সমাজ ও দেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমাজ ও দেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

হাটিকুমরুল ইন্টারসেকশনে কোনদিক দিয়ে কোথায় যেতে হবে

  সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে একটা বিরাট ইন্টারচেঞ্জের কাজ চলমান রয়েছে এখন। এটা দেখতে ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জের থেকে বেশ অন্যরকম। ভাঙ্গাতে যে ইন্টাসেকশন রয়েছে সেটার টেকনিক্যাল নাম ক্লোভারলিফ ইন্টারসেকশন অর্থাৎ এটা দেখতে লবঙ্গপাতার মত। হাটিকুমরুলেরটা একটু ভিন্ন। বিভিন্ন থ্রিডি চিত্রে এটা দেখতে বেশ লাগে কিন্তু কোনদিক দিয়ে কোনদিকে কিভাবে যাবে সেটা বুঝতে কষ্ট হয়। তাই নিজে নিজে চেষ্টা করে সেটার একটা সহজ (!) সরল (!) চিত্র বানালাম যেটাতে গাড়ি চলাচলের দিক দেখানো হয়েছে। এটাতে বিভিন্ন রঙের দিক নির্দেশক তীর চিহ্ন দিয়ে গাড়ির গন্তব্য বোঝানো হয়েছে।

মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০১৯

Harry Beckএর টিউব ম্যাপের আদলে ঢাকার BRT-MRT

১৯৩৩ সালে ইলেক্ট্রিকাল ড্রাফটসম্যান হ্যারি বেক লন্ডনের টিউবের (মেট্রো) একটা সহজবোধ্য সোজাসাপ্টা ম্যাপ তৈরী করেন। এটা মোটেই আসল ম্যাপের মত আঁকাবাঁকা বা মাপজোক মেপে করা ছিল না, বরং সমস্ত গন্তব্যগুলো সহজ সরলরেখা দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে করা হয়েছিল। এক স্থান হতে আরেক স্থানে যাওয়ার জন্য এটা সাধারণ মানুষের কাছে পুরা জটিল নেটওয়র্কটা সহজবোধ্য করে তুলেছিল। এখনকার সমস্ত শহরের গণপরিবহণের ম্যাপগুলো এভাবে করা হয় এবং প্রতিটা স্টেশনে লাগিয়ে রাখা হয় --- এতে করে যাত্রীগণ অতি সহজেই কোথায় গিয়ে বাস বা ট্রেন পরিবর্তন করতে হবে তা সহজে বুঝতে পারে এবং পরিকল্পনা করতে পারে।

অন্য শহরের গণপরিবহণ ম্যাপ দেখেছি অনেকবার, এবার নিজের শহরেরটা দেখতে কেমন লাগে সেই কৌতুহল ছিল, কিন্তু উপায় ছিল না। ঢাকা শহরে যে গণপরিবহণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা বিভিন্ন ওয়েবসাইট আর পত্রিকা ঘেটে যত তথ্য পেয়েছি সেগুলো দিয়ে যতদুর সম্ভব সঠিকভাবে একটা প্রাথমিক গণপরিবহণ ম্যাপ তৈরী করলাম।

মতামত ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য।


বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

জাপানের রাস্তায় স্পিড ক্যামেরা: উচ্চতর জ্ঞানের প্রয়োগ ও হাবিজাবি

১।
জাপানে একটা বেশ অদ্ভুদ ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম। টোল রোডের কিছু জায়গায় সাইনবোর্ড দেয়া যে কিছুদুর (যেমন: ৩০০ মিটার) সামনে ট্রাফিক ক্যামেরা আছে। তাই না দেখে সমস্ত গাড়িগুলো সব গতি কমিয়ে ৮০ কিমি/ঘন্টার নিচে চলতো, কারণ ঐ রাস্তার স্পিড লিমিট ৮০ কিমি/ঘন্টা। আর যেইনা ক্যামেরা পার হল, আবার আগের মত গতি বাড়িয়ে ১৩০-১৫০ কিমি/ঘন্টায় গাড়ি চালাতো। আমরা বিদেশিগণতো অবাক, আরে এখানকার পুলিশ বেকুব নাকি!! কারণ অন্য জায়গায় হলে ক‌োথায় ক্যামেরা সেগুলো জানানোর প্রশ্নই উঠে না – ওভারস্পিডিং করলে সুন্দর করে বাসায় জরিমানার স্লিপ চলে আসবে। এ আপাত বোকামির ঘটনা বরং জাপানি পুলিশের দক্ষতাতে আমার শ্রদ্ধা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণটা খুবই সাধারণ ---

২।
মানুষকে নিরাপদে এবং দ্রুততর সময়ে গন্তব্যে পৌছানোর লক্ষে প্রকৌশলীগণ প্রতিনিয়ত উন্নততর মসৃন রাস্তা তৈরী করার চেষ্টা করেন। আর সেই রাস্তায় আমাদের দেশে যখন হাতির মত উঁচা স্পিড ব্রেকার দেয়া হয় সেটা দেখে তখন আমার শিক্ষাদীক্ষা হ‌োঁচট খায়! গতি কমাতে চাইলে সেখানে রাস্তা মসৃন ও উন্নত না করে এবড়ো থেবড়ো অবস্থায় ফেলে রাখাই বেশি যুক্তিযুক্ত এবং কম খরচের অপশন। হাতির মত উঁচা স্পিডব্রেকারে একটি গতিময় গাড়ি যদি এসেই পড়ে তাহলে সেটার স্প্রিং ভাঙ্গবে এবং সেটা হটাত ঝাঁকিতে ব্যালেন্স হারিয়ে নিজেই দূর্ঘটনায় পতিত হবে। একান্তই যদি গতিসীমা কমাতে বলা হয় তাহলে সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি স্পিডব্রেকার দেয়া উচিত যেটা গতিতে পার হলেও গাড়ির ক্ষতি হবে না, কিন্তু গাড়ির চালক টের পাবে যে গতি কমাতে বলা হচ্ছে। এর পরে একটু বড় স্পিডব্রেকার দেয়া যেতে পারে। ইদানিং দেশের হাইওয়েতে এরকম গুড়ি গুড়ি গুচ্ছ স্পিডব্রেকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো দেখে কোন কোন ইতর গাড়িচালক দাঁত কেলিয়ে, তারপর আরো জোরে টান দিয়ে চলে যায়।

৩।
যেহেতু রাস্তা নকশা ও তৈরী করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ, তাই সেই রাস্তার স্পিড-লিমিট বা নিরাপদ গতিসীমাও নির্ধারণ করে দেয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। রাস্তায় গতিসীমা দেয়া কিন্তু খুবই ঝামেলার কাজ। কারণ, একটি উজ্জ্বল দিনে একটা নির্দিষ্ট রাস্তায় নিরাপদে যত দ্রুত গাড়ি চালানো সম্ভব, সেই একই রাস্তায় সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে নিরাপদে চলতে হলে একটু কম গতিতে চলতে হবে। এর সাথে যদি যুক্ত হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, অর্থাৎ পিচ্ছিল বা স্লিপারি রাস্তা তাহলে নিরাপদ গতি আরো কম হতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন রকম গাড়ি, এবং তাদের ফিটনেস অনুযায়ীও নিরাপদে যাত্রার গতিসীমা কম বেশি হবে। যেহেতু দিনের বেলা, রাতের বেলা, বৃষ্টির সময় আলাদা আলাদা গতিসীমা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই সবরকম বিপদের কথা মাথায় রেখে একটা রক্ষণশীল গতিসীমা লিখে দেয়া হয়। কিন্তু আসলে, একটি উজ্জ্বল শুকনা দিনে ঐ রাস্তায় ঐ গতিসীমার চেয়ে অনেক বেশি গতিতেও নিরাপদে চলা যায়। উন্নত বিশ্বে কিছু রাস্তায় ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে কন্ডিশন অনুযায়ী নিরাপদ গতিসীমা দেখানো হয়।

৪।
তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, “সামনে ক্যামেরা” সাইনবোর্ডটা দেখে যদি গাড়িচালক গতি কমিয়ে সেই লিমিটের মধ্যে গাড়ি চালায় তাহলে বোঝা যায় সে হুঁশে আছে, সবকিছু খেয়াল করতে পারছে। সুতরাং আগে-পিছে বেশি গতিতে গাড়ি চালালেও রাস্তায় যাত্রী ও গাড়ির নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু কোন ড্রাইভার যদি সেই সাইন দেখে খেয়াল না করে, তখন সেই বেশি গতি অন্যদের ক্ষেত্রে নিরাপদ হলেও, ঐ চালক আসলে বেখেয়ালে গাড়ি চালাচ্ছে - যেটা রাস্তা ব্যবহারকারীগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ – সুতরাং ক্যামেরাতে ধরা পড়ে তার জরিমানা হওয়া যুক্তিযুক্ত।

জাপানি পুলিশ রাস্তার নিরাপত্তার মূল বিষয়টা সঠিকভাবে বুঝে বলেই ও ধরণের একটা সিস্টেম করেছে। সুতরাং তারা আসলেই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। অযথা মানুষকে হয়রানি করার জন্য সিস্টেমকে কাজে লাগাচ্ছে না।

৫।
শুধু রাস্তায় গতিসীমাই নয়, এরকম আরো অনেক সিস্টেম আছে যেগুলো আসলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা আবশ্যকীয় নয়, ব্যাখ্যা জেনে সঠিক প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সেগুলো প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অন্যদেরকে হয়রানি করার জন্য ব্যবহার করে। হতে পারে প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ঐ নিয়মের মূল বিষয়টাই বোঝে না (না বুঝে মুখস্থ বিদ্যা), না হয় বোঝার চেষ্টাও করে না - অর্থাৎ নিপীড়ন করাই তাই মূল উদ্দেশ্য।

[ ইদানিং এরকম বেকুবি/ নিপীড়নের উদাহরণ দেখে পোস্টটির অবতারণা করলাম]

সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১৮

গণপরিবহণ নিয়ে ...

কোনটা চাই:

ধরুন একজন ব্যক্তি টঙ্গি থেকে মতিঝিল নিয়মিত অফিস করেন; আরও ধরুন গাড়িতে/বাসে যাওয়া আর আসাতে ৪৫ মিনিটও লাগতে পারে, আবার কপাল খারাপ থাকলে আড়াই ঘন্টাও লাগতে পারে, তাহলে তিনি ৯টার অফিস ধরার জন্য কখন রওনা দিবেন? কিংবা আগামী পরশুদিন একজনের সাথে সকাল ১০টায় মিটিং করার সময় ঠিক করে নিশ্চিন্ত মনে রওয়ানা দিতে পারবেন কি না?

এবার ধরা যাক সেই ব্যক্তির কাছে আরেকটি বিকল্প আছে, যেটাতে উনি জানেন যে এই পথটা ট্রেনে যাওয়া যায়, আর এভাবে গেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা, একটু হাঁটা সব মিলিয়ে ঠিক এক ঘন্টা ১৫ মিনিট লাগবে যেটাতে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট কম বেশি হতে পারে। তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াবে? উনি কি ৪৫ মিনিটে পৌঁছানোর চান্স নেয়ার জন্য গাড়িতে আসতে বেশি পছন্দ করবেন (ধরা খেলে আড়াই ঘন্টা লাগবে ৫০-৫০ চান্স) নাকি নিশ্চিত ভাবে সোয়া এক ঘন্টার ট্রেনযাত্রা বেছে নিবেন?
.
.
.
.
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে মানুষ যেটা চায় সেটা হল সময়ের নিশ্চয়তা। বিশেষ করে সেই যাত্রাটা যদি অফিস/স্কুল /কলেজ ইত্যাদিতে যাওয়া আসার মত নিয়মিত যাত্রার অংশ হয় তাহলে এই নিশ্চয়তার বিষয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। একই রাস্তা যেতে কোনদিন ৩০ মিনিট আর কোনদিন ৩ ঘন্টা লাগলে সেই আয়োজনের উপর নির্ভর করে কোন কাজের পরিকল্পনা করা যায় না। প্রতিদিনই যদি সেই একই রাস্তায় ঠিক দেড় ঘন্টা লাগে, তাও সেটা অনিশ্চয়তার চেয়ে ভাল। অন্ততপক্ষে সেই দেড় ঘন্টার জন্যও পরিকল্পনা করা যায় (যেমন: গাড়িতে/ট্রেনে/ট্রামে/বাসে ঘুমিয়ে নেয়া, জরুরী ফোনালাপ সেরে নেয়া, গান শোনা, নিউজপেপার পড়া, গল্পের বই পড়া, পডকাস্ট শোনা ইত্যাদি)। কাজেই সময়ের সাপেক্ষে নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা মানুষকে অনিশ্চয়তার হাত থেকে স্বস্তি দিতে পারে।

এ তো গেল যাত্রীর পক্ষের কথা। এবার আসা যাক সার্ভিস প্রোভাইডার বা সেবাদানকারীর কথায় …

সমস্যা কোথায়:

ব্যক্তি মালিকানায় যখন যাতায়াত সিস্টেম থাকে তখন তাঁদের লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ লাভ করা। কাজেই লিজ সিস্টেমে ড্রাইভার নিজ উদ্যোগে আর বেতনভোগী সিস্টেমে মালিকের নির্দেশেই সব সিট না ভরলে গাড়ি ছাড়বে না। আবার অন্যকেও আগে যেতে দেবে না, কারণ তাহলে যাত্রী হারাবে। ফলাফল রাস্তায় গাড়ি বাঁকা করে থামাবে, অন্য গাড়িকে ব্লক করবে, তৈরী হবে ঘন্টার পর ঘন্টা স্থায়ী ইতর যানজট। তৈরী হবে সেই অনিশ্চিত, সময়-অনির্ভরযোগ্য যাতায়াত সিস্টেম। এই ফল অবধারিত; বাস মালিক পক্ষকে লাভ করতে চাওয়ার জন্য দোষারোপ করে এটার সমাধান করা যাবে না। যদি জোর করে তাদের সময় মত বাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়, তাহলে অনেক সময় খালি গাড়ি নিয়ে তাঁদের বেশ কিছু পথ যেতে হতে পারে, ফলে হয়তো লাভ তো দুরের কথা, চলাচলের খরচই উঠবে না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আমরা যেই সিস্টেম চাই সেটা অর্থনৈতীকভাবে টেকসই নয়। আবার অর্থনৈতীক ভাবে টেকসই করতে চাইলে সেই নির্ভরযোগ্য সিস্টেম সম্ভব নয়। আসলেই কি তাই?

সমাধান আছে:

যদি ব্যক্তির লাভের বদলে সামগ্রীক লাভের দিকে তাকাই তাহলে হয়তো সমাধানের জায়গাটা চোখে পড়বে। যেই জায়গায় কোনো পাবলিক যাতায়াত সিস্টেম নাই আর যে জায়গায় আছে তাদের তুলনা করলে এলাকা দু'টির অর্থনৈতীক সমৃদ্ধির মধ্যে চোখে পড়ার মত পার্থক্য থাকবে। একটা এলাকার সাথে যদি অন্য এলাকাগুলোর চমৎকার নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা থাকে তাহলে সেই এলাকাটি সকলের জন্য আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। খুচরা বিক্রেয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন সেখানে আসতে চাইবে, তেমন মানুষজনও বসবাস করার জন্য সেখানে থাকতে চাইবে। ফলে সেই এলাকার জমির দাম বাড়বে, বাসা ভাড়া বাড়বে। চাহিদার উপর ভিত্তি করে সেখানে চমৎকার সব অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এই সব মিলিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় প্রশাসন তথা সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কাজেই সামগ্রীক ভাবে যে উন্নয়ন সেটার ফলে কোনো বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি মালিকের সরাসরি তেমন লাভ হয় না, কিন্তু প্রশাসনের আয় বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্য পরিমানে।

সংক্ষেপে: উন্নয়নের ভিত্তি হচ্ছে চমৎকার নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা - যেটাতে যাত্রী আসুক বা না-আসুক, সময় মত বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি চলতে হবে। কিন্তু এটাতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস/টেম্পু/ট্যাক্সি মালিকের লাভ নাই, বরং ক্ষতি। কিন্তু এই সিস্টেমে লাভ তো হচ্ছে … কার? প্রশাসনের/সিটি কর্পোরেশনের ….

আর এজন্যই দেখা যায় পৃথিবীর সকল উন্নত শহরে সরাসরি বাসের/ট্রেনের খরচ না উঠলেও ভর্তূকী দিয়ে সময়-নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে প্রশাসন। কারণ প্রশাসনই এখানে অর্থনৈতীকভাবে লাভবান হয়, ব্যক্তি মালিকানার বাস/টেম্পু মালিক নয়।

ছোট স্কেলের উদাহরণ:

ধরুন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস শহর থেকে একটু দুরে, আর সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থাও খুব খারাপ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাবলো, নিজেরাই বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করবেন। এজন্য বেশ কিছু বাসও কিনলেন। বাসে যাতায়াতের টিকেটের খরচটাও সহনীয় রাখলেন। কিন্তু এখন যদি উনারা চিন্তা করেন, বাসের সব সিট না ভরলে ছাড়বেন না তাহলে সেটা সময়-নির্ভরযোগ্য হবে না। তখন কেউই ঐ ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে চাইবে না – করতে বাধ্য হলেও সেই দিন অন্য কোনো কাজের জন্য পরিকল্পনা করতে পারবেন না। কিন্তু টিকেটের টাকা থেকে খরচ তোলার চিন্তা বাদ দিয়ে যদি ভর্তূকি দিয়ে এটাকে সময়-নির্ভরযোগ্য সিস্টেমে পরিণত করা হয়, তাহলে ঐ ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা অনেক বেশি আকর্ষিত হবেন। আর ওখানে সকলেই এভাবে আসা-যাওয়া করলে কাজে-কর্মে আরও গতিশীলতা আসবে, ফলে ছাত্র ভর্তিও বৃদ্ধি পাবে – আর সামগ্রীকভাবে এটার লাভ, ভর্তূকীকে ছাড়িয়ে যাবে বহুগুনে।

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

কাউন্সেলিং বিষয়ক চিন্তাভাবনা

বর্তমানে কাউন্সেলিং শব্দটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। সাধারণ ভাবে মনে হয় councelling -এই ইংরেজি শব্দটির অর্থ কাউকে পরামর্শ দেয়া। কিন্তু গুগল আংকেলের কাছে এই বিষয়টির ব্যাপারে জানতে চেয়ে ধারণা হল, এর ব্যাপ্তি আরো অনেক গভীর এবং এটা করতে চাইলে রীতিমত আলাদা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

গুগলে কাউন্সেলিং লিখে সার্চ দিলে এই সংজ্ঞাটি আসে
Counselling is a type of talking therapy that allows a person to talk about their problems and feelings in a confidential and dependable environment. A counsellor is trained to listen with empathy (by putting themselves in your shoes). They can help you deal with any negative thoughts and feelings you have.
অনলাইনে এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম সাহায্যমূলক পোস্টও দেখলাম (বাংলা এবং ইংরেজিতে) – কয়েকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে যে কখন নিজেই বুঝতে পারবো আমার কাউন্সেলিং দরকার। আমার মনে হয়, একজনের পক্ষে নিজে নিজেই এই সমস্যা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারার বিষয়টা হল সবচেয়ে ভাল অবস্থা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অন্যেরা একজনের মাঝে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেও সেই ব্যক্তি নিজে কিন্তু সেটা অনুভব করতে পারেন না; এমনকি কেউ যদি বলে তোমার কাউন্সেলিং দরকার, তাহলে উল্টা মাইন্ড করে বসতে পারে। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আরেকজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ চোখের দরকার হয়, যে শিশুদের আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটা চিহ্নিত করতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা নিবে। আমার ধারণা, শিশুকে সরাসরি কিছু কাউন্সেলিং দেয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিবারকে কাউন্সেলিং দেয়া বেশি জরুরী হয়ে যায়।

অর্থাৎ সকলেরই হয়তো কাউন্সেলিং-এর দরকার নাই। কারো কারো দরকার আছে। কেউ যদি সেটা নিজেই বুঝতে পারে তাহলে তো ভাল, কিন্তু না হলে আরো কিছু চোখ দরকার যারা দেখে শুনে কিংবা তাদের অজান্তেই কিছু মানসিক বিষয় পরীক্ষা করে দেখে কাউন্সেলিং দরকার – এমন ব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারবেন। চিহ্নিত ব্যাক্তিটি প্রতিষ্ঠানের স্টাফ, কর্মকর্তা, শিক্ষক কিংবা ছাত্র হতে পারে।

আপনাদের হয়তো জানা আছে, সরকারী চাকুরীর মৌখিক পরীক্ষা বা সাক্ষাতকারের সময়ে সেই ভাইবা বোর্ডে একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ বসে থাকেন এবং চাকুরীপ্রার্থীর আচরণ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে থাকেন। একই রকম বা এর চেয়েও সিরিয়াসভাবে মানসিক গড়ন পরীক্ষা করা হয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। আমার বাচ্চার স্কুলেও এরকম পূর্ণকালীন সাইক্রিয়াটিস্ট আছে বলে শুনেছি।

কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা আমরা যে কেউ চিহ্নিত করতে পারি – যেমন ক্লাসে অমনোযোগী, বাচালতা, উগ্রতা, মনমরা হয়ে থাকা ইত্যাদি। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর সমাধানও সকলের জানা - যদিও সব ইস্যূতে প্যাঁদানি দেয়া কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না ... ... আবার, এখন তো স্কুলে মারধর করা আইনত নিষেধ (ইস্ আমাদের সময়ে যদি এমন থাকতো! ...); আর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মারধর তো দুরের কথা, বকা দিতেও এখনকার যুগে রীতিমত ভয় লাগে ... ...। আমি যতটুকু বুঝি, বকা দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হয় না। ভারতীয় নায়ক আমীর খানের ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটি হয়তো অনেকেরই দেখা আছে - এটা এবিষয়ে চিন্তার খোরাক যোগাবে।

কাউন্সেলিংএর কথা একটু বাদ থাক ... আমরা যে শিক্ষকতা করি সেটারই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কয় জনের আছে? আমি নিজে প্রকৌশলী হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি, শিক্ষকতা করার জন্য কিছু আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন আছে, যা বিকাশের জন্য কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষন পাইনি – আমাদের পাঠ্য সিলেবাসে ছিল না। সম্ভবত বেশিরভাগ বিষয়ের শিক্ষকগণেরও আমার মত একই অবস্থা – আমরা গান শিখে নয়, বরং গাইতে গাইতে গায়েন হয়েছি। আমার ধারণা, যাঁরা লেখাপড়া বিষয়ে লেখাপড়া করেন অর্থাৎ বি.এড, এম.এড করেন (কিংবা পুরানা আমলের বি.এ.বি.টি) তাঁদেরকে এই বিষয়গুলোর অনেকটাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আবার বিদেশী, বিশেষত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীর কোর্স কনটেন্ট ঘাটাঘাটি করে দেখেছি সেখানে ক্লাস ম্যানেজমেন্ট, প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ, গবেষণার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে রীতিমত কোর্সওয়র্ক করতে হয়। – এর উপরে যুক্ত হচ্ছে কাউন্সেলিং; কাউন্সেলিংকে আলাদাভাবে চিন্তা করছি তার কারণ আছে ...

