বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০০৭

হায়রে বাংলা ভাষা

ভাষাভিত্তিক জাতি আমরা। বাংলা ভাষা বলা হয় এই দেশে তাই এটা বাংলাদেশ। এই দেশের উৎপত্তির অন্যতম একটা ইস্যূ ছিল ভাষা। সেই ভাষাই যখন বিকৃত ভাবে উপস্থাপিত হয় সেটা দেখতে মন খারাপ লাগেই। যেমন অনেক সময় দেয়ালের লিখনে দেখি "জাতিয়" বানান ... মনটা এ্যাত যে খারাপ লাগে। "জাতীয়" বানানটা এমন -- কিন্তু সেই বানানটারই জাত মেরে দিয়েছে .... পরোক্ষ ভাবে এই প্রিয় ভাষা, যার জন্য এত মানুষ আবেগপ্রবণ হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে সেই মানুষগুলোর আবেগ, বিবেচণাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করা হয় বলেই মনে হয়। জাতিয় বানানটা নিশ্চয়ই আঞ্চলিকতার ধোপে শুদ্ধ হবে না। (কিছুটা এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা হয়েছে প্রজন্ম ফোরামে: http://forum.projanmo.com/t921.html)।

তবে এই লেখাটার উদ্দেশ্য লিখিত ভাষা নয়, বরং কথ্য ভাষা সম্পর্কে।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু প্রাসঙ্গিক কিছু উদাহরণ লিখি। ভারতীয়দের ট ট মার্কা ইংরেজী শুনে ইংরেজী ভাষা-ভাষীগণ মুখ টিপে হাসে। যদিও চমৎকার ইংরেজি বলেন এমন ভারতীয় প্রচুর। কিন্তু মিডিয়াতেও সেইরকম হাস্যকর ইংরেজি আসছে। বিবিসির একটা প্রামান্যতে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের ইংরেজি ভাষ্যর নিচে ইংরেজি সাবটাইটেল ছিল ..... !! ইংরেজি থেকে আসা শব্দগুলোর অপভ্রংশকে ওরা ইংরেজি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ইউটিউবের একটা রেসিপি ব্লগে শুনলাম টম্যাটোকে তেমাটার বলছে!!

একই কথা প্রযোজ্য সাধারণ জাপানিদের ইংলিশ শুনলে। ইংরেজি বেড (বিছানা) ওরা বলবে বেদ্দো!! তাছাড়া ল উচ্চারন করতে পারে না বিধায় ল যুক্ত সকল শব্দই হয়ে যায় র!! মালিহাকে বলে মারিহা!! ব্যাপারটা দারুন কৌতুককর। এটা জাপানিগণও জানে। তাই ওরা সহজে ইংরেজি বলতে চায় না .... জানা থাকা সত্ত্বেও।

যতদুর বুঝি আমেরিকান, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ডের .... কোন জায়গার কথ্যটাই স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ নয়। ব্যক্তিগত লেভেল যেভাবেই বলা হউক, কিন্তু প্রচার মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড ভাষা হওয়া উচিৎ বলে মনে করি। দেশে বা বাইরে, প্রায় সকল নামকরা চ্যানেলগুলোর খবরেই ইংরেজি একই রকম -- নিজের উচ্চারন ঠিক করার চেষ্টা করি ওগুলো শুনে।

কিন্তু আমাদের এত আবেগ ঘেরা, আত্মত্যাগের ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষাতেই আমাদের বিকৃতি দেখি প্রচার মাধ্যমে। আঞ্চলিক ভাষাগুলো বাংলা ভাষার একটা অংশ... কোন সমস্যা নাই আমার সেটাতে। আঞ্চলিক ভাষা শুনলে মনে হয় দেশের কথাই শুনছি ..... খারাপ লাগে না কোনক্রমেই। ভাষাটাও পরিবর্তনশীল - কাজেই উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি পাল্টাবেই ---- ৫০ বছর আগের বাংলা আর এখনকার ভাষা তো এক নয়, কাম্যও নয়। কিন্তু তার পরেও কিছু কিছু ব্যাপার মনের মাঝে খচখচ করতে থাকে।

