজন্যই দেখা যায় সৎ অফিসার চোখ না নামিয়ে উঁচুপদের ঘুষখোর অফিসারের সাথে কথা বলতে পারেন, আর উপরের লেভেলে থাকা অসৎ বা হীনমন্যতায় ভোগা লোকটি সেটার মুখোমুখি হতে পারে না বলে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয়ার চেষ্টায় রত থাকে। আবার আগের সময়ে দেখা যেত, শোষক জমিদার প্রজাদের লেখাপড়া শেখার সুযোগ তৈরী করতে বড়ই অনাগ্রহী, বরং তাঁদেরকে অশিক্ষিত এবং আত্মমর্যাদাহীন করতে খুবই আগ্রহী। কোনো সৎ লোককে কাবু করতে চাইলে তাঁর উপর বিভিন্ন রকম অপবাদ চাপিয়ে দিয়ে তাকে হীনমন্যতায় ফেলার চেষ্টা করা হয়। একজনকে কাবু করার মত কোনো কিছু না পেলে তাঁর আশেপাশের আপনজনকে অপমান করার চেষ্টায় থাকে .... তোর ভাই তো আলকাতরার মত কালো, তোর অমুক তো আগে ডাকাত ছিলো ... ইত্যাদি অপবাদ দিয়ে হীনমন্যতা ঢুকানোর প্রানান্ত চেষ্টা চলতে থাকে। আবার এ-ও দেখা যায় অভাব অনটনের অমানুষিক কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করলেও অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকে জীবন বিসর্জন দেয়।

হীনমন্য লোকগুলো শুভ্র সত্যবাহীদের সামনে চোখ তুলে তাকাতে পারে না, তাই পেছন থেকে কামড়ানোর জন্য কুটচাল চালতে থাকে। একই গোত্রের হীনমন্য আরো কাউকে পেলে আঁকড়ে ধরে দলে ভারী হওয়ার চেষ্টায় থাকে; নিজেরা নিজেদেরকে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে ... ঠিক যেন অন্ধকারে ভয় পেলে যেমন আমরা ভয় তাড়ানোর জন্য অদরকারী কথাবার্তাও খুব জোরে জোরে বলি; অথবা, নার্ভাস হলে অতিরিক্ত হাসি বা ফুর্তি দেখানোর চেষ্টা করি; কিংবা, কাকের মত খড়ের গাঁদায় মাথা ঢুকিয়ে ভাবি আমাকে কেউ দেখছে না ... ... ... কিন্তু ভয়ের জড়তা কি আর কাটে!

কাজেই হীনমন্যতার ব্যাপারটি মোটেও অগ্রাহ্য করার নয়। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় কারণ এটা মানুষকে ভীষনভাবে আক্রান্ত করে - তাই যেন কোনোভাবেই নিজের অজান্তে হীনমন্যতায় ভুগতে হয় এমন পরিস্থিতির শিকার না হই সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বিভিন্ন বিষয়ের কারণে মনের গভীরে এই ক্ষতিকর হীনমন্যতা জটা পাকিয়ে আছে। চেষ্টা করি সেগুলোকে মূলসহ উপড়ে ফেলে সামনের দিকে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যেতে। এইরকম একটা সুযোগ পেয়েছি ওপেনসোর্স সফটওয়্যারের কল্যানে; পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহারে মনের গভীরে একটা গ্লানি ও হীনমন্যতা কাজ করতো ... এইটা থেকে বের হওয়ার উপায় পাওয়া মাত্র তাই লুফে নেই ... হাসি মুখে সংশ্লিষ্ট কিছু অসুবিধা মেনে নিয়েও।

চমৎকার বিকল্প থাকা সত্বেও আমরা কি জেনেশুনে পাইরেসী করেই যাবো (এবং মাথা নিচু করে চলবো) নাকি মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করবো - এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারটা নিজেকেই নিতে হবে।

রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০০৮

যুদ্ধের কী দরকার!

একটা সময় যখন কোথাও হত ভাতের কষ্ট,
তেড়ে গিয়ে অন্য দেশে করতো জীবন নষ্ট।
লুট করতো গরু বাছুর, ধন-সম্পদ যত,
মারতো মানুষ, পুড়তো বাড়ী, অনেক হতাহত।

লুট করেও অনেকের হয়না অভাব শেষ,
ধরে নিয়ে যেত, দিতো দাসের বেশ।
আমেরিকার কথাই ধরো, ওবামার ঐ দাদা,
আফ্রিকাতে বাড়ি তাঁদের, দাস ছিল একদা।

ভারতের পাশে আছে, দেখো সোনার দেশ,
ইংরেজরা ছুটে এল, করলো সবই শেষ।
নিজের দেশে নাই সম্পদ, নাই তো থাকার জায়গা,
কী করা তাই, করায় হেথায় নীল চাষ আর মংগা।

করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে, সম্পদ যা ছিলো,
সবই তখন জাহাজ চেপে, ঐদেশেতে গেলো।
এদেশেরই রক্ত চুষে, চকচকে হয় দেশ,
ধন-সম্পদ সবই গেল, মরে সবাই শেষ।

এখন দেখ আবার তাঁদের, অভাব তাড়া করে,
নিজ দেশেতে নাই সম্পদ, রক্ত চক্ষু ঘোরে।
মারবে নাকি লোক আবারো? করবে কি লুটপাট?
অভাব তাঁদের একার নাকি! অন্যেরা কি বাদ?