কার কাউন্সেলিং-এর দরকার আছে সেটা চিহ্নিত করাটা একটা প্রাথমিক কাজ। এটার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার আছে। চিহ্নিত করার জন্য হয়তো কিছু ধাপে ধাপে করার মত প্রক্রিয়া আছে, হয়তো কিছু প্রশ্নপত্র আছে যার অনেকগুলো সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে – সেই উত্তরের প্যাটার্ন থেকে একেকজনের মানসিক গড়নটা বেরিয়ে আসবে, অস্বাভাবিকত্ব থাকলেও বেরিয়ে আসবে। হয়তো কিছু মানসিক পরীক্ষা আছে, যেগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেখে অস্বাভাবিকত্ব চিহ্নিত করা যাবে।

সম্ভবত, এর পরের কাজ হল সেই কাউন্সেলিং দেয়া অথবা তাকে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের কাছে পাঠানো। ছাত্র কাউন্সেলিং নিয়ে গুগল আংকেল ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম বিদেশি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং বিষয়ে রীতিমত আলাদা বিরাট সেটাপ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রকম বিষয়ে কাউন্সেলিং দেয়া হয়; বিষয়গুলোর নামের উদাহরণ দিচ্ছি -যেমন আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির (Iowa State University) কাউন্সেলিং বিষয়ক বিভাগের ওয়েব পেজ অনুযায়ী বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়:

- আত্মপরিচয় এবং নৈতিকতা (exploration of identity and values)
- পেশাগত উন্নয়ন – ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং? (exploration and development of career and majors)
- সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যা (relationship problems)
- হীনমন্যতা (low self-esteem)
- চাপ (stress)
- একাকীত্ব (loneliness)
- মানসিক অবস্থার সমস্যা, মনমরা থাকা (mood disturbances or depression)
- সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য অভিযোজন বিষয়ক (cultural exploration or navigating differences)
- যৌননিপীড়ন থেকে আরোগ্য (sexual assault recovery)
- শরীরবৃত্তীয় অথবা খাদ্যাভাস বিকৃতি বিষয়ক (body image or disordered eating concerns)
- মানসিক আঘাত এবং/অথবা অত্যাচার (trauma and/or abuse)
- যৌনপ্রবৃত্তি বা পরিচয় বিষয়ক (questioning sexual identity or orientation)
- দ্রব্যের অপব্যবহার (substance misuse)
- লেখাপড়া বিষয়ক কিংবা প্রেরণা (academic concerns or motivation)

এ্যাতসব বিষয়ে সম্যক জানা এবং কাউকে সঠিক পরামর্শ দেয়া এবং তাঁর মানসিক পর্যায়ে প্রভাবিত করা যে কোন একজনের পক্ষে বেশ কঠিন কাজ হবে বলেই মনে হয়। আর, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এটা করতে গেলে হীতে-বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে না - এমনটিও নিশ্চিত করা যায় না। ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ছাড়া দলগত কাউন্সেলিংও আছে বলে দেখেছি। এমনকি সমবেত সংগীতে অংশগ্রহণ করলেও কিছু বিষয়ে উপকার হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম। পরিবেশ, শব্দ, রং, সংগীত সবই মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা (এবং অসুস্থতা) প্রভাবিত করে বলে বেশ ভালো গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে। মানুষের মনের অলিগলিতে কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে। আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষিত একটা লোকবল যে কোন প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য একটা মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।

দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় গত ৩১-জানুয়ারী-২০১৬ সালে এ বিষয়ক একটা অসাধারণ উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যা হুবহু নিচে তুলে ধরা হল। এখানে লেখকদ্বয় সরাসরি বলে দিয়েছেন কাউন্সেলিং মানে শুধু পরামর্শ দেয়া নয় …

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং
গ্লোরিয়া রোজারিও ও প্রিয়াংকা শঙ্কর দাস

একটি হাসপাতালের মানসিক বিভাগে আমার ভিজিটিং কার্ড দিতে গিয়েছিলাম, যাদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন তাদের যেন ‘রেফার’ করা হয়। কিন্তু মানসিক ডাক্তারের কথায় আমি হতবাকই হলাম। তিনি বললেন যে ‘আমিই কাউন্সেলিং করি। কারো কাছে আমার ‘রেফার‘ করার প্রয়োজন হয় না। ’

আরেক দিন একটি স্কুলে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছিলাম, যেসব ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকের মানসিক সমস্যার জন্য সাহায্যের দরকার তারা যেন কাউন্সেলিংয়ের জন্য ‘রেফার’ করেন। দুজন শিক্ষক আমাকে মুখের ওপর ফের বলে দিলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের আমরাই কাউন্সেলিং করি। ’ এ তো একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়ে দাঁতের যন্ত্রণায় কাতর রোগীর দাঁতের অপারেশন করার শামিল। একজন স্কুল শিক্ষক যদি মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সেলিং করেন (প্রশিক্ষণ ছাড়া), তাহলে ওই রোগী বা ক্লায়েন্ট কি সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে? তাঁদের কথা শুনে ভাবলাম, সবাই যদি কাউন্সেলিং করেন, তবে যাঁরা কাউন্সেলিংয়ের ওপর পড়াশোনা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাঁদের কাজ কী হবে!

অপ্রিয় হলেও সত্য যে এখনো পর্যন্ত অনেকেরই কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই ভাবেন, কাউন্সেলিং হলো পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু না, কাউন্সেলিং মোটেও পরামর্শ দেওয়া নয়। কাউন্সেলিংয়ে মূলত একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। তাই আমাদের এ লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল প্রাচীন সভ্যতার মিসর, মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক) ও পারস্যে (ইরান)। সেখানকার ধর্মযাজকরা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি দান করতেন। ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতে, সমসাময়িক কাউন্সেলরদের আবির্ভাব ঘটে ১৮০০ শতকের পর। তখনকার কাউন্সেলররা মূলত ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক (বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক), যাঁরা ছাত্রদের শুধু একাডেমিক ফলাফল ছাড়াও তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা, যেমন আবেগীয় ও আচরণগত সমস্যা, এসব ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করে কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতেন। আমেরিকার কংগ্রেস ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স এডুকেশন অ্যাক্ট (এনডিইএ) চালু করে এবং এর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং দেন, তিনিই কাউন্সেলর। একজন ব্যক্তি কাউন্সেলিং পেশায় সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্য তাঁকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি কিংবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর শিক্ষা অর্থাৎ মাস্টার্স, সেই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হয়। আর যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং সেবা নেন তাঁকে বলা হয় ক্লায়েন্ট।

কাউন্সেলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি পেশাগত সম্পর্ক বিরাজ করে এবং ব্যক্তিগত, দলগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। ফলে তাদের মধ্যে নিজেদের ও অন্যদের সম্পর্কে এমন একটা স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যেটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ও দ্বন্দ্বগুলো সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। অনেকেই কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি সমার্থক কিংবা একই অর্থে অদলবদল করে ব্যবহার করে। থেরাপি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেরাপিয়া থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসঙ্গে পথ হাঁটা’। কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কাউন্সেলর ও ক্লায়েন্ট একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তাহলে দুটি বিষয়ই অর্থাৎ কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির কাজ মোটামুটি একই রকম।

কাউন্সেলরের প্রাথমিক কাজ হলো ক্লায়েন্টকে তার নেতিবাচক চিন্তাপদ্ধতি পরিবর্তন, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, জীবনের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সে যেন তার অনুকূল মাত্রায় মনঃসামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় হতে পারে সে ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করা। এ জন্য কাউন্সেলররা মানসিক স্বাস্থ্য, মনোবৈজ্ঞানিক ও মানুষের বিকাশগত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করে চিন্তাভাবনা, আবেগীয়-আচরণীয় অথবা নিয়মতান্ত্রিক বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের ভালো থাকা বা সুস্থ থাকা, ব্যক্তিগত বিকাশ অথবা পেশাগত উন্নয়ন, এমনকি মনোরোগ থাকলে সে ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকেন।

কাউন্সেলরের ভূমিকা অন্যান্য পেশা থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে কাউন্সেলর সমস্যাটির দিকে খেয়াল করেন এই ভেবে যে এই সমস্যাটি ব্যক্তি, নিয়ম ও সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই বেড়ে চলেছে। কাউন্সেলররা রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের তুলনায় বেশি খেয়াল করেন ক্লায়েন্টদের মানসিক বিকাশ ও মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধ, দক্ষতা, গুণাগুণ, মানসিক শক্তির উৎস ও চাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

সাধারণত কাজে অনাগ্রহ, সামাজিক ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, যোগাযোগে অক্ষম, অবিরাম চিন্তা, দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন, যেকোনো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া, শুচিবায়ু, বারবার হাত ধোয়া, হতাশাগ্রস্ততা, একাকিত্ব, আশাহীনতা, পেটে সমস্যা, মাথাব্যথা, অকারণে জ্ঞান হারানো, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, ভাঙচুর করা, মিথ্যা কথা বলা, অতি চঞ্চলতা, অমনোযোগী, অটিজম, মিশতে না পারা, দুঃখজনক ঘটনা থেকে প্রাপ্ত আঘাত, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিদ্রাহীনতা, ঘুমে ব্যাঘাত, মন মরা হয়ে থাকা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করা হয়।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি যখন শুরু হয় তখন ক্লায়েন্ট তার মনের কষ্টের সব কথা খুলে বলতে থাকে। দুঃখের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই সে খুব কান্নাকাটি করে, ভেঙে পড়ে। তখন ক্লায়েন্ট নিজেও হয়তো মনে করতে পারে যে এখানে এসে সব কিছু খুলে বলে তো আমি আবারও আগের সেই আঘাত পাওয়া মুহূর্তের কষ্টটা পাচ্ছি। তাহলে আমার সঙ্গে এটা কী হচ্ছে? এটা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াতে ক্লায়েন্টের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ভয়ের কিছুই নেই; সেই বিপজ্জনক মুহূর্তটিতেও তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই কাউন্সেলররা আছেন। কাউন্সেলরই ওই মুহূর্তটিতে তাকে সহায়তা করবেন স্থির হওয়ার জন্য, ভালো থাকার জন্য।

কাউন্সেলিং সেশনটি সাধারণত হয় ৪৫-৫০ মিনিটের। আর কাউন্সেলিং সেশন সংখ্যার গড় হলো সাত-আটটি। তবে সমস্যার বিষয়ভেদে ও ক্লায়েন্ট অনুযায়ী সেশন সংখ্যা কমবেশি হতে পারে।

কাউন্সেলিং সেশনে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে ক্লায়েন্ট কাউন্সেলরের কাছে যেসব কথা বলবে সেসব কথা গোপন রাখা হয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ভাঙা হবে। প্রথমত, ক্লায়েন্টের যদি আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাহলে ক্লায়েন্টের মা-বাবা বা কাছের মানুষদের তার জীবন বাঁচানোর জন্যই তথ্যটি জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্ট যদি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তৃতীয়ত, যদি কখনো কোর্ট থেকে নির্দেশ আসে। তবে এ তথ্যগুলো জানানোর আগে অবশ্যই ক্লায়েন্টকে এ বিষয়ে বলে নেওয়া হবে।

আমাদের দেশে কাউন্সেলিং করাতে হলে ফি দিতে হয় ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে কিছু কিছু জায়গায় বিনা মূল্যেও কাউন্সেলিংসেবা পাওয়া যায়। যেমন—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিএসসির কাউন্সেলিং ও গাইডেন্স সেন্টারে।

কাউন্সেলিং হলো মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি পেশাগত প্রক্রিয়া। একজন পেশাদার কাউন্সেলরের এ পেশা চর্চা করার জন্য একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কাউন্সেলররা দক্ষতার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে কাজ করেন। কাউন্সেলিং নেওয়ার আগে কাউন্সেলরের যোগ্যতা সম্পর্কে জেনে নিন, যেন সঠিক সেবা পেতে পারেন।


লেখকদ্বয় : গ্লোরিয়া রোজারিও, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
প্রিয়াংকা শংকর দাস, কাউন্সেলর, হিলিং হার্ট কাউন্সেলিং ইউনিট, বসুন্ধরা, ঢাকা

ধৈর্যসহ এ্যাতদুর পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

সহায়কমূলক তথ্যসূত্রসমূহ:
http://www.kalerkantho.com/print-editio … /31/319282 (মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং)
https://bn.thecabindhaka.com.bd/10-sign … -health-2/ (১০ টি সংকেত যা নির্দেশ করে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং দরকার)
http://www.newsbangladesh.com/details/2399 (অনলাইনে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং)

সোমবার, ১ মে, ২০১৭

নিয়োগযোগ্যতার জরুরী গুণাবলী - জেনে রাখা ভাল


ভূমিকা

কিছুদিন আগে নিয়োগযোগ্যতা বিষয়ে একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারের কিছু অংশে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখান থেকে কিছু অংশ খুবই জরুরী মনে হওয়ায় সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এই ছোট্ট প্রয়াস। যদি ইতিমধ্যে জানা না থাকে তাহলে চাকুরীপ্রার্থী এবং চাকুরীদাতা উভয়পক্ষই হয়তো এই তথ্যগুলো জেনে উপকৃত হবেন। যেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো এই ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে এসেছে সেগুলো হল Employed, Employable, Hard Skill এবং Soft Skill। এর মধ্যে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল Soft skill - অথচ এই বিষয়টা সম্পর্কে আগে থেকে আমার কোন স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না। এই শব্দগুলো দিয়ে কী বোঝা যায় সেটা দেখা যাক।

Employed বনাম Employable

Employed অর্থ হল বর্তমানে একজনের একটা চাকুরী আছে; কিন্তু এই মূহুর্তে employed বলেই সেই চাকুরী থাকবে কি না, কিংবা একটা ছাড়লে আরেকটা পাবে কি না সেটার গ্যারান্টি নাই।

Employable অর্থ হল এই লোকের মধ্যে এমন কিছু গুনাবলী আছে যে সব প্রতিষ্ঠানই এঁকে চাকুরী দিতে চাইবে। এই গুনাবলীগুলোকে soft skill বা employability skill বলে। ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য এই গুনাবলীগুলো অপরিহার্য। কাজেই এই দক্ষতাগুলো থাকলে সেই ব্যক্তি ইচ্ছামত এক চাকুরী ছেড়ে আরেকটি নিতে পারবে। নিয়োগযোগ্যতার দক্ষতাগুলোকে কখনো সফট স্কিল, ফান্ডামেন্টাল স্কিল, ওয়র্ক-রেডিনেস স্কিল কিংবা জব-রেডিনেস স্কিল বলা হয়।

দক্ষতার প্রকারভেদ

কোন একজন ব্যক্তি Employable বা নিয়োগযোগ্য বলতেই তার দুই ধরণের দক্ষতার বিষয়টা সামনে চলে আসে। প্রথমটা হল Hard Skill আর অন্যটা Soft Skills। এর মধ্যে Hard Skill সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই মোটামুটি ভাল ধারনা রাখি, কিন্তু অতি জরুরী Soft Skillগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই মোটেই সচেতন নই।

Hard স্কিল সমূহ

যেই পেশার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, সেই পেশার নামের মধ্যেই সেই পেশা সংশ্লিষ্ট দক্ষতার বিষয়টা বোঝা যায়। এছাড়া নিয়োগের বিজ্ঞাপনে সাধারণত সেই Hard skill গুলোর ব্যাপারে উল্লেখ করা থাকে। যেমন: ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারীবিদ্যা, একাউন্টিং, টাইপিং-স্পিড, প্রোগ্রামিং দক্ষতা ইত্যাদি। 

চাকুরীপ্রার্থীদেরকে প্রাথমিক ভাবে বাছাই করতে এই hard skillগুলো ব্যবহৃত হয়। এক পেশার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন অন্য পেশায় ডিগ্রীধারী কেউ আবেদন করলে সেই আবেদনপত্র এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। অথবা একটা চাকুরীর জন্য নির্দিষ্ট টাইপিং স্পিড কিংবা নির্দিষ্ট প্র‌োগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ চেয়েছে - প্রার্থীর সেই দক্ষতাটুকু না থাকলে তার আবেদন করার যোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।  

সাধারণত Hard skillগুলো সার্টিফিকেট দেখেই বোঝা যায়, কারণ যাঁরা এগুলোর সার্টিফিকেট দেয় তাঁরা অনেক দীর্ঘমেয়াদে দেখেশুনে অনেকভাবে পরীক্ষা করেই এগুলো দিয়েছেন বলে আশা করা যায়। এই দক্ষতাগুলোকে যে কোন সাধারণ চাকুরী পেতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। 

প্রাথমিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই দক্ষতাগুলো অর্জনের পর নিজের ক্যারিয়ারকে আরো আগে বাড়াতে চাইলে কিংবা উঁচু পদে কাজ করতে চাইলে ক্রমান্বয়ে আরও কিছু বিষয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার। নিচে এই বিষয়গুলো এবং অর্জনের জন্য দরকারী ধাপগুলো উল্লেখ করা হল:

পেশায় উন্নয়ন
-- নতুন কিছু শেখা এবং বিভিন্ন রকমের প্রকল্পে কাজ করা
-- কার্যনির্বাহী কমিটিতে কাজ করা
-- নিজেই উদ্যোগী হয়ে এবং যৎসামান্য তত্বাবধানে কাজ করার সক্ষমতা/ বৈশিষ্ট
-- নিজের ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন এবং এর ব্যবসার ধরণ সম্পর্কে ধারণা রাখা
-- নিজ কাজের লক্ষ্য আর চাকুরীদাতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসারে ঠিক করা
-- সহকর্মীদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা বুঝতে পারা

নেতৃত্ব
-- অন্যদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নততর পরামর্শ দেয়া
-- প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে রাজি/প্রস্তুত থাকা
-- দর কষাকষিতে সক্ষমতা
-- কর্মীদের কাজে পরিচালনা ও অনুপ্রাণিত করা
-- দক্ষতা প্রদর্শন করা
-- পদ্ধতি সরলীকরণের চেষ্টা করা
-- ব্যবসার প্রয়োজন বিশ্লেষনের মাধ্যমে অর্থ বা সময়ের সাশ্রয় করা।
-- সহকর্মীদের সাথে অংশীদারীত্ব এবং গোষ্ঠী গঠন করা।

সফট স্কিলসমূহ

পেশাগত দক্ষতাগুলো প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হতে সাহায্য করলেও চাকুরীদাতাগণ তাদের কর্মীদের মধ্যে অন্যরকম কিছু প্রবলভাবে প্রত্যাশা করেন - এই অন্যরকম দক্ষতাগুলো নির্দিষ্টি কোনো পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর, বাছাই প্রক্রিয়া শেষে চাকুরী পেতে এই অন্যরকম যোগ্যতাগুলোই তখন মূল চাবিকাঠি হয়ে যায়। তাই সেই অন্যরকম যোগ্যতাগুলোকে Employability Skill বা Soft Skill বলে। এই যোগ্যতাগুলো থাকলে একজন প্রার্থীর কখনোই চাকুরীর বা কাজের অভাব হবে না। এগুলি এমন কিছু দক্ষতা ও অভ্যাস-আচরণের সমন্বয় যা প্রতিটা কর্মক্ষেত্রই জরুরী।