বাংলা রেডিও চ্যানেলগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝে এন.এইচ.কে. (জাপানের) থেকে খবর শুনতাম আগে। বিকৃত ভাষা শুনে রাগে গা জ্বলে যায়। ফীড ব্যাক ফর্মে জানিয়েছিও। কিন্তু যেই আর সেই .... .... অসহ্য... তাই ওটা এখন আর শুনিনা।

আরেকটা হল, ইদানিংকার কিছু দেশি চ্যানেল.... ফুর্তি? মেট্রোওয়েভ?... আমি নামগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত নই। এক বা দুইদিন শোনার পরে আর শুনিনা। দেশের কথা/ গান শুনতে গিয়ে মেজাজ খারাপ করার কোন মানে নাই -- এর চেয়ে না শোনা ভাল। শুধু বলব, এদের উপস্থাপকের বাংলা শুনলে মনে হয় সংশপ্তক নাটকের লর্ড ক্লাইভ বাংলা বলছে........ অসহ্য লাগে।

মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০০৭

ফিল্ডওয়র্কে গুরুত্বপূর্ণ তুচ্ছ ব্যাপারসমূহ

বেশ কিছু ছোট ছোট বিষয় মাঝে মাঝে বড় মনে হয়। বেশ কিছুদিন আগে চাপাইনবাবগঞ্জ শহরের কাছে চুনাখালি গ্রামে গেলাম কাজ করতে। মূল কাজ নলকূপের পানির নমূনাসংগ্রহ বা স্যাম্পলিং। ওখানকারই একটা ছোট ছেলে স্বত:প্রনোদিত হয়ে প্রচুর সাহায্য করছিল। অবশ্য আমাদের সাথে কৌতুহলীদ্দপক পদার্থ হিসেবে জাপানী ছাত্র ও প্রফেসর ছিলেন, সাথে ছিল অনেক যন্ত্রপাতি - সুতরাং উৎসাহি দর্শকের অভাব ছিল না। যেখানেই যাচ্ছিলাম, মোটামুটি একটা মিছিল সহযোগেই যাচ্ছিলাম। যা হোক, আমাদের গ্রুপের একদল, মানে দুই জন, একজায়গায় বসে ফিল্ডকিটের সাহায্যে পানির আর্সেনিক পরীক্ষা করছিল। আর অপরদল, আমরা ঘুরে ঘুরে পানি সংগ্রহ করে কিছু অংশ পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম সেখানে - ঐ ছেলেটি বার বার যাওয়া আসা করে স্যাম্পলগুলি দিয়ে আসছিল। আমরা অন্য সব পরীক্ষা করছিলাম আর চাপকলগুলির জি.পি.এস. অবস্থানও রেকর্ড করছিলাম।

যা হোক, দু-দিনের কাজ শেষে প্রফেসর বললেন যে ছেলেটিকে কিছু টাকা দিবেন। যথারীতি ছেলেটাকে গাড়ীতে তুলে সবার আড়ালে টাকা দেয়া হল - যেন সে টাকা নিচ্ছে এটা লোকজন দেখলে সে লজ্জা না পায়। ক্ষুদ্র যে ব্যাপারটি আমি খেয়াল করলাম, সেটা হল টাকাটা যতদুর সম্ভব ছোট নোটে দিলাম (১০-২০ টাকার নোট): কারণ ঐ ছেলেটা টাকা পেয়েছে এটা অনেকেরই গাত্রদাহের কারণ হতে পারে। অপরদিকে, যখন ও কোন দোকানে কিছু কিনতে যাবে, বড় নোট দিলে অবধারিতভাবেই প্রশ্ন এসে যেতে পারে, এ্যাত টাকা সে কই পেল। তারপর কথাটা ছড়িয়ে যাবে, যেটা অনেকক্ষেত্রেই ছেলেটির ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ছোট নোট -- ব্যাপারটা অতি তুচ্ছ হলেও আমার কাছে জরুরী মনে হয়েছিল। আবার, যেই ব্যক্তি আমাদের সাহায্য করেন, তাঁকে টাকা দেয়ার সময় বলতাম চলেন একটু পানি খাওয়ান, আপনার কূয়ার পানি আমার খুব ভালো লাগে -- বলে বাসার ভেতরে গিয়ে, সবার থেকে আড়ালে টাকা দেয়া হত।