খুনাখুনি, নীলচাষী, দাসের দিন শেষ,
তাতে কি, সমস্যা নাই, চলো বাংলাদেশ।
মোবাইল ফোনের ব্যবসা, লাভ কত জানো!
বছর শেষে শত কোটি ডলার গুনে আনো।

আরো আছে কত শত, ঠকানোর উপায়,
পেপার-খেলায় পয়সা ঢালো, কে আর ঠেকায়!
ঘুষ দিলে সবই ভুলে দিবে কাপড় তুলে,
যতই মারো, প্রতিবাদ করবে নাতো ভুলে।

তাইতো বলি, অবস্থাটা বদলেনি একটুও,
একই ভাবে যাচ্ছে সবই, একটু ভাবিও।
লোক মেরে আর লাভ কি বল! কয় টাকা আর পাবে!
তার চে ভাল এইভাবেই, সবই তাঁদের হবে।

সম্পদ চাও? এই যুগে ভাই দরকার নাই যুদ্ধ,
ব্যবসা কর ইচ্ছামত, লোকগুলো সব বুদ্ধু।
মারামারি, কাটাকাটির দিনতো কবে শেষ,
সবাই এসে শোষন করে সোনার বাংলাদেশ।

=====

কেমন করে ঠেকাবো তা, সেটাই শুধু খুঁজি,
থাকবো ঝকমকে দেশে, চোখ না খুলেই বুঝি।
আপাতত মাথায় কিছুই খেলছে নারে ভাই,
সবে মিলে মানুষের সচেতনতা বাড়াই।

বেশির ভাগই যদি বুঝি ওদের চতুরতা,
জেগে জেগে ঘুমালে কেউ. পিন দিয়ে দেব গুতা।

তারপরেতেও ঘুমানোর ভান করে থাকলে,
শত মাথা কুটলেও কভু না জাগলে ...
ধরে দেব কষে মাইর ...
লাথি, চাটি দুই চাইর
গদি থেকে নামাবো
ঘুম সব ভাঙ্গাবো।

(প্রজন্ম ফোরামসচলায়তনে প্রকাশিত)

মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল, ২০০৮

কেন লিখি?

ফোঁড়া কাটা সেই নাপিতের গল্পটা জানেন তো? ঐ যে, ডাক্তারদের ভাত মারতে বসেছিল ফসা ফস্ ফোঁড়া কেটে কেটে। তারপর শলাপরামর্শ করে নাপিতকে ডাক্তারিবিদ্যা শিখিয়ে দিল। কোথায় কোন শিরা, ধমনী; ভুলে কেটে গেলে বা ইনফেকশন হলে কী বিপদ হতে পারে জেনে এরপর তো নাপিত আর ক্ষুর দিয়ে ফোঁড়া কাটতে পারে না। এতে ডাক্তারদের আয় আবার স্থিতিশীল হওয়া ছাড়াও অনেকগুলি নিরাপরাধ ফোঁড়ার রোগী যে বিপদের আশংকা থেকে রক্ষা পেয়েছিল এটা নিশ্চয়ই বলার অবকাশ রাখে না।

দুইদিনের সন্যাসী ভাতকে অন্ন বললে সেটা মানুষ বাঁকা চোখে দেখবেই। কিন্তু কী করবো বলেন, ৪ বছর জাপানে থেকে আর সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, য্যুরিখ ইত্যাদি কিছুটা বেড়িয়ে এসে অনেক কিছুতেই গায়ে আগুন ধরানো জ্বালা হয়।

আমার হাতের ময়লা পকেটে ঢুকে যায় ডাস্টবিনের অপেক্ষায় আর পাশের এসি গাড়ির কাঁচ একটু নামিয়ে রাস্তাতে আইসক্রিমের কাগজ ফেলে -- কাঁহাতক ভাল লাগে?

রাস্তায় জ্যাম, ৪-ফেজের ট্রাফিক সিগনালেও ডানে মোড় নিতে পারে না রাস্তায় মানুষের জন্য। একদিন দাঁড়িয়ে দেখলাম ... ...... পথচারী পারাপারের জন্য একটা সময় সবুজ বাতিও আছে জেব্রাক্রসিং বরাবর। কিন্তু সবাই ব্যস্ত ... অত বাতি দেখার দরকার কী! ইচ্ছামত পার হবে। তাই যদি হয়, তাহলে শুধু শুধুই পথচারীদের জন্য বাতি লাগিয়েছে।

ইতর জ্যাম লাগে সবাই আগে যেতে চায় বলে, আর কেউই যেতে পারে না। তিন বা চারদিক থেকে সবাই একসাথে এগিয়ে এসে পেজগী লাগিয়ে দেয় .. ফলে কেউই যেতে পারে না। অথচ .. ধারাবাহিকভাবে সুশৃঙ্খল ভাবে গেলে হয়তো ১০ মিনিটের মধ্যে তাঁর যাওয়ার সুযোগ আসতো ... এখন ১ ঘন্টা বসে থাকো।

ট্রাফিক নিয়মগুলোতো শুধু বই ছাপানো আর লাইসেন্স পরীক্ষা নেয়ার জন্য বানানো হয়নি। ওগুলো মেনে চললেই অনেক চমৎকার চলা যায়। বিশ্বাস করেন না .... তবে শুনুন, মাঝে মাঝেই ঈদের আগে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনের জন্য বি.ডি.আর নামে রাস্তায় ... তখন একই রাস্তা দিয়ে একই সংখ্যক গাড়ী, জ্যাম ছাড়াই কি সুন্দর চলে; ফলে বোঝা যায় যে রাস্তা কম বা ইত্যাদি অভিযোগ ধোপে টেকে না।