কিন্তু soft skillগুলোর সাধারনত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট নাই। আর এগুলো দেখার জন্যই মূলত: ইন্টারভিউয়ে ডাকা হয়। যদিও আমাদের দেশে বেশিরভাগ জায়গায় চাকুরীর ইন্টারভিউ যাঁরা নেয় - তাঁরা এই ব্যাপারগুলোতে কতটুকু সচেতন এই বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কিন্তু বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো লম্বা সময় নিয়ে (কিছুক্ষেত্রে কয়েকদিন) সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা সম্ভাব্য চাকুরীপ্রার্থীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এই বিষয়গুলোই বুঝে নেয়।

নিয়োগযোগ্যতার এই দক্ষতা থাকলে একজন প্রার্থী যা করতে পারে তা হল:
-- সহকর্মীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ
-- কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সমাধান
-- দলের মধ্যে নিজের ভূমিকা বুঝে কাজ করা
-- দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেয়া
-- নিজের ক্যারিয়ারের চালক হওয়া

অন্যের সাথে আপনার মিথস্ক্রিয়া কেমন হবে তা আপনার ব্যক্তিগত গুণাবলী, অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। এই দক্ষতাগুল‌ো চাকুরীদাতার কাছে গুরুত্ব বহন করে কারণ তার কর্মীগণের পারস্পরিক কিংবা সেবাগ্রহীতা/ক্রেতার সাথে সফল/সুন্দর মিথস্ক্রিয়া/ব্যবহার তার ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে উন্নতির জন্য জরুরী। তাহলে দেখা যাক ঠিক কোন বৈশিষ্টগুলোকে soft skillবলে:

মূল দক্ষতাসমূহ (Foundational Skills)
-- গোছানো (সুবিন্যস্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ)
-- নির্দিষ্ট সময়ে কিংবা আগেই কর্মস্থলে পৌঁছানো
-- নির্ভরযোগ্য
-- কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকা
-- হাল ছেড়ে না দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা ও লেগে থাকা
-- সময়মত সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা
-- দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টায় আরো তথ্য সংগ্রহ
-- ছাড় দেয়া এবং অভিযোজন করার ক্ষমতা
-- অপ্রীতিকর হলেও সমস্ত দায়িত্ব সম্পুর্ন করা
-- কর্মস্থলে পোশাকের রীতিনীতি এবং নির্দেশাবলী বুঝতে পারা
-- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

আন্তব্যক্তিগত দক্ষতা (Inter personal skills)
-- বন্ধুসুলভ এবং বিনয়ী
-- সহকর্মী এবং কর্মকর্তাদেরকে সম্মান করা
-- সেবাগ্রহীতার অনুরোধে সঠিক উপায়ে সাড়া দেয়া
-- (কাজের/সেবার) প্রতিক্রিয়া জেনে নেয়া
-- গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা
-- শান্তিপূর্ণ এবং সততার সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করা

যোগাযোগের দক্ষতা (Communication skill)
-- লিখিত নথি পড়তে ও বুঝতে পারা
-- অপরের কথা শোনা, বোঝা এবং প্রশ্ন করা
-- নির্দেশাবলী মেনে চলার সক্ষমতা
-- লিখিত বা মৌখিক ভাবে ধারণাকে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা
-- প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যথাযথ ব্যবহারে সক্ষমতা

সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষনের চিন্তাশক্তি (Problem solving and Critical thinking)
-- পরিবর্তন মেনে নেয়া
-- দায়িত্ব পরিবর্তন, আরম্ভ বা বিরত থাকতে রাজি থাকা
-- ব্যস্ত পরিবেশেও শান্তভাবে কাজ করা
-- বলার আগেই নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করে দেয়া
-- সমস্যার সমাধানে এবং আরও ভালভাবে কাজ করার লক্ষ্যে প্রশ্ন করা

দলগত কাজ (Team work)
-- বিভিন্ন প্রকৃতির লোকের সাথে সহজে কাজ করতে পারা
-- অন্যের দরকারের প্রতি সংবেদনশীলতা
-- নিজের অংশের কাজের ভালমন্দের দায়দায়িত্ব নেয়া
-- দলগত লক্ষ্যে অবদান রাখা

আইনগত এবং নীতিগত দায়িত্ব (Ethics and Legal responsibility)
-- নিজের সিদ্ধান্ত এবং কাজের দায়ভার গ্রহণ করা
-- কাজের বিধিমালা এবং কার্যপ্রণালী বোঝা এবং মেনে চলা
-- সৎ এবং বিশ্বাসী
-- পেশাদারীত্ব ও পরিপক্কতার সাথে কাজ করা

উপসংহার

উপরে তালিকা আকারে যেই বৈশিষ্টাবলীর কথা লেখা হল সেটা দেখে কেউ নিজের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সেটার উন্নয়ন করলে আশা করা যায় নিয়োগযোগ্যতার দিকে আরও এগিয়ে যাবে। আমি নিজেও এই তালিকা থেকে উপকৃত হয়েছি - বুঝতে পেরেছি আমার সমস্যাগুলো (আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখে) কী? আর সমস্যা বুঝতে পারলে সেটা সমাধান করার পথ বের করা সহজ হয়ে যায়।

খেয়াল করে দেখুন, আমাদের যে মাঝে মাঝে রিকমেন্ডেশন লেটার নিতে/দিতে হয়, সেখানে আসলে এই soft skillগুলোকেই হাইলাইট করা হয় যেন দুরে থাকা সম্ভাব্য সুপারভাইজার কাছ থেকে না দেখেই প্রার্থী সম্পর্কে একটা ভাল আইডিয়া পায়। বিয়ে-শাদী'র সময়ে বা পরেও আমরা পরিচিত সার্কেলে বৈবাহিক সূত্রে নতুন আসা মানুষের এই soft skillগুলো নিয়ে বেশ আলোচনা করি বলে মনে হয়। কাজেই এই দক্ষতাগুলোর প্রয়‌োজনীয়তা শুধু চাকুরীক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।


ইন্টারনেটে সার্চ করলে এই বিষয়ে প্রচুর লেখা পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও আরও সংক্ষেপে সুন্দরভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই কৌতুহলী হয়ে খুঁজলে আরও চমৎকার তথ্যবহুল লেখা পাবেন নিঃসন্দেহে।

তথ্যসূত্র:

১। International Summit on Employability and Soft Skills, 2017.
২। গুগল আংকেল
৩। https://www.careerwise.mnscu.edu/careers/employability-skills.html

শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭

এই প্রজন্মের সমস্যাটা কী?

১।
কিছুদিন আগে ঠিক এই ইংরেজি শিরোনামে একটা বক্তব্যের ভিডিও দেখেছিলাম (লিংক শেষে)। অসাধারণ এই বিশ্লেষনটা আমি পরে পরিচিত অনেক জনকেই দেখিয়েছি। এই বক্তব্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নাম Simon O. Sinek – একজন ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা (জন্মসাল: ১৯৭৩)। তাঁর লেখা তিনটা বই আছে। আচ্ছা এবার মূল বিষয়ে ফেরত আসি: এইখানে তাঁর বক্তব্যের একটা কাছাকাছি বাংলা দেয়ার চেষ্টা করছি কারণ: মনে হয়েছে যাদের দেখার সুযোগ হয়নি বা ইংরেজিতে সমস্যা তাঁরা এই বিশ্লেষনটা জানুক।

২।
এবার আসি সংক্ষেপে সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনটিতে:
বর্তমানের যে প্রজন্ম অর্থাৎ ৮৪ সাল বা এর পরে যাদের জন্ম তাঁদের চারটা বৈশিষ্ট আছে যা আগের প্রজন্মগুলো থেকে সম্পুর্ন আলাদা। এঁদের নামে অনেক অভিযোগ – এরা নবাবজাদা মানসিকতার; এদেরকে ম্যানেজ করা কঠিন; এরা আত্নকেন্দ্রীক; লক্ষ্যহীন; অলস ইত্যাদি।

এঁদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: জীবনে কী হতে চাও? এঁদের জবাব হবে - আমি একটা মহৎ কাজ করতে চাই; সবার জীবনে প্রভাব ফেলতে চাই (বিখ্যাত?), ফাও খেতে চাই ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা যা চায় সেগুলো দেয়া হলে, এমনকি ফ্রী খাইতে দিয়েও তাদেরকে খুশি করা যায় না দেখা যায় কিছু একটা বাকী আছে। এরকম হওয়ার পেছনে চারটি মূল কারণ বের করেছেন তিনি।

প্রথম কারণ হল ভুলভাবে বাচ্চা লালন-পালন। এদের বেশিরভাগের বাবা-মাগণ ছোটকাল থেকে এঁদেরকে বার বার বলেছে যে তাঁরা স্পেশাল; বলেছে যে তোমরা যা হতে চাও তাই হতে পারবে - ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এমন যে শুধুমাত্র চাইলেই হবে; কিন্তু এর জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে সে ব্যাপারে কিছুই বলে না। এদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে কারণ এমন নয় যে এরা এর যোগ্য (মানে রেজাল্ট এ্যাত ভাল যে উচ্চতর ডিগ্রী করানো যায়), কারণ হল এটা এঁদের বাবা-মা’ চায় তাই। কেউ কেউ ক্লাসে এ গ্রেড পেয়ে এসেছে - যোগ্যতার কারণে নয়, বরং এই কারণে যে শিক্ষক এঁদের অতি নাক-গলানো স্বভাবের বাবা-মা’কে এড়াতে চায়। কেউ কেউ এমনকি ক্লাসে দেরিতে আসার জন্যও পুরষ্কার পায় – কাজেই যা হয় তা হল যারা সত্যিই পরিশ্রম করে তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে করে - পরিশ্রম করার আগ্রহ কমে যায়। আর যে শেষে আসার জন্য পুরষ্কার পায় সে একটু বিব্রত বোধ করে - কারণ সে জানে সে পুরষ্কারের যোগ্য না; তাই হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু এই গ্রুপের পোলাপানগুলো যখন বাস্তব জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে এঁরা দেখে - তাঁরা ম‌োটেও স্পেশাল নয়; মামা-চাচার লবিং ছাড়া প্রমোশন পাচ্ছে না; দেরিতে বা শেষে আসার জন্য কোন পুরষ্কার নাই; আর শুধুমাত্র চাচ্ছে বলেই কোন কিছু পাওয়া যায় না – ফলে মুহুর্তেই তার নিজেকে নিয়ে গড়া স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। ফলে একটা পুরা প্রজন্ম, তাদের পূর্বসূরীদের চেয়ে অনেক বেশি হীনমন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে।

৩।
দ্বিতীয় কারণ হল বাধাহীনভাবে সামাজিক মাধ্যম যথা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া। লোক-দেখানি ভাব নিতে এগুলোর জুড়ি নাই। অসাধারণ জীবন যাপনের একটা ভূয়া ভাব নেয়া যায় সেখানে, যদিও যে চরম ভাব নিচ্ছে আদতে হয়তো তাঁর মন খারাপ। ফলে এখানে ঘুরলে মনে হয় সবাই কী দারুন জীবন যাপন করছে, আর তাদের কথাবার্তা দেখলে মনে হয় জীবনে তাঁরা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে যা বাস্তবের পুরা বিপরীত। আরেকজনের কাজ কারবার দেখলে মনে হয় আমারও এমনই করতে হবে - কিন্তু আদতে সেরকম হওয়া বা করা সম্ভব না। ফলে হীনমন্যতায় ভোগা একটা প্রজন্ম আরো বেশি হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে - যদিও এতে তাঁদের কোন দোষ ছিল না।

একজনের হয়ত কিচ্ছু করার নাই, বা ভাল লাগছে না - তাই মেসেঞ্জারে গ্রুপকে লিখলো “হাই ...”। একটু পরেই আবার মেসেজ চেক করে দেখে দশটা রেসপন্স এসেছে …. “হাই”, “হাই”, “হাই”, “হাই” … … … … … । এতে আসলে কী হল!? মনে হল কিছুই না, কিন্তু আসলে এটাতে প্রথম ব্যক্তির বেশ ভাল লাগলো। এই যে ভাল লাগা, এই অনুভুতিটার পেছনে একটা হরমোন কাজ করে - যেটার নাম হল ডোপামিন। এজন্যই আমরা বার বার চেক করি, কয়টা লাইক পড়লো, কয়টা রেসপন্স আসলো ইত্যাদি। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের ডোপামিন নিঃসরণ ঘটাতে সাহায্য করে। তবে জেনে রাখা ভাল, এই সামাজিক যোগাযোগের ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া আরো অনেক যে যে জিনিষগুলো আমাদের ড‌‌োপামিন নিঃসরণ ঘটায় সেগুলোর মধ্যে আছে – সিগারেট, মদ, জুয়া এবং অন্যান্য মাদক দ্রব্য। অর্থাৎ মাদকতার আনন্দ যে ডোপামিনে, যা আসক্তি সৃষ্টি করে - ঠিক সেই একই রকম আসক্তি এই সামাজিক মাধ্যম সৃষ্টি করে। ছোটরা যেন অবুঝের মত আক্রান্ত না হয়ে পড়ে সেজন্য বিদেশে মদ, সিগারেট কিনতে এবং জুয়া খেলতে বয়সের বিধিনিষেধ আছে - দোকানে নির্দিষ্ট বয়েসের কমবয়সী কেউ সেগুলো কিনতেই পারে না; অথচ একই রকম আসক্তিদায়ক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বাচ্চাদের কোনো বাধা নাই। এর মানে হল অনেকটা এরকম: একজন কিশ‌োরকে বা বালককে নিজের সিগারেট প্যাকেটে/মদের ভাণ্ডারে বাধাহীন অধিকার দেয়া।

৪।
কাজেই এই প্রজন্ম বিশেষত কৈশ‌োরের মানসিক পরিবর্তনের সময়ে যখন বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক চাপ সামলাতে খাবি খায় তখন তাঁদের সামনে এরকম একটা নেশাদ্রব্য দিয়ে দেয়া হচ্ছে সেই চাপ ভুলে থাকার জন্য। সেই আবেগ মানসিক চাপ ইত্যাদি সামলাতে যখন বাবা-মা কিংবা বন্ধুদের সাহায্য দরকার ছিল, তখন তাঁরা নেশার সাহায্য নেয় – নেশা মানে এই সামাজিক মাধ্যম – ফেসবুক ইত্যাদি। আর এই ব্যাপারটা যখন তাঁদের মাথায় গেঁথে যায়, তখন জীবনের যে কোন পর্যায়ে সামাজিক, অর্থনৈতীক কিংবা পেশাগত চাপ সামলাতে তাঁরা কোন বন্ধু বা গুরুজনের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে নেশার বোতল তথা ফেসবুক টাইপের জিনিষপাতি খুলে বসে। আর এ-তো জানা কথাই, নেশা কখনই দীর্ঘমেয়াদে ভাল কিছু করতে পারে না; এটা জীবন ধ্বংসকারী একটা বস্তু।

আর এই আসক্তির কারণে দেখা যায়, এই প্রজন্মের বড় একটা অংশ সত্যিকারের বন্ধুত্ব, গভীর সম্পর্কের অর্থই বোঝে না। তাদের বন্ধুত্বগুলো ভাসা ভাসা; যে বন্ধুর উপর নির্ভর করা যায় না – আর এমনও হতে পারে যে মজা শেষে তাকে খুব সহজেই আনফ্রেন্ড করে দিতে পারে। বাস্তব জীবনে ঝগড়া, মারামারি, মান অভিমানে যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার কথা সেরকম গভীর বন্ধুত্ব হওয়ার মত সুযোগই তাদের হয়না। বন্ধু তৈরীর যে পথ, যে কৌশল: সেটা শেখারই কোন সুয‌োগ তারা পায় না। আর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন চাপ সামলাতে নেশাতে ডুবে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায়ও থাকে না।

নেশার যে দ্রব্যগুলো - সেগুলো কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারেই নেশা হয়। বুঝে শুনে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সেগুলো কিন্তু আনন্দের উৎস হতে পারে। কিন্তু এই সময়ে যেটা হচ্ছে ২৪ ঘন্টাই সেলফোনের প্রভাবে নেশাগ্রস্থ থাকছে একটা প্রজন্ম। আরেকজনের দিকে মাথা তুলে তাকানোর পর্যন্ত সময় নাই। খুব জরুরী দুই একটা কথার বাইরে যে কেমন আছেন, মুরগী ডিম পারছে কি না, কিংবা বাসায় মশার উপদ্রব – বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরীর শুরুতে জরুরী এই জাতীয় নির্দোষ আলাপচারিতা করার মত সময় বা দক্ষতা তাদের থাকেনা। বন্ধুদের সাথে খেতে বসে যদি সেদিকে মনযোগ না দিয়ে আরেকজনের সাথে ফোনে চ্যাট করতে থাকে কেউ – তাহলে সেটা অবশ্যই একটা নেশা, একটা সিরিয়াস সমস্যা। একটা অফিসিয়াল মিটিংএ যদি মনোযোগটা ফোনের মেসেজে বেশি থাকতে হয়, তাহলে সেটা সমস্যা। ঘুম থেকে উঠে পাশে শুয়ে থাকা প্রিয়জনের খবর নেয়ার আগে যদি ফোনের মেসেজ চেক করে কেউ – তাহলে সেটা নেশা – অবশ্যই একটা সমস্যা।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে যাদের আত্মসম্মানবোধ গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি; আরও দেখা যাচ্ছে চাপ সামলানোর টেকনিকগুলো শেখার সুযোগ আমরা তাদেরকে দেই নাই – নেশাগ্রস্থ হওয়াটা কোন টেকনিক হতে পারে না।

৫।
এবার আসা যাক তৃতীয় কারণে (যেটার সমস্যাটা হল অসহিষ্ণুতা) – তাৎক্ষনিকভাবে চাহিদা মিটে যাওয়ার অভ্যাস। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেউ কিছু কিনতে চাইলে আয়োজন করে টাকা পয়সা জোগাড় যন্ত্র, হাটের দিন কবে ইত্যাদি খোঁজ নিয়ে সময় করে বাজার/হাটে যেতে হয় না; অনলাইনে তখনি কিনে ফেলতে পারে, টাকা না থাকলে অসুবিধা নাই – কারণ এজন্য ক্রেডিট কার্ড আছে, পেমেন্ট অন ডেলিভারি আছে, ইনস্টলমেন্টের সুবিধা আছে; আর একদিনের মধ্যেই সাধারণত জিনিষটা বাসায় চলে আসে। কেউ সিনেমা দেখতে চাইলে ইউটিউব বা অন্য মিডিয়াতে সাথে সাথে দেখতে পারে, কিংবা পে-চ্যানেলে গিয়েও দেখতে পারে। সিনেমাটা কাছের সিনেমাহলে আছে কি নাই, শো-এর টাইমটেবল, টিকেট আছে কি না – এসব নিয়ে কোন ঝামেলাই নাই। একটা টিভি সিরিজ দেখার ইচ্ছা হলে সাথে সাথেই ইন্টারনেটে সেটা দেখে ফেলা যায়। পরের পর্বের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস অপেক্ষার ফলে সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সেটার কোন বিষয়ই আর নাই এখন। কেউ কেউ তো আবার এতই অধৈর্য যে, মাঝের পর্ব বাদ দিয়ে একেবারে সিজনের শেষ পর্ব দেখে ফেলে।

এমনকি, কাউকে প্রপোজ করাটাও এখন এঁরা শিখতে পারে না। কিভাবে হাত ঘষে ঢোক গিলে বোকা বোকা কথা শুরু করবে ডিজিটাল যুগে এধরণের সামাজিকতা শেখারও প্রয়‌োজন নাই। ডেটিং সাইটে গিয়ে শুধু ক্লিক করলেই সব ঠিক। এই যুগে যাই চাওয়া হয়, সাথে সাথে পাওয়া যায়, শুধুমাত্র যা পাওয়া যায়না সেটা হল – পেশাদারিত্ব আর গভীর সম্পর্ক। কারণ, এগুলোর জন্য কোন অ্যাপ নাই। এগুলোর অর্জন হয় ধীরগতির, আঁকাবাঁকা, বন্ধুর পথে – যা পেরোতে দরকার ধৈর্য আর একাগ্রতা। কিন্তু এই প্রজন্মের এই অর্জনগুলোর জন্য যে প্রশিক্ষণের দরকার ছিল তা হয়নি। কর্মস্থলে গিয়ে এরা হতাশ হয়, গভীর সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হয় / পিছিয়ে যায়: কারণ ধৈর্য ধরে সফলতার জন্য অপেক্ষা আর লেগে থাকা, তিল তিল করে সফলতার ভিত্তি গড়ে তোলা বা কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চর্চা - এ ধরণের কোন প্রশিক্ষণই বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এরা পায় না। ব্যাপারটা অনেকটা পর্বতের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে চূড়াতে যাওয়ার কামনার মত – এঁরা শুধু চূড়া দেখে আর সরাসরি সিরিয়ালের শেষ পর্ব দেখার মত স্টাইলে সেখানে যেতে চায়। কিন্তু বাস্তব তো এমন নয়: এর জন্য পাহাড় ডিঙানোর পরিশ্রম, ধৈর্য, পরিকল্পনা, দক্ষতা এইসব দরকারী বিষয়গুলোর কোন ধারণাই এদের মধ্যে থাকে না। ফলাফল আরো বেশি হতাশা, হীনমন্যতা।