আরেকটি ব্যাপার। আমাদের ফিল্ড ট্যূরগুলির একটা বৈশিষ্ট হল, প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই একটা স্থায়ী রেফারেন্স মানুষ থাকেন। কারণ আমরা মূলত আর্সেনিক দূরীকরণের যন্ত্র স্থাপনের পর সেগুলো মনিটরিং বা মেইনটেনেন্সের কাজেই যেতাম। এর আগে যতবারই কোথাও ফিল্ডট্যুরে যাওয়া হত, দুপুরের খাবার দোকান থেকে আনিয়ে নেয়া হত। তারপর সেইসকল গুরুপাক আর পচা তেলের খাবার খেত সবাই ... অবশ্য তেল এড়ানোর জন্য রুটি, ডিমভাজি বা সিঙ্গারাও খাওয়া হত। ঠিক করলাম যে, যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই খাওয়ার আয়োজন করতে হবে। যেইখানে যাই, ওখানেরই একজনের বাসায় খাই, বিনিময়ে হোটেলে খেলে যেমন টাকা খরচ হত সেটা দিয়ে দেই। অনেকগুলো সুবিধা তাতে, প্রথমত: দোকানে কি পাওয়া গেল না গেল তা নিয়ে চিন্তার কারণ নাই; রান্নার উপাদানের মান নিয়ন্ত্রত; টাকাটার প্রবাহ কার্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকল; ঘনিষ্ঠতা বাড়ল; ওখানে সাময়িক হলেও একটা কর্মসংস্থান হল। অফিসের মোটামুটি সকলেই ব্যাপারটা সমর্থন করল ... .. কিন্তু আগে থেকে কেউই এই নিয়ে নিজ থেকে কিছু বলেনি। অভিজ্ঞ সমাজ-বিজ্ঞানীদের (সোশাল সায়েন্স থেকে পাশ করে রিসার্চার হিসেবে সহকর্মী) সাথে আমার ফিল্ডে চাকরী করার পূর্ব অভিজ্ঞতাই কি এই ধরনের সামাজিক সমাধান খুঁজে বের করার জন্য দায়ী ? -- হতে পারে.. ... অভিজ্ঞতা তাই এ্যাত মূল্যবান।

শুক্রবার, ১৮ মে, ২০০৭

এক্সাইটিং সময়!

ইদানিং ভীষন একটা এক্সাইটিং সময় পার করছি। এক্সাইটিংই বলা যায়। কারণ আমার থিসিস ডিফেন্স করার প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলছে। এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই থিসিস আউটলাইন আর শিরোনাম নিয়ে একবার পরীক্ষকদের সামনে প্রেজেন্ট করতে হল। ওনারা আমার এ পর্যন্ত হওয়া সমস্ত প্রকাশনাগুলোর গুণগত মান পরীক্ষা করলেন। কোথায় প্রকাশিত হয়েছে তা পুঙখানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রায় দিলেন .. হ্যাঁ এই ছাত্র ডিগ্রী আবেদন করতে পারে। এসকল শেষ করতে করতে মে মাস চলে আসল। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে জাপানে পরপর ৪ দিনের বিভিন্ন ছুটি থাকে; তার সাথে সপ্তাহান্তের দুদিন যোগ করে মোটামুটি টানা এক সপ্তাহ ছুটি পাওয়া যায়। এজন্য এ সময়টাকে গোল্ডেন উইক বলা হয়, সারাবছরে এত বড় ছুটি আর নেই। তাই সকলেই এই সময়ে বিভিন্ন রকম বেড়ানোর পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত করে। সমস্ত বেড়ানোর জায়গাগুলোতেও ব্যবসা হয় রমরমা। প্লেনের ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়াও সিজন হিসেবে বেশি থাকে। যাই হোক, এবছর আমারও কয়েকটা জায়গায় বেড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। তাছাড়া জাপানে এটা আমার সম্ভবত শেষ বছর, বউও ফেরৎ চলে যাবে কয়েকদিন পরেই - ওর ভাইয়ের বিয়েতে অংশগ্রহন করে আমার আসার অপেক্ষা করবে বলে। কিন্তু ছুটি শুরুর ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় আমাকে জানানো হল যে থিসিসের একটা খসড়া জমা দিতে হবে। তাও আবার ঠিক চার দিন পরে, যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে ঠিক সেদিন। পূর্ব পরিকল্পিত বেড়ানো কাট-ছাট করতে হল, কিন্তু পুরোপুরি বাদ দেয়া গেল না। দিনে বেড়িয়ে রাতে কাজ। রাত জেগে জেগে মোটামুটি দাঁড় করালাম থিসিসের ড্রাফট। কি যে লিখেছি নিজেই ঠিকমত জানিনা .... শুধু কোনরকমে জমা দেয়ার মত একটা কিছু প্রস্তুত করা।

