সোমবার, ১৯ মে, ২০০৮

সামান্য দূর্ঘটনা

১৯-মে-২০০৮
অন্যান্য দিনের মতই গতকাল রাত প্রায় সাড়ে ৯টায় অফিস থেকে বের হলাম। সাথে যথারীতি জুনিয়র কলিগ রনি। আমাদের বাসা একই পথে হওয়ায় সাধারণত একসাথে বাসায় ফিরি। গুলশান-২ এ প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ইভনিং শিফটের ক্লাস নেয়া শেষ করে বাস পাওয়া হয় না এখন। কারণ মধুমতি নামক বাসটি ৯টার পর চলে না ... তাছাড়া কিছুদিন হল ওটার শাহবাগের রুটটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই নিয়মিত সি.এন.জি. বা ট্যাক্সি ক্যাবে আসি। অফিস থেকে ৯টায় একটা গাড়ী বের হয় ... কিন্তু এই সেমিস্টারে একদিনও ওটা পাইনি: কোন দিন ভি.সি. স্যার মিটিং-এ গেছেন, কোন দিন অন্য কোন কারণে গাড়ী যাবে না -- এই ধরণের অনিশ্চয়তা ভাল লাগে না ... তাই ফ্রী রাইডের আশা বাদ দিয়ে দিয়েছি। সপ্তাহে দুই দিন অবশ্য রূপার গাড়ীতে লিফট দেয়... কারণ ওরও একই সময়ে ক্লাস নিতে হয়।

রনি চমৎকার একজন ছেলে। আমি বুয়েটের যেই স্যারের তদারকীতে মাস্টার্স করেছিলাম (শ্রদ্ধেয় ড. আশরাফ আলী), ও সেই স্যারেরই অধীনে বি.এস.সি. থিসিস করেছে। ঈর্ষনীয় জিপিএ পেয়ে ৩য় স্থান পেয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই হয়তো বৃত্তি নিয়ে কানাডা যাবে পড়তে। গত ১লা মে বিয়ে করেছে ও।

অফিস থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তা বেশ ভাল রকম ভেজা। রনি জানালো যে বেশ জোড়ালো বৃষ্টি হয়েছে একটু আগে (আমি টেরও পাইনি!)। একটা সি.এন.জি. পেলাম ... গন্তব্য গ্রীন রোড - আমার শ্বশুড়বাড়ী; কারণ বউ ওখানে গিয়েছে এখন ওখান থেকে একসাথে বাসায় ফিরবে। রনির বাসা আজিমপুর, তাই গ্রীনরোড আর পান্থপথের মোড়ে নেমে রিকশা নিয়ে নিবে। গত কয়েকদিনের মতই আসার সময় আলাপ হচ্ছিল যে, শেষ পর্যন্ত পছন্দ করা দারুন ২টা অফার থেকে কোনটা নিলে ওর জন্য ভাল হবে। কোনটা নিলে কী কী সমস্যা হতে পারে ইত্যাদি।

বৃষ্টি হওয়ার কারণেই হয়তো রাস্তা বেশ ফাঁকা ছিল। বেশ তাড়াতাড়িই চলে এলাম। এফ.ডি.সির দিকে থেকে এসে হোটেল সোনারগাঁও-এর সামনে দিয়ে সার্ক ফোয়ারার সিগনাল পার হচ্ছি। এমন সময় পেছনে বিকট ধাক্কা ও শব্দ - মুহূর্তেই বুঝে গেলাম দূর্ঘটনায় পড়েছি। কিন্তু এর পরের ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না - আড়াইটা পল্টি খেয়ে রাস্তার মাঝখানে কাঁত হয়ে পড়ল আমাদের বাহন - সম্ভবত শাহবাগের দিক থেকে আসা কোন গাড়ী ধাক্কা দিয়েছে। রনি নিচ থেকে বলছে শামীম ভাই পা পা ... শামীম ভাই পা পা। মাথা কাজ করছিল না ... শরীরে শক্তি পাচ্ছি না, সতর্কভাবে দাঁড়ালাম যেন রনির গায়ে পাড়া না পড়ে। তারপর টেনে ভারি সি.এন.জিটা একটু তোলার চেষ্টা করলাম। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় উঠল ... ততক্ষণে রাস্তার পাশ থেকে লোকজন দৌড়ে এসে হাত লাগিয়েছে ।

সি.এন.জিটা সোজা হতেই আরেক দফা পল্টি খেলাম। কারণ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম ওটার মাঝ বরাবর। কোন এক অজানা কারণে সিটটা জায়গামতই সেট হয়েছে আবার। এক পায়ের স্যান্ডেল পাচ্ছি না ... তবে বই দুটো সিটের উপরেই পেলাম। রনি রনি করে ডাকতেই সাড়া পেলাম ... ও বাইরে দাঁড়িয়েছে ... সম্ভবত ড্রাইভার একজন আমার স্যান্ডেল পেয়ে দিয়ে গেল। তারপর দুজনেই রাস্তার পাশে ফুটপাথে গেলাম। ড্রাইভার গাড়িটাকে টেনে রাস্তার পাশে নিয়ে আসলো। ওটার পেছনে চ্যাপ্টা হয়েছে আর সামনের উইন্ডশিল্ড খুলে পড়েছে। ভাগ্য ভাল যে গ্যাসের সিলিন্ডার অক্ষত আছে।