এইসব কারণে হতে পারে যে সমাজে আত্মহত্যা, মাদকাসক্তির হার বেড়ে যাবে। ডিপ্রেশনের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার হার বেড়ে যাবে। মন্দের ভাল হিসেবে সবচেয়ে ভাল যেটা হতে পারে, তা হল: পুরা সমাজের একটা বড় অংশ রোবটের মত একঘেয়ে একটা জীবন পার করবে কিন্তু কখনই জীবনের আনন্দঘন দিকগুলো সেভাবে উপভোগ করতে পারবে না। কখনই তাদের মধ্যে জীবনবোধের গভীরতা কিংবা পরিপূর্ণতার অনুভূতি আসবে না।

৬।
শেষ বা চতূর্থ পয়েন্টটা হল পরিবেশ। কর্পোরেট কালচারেও সবকিছু স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে করা হয়। এঁরা যে নতুন কর্মী যোগ দিয়েছে তার কোন উন্নয়ন হল কি না সেটা মোটেও ভাবে না বরং নিজেদের স্বল্পমেয়াদী অর্জনের লক্ষ্য ঠিক আছে কি না সেটা নিয়েই চিন্তিত। এটা এমনই একটা পরিবেশ যেটা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে মোটেই সাহায্য করছে না। এই কর্পোরেট পরিবেশ তাদেরকে পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব স্থাপনের যে কৌশল তা শিখতে সাহায্য করছে না। অসহিষ্ণুতা থেকে বেরিয়ে আসতে যে প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং দরকার – ধৈর্যধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যস্থির করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার – সেটার কোন ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে না এই কর্পোরেট সংস্কৃতি। যে ধরণের অর্জনগুলো করতে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে এক লক্ষ্যে কাজ করতে হয় এবং সেটা অর্জনের পর যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, সেটা অনুভব করার কোন সুযোগই তাদেরকে এখানে দেয়া হয় না। এসব কারণে দিনকে দিন তারা আরও হতাশ হয়ে যায়, মনে করতে থাকে তাঁদের কোন যোগ্যতাই নাই।
বাব-মা’র ভুল, সমাজ-ব্যবস্থার ভুলের ফলে এই প্রজন্ম ক্রমেই আত্মকেন্দ্রীক, অসহিষ্ণু এবং অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে – অথচ তার দায় কেউ নিতে রাজি হয় না। … … … …

৭।
সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনের পরিপ্রেক্ষিতের সাথে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত হয়তো পুরাপুরি মিলবে না। কিন্তু কিছুটা শিক্ষনীয় চিন্তা-জাগানিয়া বিশ্লেষনী দৃষ্টিভঙ্গি যে সেখানে আছে - সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। এই যে আমাদের পোলাপানগুলোকে না চাইতেই গণহারে উচ্চতম জিপিএ দিয়ে পাশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে সেটার দীর্ঘমেয়াদে প্রায় একই রকম খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কথা। কারণ এতে যাঁরা সত্যিকারের পড়াশোনা করতো তাঁরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তেল আর ঘি’য়ের যখন একই মূল্যায়ন হবে তখন কেন কষ্ট করে ঘি উৎপাদন করবে কেউ? আর এই না চাইতেই পাওয়ার ফলে তাঁদের অবচেতন মনে এমন ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে এই ডিগ্রীগুলো ছেলের হাতের মোয়া, সহজলভ্য বস্তু - যা না চাইতেই পাওয়া যায়। এর জন্য পরিশ্রম, অধ্যবসায় এসবের কোন প্রয়োজন নাই। শুধু আসবো যাবো, ফূর্তি করবো, ফেসবুকিং করবো, চকচকে ক্যাম্পাসে ফ্যাশন করে ছবি তুলবো – কয়দিন পর প্রসেসের কারণে ডিগ্রী এমনিই পাওয়া যাবে।

জানি, উচ্চশিক্ষার কিছু জায়গায় এই চর্চাটাই চলছে। কিন্তু অবচেতন মনে হীনমন্যতা ঢুকে আত্মসম্মানবোধহীন যে প্রজন্ম আমরা তৈরী করছি তাতে করে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। কর্মক্ষেত্রে এঁদের বড় অংশ শুধু খাবি খাবে। কোত্থাও টিকতে পারবে কি না জানিনা, তবে হতাশা বাড়তেই থাকবে।

==
ইউটিউবে সাইমন ভাইয়ের ভিডিও লিংক

শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

ফ্রিকোনমিক্স, প্রণোদনা কেরামতি এবং দ্যা কোবরা ইফেক্ট

একটা বই কিছু অংশ পাঠ আর পডকাস্ট শুনে নতুন কিছু জানলাম, যা অন্যদের কাছে পুরাতন হতে পারে।‌
(কারন বইটির চলিশ লক্ষাধিক কপি বিক্রয় হয়েছে, ইদানিং বাংলা অনুবাদও বের হয়েছে শুনলাম)

গত ২১শে ফেব্রুয়ারী বউ-বাচ্চাকে নিয়ে শাহবাগ গিয়েছিলাম। তারপর সেখান থেকে পলাশী এস,এম,হল -- ওখানে একজন আত্মীয় থাকেন যিনি পলিটিকাল সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক। ওনার বাসায় একটা বই পড়া শুরু করে প্রায় ২৫ পাতা পড়েছিলাম। বইটির নাম ফ্রিকোনোমিক্স। এটি লিখেছেন দুইজন, যার একজন নামকরা ইকোনমিস্ট (Steven D. Levitt) -- মূল আইডিয়াগুলো তারই, কিন্তু লেখার সময় নাই ওনার, তাই অন্যজন (নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক Stephen J. Dubner) এটা লিখেছেন। ওনারা ধারণা করেছিলেন এটার ৮০ কপিও হয়তো বিক্রয় হবে না। কিন্তু বইটি ৪ মিলিয়ন কপির বেশি বিক্রয় হয়েছে। ওনাদের ওয়েবসাইটে (www.freakonomics.com) একজায়গায় কোবরা ইফেক্ট নামক প্রণোদনা সংক্রান্ত একটা পডকাস্ট শুনে ভাবলাম এটা বাংলায় লিখে রাখার মত একটা ব্যাপার -- ওনার বইয়েও এই বিষয়টার উপরে বেশ ভালো আলোচনা আছে যা পড়ে শেষ করতে পারিনি তখন।

কোন একটা বিষয়ে লক্ষ্য পূরণের জন্য সরকার বা কোন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম প্রণোদনা বা incentiveএর ব্যবস্থা করা হয়। লেখকের ভাষায় সেই প্রণোদনা ধনাত্নক বা ঋণাত্নক (=পুরস্কার বা জরিমানা) হতে পারে; অর্থনৈতীক, সামাজিক বা অন্য ধরণের হতে পারে। কিন্তু সেই প্রণোদনা সবসময় কাজ করে না, বরং এটাতে সম্পুর্ন উল্টা ফলাফল বা হিতে বিপরীত হয়। এইরকম হিতে বিপরীত হওয়ার অনেকগুলো ধরণ আছে - যার একটি হল কোবরা ইফেক্ট, (অর্থাৎ সমাধানের বদলে সমস্যা বাড়ানোর ঘটনা)।

প্রণোদনা ভাল কিছু লাভের আশায় চালু করা হলেও এটা বরং বিভিন্নভাবে দূর্নীতি বাড়াতে পারে। ছোট কর্পোরেটের ম্যানেজার বসে বসে অধীনস্থ কর্মকর্তার রেকর্ডে কারচুপী করতে পারে যাতে তার পারফর্মেন্স সকলের চেয়ে ভাল দেখায় সেজন্য। পরের ক্লাসে উত্তির্ন হওয়াটি লেখাপড়া করার প্রণোদনা - এর জন্য ছাত্র পাশের জনেরটা দেখে লেখে হয়তো। স্কুলের শিক্ষক স্কুলের খারাপ ফলাফলের ফলশ্রুতিতে অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে দূর্নীতি করে -- আমেরিকায় এরকম কেন্দ্রীয় পরীক্ষার সময়ে ক্লাসের বোর্ডে উত্তর লিখে দিয়ে চাকুরী খুইয়েছেন এক শিক্ষক। ইচ্ছা করলে শিক্ষক উত্তর দেয়ার জন্য ছাত্রদেরকে বরাদ্দকৃত সময়ের চেয়ে বেশি সময় দিতে পারে - যা প্রণোদনাঘটিত দূর্নীতি। আগে থেকে প্রশ্নের ধরণ জানা থাকলে শুধু সেই উত্তরগুলোর জন্য ছাত্রদেরকে প্রস্তুতি নেয়াতে পারেন -- এটাতে আইন ভঙ্গ না হলেও শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। সবচেয়ে সুক্ষ্ণভাবে দূর্নীতি করতে পারেন মাল্টিপল চয়েসের খাতা জমা নেয়ার পরপরই খাতা শিক্ষাবোর্ডে পাঠানোর আগে কিছু ছাত্রের কিছু উত্তর সব মুছে ঠিক করে দেয়া - এতে ঐ স্কুলের ছাত্রদের রেজাল্ট ভাল হওয়াতে অনুদান বজায় থাকবে। এটা নিয়ে বিরাট একটা বিশ্লেষণ আছে ঐ বইয়ে। এই ধরণের উত্তরের দূর্নীতি ধরার জন্য একটা এ্যলগরিদমও বানিয়ে সেটা দিয়ে বিভিন্ন স্কুলের খাতার রেকর্ড চেক করে দূর্নীতি চিহ্নিত করার পদ্ধতি বের করেছিলেন মূল লেখক।

এবার ইসরাইলের ডে-কেয়ার সেন্টারটির ঘটনাটা বলি। কর্তৃপক্ষ লক্ষ্য করেছিলো যে প্রতিদিনই কেউ না কেউ নির্দিষ্ট সময়ের পর বাচ্চা নিতে আসেন। ফলে ওখানকার কাউকে না কাউকে অতিরিক্ত সময়ে বাচ্চা আগলে বসে থাকতে হয়। একজন ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টের পরামর্শে ওরা প্রতিবার লেট-পিকাপের জন্য ৩ ডলার করে জরিমানা ধার্য্য করলো। অবশ্য জরিমানা চালু করার আগে তিন সপ্তাহ যাবত জরিমানা করা হবে এমন নোটিশ দিয়ে রেখেছিলো। ফলশ্রুতিতে কী হলো? লেট পিকাপের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে গেল। মাত্র ৩ ডলারের জন্য টেনিস খেলার মাঝ থেকে উঠে আসার মানেই হয় না, আর এজন্য তো জরিমানা দিচ্ছিই --- তাই অপরাধবোধও নাই। ফলে ৮ সপ্তাহ পরে এই জরিমানা প্রথা বন্ধ করে দিয়েছিলো কর্তৃপক্ষ। কিন্তু লেট পিক-আপের সংখ্যা বাড়ার পর আর কমেনি। জরিমানাটা যদি সেইরকম উচ্চমাত্রায় হত তাহলে হয়তো এরকম কিছু ঘটতো না।

কলম্বিয়ার বোগোটাতে সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার প্রফেসর বিকাশ মেহত্রা। উনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ওনাকে হোটেল থেকে সেমিনারস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওখানকার ইউনিভার্সিটির যে বন্ধু ওনাকে গাড়ি দিয়ে নিয়ে যায়, প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন গাড়ি দিয়ে নিয়ে যান। অনুসন্ধানে জানা গেল যে এর কারণ হল বোগোটা শহরে যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য লাইসেন্স প্লেট রেশনিং পদ্ধতি। এ রকম যানজট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মেক্সিকো সিটি এবং চীনের কিছু শহরেও আছে। বোগোটার নিয়ম ছিল অনেকটা এমন: শুক্রবারে ১,২,৩,৪ দিয়ে শেষ হওয়া লাইসেন্সপ্লেট ওয়ালা গাড়ি বের হতে পারবে; ৫, ৬, ৭, ৮ দিয়ে শেষ হলে সেটা সোমবার বের করা যাবে .... .... ইত্যাদি। এই নিয়মের মধ্য থেকে চলার জন্য প্রায় সকলেই দ্বিতীয় গাড়ি কিনেছে। ভূয়া লাইসেন্স প্লেট দিয়েও চালানো যায়, এরকম ভুয়া লাইসেন্স প্লেট ক্রয়বিক্রয়ের ব্ল্যাক মার্কেটও আছে -- তবে ধরা পড়লে খুব কড়া শাস্তি। তাই নিয়ম বা আইন না ভেঙ্গেও রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলাচলের এই উপায়। এতে অবশ্য দূষণের ক্ষেত্রে কিছুটা উপকার হয়েছে, কারণ আগের গাড়িগুলো পুরাতন মডেলের ছিলো - তাই অন্তত অর্ধেক সময়ে উন্নত গাড়ি চলাতে কিছুটা বায়ুদূষণ কমেছে (মেক্সিকো সিটির বায়ুদূষণের তথ্য নিয়ে গবেষণাপত্রও আছে)। তবে এই নিয়মের মূল যেই উদ্দেশ্য ছিল যানজট কমানো --- সেটা কিন্তু বেড়েছে।

যা হোক, এবার কোবরা ইফেক্টের কথায় আসি। নামটা এসেছিলো দিল্লীতে ব্রিটিশ আমলে কোবরা সাপ নিয়ন্ত্রণের প্রণোদনা প্যাকেজ এমন ব্যাকফায়ার করার ঘটনা থেকে। আর এই কোবরা ইফেক্ট নামটা জনপ্রিয় করেছেন জার্মান অর্থনীতিবিদ হোর্স্ট সিবার্ট (Horst Siebert)। উপরের ঘটনাগুলোতে ঋণাত্নক প্রণোদনা তথা জরিমানা কিভাবে দূর্নীতি করে সেটা দেখেছি। কোবরা ইফেক্ট হল পুরস্কার বা প্রণোদনার ঘটনায় দূর্নীতি সংক্রান্ত বিষয়:
ব্রিটিশ শাসিত দিল্লীর শাসকের মনে হয়েছিলো এখানে কোবরা সাপের সংখ্যা বিপদজনকভাবে বেড়ে গেছে, এটা কমাতে হবে। তাই উনি কোবরা মারার পেছনে পুরস্কার (bounty) ঘোষনা করেছিলেন। উনি আশা করেছিলেন যে এতে যেখানে সেখানে বিষধর কোবরা সাপের সমস্যা কমে যাবে। কিন্তু দিল্লীর কিছু লোক এটার প্রতিক্রিয়ায় বরং কোবরা খামার করা শুরু করে -- অর্থাৎ সাপের ফার্ম দিয়েছিল। হঠাৎ করেই এজন্য প্রশাসন অনেক বেশি কোবরা সাপের চামড়া জমা পেতে শুরু করলো -- এতে বুঝতে পারলো যে এই পদ্ধতিটাকে যতটা স্মার্ট ভাবা হয়েছিলো সেটা তা নয়, ফলে এই পুরস্কারের ঘোষনা বাতিল করে দিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কোবরা চাষীদের হাতে অনেকগুলো কোবরা সাপ জমে গিয়েছিলো, পুরস্কার বাতিল করাতে তারা সেগুলো বিক্রয় করতে পারলো না ফলে সেগুলোকে ছেড়ে দিল। এর ফলে দিল্লীতে কোবরা সাপের সংখ্যা মারাত্নকভাবে বেড়ে গিয়েছিলো তখন।

একই রকম ঘটনা আছে ইঁদুর নিয়ে। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়কে আধুনিক শহর হিসেবে এবং ফরাসী সভ্যতার নিদর্শন তথা এশিয়ার সেরা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলো ফ্রেঞ্চ প্রশাসক গণ। ফ্রান্সের আধুনিক শহরের চওড়া রাস্তা এবং চমৎকার অট্টালিকা ছাড়াও একটা মূল অংশ হল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বা সুয়ারেজ নেটওয়র্ক। এই সুয়ারেজ নেটওয়র্কের একটা অনাকাঙ্খিত ফলাফল ছিল - এগুলো ইঁদুরের জন্য চমৎকার বাসস্থান হিসেবে কাজ করে। তাই এই পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরী হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে কমোডের ভেতর দিয়ে ইঁদুর বের হয়ে আসার খবর আসছিলো। এমনকি সেটা ফরাসী জনগণের বসবাস করা অভিজাত এলাকাতেও ঘটছিলো। প্লেগ রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে এটা একটা বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ালো। এ্যাতদিন পর্যন্ত প্লেগ শুধু ভিয়েতনামীদের সমস্যা মনে করা হলেও ফরাসী এবং অন্য ইউরোপীয় আবাসিক এলাকাতেও ইঁদুর এই রোগ ছড়াতে শুরু করেছিলো। এতে ফরাসী প্রশাসন বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং পয়ঃনিষ্কাশন লাইনে নেমে ইঁদুর মারার জন্য ভিয়েতনামী লোকবল নিয়োগ করেছিলো। ১৯০২ সালের গ্রীষ্ম ও বসন্তে যখন এই ঘটনা ঘটেছিলো তখন প্রথম সপ্তাহে শয়ে শয়ে ইঁদুর নিধন ঘটেছিলো। রেকর্ড ঘেটে দেখা যায়, মাসখানেক পরে ১৯শে মে'র একদিনেই মারা হয়েছিলো ৭,৪৪২টি ইঁদুর। ১২ই জুন ১৯০২ সালে সম্ভবত সর্বোচ্চ সংখ্যক ইঁদুর মারা পড়েছিলো: ২০,১১৪টি। এরকম প্রতিদিনই ৬হাজার, ৭ হাজার, ১১ হাজার, ১৫ হাজার করে ইঁদুর মারা হচ্ছিলো। কাজেই রেকর্ড দেখে সেই সময়ে ইঁদুরের অসীম সরবরাহ ছিল বলে মনে হচ্ছে। এতেও কোন লাভ হচ্ছিলো না। তাই এই কয়েকজন ইঁদুর শিকারী ছাড়াও আরও লোক দরকার হয়ে পড়ছিলো। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কারো মাথা থেকে বের হল যে এই ইঁদুর মারা ভিয়েতনামীদের নাগরিক দায়িত্ব এবং এরপর ইঁদুর মারার জন্য পুরস্কার (bounty) ঘোষনা করা হল। পুরস্কারের টাকা নেয়ার জন্য প্রমাণস্বরূপ জনগণকে মৃত ইঁদুরের লেজ নিয়ে এসে জমা দিতে হবে। সিটি হলে হাজার হাজার লেজ জমা পড়তে থাকলো আর ফ্রেঞ্চ প্রশাসনও ভাবলো এবার ইঁদুর ভালই সাইজ হচ্ছে। কিন্তু কয়েকমাস পর একজন ফরাসী স্বাস্থ্য অফিসার হ্যানয়ের উপকন্ঠে একটা পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে অনেক দুইনম্বরি কাজ কারবারের মধ্যে ইঁদুরের খামারও খুঁজে পেয়েছিলো। সেখানে ইঁদুর লালন করে মেরে লেজ নিয়ে শহরের ভেতরে সিটি হলে জমা দিয়ে পুরস্কারের টাকা নিয়ে যাচ্ছিলো কিছু লোক!