ইতিমধ্যে চারজন পরীক্ষক ওটা দেখে উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিয়েছেন। ওগুলো সমন্বয় করে তারপর আবার জমা দেয়ার মাঝখানে তিন সপ্তাহ সময়। এর মাঝেই ডিগ্রীর জন্য আবেদনপত্র জমা দিতে হল। সে আরেক ঝক্কি। সমস্ত ফরমগুলো জাপানিতে। ওগুলোর সফটকপি থেকে জাপানিগুলো কপি করে ইন্টারনেটের ট্রানস্লেশন সাইট থেকে কিছুটা ইংরেজি করে করে অর্থ বুঝার চেষ্টায় গেল দুই দিন। যা হোক আমার প্রফেসরের আন্তরিক সহায়তায় ওগুলো পূরণ করা গেল.... বেশিরভাগ কাজ প্রফেসরই করে দিলেন। এখন থিসিসটার পরবর্তী পর্যায়ের উন্নয়নমূলক কাজ করছি। এর পরে এটা চুড়ান্ত রূপে আসার আগে আরোও দুইবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরামর্শ-উন্নয়ন হবে। আমন্ত্রিত এক্সামিনারগণ দেখবেন। তারপরে ফাইনাল ডিফেন্স।

আরো একটা ডিগ্রীর ছোঁয়া অনুভব করছি... তাই এ্যাত খাটুনির পরেও এক্সাইটেড লাগে। আশা করছি, এর ফলে ভবিষ্যত কর্মক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাব .... দেখা যাক।

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০০৭

শ্রোতার বিবর্তন

এখন দেশ থেকে দুরে থাকি। দেশের গান টাটকা শুনতে পারি না, আর জানিওনা যে কোন কোন নতুন গায়ক/গায়িকা/ব্যান্ড আসছে, ঝড় তুলছে। ভরসা ইন্টারনেট। তাছাড়া গত ৩ বছরে প্রায় ১২ বার দেশে গিয়েছি গবেষণার স্যাম্পলিং এর কাজে, প্রতিবারই কিছু এম.পি.থ্রী বা ভিডিও সিডি/ডিভিডি নিয়ে এসেছি। আরও এনেছি বেশ কিছু ক্যাসেট - যে গাড়ীটা ব্যবহার করি, ওটা বেশ পুরানো মডেল। শুধু ক্যাসেট প্লেয়ার আছে। এখন অবশ্য সিডি প্লেয়ার থেকে সেখানে গান বাজানোর একটা সিস্টেম করেছি। তাই গানের প্রবল অভাব অনুভব করি না।

বিবর্তন বলতে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন বুঝায়। আমি শ্রোতা হিসেবে আমার পছন্দের বিবর্তনকে ক্রোনোলজিকাল অর্ডারে দিলাম।

আম্মার কাছে গল্প শুনেছি... যখন গ্যাদা বাচ্চা ছিলাম তখন নাকি সেজ চাচা রেডিওতে গান ছেড়ে দিয়ে আমার সামনে এসে লিপসিং করত। আমি হা করে দেখতাম। হয়ত ভাবতাম, আহারে এই লোকটা কত ভাল গান গায় ..... ...