আরো বলবো .... নাহ্ থাক .... ..... দেখছেনই তো সব চারিদিকে।

যা হোক, দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে ভাল লাগে না। আবার, ওসব দেশের পরিবেশ প্রচন্ড ভাবে আকর্ষন করে। তাই সবাই যখন ভাবে - "আহা .. কবে ঐ দেশে যেতে পারবো, ঐ দেশের পাসপোর্ট হাতে পাবো", তখন আমার মাথায় ঘোরে - "আহা কবে ঐ দেশের মত সুন্দর দেশে পরিবর্তীত করতে পারবো, কবে অমন সুন্দর সভ্য হব।"

উপায় কী? ------ একটাই উপায় .... ... নাপিতকে ডাক্তারী শিখাতে হবে। সুতরাং যা জানি, ঝেড়ে ফেলি, লিখে ফেলি। দেখি নিরপরাধ দেশটাকে ইনফেকশন থেকে বাঁচানো যায় কি না।

এজন্য কলম দিয়ে (পড়ুন কীবোর্ড থেকে) সাহিত্য বের হয় না (ঐ পদের এন্টেনা বিল্ট-ইন নাই, ইনস্টলও করা হয় নাই) ... বের হয় নিরস সব পোস্ট। তবুও নাপিতে একটু ডাক্তারি শিখুক।


(সচলায়তনে প্রকাশিত)

শুক্রবার, ১৩ জুলাই, ২০০৭

রূপকথাঃ ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিলো

রূপকথাঃ রূপক অর্থে যে কথা বলা হয়। লেখাটা মূলত: প্রজন্ম ফোরামের জন্য লেখা হয়েছিলো।



ব্যাখ্যাঃ
খেয়াল করার ব্যাপার এখানে দুইটা। প্রথমত: এখানে একটি বাহন বা ঘোড়া আছে আর আছে একজন মর্দ (নারী নয়, পুরুষ)। দ্বিতীয়তঃ এখানে টুইস্ট হলো ঘোড়ায়/বাহনে চড়ার পরেও মর্দ নিজে হাঁটছে। ঘোড়ার চেয়ে লম্বা ঠ্যাঙের ব্যাখ্যাটা মজার হলেও এখানে আসলে ঘোড়া আর মর্দকে একই সত্তা (Entity) বুঝানো হয়েছে। যে চালক, সে-ই বাহন।

আধ্যাত্ববাদে এই কথাটা দারুন একটা দর্শনকে তুলে ধরে। সেটা হলো ব্যক্তির আমিত্বকে ত্যাগ করার ক্ষমতা। যারা এই দুনিয়াকে প্রচন্ডভাবে আঁকড়ে ধরে, তারা এই আমিত্বকে ত্যাগ করতে পারে না। তাই বিশ্বাস করতে পারে না যে এই নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এখানে শুধু কয়েকদিনের জন্য এই রঙ্গিলা দুনিয়া। সৃষ্টিকর্তা একটা দেহের মালিক করে দিয়েছেন তাকে সাময়িক ভাবে। এটা সম্পুর্নভাবে তার নয়। এটা তার বাহন মাত্র। কিন্তু এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে না বলে বাহনের মালিক হতে পারে না বরং বাহনে সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই আঁকড়ে ধরার স্বভাবটাকে বিভিন্ন দর্শনেই নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে - আকর্ষিত সত্তা। আর যাঁরা আকর্ষনকে ত্যাগ করতে পারে তাঁদেরকে পুরুষ বা মর্দ হিসেবে বলা হয়েছে। এখানে পুরুষ/মর্দ কিংবা নারী সত্তা আদতে রক্ত মাংসের পুরুষ বা নারী না-ও হতে পারেন। এটা স্বভাবকে নির্দেশ করে। পুরুষকে মহাপুরুষ বলে অনেক সময়। আর দেহটা যেটা দেখে আমরা পুরুষ বা নারী বলি, সেটা হলো ঘোড়া বা বাহন।

কাজেই নারী ঘোড়ায় চড়তে পারে না - কারণ সে আমিত্বকে ত্যাগ করতে পারে না বা ঘোড়াটাকে সত্তা থেকে আলাদা করতে পারে না। মর্দ ঘোড়ায় চড়ে, তারপর আবার হেঁটে যায়।


(ব্যাখ্যাটা আমার বানানো নয় - একজন গুরুর কাছে থেকে শুনে, উপলব্ধি করে লেখা/বলা)