এরকম ঘটনা আরও আছে --- এমনকি ঘটেছে এই সাম্প্রতিক সময়েও। ফোর্ট বেনিন শহরের কাহিনীটা দেখুন তাহলে। ফোর্ট বেনিন হল দক্ষিন পশ্চিম জর্জিয়ার একটা ক্যান্টনমেন্ট বা আর্মি বেস কেন্দ্রিক শহর। আটলান্টা শহরের দ্বিগুনেরও বড় আকারের এই শহরে এক লাখ কুড়ি হাজার লোক থাকে এবং এই শহরটাতেও অন্য শহরের মত স্কুল, রেস্টুরেন্ট, গ্যাস স্টেশন, আবাসিক এলাকা ইত্যাদি সবই আছে। জঙ্গল, রাস্তা, খাল - সবকিছু এ্যাত ছিমছাম যে মনেই হয় না যে এটা একটা আর্মি বেস কেন্দ্রিক শহর -- শুধু মাঝে মাঝে দুরে কোথাও কামানের শব্দ ছাড়া। দক্ষিন আমেরিকার অনেক এলাকার মত এখানেও অসংখ্য বন্য শুকর ছাড়া অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। বন্যশুকর ঘুরে বেড়ালে সেটা বিরাট ঝামেলা করে। এরা মাটি খুড়ে খাবার খোঁজে। কয়েকটা শুকর হইলেই একটা এলাকার অবস্থা খারাপ করে দিতে পারে। আর এই শহরে সেই তান্ডবের শিকার হওয়ার তালিকায় সুন্দর লন, বাগান ছাড়াও দামী দামী সেনাবাহিনীর যন্ত্রপাতিও আছে। কিছু লোক শখ বশত মাঝে মাঝেই শুকর শিকার করে খেলেও সেটাতে এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছিলো না। ২০০৭ সালের গ্রীষ্মে এদের অত্যাচার এমন মাত্রায় পৌঁছেছিলো যে শুকর শিকারে পুরস্কার ঘোষনা করেছিলো প্রশাসন। শিকার করে পুরস্কার দাবী করলে একটা ফর্মে কখন, কোথায়, কিভাবে শিকার করেছে সেটা উল্লেখ করে শুকরের লেজ জমা দিতে হত। প্রতি লেজে ৪০ ডলার, যা শিকারের বুলেটের খরচ, তেলের খরচ ইত্যাদি সবই পুষিয়ে দেয়! এটা ছাড়াও শুকর নিয়ন্ত্রণের জন্য এখানকার ইউনিভার্সিটিতে একটা গবেষণাও চলছিলো। সেই গবেষণাদলের কাজ ছিল শুকরগুলো কোথায় কোথায় চলাচল করে ট্র্যাকিং করে সেটার জিপিএস ডেটা সংরক্ষণ করা আর সেগুলোকে মেরে এনে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা। তো যখন এই শুকর শিকারের প্রণোদনা চালু হল তখন এটা কতটা কার্যকরী হচ্ছে সেটার মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিলো গবেষকদের। এটার শুরুতে ওদের হিসাব ছিল যে শহরের মধ্যে প্রায় হাজারখানেক বন্যশুকর আছে। দেড় বছরে শিকারীরা প্রায় দেড় হাজার শুকর শিকার করেছিলো - যার অর্থ দাঁড়ায় শুকরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রনের মধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু গবেষক দল যখন আবার শুকরশুমারী করলো তখন বরং দেখা গেল শুকরের সংখ্যা বেড়ে আগের দ্বিগুন!! শিকারীদের দেয়া ডেটা শিটে কখন, কিভাবে এবং কোথায় শিকার করেছিলো সেই ডেটা বিশ্লেষন করে দেখা গেল এমন এমন জায়গায় এ্যাতগুলো শুকরের কথা বলেছে যেখানে অতগুলো শুকরের যাওয়ার কোন পূর্বরেকর্ডই নাই। ওখানে মাংস প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি থেকেও লোকজন ৫-১০ ডলারে বাচ্চা শুকর কিনে সেটা মেরে লেজ কেটে জমা দিয়েছে (=৪০ ডলার + শুকরের মাংসতো থাকলোই) এমন ঘটনা জানা যায়। এরকম দশটা জমা দিতে পারলেই তো সাড়ে তিনশো ডলারের বেশি ইনকাম!! প্রশ্ন হল মাংসের দোকান থেকে আর কিছু শিকারের শুকর থেকে লেজ জমা দিলেও এদের সংখ্যা এ্যাত বাড়লো কিভাবে? অনুসন্ধানে জানা যায় যে, শুয়োরগুলোকে শিকারের জন্য ঝোপের ভেতর থেকে খোলা জায়গায় আনার জন্য টোপ হিসেবে উচ্ছিষ্ট খাবার দাবার ব্যবহার করা হত। এই টোপের হাজার হাজার টন খাবার খেয়ে শুকরের বংশবৃদ্ধির হার বেড়ে গিয়েছিলো।

শুধুমাত্র পশু বা পোকামাকড় মারতেই যে কোবরা ইফেক্ট হয় তা-ই না। কিছুদিন আগে গ্লোবার ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশ কিছু গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে ঐক্যমত হয়েছিলো। বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্রীনহাউজ গ্যাসের নিঃসরন কমাতে পারলে সেই কারখানার জন্য পুরস্কার স্বরূপ বেশ ভাল ভর্তূকীর ব্যবস্থা ছিল জাতিসংঘের তহবিল (কার্বন ফান্ড) থেকে। সাধারণ কুল্যান্ট থেকে বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে নিঃসরিত HFC23 গ্যাসের জন্য ভর্তূকীর পরিমান সবচেয়ে বেশি ছিল। ফলাফল হল, বিভিন্ন কারখানায় এই শীতলকারক (coolant) এর উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে লাগলো, কারণ এতে বেশি পরিমাণ বাইপ্রোডাক্ট গ্যাস উৎপন্ন হবে যা ধ্বংস করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ভর্তূকি (কার্বন ফান্ড) নেয়া যায়। সমস্যার আরেকটা বিপদজনক দিক হল যে এই শীতলকারকটি নিজেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।

বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের জন্য করা আইনও একইভাবে উল্টা ফলাফল দিতে পারে। একটা প্রাণীকে বিলুপ্তপ্রায় করার আগে কয়েকবছর ধরে সেই প্রাণী কতবার দেখা গিয়েছে সেটার পরিসংখ্যান নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলে। তারপর হয়তো সেটার আবাসস্থলকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই পরিসংখ্যান নিয়ে তর্ক বিতর্কের সময়েই কেউ হয়তো সেই জঙ্গলটি এর পর নিষিদ্ধ হতে পারে ভেবে সেখান থেকে সম্পদ আহরণ বাড়িয়ে দিয়ে সেই প্রাণীটাকে আরও বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেয়।

ড. লেভিটের মতে তাই কোন ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজই সম্পুর্ন তস্কররোধী নয়। যারা আইন বা প্রণোদনা প্যাকেজ বানায়, তাদের চেয়ে চালাক ব্যাক্তি থাকতেই পারে, যারা এই প্রণোদনা ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়ে মূল উদ্দেশ্য ব্যহত করতে পারে।

তথ্যসূত্র:
বই: Freakonomics: A Rogue Economist Explores the Hidden Side of Everything, Published: April 12, 2005, Authors: Steven D. Levitt, Stephen J. Dubner
পডকাস্ট: http://www.freakonomics.com/2012/10/11/the-cobra-effect-a-new-freakonomics-radio-podcast/
উইকি: http://enwikipedia.org/wiki/Cobra_effect

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১১

এ্যাত লাফালাফি, চিল্লাপাল্লা করি কিল্ল্যাইগ্গা?

যাঁরা জানেন না, তাঁদের অনেকেরই মনে চিন্তা খেলা করে, এই লোকগুলো নিজেরা লিনাক্স ব্যবহার করে ভাল কথা, কিন্তু আমাদের পিছে লাগছে ক্যান? এঁদের স্বার্থ কী? এদের কি মহাপুরুষ রোগে ধরছে? কাউরে ইমপ্রেস করতে চায়? নাকি কেউ কি এঁদের টাকা দেয়?: দেয় মনে হয়, অবশ্যই দেয় …. নাইলে কার ঠেকা পড়ছে পকেটের টাকা খরচ করে সিডি বানায় দিবে, সময় খরচ করে আমাদের পেছনে ঘুরবে, ইনস্টল করে দিয়ে যাবে, সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করবে। আমি আমার মত ভাল আছি, ভাইরাস মারতেছি, রিইনস্টল করছি, এন্টিভাইরাস কিনতেছি … প্রতিনিয়ত এই প্রতিকূল পরিবেশেও আমাকে কত কিছু শিখতে হচ্ছে, লিনাক্সে গেলেও তো শিখতে হবে। … কী?! তোমরা টাকা পাও না কারো কাছ থেকে! তাহলে কি শুধুই দলে ভারী হইতে চাও জন্য এ্যাত কিছু কর? … আচ্ছা ভাল কথা, আমারে বাদ দিয়ে হিসাব কর। … যাও মিয়া ভাগো, আমি চোরাই উইন্ডোজ ব্যবহার করি আমার রিস্কে, তোমার তাতে কী!

জ্বী ভাই, আমার তাতে এসে যায়। আপনি জেনুইন সফটওয়্যার ব্যবহার করলে আমি কখনই আপনাকে লিনাক্স নিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে যাব না, যদি ইতিমধ্যেই গিয়ে থাকি তবে সেটা ভুল হয়েছে, কিন্তু আপনি চোরাই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে তাতে আমার সমস্যা হয়। কীভাবে জানতে চান নাকি?

সম্মান হারাতে চায় না কেউ। বড়লোকের হারানোর মত অনেক কিছু থাকতে পারে, কিন্তু গরীবের সম্মান ছাড়া আর আছে কী? (এই রে! বাংলা ছিঃনেমার ডায়লগ দিয়ে ফেললাম মনে লয় ...) বংশের সম্মান, ব্যক্তির সম্মান ইত্যাদিকে ঘিরে কত ঘটনাই না আবর্তিত হয় চারিদিকে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা আজও দেখছি অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে অপমানিত আত্মসম্মানী মানুষ। আবার পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে বিপথগামী সদস্য বা সদস্যাকে হত্যা করে অনেক জায়গায়: এটাকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনার কিলিং বলে একটা শব্দ আছে ইংরেজিতে।

আপনি চোরাই উইন্ডোজ ব্যবহার করলে আমার সম্মান হারাই আমি। জ্বী, ঠিকই শুনেছেন ….. আপনি চোরাই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে শুধু আপনি না সাথে আমিও সম্মান হারাই। আর হারানো সম্মান ফিরানোর জন্যই আমরা নিজেদের পকেটের টাকা আর মূল্যবান সময় খরচ করি, কিন্তু কোনো রকম আত্মহত্যা বা খুনাখুনি করি না (দেখেছেন, আমি কত্ত ভালো!)।

বাংলাদেশ খারাপ মানুষের দেশ, দূর্নীতিতে আগে টানা চ্যাম্পিয়ন ছিল, আর বর্তমানে এটা পৃথিবীতে সফটওয়্যার পাইরেসী তথা চুরীতে ৩য়। এর আগে ২য় পজিশনে ছিল, ইট্টুর লাইগা ফাস্ট হইতে পারে নাই …. আফসুস! এই ব্যাপারটা আপনি উপভোগ করেন কি না আমি জানিনা, তবে আমার কাছে এদেশের নাগরিক হিসেবে অসম্মানজনক মনে হয়।

নিজে জেনুইন সফটওয়্যার ব্যবহার করেও যদি আপনাদের চোরাই সফটওয়্যারের কারণে আমাকে নাগরিক হিসেবে এই অপমানের ভাগ নিতে হয়, আমার দেশমাতাকে অপমানিত হতে হয় তাতে আমি ক্ষিপ্ত হই। কিন্তু ঐ যে বললাম, সম্মান রক্ষার্থে এখনও খুনাখুনি করি না, তাই লিনাক্স প্রচার করি। আমি টাকা দিয়ে আপনাকে জেনুইন সফটওয়্যার কিনে দিতে পারবো না (দিতে পারলেও সেটা নিতে কি আপনার নিজেকে ছোট মনে হত না?!) - তাই লিনাক্স ব্যবহার করতে বলি। কারণ, বিনামূল্যে জেনুইন সফটওয়্যার ব্যবহার করার এটাই এখন পর্যন্ত জানা একমাত্র রাস্তা। আর এটা কারো দান নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই ফ্রী সফটওয়্যারের আন্দোলন। এতে আমি সহ সমস্ত ব্যবহারকারীর বিভিন্নভাবে কন্ট্রিবিউট করি - কীভাবে জানতে চান? আজকে থাক, তবে চিন্তা (=দুশ্চিন্তা) কইরেন না, সেই কন্ট্রিবিউশন নিয়ে শীঘ্রই আরেকটা ত্যানা প্যাচানি লেখা নামাবো।

ভাইরাস মাইরাস, সিকিউরিটির সমস্যা অথবা উত্তেজনা - সেটা আপনার ব্যাপার, এগুলো আপনি এনজয় করলে আমার তাতে কী! বরং এইসব নিয়া আপনাদের পেরেশানী দেখলে আমিও আমোদিত হই, কারণ, আসলে আমিও খারাপ লুক, আর এই পেরেশানীর দলে আমিও ছিলাম এককালে। তারপরেও লিনাক্স নিয়া চিল্লাপাল্লা করার ইয়্যাকমাত্র কারণ - আমি আমার সম্মান বাঁচাতে চাই।

কখনো যদি এই দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করি তারপরেও এই দেশটাই আমার মা (টিপিকাল বাঙালীর মত, একটু বেশি আবেগ হইয়ে গেল মনে লয়) – এর গায়ে অপমানের থুথু আমৃত্যূ আমার গায়েও এসে পড়ে।

সোমবার, ৯ মে, ২০১১

জরিপ: বাংলাদেশে কয়জন লিনাক্স ব্যবহার করেন?

উবুন্টু বাংলাদেশ মেইলিং লিস্টে জনৈক মেহদী ভাই হঠাৎ জানতে চাইলেন - আসলে বাংলাদেশে কতজন লিনাক্স ব্যবহার করে। কেউ বলে শ, কেউ কয় হাজার। তখন মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো, জরিপ করা হউক। এই জরিপে আপনি বা আপনার পরিচিত লিনাক্স ব্যবহারকারীর হয়ে ফর্ম পূরণ করে দিতে পারেন।

কয়েকজনে মিলে গুগল ডকসে একটা জরিপ স্প্রেডশীট বানালাম। ডেটা এন্ট্রি করতে হবে ফর্ম ফিলাপ করে - অপশনাল মন্তব্যের ঘরে কেউ যদি কাহিনী না লিখেন তাহলে এটাতে ২ থেকে ৫ মিনিট লাগতে পারে। সকলের জন্য ফোন নং বা ইমেইলের মত তথ্যগুলো উন্মুক্ত করা ঠিক নয়, তাই এই ডেটা শুধুমাত্র আমি বা শিপলু দেখতে পারি। কিন্তু মানুষের তথ্যতে অধিকার আছে। তাই ইমেইল, ঠিকানা ও ফোন নং-এর মত তথ্যগুলো লুকিয়ে রেখে বাকীগুলো নিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা (!) প্রকাশ করে রেখেছি। প্রতিদিন এটাকে আমি একবার করে সর্ট করে রাখবো যাতে জেলা অনুযায়ী কয়জন সেটা সহজে বোঝা যায়।

প্রবাসীগণ এই ফর্ম পূরণের সময়ে জেলার স্থলে সর্বনিম্নে "প্রবাসী" এন্ট্রি ব্যবহার করতে পারেন।

নিচে ফর্মটা এমবেড করে দিলাম। যদি কোন কারণে এটা দেখতে না পারেন তবে সরাসরি এই লিংক থেকে ফর্ম ফিলাপ করতে পারেন। অন্যকে বলার জন্য সহজ লিঙ্ক হল http://bit.ly/lubd11 (lubd11 = Linux Users Bangladesh 2011)। আর কথা না বাড়াই, ধন্যবাদ।
.

বৃহস্পতিবার, ৫ মে, ২০১১

PTC হল প্রতারককে সাহায্য করা – ভুল বললে শুধরিয়ে দিন

কিছু বাংলা ব্লগসাইটে PTC বা Pay to Click নিয়ে পোস্টের ছড়াছড়ি দেখে খারাপ লাগে। পিটিসি টাকা ইনকামের কোন সম্মানজনক পদ্ধতি বলে মনে হয় না কখনই। এটা সংঘবদ্ধ প্রতারককে সহযোগীতা করার একটা পদ্ধতি ছাড়া কিছুই না।

কিছুদিন আগে আমাদের দেশে বেশ কিছু কাজ আসতো, ছবি দেখে ওখানে যা লেখা আছে তা টাইপ করার কাজ। ছবির লেখাগুলো খুব সাধারণ আর দৈর্ঘ্যও খুব বেশি না - একটা কি দুইটা শব্দ। পাবলিক তো ভাবলো, আহ্ কি সহজ কাজ -- টাকাও কামাইলো। কিন্তু ফলাফল হল বাংলাদেশের অনেক আইএসপি এখন ব্ল্যাক লিস্টেড এই কারণে। কারণটা কী? জানতে চান?

কারণ - এগুলো ছিল ক্যাপচা পূরণের কাজ। বিভিন্ন সাইটে রেজিস্ট্রেশন বা পোস্ট করার জন্য স্প্যাম ঠেকানোর জন্য ক্যাপচা দেয়া হয়। উদ্দেশ্য হল অটোমেটিক কোন স্ক্রিপ্ট দিয়ে এখানে তাহলে স্প্যামারটা কিছু পোস্ট করতে পারবে না - কারণ অটোমেটিক স্ক্রিপ্ট এই ক্যাপচা পূরণ করতে অক্ষম। দুষ্টু স্প্যামাররা তখন সেই কাজ করার জন্য এই কাজ আউটসোর্সিং করলো। ওদের স্ক্রিপ্ট একটা করে ক্যাপচা নিয়ে আসে আর এখানকার লোক টাকার জন্য সেটা পূরণ করা মাত্র ওদের স্ক্রিপ্ট ওখানে একটা স্প্যাম পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু দোষ হয় এখানকার আইপি'র। কারণ ওখানকার এডমিনরা দেখে যে, এখানকার আইপি থেকে এই ক্যাপচা পূরণ করে স্প্যাম পোস্ট করা হয়েছে।

এবার আসি পিটিসির ব্যাপারে। অ্যাডসেন্স কিভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে হবে এজন্য। ইন্টারনেটে কোনো কম্পানি বিজ্ঞাপন দিলে সেটার জন্য পেমেন্ট দেয়ার সিস্টেমটা বেশ সুন্দর। তবে সেটা বলার আগে ইন্টারনেটের বদলে বাইরের বিজ্ঞাপনের কথা বলি .... ... একটা বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দিলে সেটার ভাড়া স্থানভেদে ভিন্ন হয়। ঢাকার ফার্মগেটের মত জায়গায় যেখানে প্রচুর লোক এই বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে বড়সড় একটা বিলবোর্ডের ভাড়া মাসে লাখটাকার মত, আর একই বিলবোর্ড মিরপুর বা অন্য জায়গায় হলে সেটার ভাড়া ত্রিশহাজার টাকার মত। ভাড়ার এই তারতম্যের কারণ হল এই বিলবোর্ড কতজন সম্ভাব্য কাস্টমারের কাছে পণ্যটার কথা পৌঁছে দিচ্ছে সেটা। বেশি কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দিলে চার্জ বেশি, আর কম কাস্টমারে চার্জ কম। একই কারণে বেশি প্রচারসংখ্যার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের চার্জ বেশি (বেশি লোকের কাছে পণ্যের বিজ্ঞাপন পৌঁছাচ্ছে)। প্রথম আলোর মত পত্রিকার প্রথম পাতায় একবার (১ দিন) ৩*৫ বর্গইঞ্চি বিজ্ঞাপনের চার্জ লাখটাকা, কিন্তু একই বিজ্ঞাপন ৭ নম্বর পাতায় দিলে সেটার চার্জ ২০ হাজার -- কারণটা একই ... প্রথম বা শেষ পাতার বিজ্ঞাপন বেশি লোক দেখে, ভেতরের পাতার বিজ্ঞাপন দেখে কম মানুষ।

ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এই বিজ্ঞাপনের রেট আরো বেশি যুক্তিসংগত করা গেছে। শুধুমাত্র সম্ভাব্য কতজন ক্রেতা সেই বিজ্ঞাপন দেখছে সেটার উপর ভিত্তি করে এখানেও ভাড়া বা মূল্য পরিশোধ করা হয়। একটা বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে এটা সম্পর্কে আরেকটু ডিটেইলস খোঁজ খবর নেবে শুধুমাত্র আগ্রহী ক্রেতা, অন্যরা এই ব্যাপারে আগ্রহী না হলে এটাতে ক্লিক করার মত কাজ করে সময় নষ্ট করবে না। যেমন: আমি যখন ক্যামেরা কেনার কথা চিন্তা করি তখনই শুধু বিভিন্ন ক্যামেরার বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে স্পেসিফিকেশন দেখবো, কেনার চিন্তাভাবনা না থাকলে শুধু শুধু ক্লিক করে সময় ও ব্যান্ডউইড্থ নষ্ট করবো না। আবার, কখনো দেখা যায় ভুল ক্রমে কেউ একটা বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে ফেলেছে - তখন দ্রুত সে ঐ সাইট থেকে বেরিয়ে যায়, বিজ্ঞাপনে কী লেখা আছে সেটা পড়ার দরকার বোধ করে না।

তাই ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দাতাগণ এখানে বিজ্ঞাপনে কতগুলো ক্লিক হয়েছে সেটার উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন প্রকাশের সাইটকে মূল্য পরিশোধ করে। তবে আগ্রহী ক্রেতা তারাই যারা অন্তত ৩০ সেকেন্ড ঐ বিজ্ঞাপনটা দেখেন, এর চেয়ে কম দেখলে তিনি আসলে আগ্রহী ক্রেতা নন, ভুলক্রমে ঐ সাইটে ক্লিক করে ঢুকেছিলেন বলে ধরা হচ্ছে।

এইখানেই পিটিসি সাইটগুলো চিট করে। আপনি ক্লিক করে ঢুকছেন, ৩০ সেকেন্ড থাকছেন --- কাজেই আপনি সম্ভাব্য ক্রেতা। এই ক্লিকের জন্য বিজ্ঞাপনদাতা সাইটকে পে করবে। আর সাইটওয়ালা আসলে অসৎ ... ... কারণ তার সাইটে আসলে জেনুইন ক্রেতা ক্লিক করে নাই, করেছে ভাড়া করা ক্রেতার অভিনেতা (আপনি)। তাই তার ইনকাম থেকে কিছু অংশ আপনার অভিনয়ের চার্জ হিসেবে দিয়ে দিচ্ছে।

একই কারণে একই বিজ্ঞাপনে একাধিকবার ক্লিক করা নিষেধ। কারণ সেখানে মূল বিজ্ঞাপনদাতার একজন সম্ভাব্য ক্রেতার জন্য একবারই মূল্য পরিশোধের কথা। আপনি একাধিকবার ক্লিক করলে সেটার জন্য সাইটওয়ালা চার্জ করবে এতে সাইটওয়ালাকে বিজ্ঞাপনদাতা এর জন্য টাকা তো দেবেই না উল্টা মিথ্যাবাদী বলবে আর ভবিষ্যতে বিজ্ঞাপনও দেবে না। তাই সাইটওয়ালারা এই অভিনেতা ক্রেতা আনার ব্যাপারে খুবই সতর্ক। একাধিক ক্লিক করলে পিটিসি একাউন্ট বাতিল ... .... .... মিয়া প্রতারণার সহযোগী হতে হলে আরো স্মার্ট হতে হবে - সহযোগীতা করতে গিয়ে ওস্তাদরে ফাঁসায় দিবেন নি - আপনি বাতিল!
এই হইলো কাহিনী।

পুরাটা আমার কমনসেন্স থেকে লিখেছি। ভুল থাকতে পারে। থাকলে ধরিয়ে দিবেন আশা করছি ... ... আর সিদ্ধান্ত নিবেন - এই প্রতারণার সহযোগী হবেন কি না।

সোমবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১১

শেয়ার মার্কেট - ঘটনাটা কী?