যখন বেশ ছোট ছিলাম: প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন বাসায় গান শুনতো ছোটচাচা। বিভিন্ন রকম হিন্দি গান, নজরুল আর রবীন্দ্র আর অাধুনিক। ওনার গলায় গান শুনে নিজেরও ওভাবে গাইতে ইচ্ছা করত। তখন শুনতাম: আমি চিনি গো চিনি তোমারে....; আমি দুর হতে তোমারে দেখেছি ইত্যাদি গান। ভূপেন হাজারিকা'র গানও ভাল লাগত শুনতে। আবার হেমন্তের ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে... মুখস্থ ছিল।

হাইস্কুলের শেষের দিক ছিল ব্যান্ডের যুগ। ঈদের সালামি দিয়ে শুধু ক্যাসেট কিনতাম ..... চাইম, ফীডব্যাক, উইনিং, ডিফরেন্ট টাচ, অবসকিওর শুনতাম খুব। তারপর হলাম এল.আর.বি'র ভক্ত। সাথে সাথে ইংলিশ রক শুনতাম খুব। তবে সেটার সোর্স ছিল প্রতিদিন দুপুরে রেডিওর ওয়র্ল্ড মিউজিক অনুষ্ঠানটি। দুইটা সিনেমার ট্রেইলার শুনে ওয়র্ল্ড মিউজিক মিস করতাম না বাসায় থাকলে। মূলতঃ সেখান থেকেই বিভিন্ন বিদেশী শিল্পীর গান পছন্দ করা শুরু করলাম।

আব্বার ঝোক ছিল মারেফতি বিষয়ের প্রতি। তাই উনি গিয়ারে থাকলে, ক্যাসেটপ্লেয়ার ফ্রী-পাওয়া যেত না। তখন লালণগীতি এবং অন্যান্য বাউল সংগীত খুব বাজত বাসায়। আবার কখনো ডেকে জোর করে তা শুনানো হত। আশেপাশে শেয়ার করার কাউকে না পেয়ে লালণগীতির মর্মকথা আমাকেই ব্যাখ্যা করে শুনাতো। আমি আব্বার মন রক্ষার্থে সেসব চিরতার পানির মত গিলতাম। অবস্থা এমন দাড়িয়েছিলো যে, মনে লালনগীতি ভীতি ঢুকে গিয়েছিলো। স্কুল থেকে বা খেলা শেষে বাসায় ফেরার সময় দুর থেকে লালন বা বাউল বাজতে শুনলেই, বাসায় ঢোকার সময় বেড়ালের মত নিঃশব্দে ঢুকে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে বাইরে ভেগে যেতাম! বা চুপে চুপে থাকতাম বাসায়।

১৯৯০ সালে এস.এস.সি. পাশ করলাম। এরপর নটরডেম কলেজে ভর্তি হলাম। বাসা মিরপুর ১১তে। প্রতিদিন বাসা টু কলেজ আসা যাওয়া করে আর কলেজের পড়ার চাপে সব সময় আর গান শোনার শক্তি থাকত না। তারপরেও যাওয়া আসার পথে গুলিস্থানের স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে ক্যাসেট কিনেছি মাঝে মাঝে। রেডিওর ওয়র্লড মিউজিকে গান শুনেছিলাম, তাই কিনলাম Def Leppard ব্যান্ডের একটা ক্যাসেট। ভাল কোয়ালিটির ক্যাসেট বলে দাম নিল ৯০ টাকা, যেখানে সাধারণ ক্যাসেটের দাম ছিল ৩৫-৪০ টাকা। গান শুনে তো মুগ্ধ। এরপর একে একে Iron Maiden, Metallica, AC DC কিনলাম। তাছাড়া অন্যান্য পুরানো হেভী মেটাল ব্যান্ডের গানও শুনতাম। পাশাপাশি Rap শুনতেও খারাপ লাগত না তেমন --- তবে সেই ভাল লাগা খুব বেশি স্থায়ী হয়নি; এটা মাঝে মাঝে শুনতে ভালই লাগে।