জড়ো হওয়া লোকজনের কাছে জানলাম যে একটা মাইক্রোবাস ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছে। ওটার নম্বরও কেউ দেখেনি। রনির বাম পায়ের গোড়ালির উপরের জোড়াটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ... সম্ভবত ওটার উপরেই সি.এন.জি'র মাঝখানের খাঁচাটা পড়েছিল। জুতা খুলে পা স্ট্রেচ করালাম (যেভাবে ক্রিকেট মাঠে খেলোয়ারদের করতে দেখি) ... রনির পায়ের ঐ জোড়াটা ফুলেছে একটু, তিনদিকে ছড়ে গেছে .. একটু রক্ত বের হয়েছে। একটা খালি মিশুক পেয়ে সেটাকে বললাম যে বাসায় পৌছে দিতে (ওখান থেকে শ্বশুড় বাড়ি ১ কি.মি. এরও কম)। রনি পা ফেলতে পারছে না ... ওকে ধরে মিশুকে তোলার সময় একলোক বলল যে গ্রীনরোড-পান্থপথের সিগনালে মাইক্রোবাসটাকে আটকিয়েছে ট্রাফিক সার্জন। আমরা মিশুকে প্রথমে ওখানে গেলাম। এক মিনিট পর আমাদের সি.এন.জি.ও চালিয়ে নিয়ে আসলো ড্রাইভার (!)। সার্জন বললো মাইক্রোবাসটা থানায় নিয়ে যাওয়া হবে ... আপনাদের ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটা মিউচুয়ালি মিটমাট করলে ভাল হয়। আমি শুধু ওনাকে আমার ভিজিটিং কার্ডটা দিয়ে বললাম ... আপাতত অত সময় নাই; আমার সঙ্গির মেডিকেল এসিস্টেন্স দরকার - যদি কোনরকম স্টেটমেন্টের দরকার হয় ফোন দিবেন দয়া করে। তারপর আমার শ্বশুড় বাড়ি আসলাম। রনি আসার পথে মোটামুটি এলিয়ে পড়েছিল। ওর ব্যাগ, এক-পাটি জুতা ওখানে রেখে ও আর আমি একটা রিকশায় গেলাম কমফোর্ট হাসপাতালে। সাথে আরেক রিকশায় আমার শ্বশুড়সাহেব আসলেন।

ডক্টর অন ডিউটি ৬ষ্ঠ তলাতে ... ওখানে উনি রনির পা নিজের হাটুর উপরে রেখে টিপেটুপে পরীক্ষা করে বললেন কোন হাড় ভাঙ্গেনি। কথাবার্তায় জানলাম উনি আবার আমাদের আরেক সহকর্মীর মামাতো ভাই, সেই সহকর্মী আর রনি একই কক্ষে বসে। ঔষধ লিখে দিলেন কিছু এন্টিবায়োটিক, পেইনকিলার আর ওটা সহ্য করার জন্য গ্যাস্ট্রিকের কোন একটা ট্যাবলেট। পাশাপাশি যে কোন জায়গা থেকে একটা এক্সরে করতে বললেন নিশ্চিত হওয়ার জন্য। ইতিমধ্যে এল প্রচন্ড ঝড়। ঔষধগুলো ওখানকার ফার্মেসি থেকে কিনে অতিকষ্টে আরেকটা মিশুক জোগাড় করা গেল .. ওটাতে আমার শ্বশুড়সাহেব রনিকে বাসায় রেখে আসলো। আমি একটা রিকশা জোগাড় করে ভিজতে ভিজতে শ্বশুড়বাড়ি। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা, তাই নিজের বাসায় আর যাওয়া হল না।

পরদিন সকালে উঠে টের পেলাম আমি কোথায় কোথায় ব্যাথা পেয়েছি। ডান হাতের কনুইয়ে একটু ছড়ে গেছে, হাতের চেটোয় পুরাতন একটা ব্যাথা মাথা চাড়া দিয়েছে - কড়ে আঙ্গুল আর অনামিকা নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। এছাড়া বাম কাঁধে আর বাম হাটুর নিচে দুইটা ঘনীভূত ব্যাথার স্পট পেলাম। ফোনে খবর পেয়েছি ওর গায়ে সামান্য জ্বর এসেছে আর সন্ধ্যায় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এক্স-রে করিয়েছে -- একটা হাড়ে মৃদূ ফাটল (ফ্র্যাকচার) পেয়েছে। আজ ওর ব্যাগ, একপাটি জুতা নিয়ে অফিসে এসেছি ... হয়তো ফেরার সময় ওর বাসায় দিয়ে আসবো।

দূর্ঘটনাটা প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অসংখ্য দূর্ঘটনার তুলনায় খুবই সামান্য হলেও অনেকদিন স্মৃতিতে তাড়া করে বেড়াবে।


(সচলায়তনে প্রকাশিত)

২টি মন্তব্য:

Imtiaz Kabir বলেছেন...

দুর্ঘটনার উপরে কারোরই হাত নেই। সাবধান থাকাটাই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার সবার। সাবধান থাকবেন আপনিও। :)

Miah M. Hussainuzzaman বলেছেন...

৫ বছরের আগের ঘটনা হলেও স্মৃতিগুলো তাজা আছে। প্রতিবার ঐ সিগনাল পার হওয়ার সময় একবার করে মনে পড়ে।