শেয়ার মার্কেট কী জিনিষ? আমি ঠিক বুঝি না .... কেউ যদি বেসিক আইডিয়া দিতে পারতো ... .... (ডিসক্লেইমার: মরহুম অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া আমার কেউ নয়)shame মনের মধ্য প্রশ্ন ঘুরঘুর করে: একটা শেয়ারের মূল্য বাড়ে বা কমে কখন ... ... এর পেছনের বেসিক কারণ কী? thinking

আমি শেয়ার নিয়ে কিছু বুঝি কি না সেটা শেয়ার করা মুশকিল। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলাম - ঐটাই ঠিকমত বুঝি না আর শেয়ার ......তবে এখন এই বিষয়ে আগ্রহী অনেক বান্দা আছেন মনে হয়। নিশ্চিতভাবেই অনেকে ভাল বুঝেন। তাই কোন সহৃদয় যদি এটা নিয়ে লিখতেন তবে একটু কৌতুহল মিটতো। এই নিয়ে আমার জানার দৌড়টা এর আগে শেয়ার করি একটু। তাহলে এই অধমকে পরামর্শ দিতে সুবিধা হবে।

সহজ সরল ভাবে দেখলে - একটা কম্পানির মূলধন দরকার ধরুন ১০ কোটি টাকা। কিন্তু মালিক/উদ্যোক্তার হাতে আছে ৬ কোটি। বাকি টাকা সে ব্যাংক থেকে লোন নিতে পারে, অথবা পাবলিকের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রি করে নিতে পারে। ধরুন ঐ ৪ কোটি টাকা ১০০ জন লোক প্রত্যেকে ৪ লাখ করে দিল। শেয়ার বিক্রি অর্থ হল এখন ১০ কোটি টাকা মূলধনের ৬ কোটি একজনের - কাজেই কম্পানির মালিকানার ৬০% মালিক সে। আর বাকী ৪০% মালিকানা শেয়ার করা হয়েছে। প্রতিজন ৪ লাখ টাকা করে দেয়াতে ঐ ১০০ জনের প্রতিজন ০.৪%  করে মালিকানা পাবে।

বছর শেষে ঐ কম্পানি ধরি ৫ কোটি টাকা মুনাফা করে, এবং এ থেকে ২ কোটি টাকা ব্যবসা সম্প্রসারনে ব্যয় / পূণর্বিনিয়োগ করলো। তাহলে বাকি ৩ কোটি টাকার মধ্যে
মালিক/উদ্যোক্তা পাবে - ১কোটি ৮০ লাখ (যেহেতু ৬০% মূলধন তার)
শেয়ার হোল্ডার প্রতিজন পাবে - ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে। (১০০ জনে = ১কোটি ২০ লাখ = ৪০% লাভ)

এখন কেউ যদি তার শেয়ার রাখতে না চায় তবে ঐ লাভ নেয়ার পর ৪ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার ৪লাখ ৮০ হাজারে বিক্রি করতে পারবে। কারণ এখন ব্যবসার মূল্য ১০+২=১২ কোটি। কাজেই ১২ কোটি * ০.৪% = ৪ লাখ ৮০ হাজার। আর লভ্যাংশ না নিয়েই বিক্রি করলে দাম পাবে ৬ লাখ।
এভাবে ৪ লাখ টাকা ১ বছরে ৬ লাখ হল। কারণ মূল ব্যবসা একই অনুপাতে লাভ করেছে।

শেয়ার মার্কেটে যখন মানুষ বিনিয়োগ করে তখন এগুলোর কোন নাম নিশানা আমি দেখিনা। তার মানে ইহা ভিন্ন কোনো জিনিষ। এখানে হু হু করে দাম কেন বাড়ে, হুট করে কমেই বা কেন? ১০ টাকার ফেসভ্যালুর শেয়ারের মূল্য যখন দেখি ৩০০ টাকা - এর অর্থ আমার বুঝামতে ঐ কোম্পানি যখন শেয়ার ছে‌ড়েছিলো তখনকার তুলনায় ব্যবসা  ৩০ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ... ... আসলেই কি তাই ঘটেছে? ঐ শেয়ারের ক্রেতা কি এই তথ্যের ভিত্তিতেই আরো প্রবৃদ্ধিজনিত লাভের আশায় শেয়ারের মালিক হয় নাকি এর পেছনে অন্য কোনো শক্ত থিওরী আছে? এ্যাত টাকা বিনিয়োগ যখন করছে তখন নাড়ি নক্ষত্র না জেনে নিশ্চয়ই করেনি ... ... সেই নাড়ি নক্ষত্র কী কী -- কোন পুরাতন কেস স্টাডি করে দেয়া যাবে কি?

আমার বুঝা ঠিক কি না জানিনা। তবে এটা ঠিক হলে বেশির ভাগ বিনিয়োগকারীই হুজুগে চলে - যাদের মূলধন হল লোভ; বিনা পরিশ্রমে বড়লোক হওয়ার দিবাস্বপ্ন। আর এর সুযোগ নেয় ঘাঘু ঠকবাজরা। লোভ করে নিজের কল্লা জবাই হওয়ার রিস্ক নিয়ে পেতে দিলে সেটা কাটা পড়তেই পারে। এজন্য কার ঘাড়ে দোষ চাপাবেন? ---  মাইন্ড খাইয়েন না -- পাগলের সুখ মনে মনে -- আমি এইসব ভেবে ও থেকে দুরে থাকার বুঝ নেই মনে মনে।

==আপডেট: আরো কিছু টেক্সট যোগ করি==

বিভিন্ন চিপায় লেকচার শুনে যা জানি তা হল: একটা বস্তুর দাম বাড়ে যখন কোন ভাবে এটাতে ভ্যালু এডিশন হয়।

সবচেয়ে বেশি ভ্যালু এডিশন হয় শিল্প কারখানাতে: ১০০ টাকার লোহার টুকরাতে আরো ৪০০ টাকার মেশিন/লেবার খরচ করে সেটা ৫০০০ টাকা মূল্যের বস্তুতে পরিণত হয়। কিংবা ধরুন ৬০ টাকার তুলাতে ৩০ টাকার মেশিন / লেবার খরচ করে ১২০ টাকার সুতা তৈরী হয়। সেই সুতা থেকে কাপড় বা কাপড় থেকে তৈরী পোশাক -- সবই ওরকম।

এছাড়াও ভ্যালু এডিশন হয় বিপননে। ৫০০০ টাকার বস্তু এনে সেটার পেছনে আরো ৩০০০ টাকার চমৎকার আলোকসজ্জা, ডিসপ্লে, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি দিয়ে ১০০০০ টাকায় বিক্রয় করা হয়। কিংবা ধরুন ১২০ টাকার সুতা ১৫ টাকার পরিবহন, গোডাউন, প্যাকেজিং, ডিসপ্লে ইত্যাদি পার হয়ে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

মোদ্দা কথা হল, শিল্প কারখানায় ভ্যালু এডিশন হয় বিপননের চেয়ে অনেক বেশি। সেজন্য বিনিয়োগ করতে হলে ঐ খাতে করাই বেশি বুদ্ধিমানের লক্ষণ। কিন্তু আমাদের এখানে শিল্প কারখানা বাদ দিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যমুনা ফিউচার পার্ক টাইপের বিপনন কেন্দ্র বানানো দেখে একজন দুঃখ করে এসব বলেছিলেন আমাকে।

আমার প্রশ্ন হল, এসেট ভ্যালুর সাথে শেয়ারের মূল্য যদি সংগতিপূর্ণ না হয় তবে এর ভ্যালু এডিশন হচ্ছে কিসের ভিত্তিতে? যতদুর বুঝি তাতে - সত্যিকার অর্থে যদি এর ভ্যালু এডিশন না হয়, তাহলে সেটা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য।

কিছুদিন আগে বিশ্বমন্দা এ ধরণের কিছু শেয়ার কেলেংকারির জন্যই হয়েছিলো। তখন যা ঘটেছিলো তা মেকানিজম ছিল অনেকটা এমন:
একজন ১০০ টাকা মূলধনে ব্যবসা করে ৩০ টাকা লাভ করলো - ফলে শেয়ারের মূল্য বাড়লো ৩০%। আরেকজন নিজের ৫০ টাকা মূলধনের সাথে আরো ৫০ টাকা লোন নিয়ে ১০০ টাকার মূলধন বানিয়ে সেটা দিয়ে ব্যবসা করে সে-ও ৩০ টাকা লাভ করলো। কিন্তু হিসাবে দেখালো - আমার ৫০ টাকা মূলধন কিন্তু লাভ ৩০ টাকা .... অর্থাৎ শেয়ারের মূল্য ৬০% বৃদ্ধি পেল - যেটা আসলে ঠিক নয় (কারণ তারও ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি আসলে ৩০%)। ব্যবসার জন্য লোনগুলোতে অনেক জায়গাতেই প্রথম কয়েক বছর সুদ দেয়া লাগে না - তাই এর সুযোগ নিয়েছিল কেউ কেউ। ফলে কী হল? যে শেয়ারের আসল ভ্যালু এডিশন ৩০% সেটা ম্যানিপুলেট করে ৬০% এ কেনা বেচা হচ্ছে --- --- এভাবে কতদিন আর ধামাচাপা দেয়া যায়? এক সময় না এক সময় আসল থলের বেড়াল বের হয়ে পড়ে, আর এর আগেই আসল খেলোয়ারগণ নিজের শেয়ারগুলো বিক্রয় করে দেয়।


ফলে সাধারণ বিনিয়োককারীর অবস্থা হয় কৃষিকাজ বাদ দিয়ে বেশি দামে বানর কিনে বসে থাকা মানুষের সেই গল্পের মত। আসল জায়গায় ভ্যালু এডিশন না হয়ে যদি দাম বাড়ে তাহলে সেই অতিরিক্ত টাকা কারো না কারো পকেট থেকেই যাবে।

শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১০

যানজট নিরসনে তাহলে প্রতিদিন হরতালই কি সেরা সমাধান?

(সর্বপ্রথম সচলায়তনে প্রকাশিত)
ইদানিংকালে যানজট নিরসনে অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের বেশ কিছু বক্তব্য আমাকে বিষ্মিত করেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, উনি অর্থমন্ত্রী - যোগাযোগ মন্ত্রী নন!

এর মধ্যে একটি হল প্রাইভেট কারে ৫ জন ছাড়া চলা যাবে না। আহা ... ... এতে সঙ্গিযাত্রী হিসাবে কিছু বেকারের নিশ্চিত কর্মসংস্থান হবে। বাসা থেকে ৫ জন বের হল। বাচ্চা স্কুলে নামার পর ৫ জনের কোটা পূরণ করার জন্য সেখান থেকে একজন সঙ্গিযাত্রী উঠবে গাড়িতে (ঘন্টা হিসাবে মজুরি দিতে হবে) .... এভাবে শেষজন নামার আগ পর্যন্ত লোক অফিসে নামবে সঙ্গিযাত্রী উঠবে। ফেরার পথেও একই রকম কাহিনী। সঙ্গিযাত্রী বা প্রক্সি/ডামি যাত্রী হিসেবে কর্মসংস্থানের ফলে কিছু লোকের হয়তো বেকারত্ব দুর হবে (ছিনতাই বৃদ্ধির আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না), তবে উৎপাদনশীলতা বাড়বে না, বরং অতিরিক্ত ভারবহন করার কারণে জ্বালানী খরচ বাড়বে।

নির্দিষ্ট আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা না থাকলে এই রকম ব্যবস্থাটা (যার টেকনিক্যাল নাম কার-পুলিং car pooling) মানুষের ভোগান্তি আরেকটু বাড়ানো ছাড়া আর কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। যানজট বেশি হয় অফিস টাইমে, অর্থাৎ, অফিস শুরু এবং ছুটির সময়ে। তখন হঠাৎ করে (খুব কম সময়ের ব্যবধানে) বিপুল সংখ্যক লোক রাস্তায় নেমে আসে। নির্দিষ্ট আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা থাকলে দেখা যায় যে একই আবাসিক/বাণিজ্যিক এলাকা থেকে ৪/৫জন লোক ৪/৫টা গাড়ি ব্যবহার করে একই বাণিজ্যিক/আবাসিক এলাকায় যাচ্ছে। যাত্রা শুরু এবং গন্তব্যস্থল একই হওয়াতে এরা ৪/৫টি গাড়ির বদলে একটি গাড়ি দিয়েই যাতায়াত করতে পারে, যার ফলে রাস্তা থেকে কিছু গাড়ি কমে গিয়ে যানজট কমাতে সাহায্য করে।

ঢাকায় আমার জানামতে নির্দিষ্ট সময়ে এরকম নির্দিষ্ট যাতায়াতের জন্য কার শেয়ারিং বা কার পুলিং খুব ভালভাবেই বিদ্যমান। অফিসের কর্মকর্তা যাত্রাপথে অন্য সহকর্মীদেরকে তার গাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে, এটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। কিন্তু এক বাসা থেকে বের হওয়া ৪ জনের গন্তব্য ভিন্ন হলে তখন কী হয়? বাড়ির একজন সিটি কলেজের সিনিয়র শিক্ষিকা, ওনাকে কলেজে নামিয়ে তারপর ছেলে আর ছেলের বউয়ের অফিস মিন্টো রোডের পাশের রাস্তায় (ওল্ড এলিফ্যান্ট রোড); এরপর কনসালট্যান্ট কর্তার ৩/৪টি কর্মস্থলের যে কোনো একটিতে (ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট / মগবাজারের কনস্ট্রাকশন ফার্ম/ মনিপুরিপাড়ার কনস্ট্রাকশন ফার্ম / মহাখালি / অন্য কোনো অফিস)। এরকম একটা কর্মঠ ও কর্মব্যস্ত পরিবারের অতি প্রয়োজনীয় গাড়ি চালাতে তবে এরপর থেকে প্রথমে উল্লেখ করা সঙ্গিযাত্রী বা ডামি যাত্রী ছাড়া পথ খোলা থাকবে না। আর তা না করতে চাইলে হয় ক্যাব বা রিক্সা ... ... যা যানজট কমাবে কীভাবে সেটা বুঝি না।

বিদেশের কিছু কিছু শহরে কার পুলিং সফলতার সাথে প্রযুক্ত হয়েছে .... .... প্রশ্ন হল কীভাবে?
এসব শহরে পরিকল্পিত ভূমির ব্যবহার প্রযুক্ত হয়েছে, ফলে নির্দিষ্ট আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠেছে। এছাড়া ঐ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা যুক্ত করে এমন নির্দিষ্ট রাস্তা আছে। আসা এবং যাওয়ার জন্য দুইপাশে নির্দিষ্ট লেন ছাড়াও রাস্তার মাঝ বরাবর একটা অতিরিক্ত বিশেষ লেন আছে। এই লেনে নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছাড়া গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। এই লেনটির বিশেষত্ব হল, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এটি দিয়ে আবাসিকের দিক থেকে অফিসের দিকে আর দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত উল্টাদিকে (অফিস-আবাসিক) চলাচলের জন্য খোলা থাকে। অর্থাৎ যেদিকে চাহিদা বেশি সেদিকে সেবা দেয়। এই লেন ব্যবহার করে অনেক দ্রুত যাওয়া যায়, কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে এটা ব্যবহার করা যায়। বাস কিংবা কমপক্ষে ৪জন যাত্রী আছে এমন কার বিনা বাঁধায় এই লেন ব্যবহার করতে পারে। অন্যরা ব্যবহার করতে চাইলে উচ্চমাত্রায় টোল দিয়ে করতে পারে। অর্থাৎ কার পুলিং করলে বিশেষ কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে ... ... ... "পেটে খেলে পিঠে সয়', ঢাকায় প্রাইভেট কারের জন্য এমন কোন সুবিধার ব্যবস্থা আছে কি? আর, প্রাইভেট কারের বদলে পাজেরো (পাবলিক না হয় নির্লজ্জ্ব মন্ত্রী বা এমপিদের মত বিনাট্যাক্সে নাই কিনলো) ব্যবহার করা শুরু করলে তখন নিয়মটা কেমন হবে?

এরপর আরেকটা উদ্যোগের কথা জেনে হাসবো নাকি কাঁদবো তা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এটা হল জোড় আর বেজোড় সংখ্যার প্রাইভেট কার বিষয়ক। অন্যান্য গাড়ির মতই ১০০% ট্যাক্স দিয়ে কেনা এই গাড়িগুলোর দোষ হল, এরা সংখ্যায় বেশি। তাই একদিন জোড় সংখ্যা বিশিষ্ট ও অন্যদিন বেজোড় নম্বরবিশিষ্ট কার রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। যাদের একটি মাত্র গাড়ি তারা তাহলে বাকী কর্মদিবসগুলোতে কীভাবে যাতায়াত করবে? এমনতো নয় যে যথেষ্ট পরিমান গণপরিবহন ব্যবস্থা করা সত্বেও দুষ্টু মানুষ ওগুলো ব্যবহার না করে শুধু শুধু গাড়ি বের করে রাস্তায় যানজট বাড়াচ্ছে। বরং অকার্যকর এবং অনুপযোগী গণপরিবহন ব্যবস্থায় অতীষ্ট হয়েই স্বল্প আয়ের এই দেশেও, মানুষ এক প্রকার বাধ্য হয়েই, অন্য দেশের চেয়ে আড়াইগুন দামে প্রাইভেট কার কিনছে। নাহলে কোন মধ্যবিত্তের ঠেকা পড়েছে যে বেতন দিয়ে ড্রাইভার নিয়োগ দিয়ে, এদের তেল/পার্টস্ চুরি ও মোবাইল হারানো সহ্য করে, রিক্সার ঘষা খেয়ে, ২/৩ ঘন্টা গ্যাসের জন্য সিরিয়াল ধরে গাড়ি চালানোর?