এরপর বুয়েট লাইফ.... সেখানেও হেভী মেটাল, হার্ড রক। গীটার শেখার চেষ্টা করলাম একবার। ৩ মাস নীলয় দাসের ওখানে ক্লাসও করলাম। তারপর ভাগারাম। ৩য় বর্ষের শেষের দিকে আর ৪র্থ বর্ষে আস্তে আস্তে আবার মান্না দে, কিশোর .. এদের গান শুনা শুরু করলাম। যদিও হেভী মেটাল ভক্তদের ওসব প্যানপ্যানানি ভাল লাগার কথা না, আমার কাহিনীটা একটু অন্যরকম। রূমমেট ও ব্যাচমেট ও ক্লাশমেট আবীর শুনত ঐ গানগুলো। শুনতে শুনতে দেখলাম আমারও ভাল লাগতে শুরু করল। আফটার অল ছোটকালে আমার ছোটচাচাও এই গানগুলো শুনতেন। তাই হয়ত পাশ করার পর প্রেমে পড়তে মন চাইল, চাকরী পেলাম। বিয়ে করলাম।

বিয়ের পর গানের জগতে আরো কিছু যোগ হল। জাগজিৎ সিং-এর গজল; প্রথম দিকে ভাল লাগত না... এখন মন্দ লাগে না। বউয়ের পছন্দে বাপ্পার গান শুনলাম। শুনেই তো হিট ..... আসলে এর আগে টিভিতে দলছুট ব্যান্ডটার পারফর্মেন্স দেখে খুব ভাল লেগেছিল। তাই দলছুটের ভোকালিস্ট দেখে একটা আকর্ষন তো ছিলই। এখন আমি বাপ্পার গানের একজন ভক্ত। তাছাড়া কুমার বিশ্বজিতের গানও এভাবে ভাল লাগায় স্থান করে নিল। রেঁনেঁসা ব্যান্ডটা সবসময়ই ভাল লাগত - বলা হয় নি আগে।

এখন বয়স বাড়ার সাথে সাথে মনের চাহিদা পরিবর্তন হচ্ছে... তাই পছন্দের গানের ব্যাপ্তিও বেড়ে যাচ্ছে। কিছু গান ভাল লাগে মিউজিক কম্পোজিশনের জন্য। কিছু গান ভাল লাগে কথার জন্য। তবে কোন একটা গান ভাল লাগার পেছনে আমার মনে হয় মনের অবস্থাটা সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। এখানে উল্লেখিত শিল্পী/ব্যান্ড ছাড়াও আরো অনেক গানই আমার পছন্দ; সবগুলো পছন্দ হয়ত লেখাতে আসেনি। এ পর্যন্তই........


বুধবার, ১১ এপ্রিল, ২০০৭

সুইজারল্যান্ডের এক কোনা ভ্রমনের বিশাল অভিজ্ঞতাঃ পর্ব-৩ (যাত্রা হল শুরু)

(....পূর্বের পর্ব হতে চলমান)

কোনরকম ঝুট ঝামেলা ছাড়াই চেক ইন করলাম। আমার ফ্লাইট ছিল বিমানে ঢাকা থেকে মুম্বাই, তারপর ৫ ঘন্টা ট্রানজিট, আর তারপর সুইস এয়ারে মুম্বাই থেকে যুরিখ। ঝামেলা পাকাল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। অযথা হয়রানী করল, ঘুষ দাবী করল। এটা আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ .... ভয় পাইছিলাম; ঘুষ দিলাম, সাথে দিলাম একগাদা গালাগালি (মনে মনে অবশ্য)। পরের ছোট্ট ঝামেলা স্টীলের কাটাচামচ .... ঐটা ফেলে দিতে হল বোর্ডিঙের সিকিউরিটি চেকিঙের সময়।