শনিবার, ৭ জুলাই, ২০০৭

উৎকর্ষবাদীতা - যেভাবে দেখি

উৎকর্ষবাদীতা/পারফেকশনিজম হলো কোন একটা কাজ করার সময় ওটাকে বার বার নিখুত করার চেষ্টা এবং মনমত সুন্দর হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটার উন্নয়নে কোন বিরতি না দেয়ার একটা দারুন বৈশিষ্ট - যা কিছু মানুষের স্বভাবে থাকে। ব্যাপারটাকে খুতখুতে স্বভাবও বলা যেতে পারে। খুতখুতে স্বভাবটা আমি নিজেও পরিমিত পরিমানের বেশি পছন্দ করি না। বিশেষতঃ কিছু মানুষের এই ব্যাপারটা যখন মানসিক বিকারের পর্যায়ে চলে যায় - তখন তো নয়ই। যেমন ধরুন, কারো কারো পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বড়ই খুতখুতে স্বভাব। অসুখ বলি তখনই যখন এজন্য তিনি দিনে ৭বার গোছল করবেন, আয়নার সামনে কয়েকঘন্টা ব্যয় করবেন। কোন কোন ব্যক্তি আছেন, মাছ যতই ধোয়া হউক না কেন তাঁদের মন ভরে না - মনে হয় ময়লা তো রয়েই গেছে।

জাপানে এসে আর এদের সাথে কাজ করে বুঝলাম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা পারফেকশনিস্ট বা উৎকর্ষবাদী মনোভাবের। ধরুন মেকানিকাল ল্যাবরেটরিতে কোন ছাত্র একটা যন্ত্রাংশ বানাবে, সে সেটা নির্দিষ্ট আকার দেয়ার জন্য ঘষার যন্ত্র দিয়ে ঘষতেই থাকবে ঘষতেই থাকবে -- যতক্ষণ না মনমতো হচ্ছে। সময়ের কোন ব্যাপার নাই, সন্ধা ৬টায় ল্যাব বন্ধ হয়, কিন্তু ঐ ব্যাটা দেখা যাবে রাত ১০টা পর্যন্ত ঘষতেছে। যে কোন ল্যাবে, একটা প্রেজেন্টেশন বানাবে, সেটা নিয়ে কি যে আদিখ্যেতা -- অক্ষরের রঙের ব্যাপারে, আকারের ব্যাপারে, ব্যাকগ্রাউন্ডে কোন রং ইত্যাদি। দেশে কাজ করতে গিয়েছি ইউনিভার্সিটি থেকে, সাথে জাপানি প্রফেসর, আরও কয়েকজন ছাত্র। একটা ম্যাটেরিয়াল ময়লা, ব্যাস ... সবাই মিলে বসে গেলাম সবগুলো হাতে ঘষে ঘষে ধোয়ার কাজে - ১ ইঞ্চি আকারে ছোট ছোট করে কাটা ০.৫ ইঞ্চি ব্যাসের প্লাস্টিক পাইপের এক বস্তা টুকরা, ধরুন, একবস্তা ছোট ইটের খোয়ার মত পরিমান -- সবগুলো ধুলাম সবাই মিলে, প্রফেসরও বাদ নাই।

প্রথম প্রথম এসব আদিখ্যেতা মনে হলেও এখন বুঝি, জাপানের উন্নতির মূলকারণগুলোর একটি হয়ত এই উৎকর্ষবাদী মনোভাব। এরা নিজেরা কম্পিউটার বা গাড়ীর আবিষ্কর্তা না; আমেরিকা বা অন্য কোন দেশ থেকে এনেছে টেকনোলজি ---- তারপর সেই অক্লান্ত ঘষাঘষি। জাপানের প্রতিটি শিল্পপন্যের মধ্যেই এই অতিরিক্ত যত্নের ছাপটা চোখে পড়ার মত। যেমন এর ভেতরের কলকব্জা তেমনি এর বাইরের ফিনিশিং। ফলাফল ব্যবসা সফল। এ প্রসঙ্গে ২য় বিশ্বযুদ্ধের উপরে নির্মিত বিভিন্ন সিনেমায় দেখা জার্মানদের কথা মনে পড়ে। ওদের প্রতিটি গাড়ী, অস্ত্রের অতিরিক্ত যত্ন নেয়া হত - তাই সবকিছুই চলতো দারুন।

এখানে একজন উড়িষ্যার বাঙালি দাদাবাবু থাকতেন, পশ্চিমবঙ্গে চাকরি, লেখাপড়ার সুবাদে বাংলা দারুন বলতেন। বলতেন এই এটিচ্যুডের পার্থক্যটা বড়ই চোখে পড়ার মত দেশে আর জাপানে। ওখানে কেনা সবচেয়ে দারুন মটরসাইকেল হিরো হোন্ডা কিনে দুদিন পরে আর ঠিকমত স্টার্ট নেয় না। সার্ভিস সেন্টারে বলে - আরে দাদা ওটা ব্যাপার না, কয়েকদিন বেশি করে কিক দিন, ঠিক হয়ে যাবে; অথচ ঐ একই ঘটনা এখানে ঘটলে কী হতো, সার্ভিস সেন্টারের প্রধান দৌড়ে আসতেন, মাথা ঝুকিয়ে গলায় কাতরতা ঢেলে দিয়ে সুমিমাসেন সুমিমাসেন (দূঃখিত অর্থে) বলে একাকার করতেন। তারপর, ওটার বদলে আরেকটা ভালো দেয়ার চেষ্টা করতেন। সার্ভিস চার্জ নিতেন না, কারণ এটা তাঁদের ত্রুটি। --- দাদাবাবু ঠিকই বলেছিলেন মনে হয়।