ট্যাক্সির ধারণাটাই হল যাত্রী এতে উঠে কোথায় যেতে হবে যাত্রী তা বলবে - শহরের যে কোনো জায়গায় যেতে এরা বাধ্য ... ... অথচ ঢাকায় ক্যাব/ট্যাক্সিকে গন্তব্যে যাবে কি না সেটা জিজ্ঞেস করতে হয় আগেই, এবং ওরা সেখানে যেতে চায় না; আবার গেলেও ৬০ টাকার ভাড়া ১৫০টাকার কমে যায় না। আর এখানে প্রাইভেট কার ব্যবহারকারীদেরকেও ঠেলে দিলে আরও কী তুঘলকী কাণ্ড ঘটবে তা কল্পনা করা দুরূহ।

গণপরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত না করলে এবং ট্রিপ ডিমান্ড না কমালে যানজট কমানোর উদ্যোগগুলো সফল হবে না - এটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার হয় না। গণপরিবহণ প্রসঙ্গে গত ২২শে ডিসেম্বর রাতে দেশ টিভিতে সোজাকথা নামক টক-শোতে আমন্ত্রিত অতিথি জনাব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া সাহেব (শুরু থেকে দেখিনি বলে ওনার পদমর্যাদা জানা হয়নি) সরকারের তরফ থেকে যে সকল উদ্যোগের কথা জানালেন সেগুলোকে আমার চমৎকার এবং সঠিক মনে হল। উনি বলেছিলেন যে, পর্যায়ক্রমে (১০-১৫ বছর) তিনটি রুটে MRT / মেট্রো ট্রেন চালু করা হবে। দেশের বিদ্যূৎ ব্যবস্থা, ভূতত্ব এবং খরচ বিবেচনা করে এগুলো যতদুর সম্ভব মাটির উপরে এবং উড়াল লাইনে (স্কাই ট্রেন) করা হবে। সামান্য কিছু জায়গায় হয়তো স্থানাভাবে বাধ্য হয়ে পাতালে যেতে হতে পারে। তাহলে সিঙ্গাপুর বা ওসাকা/টেকিওর মতই কিছু উপরে আর কিছু নিচে হচ্ছে। আর, ব্যাংককের মতই রাস্তার ডিভাইডার থেকে কলাম তুলে উপরে লাইন হবে। MRT করতে প্রচুর অর্থ লাগবে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের উপর বিরাট ঋনের বোঝা চাপিয়ে দেবে।

তবে আগামী বছরেই যা হবে সেটা হল কিছু কিছু রুটে BRT বা বাস রেপিড ট্রানজিট। এটাতে উপরোল্লিখিত কার পুলিং লেনের মতই বাস চলাচলের জন্য রাস্তায় বিশেষ সুরক্ষিত লেন আলাদা করা হবে। এখানে চলাচলের জন্য সুপরিসর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস আনা হবে (কোরিয়া বা ভারত থেকে এবার যেগুলো আসছে সেগুলো নয়)। বাসে ওঠা-নামা করার জন্য প্ল্যাটফর্ম এমন হবে যেন অতি দ্রুত ওঠা/নামা যায় (মেট্রো'র মতই)। বিভিন্ন ক্রসিংএ ও সিগনালে এই বাসগুলো অগ্রাধিকার পাবে। ফলে বাসে যাতায়াত হবে আরামদায়ক এবং প্রাইভেট গাড়ির চেয়ে দ্রুততর। সারা ঢাকাতে এই সুবিধা ছড়ানোর জন্য দুই তিনটি প্রাইভেট কম্পানিকে লিজ দেয়া হবে। এজন্য পরিবহন কম্পানিগুলো একিভূত করার জন্য কাজ চলছে। MRT'র তুলনায় কম যাত্রী বহন করলেও BRTতে খরচ সেই তুলনায় অনেক কম হবে।

ট্রিপ ডিমান্ড কমানোর প্রসঙ্গে চমৎকার একটা উদ্যোগ ছিল এলাকাভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন দিনে সাপ্তাহিক বন্ধের আইডিয়াটা। এখন পর্যন্ত আমি এই উদ্যোগের সুফল ভোগ করছি। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন ফলাফল প্রকাশের কারণেও ট্রিপ ডিমান্ড বা যাতায়াত চাহিদা কমেছে। এভাবে অফিসের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে (ভিডিও কনফারেন্সিং ইত্যাদি, অনলাইন বুকিং, অনলাইন আবেদন পত্র জমা দেয়া ইত্যাদি) ততই যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা কমে তা যানজট কমানোতে সাহায্য করবে।

এরকম যৌক্তিক কাজকর্মগুলো এ বিষয়ে পেশাদারগণ যাতে দক্ষভাবে করতে পারে সেটা নিশ্চিত করলেই মন্ত্রী মহোদয় সকলের অকুন্ঠ সমর্থন পাবেন। যানজট বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা বুঝাতে অযথা উদ্ভট কাজকর্ম করার প্রয়োজন নাই। নাহলে দেখা যাবে আজ প্রাইভেট কার বন্ধ করার পর উৎসাহিত হয়ে পরবর্তীতে সরকার-ই প্রতিদিন হরতাল না ডেকে বসে।

শেষে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত, জাতীয় স্থল পরিবহন নীতিমালা, এপ্রিল ২০০৪ হতে ঢাকা মহানগরীর জন্য নীতিমালা অংশটি আপনাদের জন্য সংযুক্ত করলাম। এতে চমৎকার দিক নির্দেশনা আছে।

এইটা পড়ার আগেই বলি, এটা ডাউনলোড করতে পারবেন এখানে ক্লিক করে (মাত্র ৪১৫ কিলোবাইট)। তবে ওটার বাংলা লেখাগুলো কোনোভাবেই ইউনিকোডে আনতে না পেরে শেষে টাইপ করে ফেললাম।

৯. ঢাকা মহানগরীর জন্য নীতিমালা

৯.১ পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম

৯.১.১ সরকার ঢাকা নগরীর পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবে।
৯.১.২ গণপরিবহনের উন্নতি, যানজট হ্রাস ও পরিবেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করবে। এ ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
     ১. মহানগরীর জন্য দীর্ঘমেয়াদী আধুনিক গণ-পরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনা প্রণয়ন
     ২. অধিক সংখ্যায় সুপরিকল্পিত বাস রুট চালু;
     ৩. গণ-পরিবহন ব্যবস্থায় উচ্চমানের যানবাহন ব্যবহার এবং সার্ভিসের মান বৃদ্ধি;
     ৪. বেসরকারী খাতের বাস অপারেটরদের অংশগ্রগণের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি; 
     ৫. বাস সার্ভিসকে অগ্রাধিকার প্রদান; 
     ৬. সব ধরণের যানবাহন থেকে দূষণ হ্রাস;
     ৭. সড়কের উপর পার্কিং এবং সড়কের অনধিকার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ;
     ৮. ট্রাফিক ব্যবস্থারনার উন্নয়নে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ;
     ৯. ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার;
     ১০. পদযাত্রীদের জন্য উন্নততর সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি; 
     ১১. গণপরিবহন ব্যবস্থার মূল্যায়ন;
     ১২. সকলের জন্য বিশেষ করে দূর্ঘটনা প্রবণ (vulnerable) সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য উন্নততর নিরাপত্তা ব্যবস্থা; 
     ১৩. পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা; এবং
     ১৪. উন্নত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা।

৯.২ অযান্ত্রিক যানবাহন

৯.২.১ প্রধান প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিক্সা চলাচল পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা হবে। অপ্রধান সড়কে চলাচলকারী রিক্সাকে কেবল প্রধান প্রধান সড়কের নির্ধারিত স্থানেই ক্রসিং করতে দেয়া হবে।
৯.২.২ সড়ক সংযোগস্থল (intersection) উন্নতিকরণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সড়ক সংযোগস্থলের ধারণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখার স্বার্থে সড়ক ও ফুটপাথের সন্ধিস্থল (curb side) রিক্সামুক্ত করা হবে।
৯.২.৩ শহরতলীর যেসব এলাকায় বাস নেটওয়ার্ক অপেক্ষাকৃত স্বল্প এবং/অথবা চলাচল কম সে সব এলাকায় ফিডার সার্ভিস হিসেবে রিক্সা ব্যবহার হবে।
৯.২.৪ আগামী ১০ বছরে রিক্সার ট্রিপ অর্ধেকে কমিয়ে আনা হবে।

৯.৩ অটো রিক্সা

৯.৩.১ ২-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার যানবাহনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ঢাকায় ৪-স্ট্রোক সিএনজি অথবা পেট্রোল চালিত অটো-রিক্সা ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৯.৩.২ প্রধান প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সমূহে অগ্রাধিকার ভিত্তিক বাস সার্ভিস প্রবর্তনের পর ঐসব রুটে পর্যায়ক্রমে অটো-রিক্সা চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
৯.৩.৩ কেবলমাত্র বাস এবং রেল পরিবহনের ফিডার সার্ভিস হিসেবে অটো-রিক্সা ব্যবহার উৎসাহিত করা।
৯.৩.৪ চূড়ান্ত পর্যায়ে অটো-রিক্সা চলাচল বন্ধ করা।

৯.৪ প্রাইভেট কার

৯.৪.১ জরুরী সার্ভিস সমূহের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (যেমন সড়ক পার্শ্বে পণ্য বোঝাই-খালাসের জন্য সাময়িক বিরতিস্থল নির্ধারণ) রেখে সড়কের উপরে পার্কিং নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
৯.৪.২ পুরাতন ঢাকা এবং এরূপ অন্যান্য যে সকল স্থানের সড়ক কার ব্যবহারের জন্য অনুকুল নয় সে সকল স্থানে শুধু পায়ে চলার ব্যবস্থা প্রবর্তনের কার্যক্রম গ্রহন করা।
৯.৪.৩ ২০২২ সালে ঢাকার প্রাইভেট কারের ব্যবহার মোট যান্ত্রিক যানবাহন ট্রিপের ৩০% এর মধ্যে সীমিত রাখা।

৯.৫ ট্রাক

৯.৫.১ সকল নতুন বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনার জন্য সড়কের বাইরে ট্রাকে পণ্য বোঝাই-খালাসের প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে তোলা।
৯.৫.২ ঢাকার রাস্তায় দিনের বেলা ট্রাক চলাচলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে পর্যালোচনা করা।
৯.৫.৩ কন্টেইনার ট্রাকে মালামাল ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য নতুন সুবিধাদি সৃষ্টি করা।

৯.৬ রেলওয়ে

৯.৬.১ জয়দেবপুর-নারায়নগঞ্জ লাইনে রেল কমিউটার সার্ভিস প্রবর্তন।
৯.৬.২ ২০১২ সালের মধ্যে কমিউটার রেল সার্ভিসের মাধ্যমে দৈনিক ২,০০,০০০ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।
৯.৬.৩ গণ-পরিবহন (Mass Transit System) পরিকল্পনা প্রণয়ন, পাতাল, এলিভেটেড ও সার্কুলার রেলওয়ে ব্যবস্থা প্রবর্তন, পরিবহন সেক্টরে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগীতায় সমীক্ষা পরিচালনা করা।

৯.৭ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা

৯.৭.১ ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি পূর্নাঙ্গ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন।
৯.৭.২ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন কারিগরি কৌশল প্রবর্তন।
৯.৭.৩ পদযাত্রীদের জন্য উন্নততর সুবিধাদি এবং একই গ্রেডে নিরাপদ ক্রসিং সুবিধার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচী প্রণয়ন।
৯.৭.৪ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাদি, বিশেষত: ঝুঁকিপ্রবণ সড়ক ব্যবহারকারীগণের (vulnerable road users) বিষয় অন্তর্ভুক্তকরণ।
৯.৭.৫ কোন নতুন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে ট্রাফিকের প্রতিক্রিয়া নিরূপণের (traffic impact assessment, TIA) সমীক্ষা করা এবং সে মতে এর জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুবিধাদি সৃষ্টি করা।

৯.৮ প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি

৯.৮.১ সাধারণভাবে ডিটিসিবি'র ভূমিকা হবে সমন্বয়কারীর। তবে একে নিম্নবর্ণিত বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা প্রদানের ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী করা হবে-
     ১. প্রকল্পের ভৌত (physical) বাস্তবায়ন
     ২. প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার নির্ণয়
     ৩. যৌথ দায়িত্ব সম্পন্ন প্রকল্পের সমন্বয় সাধন
৯.৮.২ ডিটিসিবি'র বিশেষ দায়িত্ব হবে যাত্রীর চাহিদা যথাযথভাবে পূরণের লক্ষ্যে একটি নিরাপদ, দক্ষ ও আধুনিক বাস রুট নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা। রুট ইজারা (route franchising) ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ডিটিসিবি নিজস্ব কৌশল বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করবে।

সোমবার, ৭ জুন, ২০১০

গ্রেডিং পদ্ধতি এবং কিছু অগোছালো চিন্তাভাবনা

সর্বপ্রথম সচলায়তনে প্রকাশিত

এটি একটি গবেষণাবিহীন লেখা; সম্ভবত একটু বেশি লম্বা হয়ে গেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে। অনেকের কাছেই পুরান প্যাচাল মনে হতে পারে।

পরীক্ষার ফলাফল কী কাজে লাগে?

যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার আগে এটার প্রয়োজনীয়তা বা objective জানা থাকলে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় সুবিধা হয়। তাই প্রথমেই পরীক্ষার ফলাফল কী কাজে লাগে সে বিষয়ে আমার সামান্য ধারণাটুকু তুলে ধরি। জ্ঞানার্জনের জন্য লেখাপড়া, তাই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য হল সেই জ্ঞান কতটুকু অর্জিত হল সেটা যাচাই করে নেয়া। তবে প্রায়োগিক দিক চিন্তা করলে দেখা যায়, এই পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে আমরা নির্দিষ্ট বিষয় বা বিষয়সমূহে একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের পাশাপাশি তার মেধাশক্তি পরিমাপ করার চেষ্টা করি। সেই মেধার ভিত্তিতে তাঁর উচ্চতর শিক্ষার উপযুক্ততা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া এই ফলাফলের ভিত্তিতেই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্মী বাছাই করা হয়।

তাই পরীক্ষার ফলাফলকে বলা যায়, উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত শিক্ষার্থী এবং কর্মক্ষেত্রে কর্মী বাছাইয়ের একটা হাতিয়ার। নিয়োগকর্তা যদি পরীক্ষার ফলাফল দেখে কর্মীর যোগ্যতা বুঝতে না পারেন, তবে সেই ফলাফল এর মূল একটা উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ এবং নিয়োগকর্তার কাছে এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু মনে হতে পারে না।

এজন্য শিক্ষকদের দুই ধরণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। একদিকে শিক্ষক হলো কোচ ... অর্থাৎ, তিনি শিক্ষার্থীকে উপযুক্তি কোচিং বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মযজ্ঞের জন্য প্রস্তুত করেন। অপরদিকে শিক্ষক হলো গেট-কিপার বা দাড়োয়ান, অথবা বলা যেতে পারে "কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার"। অর্থাৎ, তার প্রদত্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ইন্ডাস্ট্রি উপযুক্ত কর্মী বেছে নিতে পারবে। এটা সমাজ তথা কর্মক্ষেত্রের কাছে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা।

আমরা শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা বলতে শুধুমাত্র পাঠদানে অবহেলা করার বিষয়টা বুঝে থাকি। কিন্তু যদি শিক্ষক কোয়ালিটি কন্ট্রোল ঠিকমত না করেন, এবং সমাজ এবং নিয়োগকারী/উচ্চতরা শিক্ষাব্যবস্থাকে উপযুক্ত কর্মী/শিক্ষার্থী বেছে নিতে সাহায্য করার মত ফলাফল না দেন, তবে সেটাও সমাজের প্রতি চরম দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে গণহারে এস.এস.সি.তে A গ্রেড পাওয়ার ব্যাপারটা উল্লেখযোগ্য মাত্রার দৃষ্টিকটু লাগে ... মনে হয় কোনো কারখানায় প্রোডাক্ট উৎপন্ন হওয়া মাত্র সর্বোচ্চ মানের বলে নিশ্চয়তা দেয়া হচ্ছে।

প্রচলিত গ্রেডিং পদ্ধতি

গ্রেডিং নিয়ে মোটাদাগে কিছু বলার আগে এই সিস্টেমে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটুকু শেয়ার করি। এই সিস্টেমের সাথে প্রথম পরিচয় হয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে। গ্রেডিং সিস্টেমের সাথে পরিচয় আরেকটু গাঢ় হয় পরবর্তীতে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েই মাস্টার্স করতে গিয়ে। আর এখন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুবাদে প্রতিনিয়ত এই বিষয়ে ছাত্র/শিক্ষকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এ বিষয়ে আরো কিছু বলার আগে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও কিছু প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই পদ্ধতিতে গ্রেড দেয়া হয় সেটা দেখি:

তালিকা-১

  প্রাপ্ত নম্বর     লেটার গ্রেড     গ্রেড পয়েন্ট  
৮০+   A + ৪.০০
৭৫+   A ৩.৭৫
৭০+   A - ৩.৫০
৬৫+   B + ৩.২৫
৬০+   B ৩.০০
৫৫+   B - ২.৭৫
৫০+   C + ২.৫০
৪৫+   C ২.২৫
৪০+   D ২.০০
০-৩৯   F ০.০০

ভাবছেন এগুলোতো জানা কথা, এ আর এমন কি ... ... । তবে দেখুন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েই মাস্টার্স লেভেলে যেভাবে গ্রেড দেয়া হয় সেটার পদ্ধতি:

তালিকা-২

  প্রাপ্ত নম্বর     লেটার গ্রেড     গ্রেড পয়েন্ট  
৯০+   A + ৪.০
৮০+   A ৩.৫
৭০+   B + ৩.০
৬০+   B ২.৫
৫০+   C ২.০
০-৪৯   F ০.০

গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে যাঁরা খুব বেশি নাড়াচাড়া করেননি, তাঁরা নিশ্চয়ই একটু ধাক্কা খেয়েছেন এই পর্যায়ে এসে। আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে যেখানে ১০ রকম গ্রেড (ফেল সহ) সেখানে মাস্টার্সে ৬ রকম গ্রেড হতে পারে। আর প্রাপ্ত নম্বরের পার্থক্যটাও চোখে পড়ার মত: আন্ডারগ্র্যাডে প্রতি ৫ নম্বরের জন্য গ্রেড পয়েন্ট পরিবর্তন হয় যেখানে মাস্টার্সে এই পার্থক্য ১০। সাথে সাথে পর্যায়ক্রমিক গ্রেড পয়েন্টের পার্থক্যগুলোও দেখা যেতে পারে: আন্ডারগ্র্যাডে ধারাবাহিকভাবে ০.২৫ পার্থক্যতে গ্রেডগুলো অবস্থিত, যেখানে মাস্টার্সে এটা ০.৫০। পাস্‌মার্কও আলাদা: মাস্টার্সে ৫০, আন্ডারগ্র্যাডে ৪০।

একটা বিষয় নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন যে, দুই লেভেলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের দক্ষতাকে আলাদা পাল্লায় মাপা হয়। আর, একজন ছাত্র বুয়েটে যত সহজে আন্ডারগ্রাজুয়েটের গ্রেড তুলতে পারবে, মাস্টার্সে ব্যাপারটা ততটা সহজ হবে না। এমনকি যেই ছাত্র প্রতিটা বিষয়ে আগে সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়ে এসেছে, মাস্টার্সে সেই মানের পরীক্ষা দিয়ে একই গ্রেড পাবে না: আগে ৮০ পেলেই যেখানে A+ = ৪.০ পাওয়া যেত, সেখানে মাস্টার্সে ৮০ = A = ৩.৫। আর পাশের ব্যাপারটাও খেয়াল করুন: আন্ডারগ্রাডে ৪৬ = C = ২.২৫, কিন্তু মাস্টার্সে সেটাই ফেল।

কাজেই এ থেকে অনুমান করা সহজ হয় যে সর্বক্ষেত্রে একই প্রাপ্ত নম্বরের জন্য একই গ্রেড পেতে হবে -- এমন কোন নিয়ম নেই। আর গ্রেডিং পদ্ধতি যে সব জায়গায় একই হতে হবে, বা হবে এমনটি আশা করাও উচিত নয়।

আমি একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি করি। এটাতে যে গ্রেডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তা দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় অপেক্ষা ভিন্ন। এই ভিন্নতার পেছনের কারণগুলো প্রবন্ধের শেষে জানানোর চেষ্টা করবো। নিচে এখানকার গ্রেডিং পদ্ধতি দেয়া হল:

তালিকা-৩

  প্রাপ্ত নম্বর     লেটার গ্রেড     গ্রেড পয়েন্ট  
৯০+   A ৪.০
৮৫+   A - ৩.৭
৮০+   B + ৩.৩
৭৫+   B ৩.০
৭০+   B - ২.৭
৬৫+   C + ২.৩
৬০+   C ২.০
৫৫+   C - ১.৭
৫২+   D + ১.৩
৫০+   D ১.০
০-৪৯   F ০.০


গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে একটু ত্যানা প্যাচানি: (কী, কেন)

বাস্তব জীবন থেকে একটা সহজ উদাহরণ দেই। ধরুন চারজন পরীক্ষার্থী একটি পরীক্ষায় যা লিখেছে তা মূল্যায়ন করার পরে নিচের মত করে নম্বর দেয়া হল। আগের প্রচলিত পদ্ধতিতে এই নম্বরের উপর ভিত্তি করেই তাদের মেধাক্রম দেয়া হত। এখনকার পদ্ধতিতে এই নম্বরের উপর ভিত্তি করে গ্রেড দেয়া হয়।

তালিকা-৪

  ছাত্রের নাম     প্রাপ্ত নম্বর     মেধাক্রম     গ্রেড  
ছাত্র-১ ৯৩ A অথবা ৪.০
ছাত্র-২ ৭৭ B অথবা ৩.০
ছাত্র-৩ ৭৭ B অথবা ৩.০
ছাত্র-৪ ৭৬৩ বা ৪ B অথবা ৩.০

একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন যে সাধারণ মেধাক্রম পদ্ধতিতে একটা বড় দূর্বলতা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে শুধু ১ম, ২য়, ৩য় অবস্থান দেখে তাদেরকে সম-ব্যবধানে অবস্থিত মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে ১ম স্থান অধিকারী ২য় বা ৩য়'র চেয়ে অনেক বেশি ভালো। অন্য কোন ক্ষেত্রে (ধরুন যথাক্রমে ৯১, ৯০, ৬৬ নম্বর) ১ম ও ২য় হয়তো প্রায় একই নম্বর পেয়েছে কিন্তু ৩য় বা এর পরের ক্রমগুলোতে থাকা পরীক্ষার্থী এই দুইজনের চেয়ে অনেক পেছনে, যা শুধুমাত্র এই মেধাক্রম পদ্ধতিতে বোঝা সম্ভব নয়। অর্থাৎ আগের এই পদ্ধতিতে মেধার তূলনা করা যাচ্ছে না।