প্লেন টেক অফ করার সময় তো অবস্থা যায় যায় .... ... প্রথমেই দেখাল কিভাবে সীট বেল্ট বাঁধতে হয়, তারপর জরুরী অবস্থায় করণীয় – ভয় লাগা শুরু করল..... এ্যাত কিছু দেখাইতেছে কেন? বিপদ কি আবশ্যম্ভাবী? তারপর টেকঅফের জন্য বাতি নিভায় দিল; আশেপাশের সহযাত্রীরা দেখলাম বিকারহীন; ওনাদের দেখে মনে সাহস নিয়ে বসে থাকলাম। রানওয়ের মাথা থেকে যখন ছিলা মুক্ত তীরের মত ছুটা শুরু করল প্লেনটা তখন যে কিরকম অনুভুতি হয়েছিল বোঝানো মুশকিল ..... প্রথমবার রোলার কোস্টারে চড়ার মত (তখনো একবারও চড়িনি)।

বিমানে কি যে খাওয়াইছিল মনে নাই এখন। তবে যে জিনিসটা অবাক করেছিল সেটা হল সীটের সাইজ .... তেমন একটা আরামদায়ক না ... টিভি বিজ্ঞাপনগুলাতে যেরকম দেখায় তার সাথে মিল নাই একটুও! তাছাড়া আছে গোঁ গোঁ বিরক্তিকর একটা শব্দ। জানালা দিয়ে বাইরে কেমন দেখায় দেখতে খুব ইচ্ছা করছিল কিন্তু আমার সীটটা ছিল মাঝের দিকে.... জানালা থেকে অনেক দুরে।

সময়মত মুম্বাই পৌছালাম। ল্যান্ড করার সময় আরেকবার আতঙ্কিত হলাম। প্লেন থেকে নেমে বোর্ডিং ব্রীজ থেকে করিডোরে পা রাখা মাত্র দেখলাম একজন সুন্দরী এয়ারপোর্ট স্টাফ সুইস এয়ার সুইস এয়ার বলে ডাকছে .... মিরপুর, গুলিস্থান বাসের হেলপার/ কন্ডাকটরদের সাথে এর কোন তুলনা চলে না। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম যে, আমি সুইস এয়ারের যাত্রী। আমাকে বলল ওনাকে ফলো করতে .... আর জিজ্ঞেস করে জানলাম আমিই একমাত্র যাত্রী বিমান থেকে সুইস এয়ারে যাব – আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এই আশায় যে কোন দেশী সহযাত্রী পাইলে একটু ভাল লাগত এই আশায়। যা হোক ঐ মহিলাকে দেখে অন্ততপক্ষে এটুকু আশ্বস্ত হলাম যে, আমি একেবারে অবহেলিত না । এখন বুঝতেছি যে, এয়ার টিকিট আনার সময় আমার আনকোরা পাসপোর্ট দেখে সুইস এয়ারের ট্রাভেল এজেন্ট “সাহায্য দরকার, প্রথমবার আকাশপথে ভ্রমনকারীঁ” - এ ধরনের একটা অনুরোধ করে রেখেছিলেন।

এয়ারপোর্ট স্টাফের সাথে একটা লম্বা করিডোর দিয়ে হেটে চলছি তো চলছিই..... বামপাশে গ্লাস প্যানেল, প্লেন, রানওয়ে আর অন্যান্য জিনিস দেখা যাচ্ছে, আর ডান পাশে দেয়াল। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা হয়ে গেল ........... শেষ পর্যন্ত ট্রানজিট লাউঞ্জ নামক একটা জায়গায় এসে পৌছালাম। ওখানের ট্রান্সফার ডেস্কের স্টাফকে গিয়ে এই মহিলা স্টাফ কি জানি বলল; আমার হাতে একটা খাওয়ার কুপন ধরায় দিয়ে বলল রাত ৮টা থেকে ১১টার (?) মধ্যে পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করে নিতে আর সময়মত পরবর্তী প্লেনে চড়তে। তারপর এ্যাতবড় লাউঞ্জে যাত্রী হিসেবে আমি একা - আর ট্রান্সফার ডেস্কে একজন কর্মকর্তা ।