আমি নিজেও একটু খুতখুতে স্বভাবের মনে হয়। বিশেষত টাইপ করার সময়ে বানানের প্রতি অতিযত্ন নেবার প্রবণতাটাকে ঐ স্বভাবেরই এক রূপে বহিঃপ্রকাশ বলা যেতে পারে। যখনই টাইপ করি, কোন বানানের ব্যাপারে মনে একটু সন্দেহের উদ্রেক হলেই অভিধান ঘাটার চেষ্টা করি। অবশ্য কখনো কখনো খুব ক্লান্ত থাকলে অবশ্য ... ভুল হচ্ছে, এই ধরণের কোন অনুভুতি/সন্দেহই মনে কাজ করে না - ফলে লেখাটা হয়ে যায় দায়সারা গোছের।

অবশ্য শুরু থেকে এমন উৎকর্ষবাদী ছিলাম না। স্কুলে খাতায় এমনভাবে লেখতাম, যে হাতের লেখা দেখে বাবা বলত, যে তুই তো স্যারকে বাসায় টেনে আনবি, কিংবা, তোর হাতের লেখা পড়ার জন্য স্যার তোকে ডেকে নিয়ে যাবে। নিজের হাতের লেখা সম্পর্কে আমার নিজের ধারণাও ওরকমই ছিল। তবে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতাম, স্যার ঠিকই পড়ে নম্বর দিত -- স্যারদের যোগ্যতা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে যেত :D । পরবর্তীতে কোন এক সুন্দর দিনে ঠিক করলাম --- নাহ্ এভাবে অন্যদের কষ্ট দেয়া আর নয়। সুন্দর না হোক, অন্তত বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে পারে এমন পাঠযোগ্য করে লিখতে হবে। হ্যাঁ - ঠিকই ধরেছেন --- উৎকর্ষবাদীতা আমাকে দখল করলো বোধহয়।

ধুর ...... ...... ব্যাপার ঠিক তা না; একটু খুলে বলিঃ মূল উৎসাহ (!?) বা আগ্রহটা পেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়; বন্ধু সৌরভ (বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক), কিংবা পান্থ (ওকলাহোমাতে আছে) বা আবীর (সাউথ ডাকোটাতে আছে) সকলের হাতের লেখার পাশে আমারটা খুলতে ইচ্ছা করতো না। কিন্তু আমার ক্লাসনোট নেয়া ছিল খুব ভাল। কোচিং করার সময়েই পান্থর সাথে পরিচয় - ও ব্যাটা চার রঙের কালিতে নোট নিত। কোন লাইন কালো কালি, কোনটা নীল আবার কোনটা লাল বা সবুজ। দেখাদেখি আমিও শুরু করেছিলাম। যা হোক, ক্লাসনোট নেয়ার সময় কালির ব্যবহার আর বিস্তারিত টুকে রাখার জন্য (স্যার এই সময়ে একটু খুক খুক করে কাশলো ... এই টাইপের ডিটেইলিং ;) ) পরীক্ষার আগে কিছু ক্লাসনোট উদাসীন বন্ধু এসে আমার খাতা ফটোকপি করতো পড়ার সুবিধার জন্য। ওদের বরংবার এসে আমাকে ঘুম থেকে তোলা থেকে বাঁচার জন্যই হাতের লেখাটা একটু উন্নয়ন করতে বাধ্য হলাম শেষে (হল/ছাত্রাবাসে থাকতাম)।

সেই সুন্দর করার ইচ্ছাটা মনে প্রভাব ফেলেছিল নিঃসন্দেহে। কারণ নিজের পাঠযোগ্য লেখায় খাতার ফটোকপি দেখে নিজেই মুগ্ধ হতাম - প্রেরণা পেতাম :D ।

থিসিস করার সময় পার্টনার ছিল পান্থ। ব্যাটাও ওরকম। আমি যখন ছেড়ে দিতাম ও তখন দ্বিগুণ উৎসাহে সৌন্দর্য বর্ধনে বসতো। কাজ ছিল সফটওয়্যার বানানো, যেটা যে কোন কাঠামোর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট হিসাব করে দিতে পারবে। কোডিং করার পর ঐ ব্যাটা আবার বসতো সৌন্দর্য বর্ধনে .... ইনপুট, আউটপুট আর গ্রাফিকাল ফিল্ডের রূপচর্চা। থিসিস লেখার সময়ে, ও ব্যাটার জ্বালায় বিরক্ত হয়ে যেতাম .... কিন্তু দেখা যেতো, ও ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলে আমি আবার একই ভূমিকা নিতাম। সমমনা না হলে আর বন্ধুত্ব কেন ... ...

নিজের অনেক গুণগান করলাম :D । তবে, এখন আর ১০০% শুদ্ধ করার জন্য চেষ্টা করি না আমি। সবসময়ই চেস্টা করি মোটামুটি ৯৫% বা এর বেশি শুদ্ধ করতে। কারণ ৫০-৭০% উৎকর্ষ বা শুদ্ধভাবে লেখার জন্য এ্যাতদিনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অর্জিত দক্ষতাই যথেষ্ট। কিন্তু সেই ৭০ থেকে আগে বাড়ার জন্য জ্যামিতিক হারে চেষ্টা/যত্নের পরিমানটা বাড়াতে হয়। এসকল ক্ষেত্রে ১০০% সবসময়ই একটি কাল্পনিক ব্যাপার মনে হয়। তাই থামতে জানতে হবে। জানতে হবে কখন ও কোথায় থামতে হবে .... ...তা না হলে ঘষতে ঘষতেই জীবন পার হয়ে যাবে, অন্য কিছুই আর করা হয়ে উঠবে না।