শোনা যায় একটি বাংলা উত্তরপত্র ফটোকপি করে অনেকজন শিক্ষকে দেয়াতে তাঁদের মূল্যায়নে বিরাট ব্যবধান দেখা গিয়েছিলো। এছাড়া একই লেখা সম্পন্ন খাতা পর পর দুইবার দেখলেও একই শিক্ষকের প্রদেয় নম্বরের সামান্য হেরফের হতে পারে। তাই এই সামান্য নম্বরের হেরফেরের কারণে দুইজন ছাত্রর মেধা আলাদা সেটা জোর গলায় দাবী করা যায় না (উপরের উদাহরণে ছাত্র-২, ছাত্র-৩ এবং ছাত্র-৪ একই মেধাসম্পন্ন)। এমনকি MCQ পদ্ধতিতেও কোনো কোনো ছাত্র আন্দাজে টিক দিয়ে সম মেধার আরেকজনের চেয়ে ২/১ নম্বর বেশি পেয়ে যেতে পারে। তাই সম মেধার ছাত্রদেরকে একই কাতারে রাখার জন্য গ্রেড পদ্ধতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো।

বাস্তব জীবনেও কিন্তু আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রেডিং তূল্য পদ্ধতি ব্যবহার করি। ১নম্বর মাল, দুই নম্বর কোয়ালিটি, ইত্যাদি কথাগুলো এজন্যই বহুল প্রচলিত। বিলাসবহুল বাসের টিকিট সবগুলোর একই মূল্য হলেও সবগুলো বাসে/সিটে কিন্তু আরাম/সুবিধা সমান নয়। আবার ইটের ভারবহন ক্ষমতা ৫০৪০ পাউন্ড/বর্গইঞ্চি (psi) হউক আর ৫১০০ psi হউক সেটাকে আমরা ১ নং মানের ইট বলি। আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সবসময় নম্বর প্রদানের মত নিঁখুত (!) পরিমাপ দেয়া সম্ভব নয় - সেসব ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্ধারিত একটা মাত্রা/তালিকা অনুযায়ী গ্রেডিং এর মত করে শ্রেণীবিভাগ করা হয় (যেমন ধরুন: ৫ তারকা হোটেল, ৩ তারকা হোটেল; বৈদ্যূতিক যন্ত্রের শক্তি সাশ্রয়ী রেটিং; ২নং বিপদ সংকেত, ৭নং বিপদ সংকেত; প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার ইত্যাদি)।

প্রায় একই ভাবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে প্রতিটা গ্রেডের একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। যেমন:

A গ্রেড (A+, A, A-)= Excellent বা অসাধারণ
B গ্রেড (B+, B, B-)= Very good বা খুব ভাল
C গ্রেড (C+, C, C-)= Average বা গড়পড়তা
D গ্রেড (D+, D, D-)= Passable বা পাশযোগ্য
কাজেই একটা নির্দিষ্ট উত্তরপত্রে ঠিক কত নম্বর পেলে সেটা অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখবে সেটা আপেক্ষিক এবং প্রশ্নপত্রের ধরণের উপর নির্ভর করে। অসাধারণ মেধার অধিকারীকে আলাদা করে চেনার মত প্রশ্নই যদি না থাকে এবং সবগুলো প্রশ্নই যদি গড়পড়তা মেধার ছাত্র সঠিক উত্তর দিতে পারে, তবে সেই পরীক্ষা পদ্ধতি ছেঁকে ছেঁকে মেধাবীদের আলাদা করতে সম্পুর্নরূপে ব্যর্থ হবে। ইদানিংকার SSC'র ফলাফল দেখে এই ব্যর্থতার কথাটাই বার বার মনে পড়ে যায়।

লক্ষনীয় হল যে এখনও গ্রেড প্রদানের আগে ছাত্রকে নম্বর প্রদান করা হচ্ছে। কারণ একাধিক উত্তর থেকে সবগুলোতে প্রদত্ত উত্তরের সমষ্টিগত ফলাফল পেতে নম্বরের বিকল্প নাই। এই একই কারণে লেটার গ্রেডের সমতূল্য গ্রেড পয়েন্টও দেয়া হয়ে থাকে যা সিজিপিএ (কম্বাইন্ড গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ) নির্ণয়ে কাজে লাগে। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষার উত্তরপত্রে নম্বরপ্রদান পদ্ধতির বিকল্প এখনও বের হয়নি।

রিলেটিভ গ্রেডিং; অ্যাবসলিউট গ্রেডিং

নম্বর পদ্ধতি খুব সুবিধাজনক হলেও এটার একটা বড় দূর্বলতা আছে, যা শিক্ষার্থীদেরকে ভোগাচ্ছে বহুভাবে; এই সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব হয়েছে গ্রেডিং পদ্ধতিতে। প্রথমে সমস্যাটা উল্লেখ করি: ভিন্ন ভিন্ন সময়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্ন প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে কোনো বছরে সহজ এবং কখনো অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন হতে পারে। স্বাভাবিক ভাবেই কঠিন প্রশ্নের সময়ে একই রকম মেধা সম্পন্ন পরীক্ষার্থীও বেশি নম্বর উঠাতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে অন্য ব্যাচের ছাত্রদের সাথে তার মেধার তূলনীয় মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না।

এই সমস্যা সমাধানকল্পে উপরের তালিকাগুলোতে দেয়া অ্যাবসলিউট গ্রেডিং (=নির্দিষ্ট নম্বর পেলে নির্দিষ্ট গ্রেড) পদ্ধতির পরিবর্তে রিলেটিভ গ্রেডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। কয়েকভাবেই এই রিলেটিভ গ্রেডিং প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রথম পদ্ধতিতে ক্লাসের সমস্ত ছাত্রদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ৫ জনকে বা ৫%কে সর্বোচ্চ গ্রেড দেয়া হবে, তারপর সেই নম্বর অনুযায়ী বাকীদেরকে একটা নির্দিষ্ট নম্বর পরপর পরবর্তী গ্রেড দেয়া হবে। কাজেই নম্বরের উপর নির্ভরশীল থাকলেও সহজ বা কঠিন প্রশ্নের সীমাবদ্ধতা এখানে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে এই পদ্ধতিটা আমার খুব বেশি পছন্দ নয়, কারণ প্রতি ব্যাচেই যে সম-মেধার ছাত্র ভর্তি হবে এটা সদাসত্য নয়। এমনও হতে পারে সঠিকভাবে পড়ানো এবং প্রশ্ন সহজ হওয়া সত্বেও বেশিরভাগ ছাত্র খারাপ করলো, কারণ তাঁরা আসলে তেমন মেধাবী নয় - তাই তাদের সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া উচিত নয়। আবার অন্য আরেক পরীক্ষায় স্ট্যান্ডার্ড কঠিন প্রশ্ন হওয়া সত্বেও ৫%-এর বেশি ছাত্র খুব ভালো নম্বর পেল ... অর্থাৎ নির্দিষ্ট ৫% এর চেয়ে বেশি ছাত্র সমান মাত্রার মেধার অধিকারী হওয়া সত্বেও কেউ কেউ সামান্য ১ নম্বরের জন্য সর্বোচ্চ গ্রেড পাবে না ... যেটা সঠিক মেধার মূল্যায়নের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করি।

আরেকটি পদ্ধতি হতে পারে গ্রেস নম্বর প্রদান। গণহারে সকলকে গ্রেস প্রদান নয়, বরং এই পদ্ধতিতে শিক্ষক ছাত্রদের সাথে তার মিথষ্ক্রিয়া বা পড়ানোর অভিজ্ঞতায় ঠিক করবেন যে এই ক্লাসের ছাত্রদের গড় মেধা আসলে কোন গ্রেডের অধিকারী। সেই গ্রেডের জন্য গড়ে যত নম্বর পাওয়া দরকার, সেটার সাথে ছাত্রদের প্রাপ্ত নম্বরের গড় তুলনা করে গড় গ্রেস নম্বরের পরিমান নির্ণয় করবেন। তারপর একটা অনুপাতের সূত্র ব্যবহার করে প্রতিটি ছাত্রের জন্য গ্রেস নম্বরের পরিমাণ বের করবেন। এতে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র যত নম্বর গ্রেস পাবে, সবচেয়ে কম নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র গ্রেস পাবে তার চেয়ে অনেক বেশি।

উল্লেখিত এই দুইটি পদ্ধতিই কাজ করবে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে, কারণ এখানে সরাসরি শিক্ষকগণই ছাত্রদেরকে মূল্যায়ন করে থাকেন। কিন্তু SSC/HSC অথবা নতুন শিক্ষানীতি অনুসারে কেন্দ্রীয়ভাবে যেই পরীক্ষাগুলো নেয়া হবে সেখানে যেহেতু মূল্যায়নকারী শিক্ষক সরাসরি সেই ছাত্রকে চিনবেন না, তাই রিলেটিভ গ্রেডিং-এর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতাটুকু ওনার থাকবে না। এজন্য ফিক্সড গ্রেডিং পদ্ধতির উপযোগী এমন প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে যেন অসাধারণ মেধার ছাত্রকে সাধারণ মেধার ছাত্র থেকে আলাদা করার জন্য নির্দিষ্ট নম্বরের প্রশ্ন থাকে। সাধারণ মেধার ছাত্র ঐ প্রশ্নের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষন বা উত্তর দিতে পারবে না, তাই অসাধারণ গ্রেডের উপযুক্ত নম্বরও পাবে না। যে কোন পরীক্ষাতেই এই রকম চিন্তাধারা থেকেই সঠিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয়।

গ্রেডিং পদ্ধতির ভিন্নতা কেন

পাঠক যদি এতদুর পর্যন্ত পড়ে থাকেন, তবে ইতিমধ্যেই এই ভিন্নতার বিষয়ে কিছুটা পরিস্কার ধারণা হয়েছে। এককথায় যদি এর কারণ ব্যাখ্যা করতে হয় তবে বলা যায়: বিভিন্ন স্তরের মেধার ছাত্রদেরকে আলাদা ভাবে চেনানোর জন্য যতটুকু নম্বর নির্ধারণ করা দরকার, পরিস্থিতির ভিন্নতা অনুযায়ী ততটুকুই নির্ধারণ করা হয়। আমার সীমিত অভিজ্ঞতা শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়া এবং পড়ানো সংক্রান্ত, তাই উদাহরণে ওগুলোই চলে এসেছে। আশা করছি, এগুলো অন্য বিষয়গুলোর (বাণিজ্য বা অন্যান্য বিভাগের) গ্রেডিং পদ্ধতির সাথে খুব একটা আলাদা হবে না। উপরের তালিকা-১ এবং তালিকা-৩ এ ভিন্নতার কারণ এভাবেই ব্যাখ্যা করা যাবে।

বুয়েটের আন্ডারগ্রাজুয়েটে যেই স্তরের চ্যালেঞ্জ সহ প্রশ্ন করা হয়, সেখানে অসাধারণ মেধা না হলে ৮০%+ নম্বর পাবে না। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানে একই স্তরের চ্যালেঞ্জ সহ প্রশ্ন করা হলেও অসাধারণ মেধা প্রমাণের জন্য ৯০%+ নম্বর পেতে হবে; কারণ পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতির ভিন্নতা। বুয়েটে পুরা পাঠ্যক্রম/সিলেবাসের উপরে ৩ ঘন্টার একটা ফাইনাল পরীক্ষা হয়, যাতে মোট নম্বরের ৭০% ওজন বরাদ্দ থাকে (বাকী ৩০% ক্লাস পার্ফর্মেন্স + কুইজ থেকে আসে)। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানে ২ ঘন্টার ফাইনাল পরীক্ষাতে এক তৃতীয়াংশ পাঠ্যক্রম/সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাকী দুই তৃতীয়াংশ দুইটি ১ ঘন্টার মিড টার্ম পরীক্ষাতে সম্পন্ন করা হয়। (ফাইনাল = ৩৫%; মিডটার্মদ্বয় = ২০%+২০%; কুইজ+এসাইনমেন্ট+ক্লাস পার্ফর্মেন্স=২৫%)। ছোট ছোট সিলেবাসে পরীক্ষার কারণে এখানে বেশি নম্বর তোলা অপেক্ষাকৃত সহজ। এই প্রতিষ্ঠানে যদি বুয়েটের মতই ৮০% এ অসাধারণ মেধার গ্রেড দিতে হয়, তবে পরীক্ষার সময়ের স্ট্রেস/চাপ-ও একই পর্যায়ের করতে হবে, অর্থাৎ মিড টার্ম বাদ দিয়ে সম্পুর্ন সিলেবাসের উপরে ফাইনাল পরীক্ষা নিতে হবে। মজার ব্যাপার হল, ৯০%-এ সর্বোচ্চ গ্রেড অনেকের কাছে কঠিন মনে হলেও এখান থেকেও প্রায় ব্যাচেই দুই/একজন এই গ্রেড তুলতে সক্ষম হয় -- সেটা পার্ট-টাইম শিক্ষক হিসেবে বুয়েট/ডুয়েটের সিনিয়র শিক্ষকদের কোর্সেও ঘটে।

সমস্যা

কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও বুয়েটের মত গ্রেডিং পদ্ধতি অনুসরণ করে (ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশনও এমনই গাইডলাইন দিয়েছেন); অথচ সেসব জায়গায় ফাইনাল পরীক্ষায় কিন্তু বুয়েট/ডুয়েট/চুয়েট/কুয়েট-এর মত সম্পুর্ন সিলেবাসের চাপ নিতে হয় না, কারণ মিড টার্ম পরীক্ষায় কিছু সিলেবাস সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে দেখা যায়, কম মেধার ছাত্র হওয়া সত্বেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রর গ্রেড পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের গ্রেডের চেয়ে বেশি হয় (অনেকটা SSC পরীক্ষার ফলাফলের মত)।

আর একই কারণে আমার প্রতিষ্ঠানে কম গ্রেড পাওয়া ছাত্রও ক্রেডিট ট্রান্সফার করে অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে গ্রেডের বন্যায় ভাসতে থাকে। আর এই রকম কোয়ালিটি কন্ট্রোলজনিত সমস্যার কারণে কিছু চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠানও একটা নির্দিষ্ট গ্রেডের চেয়ে কম পেলে আবেদন করার দরকার নাই বলে দেয় -- অর্থাৎ এর চেয়ে কম গ্রেড পাওয়া যাকে আমরা উপযুক্ত প্রকৌশলী হিসেবে সার্টিফিকেট দিচ্ছি সেটা তার প্রাপ্ত সম্মান পায় না। মজার ব্যাপার হল, আমাদের এখান থেকে সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতার (CGPA>2.25) চেয়ে কম গড় গ্রেডের ছাত্র অন্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে চলে গেলে শুধু যে বেশি গ্রেড পাচ্ছে (খুব ভালো B থেকে অসাধারণ A) তা-ই নয়, ওখানে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে নিয়ে যাওয়া আমাদের দেয়া গ্রেডকে ওদের নম্বর পদ্ধতিতে ফেলে নতুন গ্রেডও দেয়া হচ্ছে!!

শিক্ষকতার আদর্শ থেকে সরে গিয়ে শুধুমাত্র শিক্ষা-বাণিজ্য কেন্দ্রিক এই কোয়ালিটি কন্ট্রোল দীর্ঘমেয়াদে দেশকে কী পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে ভাবতেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কোয়ালিটি সম্পন্ন শিক্ষক ছাড়া, কোনোরকম ল্যাবরেটরি ছাড়া (কোচিং-এ খারাপ মান + কোয়ালিটি কন্ট্রোলেও খারাপ মান) শুধুমাত্র সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে যাদের ডিগ্রী দেয়া হবে, সেই তথাকথিত ইঞ্জিনিয়ারের নকশা করা ভবন ফেটে যাবে, হেলে যাবে, ভেঙ্গে পড়বে; তথাকথিত ডাক্তারের রোগী আর সুস্থ হবে না। এখনই এই দেশে গুণীর কদর নাই ... ... ... আর এ অবস্থা চলতে দিলে শিক্ষিত লোকের শিক্ষাকে সমাজ আর মূল্য দেবে না। উল্লেখ্য যে বিদেশের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এরকম অবস্থা বিরাজ করে।

চাকুরীর বাজারে, নিয়োগকর্তার গ্রেডিং পদ্ধতির মূলনীতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকাটাও একটা বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করছে। সকলেই লেটার গ্রেডের বদলে নিউমেরিকাল গ্রেড দেখতে চায় এবং একটির সাথে অপরটির তুলনা করে। অথচ এই গ্রেডিং পদ্ধতি সব জায়গায় এক নয়, এক হতে পারে না। বরং লেটার গ্রেডটিই ছাত্রটির আসল মেধা সম্পর্কে বলে দেয় -- সে কি অসাধারণ, নাকি খুব ভালো, নাকি গড়পড়তা ইত্যাদি। কিন্তু যখন সিজিপিএ ৩.০ এর নিচে আবেদন করতে নিষেধ করা হয়, তখন বাণিজ্য-মূখী কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কম মেধার অথচ বেশি গ্রেডের ছাত্র সেখানে আবেদন করতে পারে, অথচ বুয়েটের অপেক্ষাকৃত মেধাবী ছাত্র আবেদনের যোগ্য বিবেচিত হয় না! সেলুকাস!

কিছুটা অফটপিক, কিছুটা ভিন্নমত


প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা কি সত্যই মেধা যাচাই করতে পারছি? আমার সহপাঠিগণ বিদেশী নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গ্রেড পেয়েছে, বুয়েটে তার চেয়ে অনেক কম গ্রেড পেয়েছিলো। এছাড়া কিছু কিছু বিষয়ের পরীক্ষায় ঠিক কোন ধরণের মেধা যাচাইয়ের লক্ষ্যে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয় সেটাই ভেবে পাই না। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষাগুলোতে দেখেছি, মুখস্থ বিদ্যা ছাড়া ভাল গ্রেড পাওয়া অসম্ভব। মুখস্থ করার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে এক প্রকার মেধা, এবং কর্মক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তাই বলে ম্যাথ পরীক্ষায় মুখস্থ! ম্যাথের উদ্দেশ্য কি মুখস্থ? সেখানে সমাধানের দাড়ি, কমার জন্য নম্বর কাটতো!

শুধুমাত্র ভাল অংক করতে পারলেই মেধাবী -- এমন একটা ভুল ধারণার প্রচলন আছে এদেশে। ভিন্ন ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা ও মেধার প্রয়োজন হয়। ভাল ডিজাইনার হওয়ার জন্য মার্কেটিং করার মত মেধা না থাকলেও চলবে, আবার যে ম্যানেজমেন্টে দক্ষ তার মেকানিকসে জ্ঞান/মেধার প্রয়োজন নাই। পরীক্ষার খাতায় লেখে ফাটিয়ে ফেললো, গ্রেডের বন্যায় ভেসে গেল অথচ কর্মক্ষেত্রে একটা সিদ্ধান্ত নিতে কাঁপাকাঁপি লেগে যায় ... এ ধরণের মেধার আদৌ কি খুব প্রয়োজন আছে?

আমার ধারণা, মেধা হল ক্ষমতার পরিমাপ; আর জ্ঞান হল সেই ক্ষমতা কতটুকু ব্যবহার করা হল তার একটা পরিমাপ। পরীক্ষার গ্রেডকে মেধার পরিচায়ক রূপে ব্যবহার করলেও আসলে এটা তার জ্ঞানের প্রতিফলন, মেধার প্রতিফলন নয়। অন্যভাবে বললে, একটা নির্দিষ্ট রাস্তায়, রাস্তার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দুইটি গাড়ি যদি ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে চলে ... তা থেকে দুইটি গাড়িই সমান ক্ষমতার বলে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না, কারণ একটি গাড়ি হয়তো এর ইঞ্জিনের সমস্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেছে, অন্যটি এর অর্ধেক ক্ষমতা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র যদি পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে থাকে কিংবা তার কোন বিপদ ঘটে থাকে তবে বিদ্যমান পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফলাফলে তাকে নিম্ন মেধার মনে হবে। আবার দেখুন স্কুলে কিছু সহপাঠি সবসময় পেছনের সারির ফলাফল করলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের অধীনে তথাকথিত মেধাবী ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদিরা চাকুরী করছে। মেধা না থাকলে শুধুমাত্র চাচা/মামার জোরে কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। বিদ্যালয়ের গৎ বাধা লেখাপড়া তাকে ঐ বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে পারেনি, তাই তার মেধা সে সেখানে প্রয়োগ করেনি। আবার, লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র কর্মক্ষেত্রে লবডংকা -- এমন উল্টা ঘটনাও দেখা যায় অহরহ!

এরকম হওয়ার কারণ হতে পারে - আমাদের লেখাপড়া পুরোপুরিভাবে কর্মমূখী শিক্ষা নয়। ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারী, আইন ইত্যাদি পেশাদার লেখাপড়া থাকা সত্বেও এই ধরণের (কর্মমূখী নয় অথবা কার্যক্ষেত্রের চাহিদা পূরণ করে না) অভিযোগ আসতে থাকলে, লেখাপড়া এবং এই মেধা যাচাই পদ্ধতির সার্থকতা সম্পর্কে আরেকটু চিন্তাভাবনা করার ইন্ধন যোগায়।