৫ ঘন্টা যাত্রাবিরতি ছিল .... .... তার মধ্যে ঐ রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে এসেছি (যতদুর মনে পড়ে, বুফে সিস্টেম ছিল).... ... বাকী সময়টা যে কি বিরক্ত লাগছিল: বলার মত না। যা হোক, নির্দিষ্ট সময়ে পরবর্তী প্লেনে চড়লাম। এবারও সীট মাঝখানের দিকে তবে চলাচলের রাস্তার সাথে (আইল সিট)। আগেরটা ছিল ৩ কি সাড়ে ৩ ঘন্টার যাত্রা.... আর এটা সম্ভবত ৭ ঘন্টার। কি যে বিরক্তিকর। একে তো সীট আটোঁসাটো, গোঁ গোঁ শব্দ (ফ্লাই এমিরেটস-এর বিজ্ঞাপনওয়ালারা যে কি বিরাট মিথ্যূক!) তার উপর গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে খারাপ আবহাওয়া, টার্বুলেন্স .... .... মনে হল ঢাকা-উত্তরবঙ্গের বাসও এত ঝাকায় না (সীটও এর চেয়ে আরামের)-- শালার প্লেন ভ্রমন! আধো অন্ধকারে দেখলাম কেউ কেউ এর মধ্যে ঘুমাচ্ছে ... .... আমি মাঝে মাঝে হাটছি, একটা বন্ধ এক্সিট দরজার সামনে দাড়িয়ে, মাঝখানের জানালার মত জায়গা দিয়ে বাইরেটা দেখছি মাঝে মাঝে। আকাশের উপরটা অদ্ভুদ রকম মায়াবী। প্লেনের নীচে বিরাট একটা মেঘের সমুদ্র, উপরে চাঁদ, চারিদিকে জোৎস্না।

আরো কিছু পরে ঝাকুনি থেমে গেল, কিন্তু বিরক্তিকর শব্দটা থামল না। সামনের একটা স্ক্রীনে প্লেনের যাত্রাপথের মানচিত্র, আর তার মাঝে আমাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। একসময় খেয়াল করলাম ইরানের উপর দিয়ে যাচ্ছি, নীচে পাহাড়। কৌতুহলি হয়ে গেলাম সেই জানালায় (এক্সিট ডোর)। আবার বিমোহিত হলাম: পরিষ্কার আকাশের নীচে চাঁদের আলোয় প্লাবিত প্রান্তর.... ... ধুসর লালচে (রাতে কেন যে লালচে দেখাচ্ছিল কে জানে) ন্যাড়া পাহাড়ী অঞ্চল দেখা যাচ্ছে। ধারনা ছিল পাহাড় হলে তো জঙ্গল থাকবে; কিন্তু এটা ন্যাড়া দেখাচ্ছে কেন? মনের মধ্যে যুক্তি হাতড়াচ্ছিলাম... .... একেই তো রাত, আসল রঙ যে সবুজ না তা নিশ্চিত করে বোঝা সম্ভব না, তার উপর প্লেন উড়ছে প্রায় ১০ কি.মি. উচ্চতায় ... হতে পারে এটা কি আফগানিস্থান বা তার আশেপাশে; কারণ, র‌্যাম্বো সিনেমার একটা পর্বে আফগানিস্থানের রূক্ষ প্রান্তর আর ন্যাড়া পাহাড় দেখাইছিল... আর ইরান তো আফগানিস্থানের পাশেই; কাজেই ন্যাড়া হওয়া অসম্ভব নয় --- কতক্ষন দাড়িয়ে দেখেছি জানি না, কিন্তু পাহাড়ী অঞ্চল আর শেষ হল না। ... ... প্লেন কি এ্যাত আস্তে চলে... তাই হবে হয়ত, আকাশের মাঝে ছোট ছোট প্লেন তো আস্তেই যেতে দেখি!! আবার এসে বসলাম... ... একসময় মনে হয় তন্দ্রা মত এসেছিল।


(.... চলবে)