৭-জুলাই-২০০৭
(লেখাটি সচলায়তন এবং খিচুড়ী ব্লগে প্রকাশিত হল)

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০০৭

হায়রে বাংলা ভাষা

ভাষাভিত্তিক জাতি আমরা। বাংলা ভাষা বলা হয় এই দেশে তাই এটা বাংলাদেশ। এই দেশের উৎপত্তির অন্যতম একটা ইস্যূ ছিল ভাষা। সেই ভাষাই যখন বিকৃত ভাবে উপস্থাপিত হয় সেটা দেখতে মন খারাপ লাগেই। যেমন অনেক সময় দেয়ালের লিখনে দেখি "জাতিয়" বানান ... মনটা এ্যাত যে খারাপ লাগে। "জাতীয়" বানানটা এমন -- কিন্তু সেই বানানটারই জাত মেরে দিয়েছে .... পরোক্ষ ভাবে এই প্রিয় ভাষা, যার জন্য এত মানুষ আবেগপ্রবণ হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে সেই মানুষগুলোর আবেগ, বিবেচণাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করা হয় বলেই মনে হয়। জাতিয় বানানটা নিশ্চয়ই আঞ্চলিকতার ধোপে শুদ্ধ হবে না। (কিছুটা এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা হয়েছে প্রজন্ম ফোরামে: http://forum.projanmo.com/t921.html)।

তবে এই লেখাটার উদ্দেশ্য লিখিত ভাষা নয়, বরং কথ্য ভাষা সম্পর্কে।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু প্রাসঙ্গিক কিছু উদাহরণ লিখি। ভারতীয়দের ট ট মার্কা ইংরেজী শুনে ইংরেজী ভাষা-ভাষীগণ মুখ টিপে হাসে। যদিও চমৎকার ইংরেজি বলেন এমন ভারতীয় প্রচুর। কিন্তু মিডিয়াতেও সেইরকম হাস্যকর ইংরেজি আসছে। বিবিসির একটা প্রামান্যতে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের ইংরেজি ভাষ্যর নিচে ইংরেজি সাবটাইটেল ছিল ..... !! ইংরেজি থেকে আসা শব্দগুলোর অপভ্রংশকে ওরা ইংরেজি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ইউটিউবের একটা রেসিপি ব্লগে শুনলাম টম্যাটোকে তেমাটার বলছে!!

একই কথা প্রযোজ্য সাধারণ জাপানিদের ইংলিশ শুনলে। ইংরেজি বেড (বিছানা) ওরা বলবে বেদ্দো!! তাছাড়া ল উচ্চারন করতে পারে না বিধায় ল যুক্ত সকল শব্দই হয়ে যায় র!! মালিহাকে বলে মারিহা!! ব্যাপারটা দারুন কৌতুককর। এটা জাপানিগণও জানে। তাই ওরা সহজে ইংরেজি বলতে চায় না .... জানা থাকা সত্ত্বেও।

যতদুর বুঝি আমেরিকান, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ডের .... কোন জায়গার কথ্যটাই স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ নয়। ব্যক্তিগত লেভেল যেভাবেই বলা হউক, কিন্তু প্রচার মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড ভাষা হওয়া উচিৎ বলে মনে করি। দেশে বা বাইরে, প্রায় সকল নামকরা চ্যানেলগুলোর খবরেই ইংরেজি একই রকম -- নিজের উচ্চারন ঠিক করার চেষ্টা করি ওগুলো শুনে।

কিন্তু আমাদের এত আবেগ ঘেরা, আত্মত্যাগের ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষাতেই আমাদের বিকৃতি দেখি প্রচার মাধ্যমে। আঞ্চলিক ভাষাগুলো বাংলা ভাষার একটা অংশ... কোন সমস্যা নাই আমার সেটাতে। আঞ্চলিক ভাষা শুনলে মনে হয় দেশের কথাই শুনছি ..... খারাপ লাগে না কোনক্রমেই। ভাষাটাও পরিবর্তনশীল - কাজেই উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি পাল্টাবেই ---- ৫০ বছর আগের বাংলা আর এখনকার ভাষা তো এক নয়, কাম্যও নয়। কিন্তু তার পরেও কিছু কিছু ব্যাপার মনের মাঝে খচখচ করতে থাকে।

বাংলা রেডিও চ্যানেলগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝে এন.এইচ.কে. (জাপানের) থেকে খবর শুনতাম আগে। বিকৃত ভাষা শুনে রাগে গা জ্বলে যায়। ফীড ব্যাক ফর্মে জানিয়েছিও। কিন্তু যেই আর সেই .... .... অসহ্য... তাই ওটা এখন আর শুনিনা।

আরেকটা হল, ইদানিংকার কিছু দেশি চ্যানেল.... ফুর্তি? মেট্রোওয়েভ?... আমি নামগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত নই। এক বা দুইদিন শোনার পরে আর শুনিনা। দেশের কথা/ গান শুনতে গিয়ে মেজাজ খারাপ করার কোন মানে নাই -- এর চেয়ে না শোনা ভাল। শুধু বলব, এদের উপস্থাপকের বাংলা শুনলে মনে হয় সংশপ্তক নাটকের লর্ড ক্লাইভ বাংলা বলছে........ অসহ্য লাগে।

মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০০৬

শিশুর মানসিক বিকাশে আমাদের ভূমিকা

(পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিলো)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়ে ধারণা হয়েছে যে, শিশুর মানসিক বিকাশ শুরু হয় মায়ের গর্ভ থেকেই। মায়ের মানসিক অবস্থাও গর্ভের শিশুর উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। মা হাসিখুশি, প্রফুল্ল থাকলে শিশুটিও হাসিখুশি ধরনের হবে। আর মা যদি খিটমিটের মধ্যে থাকে, গালাগালির মধ্যে (শুনে বা দিয়ে) দিন কাটায়, শিশুটির মানসিক গড়নেও সেটার ছাপ পড়বে। তাই আমার আশেপাশের মানুষগুলোকে বলতে শুনি, গর্ভবতী মায়েদেরকেও তার শিশু সম্পর্কে ভাল এবং পজিটিভ কথা বলা উচিৎ। একজন মানুষ যা করে, যে ধরনের অভ্যাস গড়ে তোলে তা তো তার জেনেটিক রেকর্ডকেও পরিবর্তন করে - যা তার শিশুর মধ্যে সঞ্চালিত হয়। যা হোক এখনো বাবা হই নাই- কাজেই ব্যাপারটা অত গভীরভাবে অবলোকন/পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাই নাই।

এখন বলি শিশুর কথা। বেশ কিছু দিন আগে (১০-১২ বছর) আমি আমার চাচার বাসায় বেড়াতে গেছিলাম, আমার চাচাতো বোনের বয়স তখন ১ মাস। বাচ্চা খুবই শান্ত ধরনের। যে ভাবে শোয়ায় রাখা হয় সেভাবেই শুয়ে থাকে - কোন ঝামেলা করে না। আমি ঐ কয়দিন ওকে কোলে নিয়ে খুব ঘুরালাম, এটা ওটা দেখাই আর বলি -- আপু দেখো এটা ফুল, ঐযে নীল আকাশ ইত্যাদি। ভাবছেন ১ মাসের বাচ্চাকে আমি কি পাগলের মত বুঝাইতে চেষ্টা করছি! কিন্তু অবাক ব্যাপার, এর পর থেকেই ও আর ভাল (তথাকথিত) থাকল না -- খালি কোলে উঠতে চায়, এদিক ওদিক যেতে চায় (কোলে নিয়ে দাড়ায় থাকলেও প্যাঁ প্যাঁ করে)। আমাকে চাচী বলল -- তুই ওরে এমন দুষ্ট বানালি। আমি বলেছিলাম - আমি ওর মানসিক বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করছি।

পয়েন্টটা হল - শিশুকে শিখতে দেয়া উচিৎ। আরেকটা গল্প বলি (ওহ্ বোরিং ;) ).....

আমার এখানে প্রতিবেশী বাঙালি সিনিয়র ভাই-ভাবীর ৩য় সন্তানকে নিয়ে। ওর বয়স তখন প্রায় ১.৫ বছর। আমরা মগে চা নিয়ে বসলেই থাবা দিতে চায়। যতই মানা করা হয় বলা হয় ... না (জাপানীতে - দামে ) বিপদজনক (জাপানীতে - আবুনাই), গরম (আৎসুই) উ: উ: .... ও আরো মজা পেয়ে যায় -- ভাবখানা এরকম -- পাইছি, আমার দিকে তো এমন করলেই বেশী মনোযোগ দেয়.... তাইলে এইটাই করি।

আমার তখন মনে হলো - আরে! গরম (আৎসুই) যে, কি জিনিস সেটাই তো এ জানে না। ভয় পাবে বা সতর্ক হবে কেন - এটা তো ওর মনোযোগ আকর্ষনের জন্য একটা আকর্ষনীয় খেলা। আমি ওকে কোলে নিয়ে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বল্লাম - “কোরে আৎসুই, আবুনাই“ (এটা গরম, বিপদজনক)। কিন্তু ও যখন থাবা দিল তখন থামালাম না -- একটু ছেকা লাগতে দিলাম কিন্তু হাত ডুবানোর আগেই মগ সরায় নিলাম। বেচারা ভ্যাঁ -- তাড়াতাড়ি হাত মুছে ফূ.. ফু..; আবার শান্ত। আবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বল্লাম -- (এবার বাংলা আর জাপানীজ মিশায়.... কারণ আমার জাপানীজের অবস্থাও সেরকম!) “বললাম না কোরে আৎসুই“। এফেক্টটা রিমার্কেবল। এখন আর ও এই কাজ করে না -- যদি কখনো বলা হয় রিদওয়ান কোরে আৎসুই (রিদওয়ান, এটা গরম---- ওর নাম রিদওয়ান) তখন ও করে কি... দারুন একটা সমঝদার মুখভঙ্গি করে বলে - আচ্চুই উ: , আর একটা আঙ্গুল বাড়ায় দেয় ছুঁয়ে দেখার মত করে।

ইতিমধ্যে অনেক তেনা প্যাচায় ফেললাম। তাই আর উপসংহার টানলাম না। শুভেচ্ছা সহ।

বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৬

আমাদেরকে সীমিত সম্পদ অপচয় করা শিখানো হচ্ছে

(পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিলো)
আমি ঢালাও ভাবে এই মন্তব্য করছি না, কিন্তু এর চেয়ে ভালো শিরোনাম এই মুহূর্তে মাথায় আসছে না। এ লেখাটি আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার খারাপ দিক (ব্যক্তিগত মতামত) তুলে ধরার জন্য এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য।

স্কুল-কলেজে, বিশেষ করে স্কুলে অনেকগুলো বিষয় পাঠ্য আছে যাতে অনেক রচনামূলক প্রশ্ন পরীক্ষায় আসে। কিন্তু কখনোই ওগুলোর উত্তরে পূর্ণ নম্বর দেয়া হয় না। যেমন, ২০ নম্বরের একটি রচনাতে কখনই কাউকে ২০ দেয়া হয় না। আমারতো মনে হয়, একজন বাংলার শিক্ষকও যদি রচনাটি লিখেন, তিনি নিজের রচনাকেও পূর্ণ নম্বর দিবেন না। এর কারণ হিসেবে হয়তো তাঁরা বলবেন, রচনাটি পূর্ণাঙ্গ নয়, এতে আরো ভালো লেখার scope আছে। মানছি যে, এ ধরণের লেখাতে সবসময়ই আরো ভালো করার উপায় থাকে, কিন্তু তাই বলে একজন ছাত্রকে পূর্ণ নম্বর দেয়া যাবে না ‌- এ কথা মানতে আমি রাজি নই। একটু ব্যাখ্যা করি ---

আমরা নিশ্চয়ই একজন স্কুল ছাত্রের কাছ থেকে একজন সাহিত্যিকের মান আশা করব না। তার কাছ থেকে তার বয়স ও শ্রেণী অনুযায়ী যথোপযুক্ত উত্তর আশা করব; এবং সেই মান অনুযায়ী লিখতে পারলেই তাকে পূর্ণ নম্বর দেয়াটা যুক্তিসম্পন্ন হবে বলে আমি মনে করি।

ধরুন, একটি প্রশ্ন: এক বছরে কত দিন? - ধরা যাক এই প্রশ্নের মান ২; একজন ২য় শ্রেণীর ছাত্র ৩৬৫ দিন লিখলে পূর্ণ ২ নম্বর পাবে, কিন্তু একজন দশম শ্রেণীর ছাত্রের জন্য উপযুক্ত উত্তর হবে ৩৬৫.২৪২৫ দিন। একজন স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রকে সম্ভবত; সৌরবছর, চন্দ্রবছর, অধিবর্ষ ইত্যাদিও উল্ল্যেখ করতে হবে ওই ২ নম্বর পাওয়ার জন্য।

অপরপক্ষে, যখন ৩ ঘন্টায় ১০০ নম্বরের উত্তর দিতে হয়, তখন ২০ নম্বরের জন্য মোটামুটি ভাবে ৩৬ মিনিট বরাদ্দ থাকে। এটা আশা করা যুক্তিসম্পন্ন হবে না যে, ওই ৩৬ মিনিটের সম্পুর্ন সময় লেখার কাজে ব্যয় হবে, ছাত্রকে চিন্তা করে গুছিয়ে লিখতে হবে। কাজেই ধরা যায়, লিখার জন্য ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগবে। যদি কেউ পুরা সময় লিখে তাহলে সম্ভবত সে মুখস্থ লিখছে ‌-- এটা সমর্থনযোগ্য নয় কারণ আমরা নিশ্চয়ই ছাত্রকে মুখস্থবিদ্যা শিখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাই না।

কাজেই ওই সীমিত সময়ের মধ্যে একজন ছাত্র, গুছিয়ে তার শ্রেণীর মাণ অনুযায়ী যতটুকু লিখা সম্ভব, ততটুকু লিখলেই পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে। একজন শিক্ষক ছাত্রকে কার্যকর ভাবে কতটুকু শিখাতে চেয়েছে বা সক্ষম হয়েছে, সেটাও বিবেচনা করা উচিৎ। শিক্ষক যে জিনিষ ছাত্রকে শেখায়নি বা সার্থ কভাবে শিখাতে চেষ্টা করেনি, তা নিশ্চয়ই ছাত্রের কাছ থেকে আশা করবে না, এবং তা লিখতে না পারার জন্য নম্বর কাটবে না।

এবার বলি উপরের প্রসঙ্গটি কিভাবে অপচয় শিখায়:

পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো, সীমিত সময়ের মধ্যে একজন ছাত্র কতটুকু শিখলো তা বিচার করা। একটি রচনায় সবচেয়ে ভালো লিখলে যদি ২০ এর মধ্যে ১৬ দেয়া হয়, তাহলে আমার মতে ঐ ৪ নম্বর অপচয় করা হচ্ছে। কারণ ঐ ৪ নম্বর বিচারকার্যে ব্যবহ,ত হচ্ছে না কোনভাবেই। এই প্রচলিত নিয়ম খুব সূক্ষ্ণভাবে ছাত্রদের কচি ও অবচেতন মনে এই বার্তাই পৌছে দেয় যে, সীমিত সম্পদ অপচয় করা একটি গ্রহনযোগ্য প্রথা -- যার প্রতিফলন দেখতে পাই, সারাদেশের শিক্ষিত সমাজ যখন অবলিলাক্রমে রাষ্ট্রীয় সীমিত সম্পদ অপচয় করে, এবং যার জন্য কারো মনে কোন অপরাধবোধের উদয় তো হয়ই না বরং উৎসাহিত করা হয় – তার মধ্যে।

আশা করি সচেতন বিবেকবান ব্যক্তিগণ ব্যপারটি ভেবে দেখবেন এবং এই আত্মঘাতী প্রথা পরিবর্তনের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন।