Thursday, June 4, 2009

লিনাক্স পুরা ফালতু - ব্যবহার করে দিনকে দিন হতাশ হচ্ছি

উইন্ডোজে খেলার জন্য নিড ফর স্পীড বলে একটা গেম আছে। কঠিন লড়াই করে গাড়ীর দৌড় প্রতিযোগীতায় জিততে হয়। ওটা খেলতে কঠিন মজা পেতাম। প্রতিটা চ্যালেঞ্জ জিততে দারুন মজা। কয়েকদিন পরেই কম্পিউটারের প্রতিযোগীগুলো কোনক্রমেই পেরে উঠতো না। বন্ধু বান্ধবের যারা খেলতো তারা তো কম্পিউটারের সাথেই পারে না। আমার সাথে পেরে ওঠার প্রশ্নই ওঠে না ... ... তাই ওদের সাথে খেললে মজা নষ্ট হয়ে যায়। আমার ছোট দুই ভাইও কঠিন গেমার ছিল ... ওদের সাথে তাই জমতো। এছাড়া কল অব ডিউটি বা সিমসিটি টাইপের স্ট্রাটেজি গেমগুলোও চরম আকর্ষনীয় ছিল। সবসময়ই টানটান উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ না থাকলে যে কোনো গেমই ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়।

লিনাক্স ব্যবহার শুরু করে ভেবেছিলাম কঠিন একটা বিষয় আয়ত্তে আনছি ... চ্যালেঞ্জ জয় করছি .... কঠিন ভাব নেয়া যাবে। লোকজন ইমপ্রেস হবে। আজ এটা সমস্যা, কাল ওটা সমস্যা .... রাতে চিন্তায় ঘুম হবে না, চোখের নিচে কালি পড়বে। এই করতে হবে, সেই করতে হবে .. ... দুশ্চিন্তায় ডায়বেটিস হয়ে যাবে, হার্টের সমস্যা দেখা দিবে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে ..... .... লোকজন জিজ্ঞেস করলে মুখ ঝামটা দিয়ে বলা যাবে ... "ধুর মিয়া অফ যান - জানেন নাতো কী রকম দৌড়ানীর উপরে আছি"। আহ .... কী চরম চ্যালেঞ্জ আর উত্তেজনা।

আমার সে আশায় গুড়ে বালি। লিনাক্সে কোন চ্যালেঞ্জই নাই। একেই তো বিনামূল্যে দেয় সেজন্য জুয়া খেলে টাকা হারাবার মত উত্তেজনা নাই, তার উপর চৌর্যবৃত্তির দারুন থ্রীল পুরাটাই মিস ....... অথচ পাইরেটেড উইন্ডোজে কত্ত উত্তেজনা; আজকে জেনুইনিটি টেস্ট কালকে ম্যালওয়্যার, পরশু ভাইরাস .... চ্যালেঞ্জের পর চ্যালেঞ্জ ... কখনই ম্যাড়মেড়ে ভাব নাই।

জেনুইনিটি টেস্টের সেই উইজেটটা নিউট্রাল করা দারুন উত্তেজনাকর .... বিল কাকুর মাইক্রোসফটকে টেক্কা দেয়া বলে কথা! ইন্টারনেট ঘেটে পদ্ধতি বের করে তারপর প্রসেস বন্ধ করতে হয়, ফাইল মুছতে হয়, রেজিস্ট্রি এন্ট্রি মুছতে হয় .... এজন্য ব্যাকআপ নিতে হয় কারণ ভুল ভাল হয়ে গেলে মেশিন বসে যাবে ---- ওয়াও!! এরকম টান টান উত্তেজনা না থাকলে জীবন চলে! অবশ্য, অরিজিনাল উইন্ডোজ ব্যবহার করলে এইসব করা লাগবে না - অন্তত তাই হওয়ার কথা। অবশ্য চুপি চুপি জানিয়ে রাখি, অরিজিনাল উইন্ডোজ ব্যবহারকারীগণ হতাশ হবেন না ... ... বিল কাকুর এই উইজেট আপনাদের জীবনেও উত্তেজনার আনন্দ দিতে পারে ... অনেক অরিজিনাল / জেনুইন ব্যবহারকারীকেও এই উইজেট পাইরেটেড বলেছে বলে শোনা যায় --- অবশ্য এতে উত্তেজিত হয়ে কারো হার্ট এ্যাটাক হয়েছে বলে শুনিনি।

তারপর ধরুন নতুন নতুন উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমগুলো হাইফাই হার্ডওয়্যার ছাড়া চলে না। অনেক ড়্যাম, অনেক বড় হার্ডডিস্ক, উচ্চমার্গীয় প্রসেসর এই সব লাগেই। এ্যাতসব হাইফাই হার্ডওয়্যার কিনলে কত ভাব নেয়া যায়, বলা যায় যে ঐসব বড় বড় হার্ডওয়্যার কম্পানিকে আমরা বাঁচিয়ে রেখেছি -- অথচ ব্যাটা ফাউল লিনাক্স, কম শক্তির পিসিতেও নাকি অনায়েসে চলে। শালার ... টাকা খরচের উপায়ই নাই।

তারপর ধরেন, ভাইরাস ভাইদের কথা। সবসময় কত উত্তেজনার মধ্যে রাখে - এই মারলো রে তো সেই মারলো করে সবসময় হৈ হুল্লোরের মধ্যে থাকা যায়। একবার দেখা গেল সকলের স্ক্রীনে ছোট ব্যানারে কী জানি হ্যাক ডে লেখা দুইটা আস্তে আস্তে ইতস্তত ঘুরাঘুরি করছে। যত ক্লিক করা হয় তত বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে। ইন্টারনেট ঘেটে ঐটা দুর করার পদ্ধতি দেখে খুঁজে খুঁজে ওগুলো মোছা হল .... .... বলেন তো, একঘেয়ে জীবনের মধ্যে এমন ব্যতিক্রম না থাকলে ভাল লাগে! অথচ আমার কম্পিউটারে এমন কিছুই নাই। ভাইরাস নাকি বানানোরও কোন রাস্তা খোলা রাখে নাই।

আগে লিনাক্সে ভাল কোনো গেম ছিল না। তাই বড় হয়ে গিয়েছি এমন একটা ভাব আসতো। কিন্তু দেখেন কারবার, এখন দূর্দান্ত থ্রী-ডি গেমও চলে এসেছে। বড় বড় ভাব নেয়ার উপায় নাই।

আগে দেখতাম বড় ভাইরা কালো স্ক্রিনে কাজ করে ভাব নিত... ডসের মত কালো স্ক্রীনে কী কী হিজিবিজি লেখা উঠতো সেগুলো দেখে বিজ্ঞের মত মাথা নাড়াতো। ভাবলাম লিনাক্স ব্যবহার করলে তেমন ভাব নেয়ার সুযোগ হবে। কিন্তু সেই আশাও পুরা হওয়ার কোনো উপায় নাই। লিনাক্সে গ্রাফিকালি ক্লিক করেই সব করা যায় - ধ্যা-এ্যা-ত্ ।

অনেক আগে ১০ গ্রাম ঘুরে একজন মেট্রিক পাশ লোক পাওয়া যেত। একনামে সকলেই তাদেরকে চিনতো। কিন্তু এখন সেইরকম অবস্থা নাই। আমার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার বলেছিল তাঁদের সমস্ত গ্রাহকদের মধ্যে আমি আর একজন - এই দুইজনই শুধু লিনাক্স ব্যবহার করে। তাই আলাদা ভাবে আমাদের কথা মনে থাকে। কিন্তু ইদানিং যে দ্রুত হারে ব্যবহারকারী বাড়ছে ... তাতে সেই রেয়ার স্পিশিজ বলে ভাব নেয়ারও উপায় দুর হয়ে যাচ্ছে --- নাহ্ লিনাক্সটা আসলেই যাচ্ছেতাই হয়ে গেল।

"জানিস আমার পিসি না হ্যাক হয়ে গিয়েছিলো ... যখন বুঝতে পারলাম তখন তো সাথে সাথে ইন্টারনেট ডিসকানেক্ট করলাম। তারপর সব রিইনস্টল দিয়ে ফায়ারওয়াল দিয়ে কত কি করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসলাম।" ইত্যাদি ইত্যাদি কত গল্প করার বিষয় তৈরী হয় যেগুলো লিনাক্সে হওয়ার সুযোগই নাই --- হতচ্ছাড়া লিনাক্সের কারণে বন্ধু বান্ধবের সাথে আলাপ করার বিষয়বস্তু কমে যাচ্ছে।

সুতরাং হে রক্ত গরম যুবা, চ্যালেঞ্জিং জীবন চাইলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিন, সেটা সম্ভব না হলে পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করুন; ভুলেও লিনাক্স চালানোর কথা ভাববেন না।

(সচলায়তনে প্রকাশিত)

Monday, May 11, 2009

কত কপি করে রে!

কয়েকদিন আগেই আগের সেমিস্টার (ট্রাইমিস্টার) শেষ হলো। ঠিক সময়ে খাতা দেখে জমা দেয়া অসম্ভব বলে মনে হয়েছে এ পর্যন্ত। শেষ যেই খাতার বান্ডিলটা ছিল, সেটা দেখে মনে হল - বেশ কয়েকজন ভরপুর নকল করেছে। ঐ পরীক্ষায় ইনভিজিলেটর কে ছিল সেটা খেয়াল নাই (আমি ছিলাম না); তবে সে সম্ভবত পরীক্ষার গার্ড দেয়ার বদলে নিজের ভাগের খাতা দেখেছে বসে বসে।

এই গ্রুপটার খাতা আগেও দেখেছি দুটো মিডটার্ম পরীক্ষায়। আহামরি কিছু নাই ... কিন্তু ফাইনালের খাতায় নিখুত ইংরেজি দেখেই সন্দেহ হচ্ছে ... ... এমনকি আমার দেয়া ক্লাসনোটে দুই জায়গায় টাচপ্যাডের কল্যানে / টাইপিং এর ভুলে কোনো কোনো শব্দের মাঝখানে সংখ্যা পড়ে গিয়েছিল (যেমন diffic3ult); সেগুলোও ঐ ভুল সহ খাতায় নিখুত ভাবে লেখা!! যাঁরা সত্যই পড়েছে আর যারা না পড়েই লিখছে তাদের আলাদা করতে না পেরে মেজাজ একটু খারাপ।

একই ব্যাপার দেখা যায়, হোম এসাইমেন্টের ক্ষেত্রে; একই ভুল অনেক খাতায় পেলে সবগুলোতেই শূণ্য দিতে হয়। আবার পরীক্ষার খাতায় দেখা যায় এক প্রশ্নসেটের উত্তরে আরেক সেটের ডেটা দিয়ে সমাধান করা ... ... সাথে সাথে শূণ্য। ওপেন বুক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ডেটার বদলে বইয়ের ডেটার সমাধান কপি করা!!

ছাত্রাবস্থায় ঐতিহাসিক কপি করার কাহিনীগুলো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তো। যেমন কোনো এক বড়ভাই সেশনালের খাতা কপি করার সময় ভুলে আরেকজনের নাম রোল নং শুদ্ধ লিখে দিয়েছিল!! কোনো স্কুলে নাকি কপি করতে গিয়ে বাবার নামে আরেকজনের বাবার নাম বসিয়ে দিয়েছিল।

তবে, লেটেস্ট যেটা শুনলাম (পুরাতন কাহিনী হয়তো) সেটা হল: কোনো এক ছাত্র একটি প্রশ্নের উত্তরে লিখেছে - "প্রমথ চৌধুরী"। পাশের জন দেখে কপি করেছে - "প্রথম চৌধুরী"! তারও পাশের জন ওটা দেখে লিখেছে "১ম চৌধুরী"!!

এরা পাশ করে কর্মক্ষেত্রে কী করবে .. ... .... :(

(সচলায়তনে প্রকাশিত)

Thursday, April 9, 2009

জরীপ: কোন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করেন?

আমাদের প্রযুক্তি ফোরামের পক্ষ থেকে সম্প্রতি শুরু হয়েছে নতুন একটি জরিপ, যেখানে আপনি বলতে পারবেন আপনার কম্পিউটিং অভিজ্ঞতার কথা। কি দিয়ে শুরু করেছিলেন কম্পিউটিং? বন্ধুর বাড়িতে কিংবা কলেজের ল্যাবে সেই প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা। জানাতে পারেন গেম খেলা কিংবা মুভি দেখার কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করতেন কিনা সে কথাও। ছোট্ট এই জরিপটির ফর্ম পূরণ করতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের জন্য থাকছে প্রযুক্তি বিষয়ক ই-ম্যাগাজিন "প্রযুক্তি কথন"-এর পরবর্তী সংখ্যা সরাসরি ইমেইলে পাবার সুযোগ। তো ঝটপট নিজে পূরণ করে দিন ফর্ম আর বন্ধুকের পাঠিয়ে দিন জরিপের লিংক।


কৃতজ্ঞতা/তথ্যসূত্র: উন্মাতাল তারুণ্য

Saturday, March 7, 2009

অসহায় বাচ্চা, ভয়ংকর ডাক্তার

(বাঁচতে হলে জানতে হবে টাইপ কথাবার্তা আছে ... খোকা খুকিদের না পড়াই ভাল)

আমার ছোটভাই শাহেদের বাচ্চার বয়স প্রায় ৬ মাস। হাসিখুশি আমার এই ভাস্তিটার জন্মের সময়টার কথা মনে পড়লে এখনও ঐ ডাক্তারের উপর রাগে মাথায় রক্ত চড়ে যায়। শাহেদের বউ আমাদের কাজিন ছিল (আছে)। গর্ভের কয়েক মাসের সময় বাইরে বেশি ঘুরাঘুরি করার জন্য সম্ভবত হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তার পরামর্শ দিল বেড-রেস্টে থাকার জন্য। এই সময়টাতে গর্ভবতী মেয়েরা সাধারণত তাঁদের মায়ের কাছে চলে যায় --- এই রেওয়াজ জাপানেও দেখে এসেছি। সুতরাং ও সাভারে ওদের বাসায় চলে গেল।

সাভারেই একটা ক্লিনিকের ডাক্তারকে দেখানোর ব্যবস্থা করা হল। ঐ লেডি-ডাক্তারের দেশের বাইরের বড় ডিগ্রী আছে, উপরন্তু শাহেদের সম্বন্ধীর (আমাদের ..তুতো ভাই) খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মা উনি। ক্লিনিকটা ঢাকা থেকে গেলে সাভার বাজার পার হয়ে কিছুদুর পরে প্রধান রাস্তার বামপাশে অবস্থিত (ভেলরি টেইলরের সি.আর.পি. ওটার উল্টা দিকে কিছুটা ভেতরে)। ডাক্তার সাহেবের আলিশান বাড়িটাও ক্লিনিকের সাথেই লাগোয়া। কাজেই বেশ নির্ভরতার সাথেই ওনার পরামর্শ মেনে চলতে থাকলো ওরা। বাইরের দেশগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ... সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তাঁদের নিয়মিত বিভিন্ন ব্যায়াম করানো হয়। জাপানে থাকার সময় এই ব্যাপারটা দেখেছি .... কেউ আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের জুনিয়র সিনেমাটা দেখে থাকলেও এই ধরনের সিন দেখে থাকবেন। অথচ, আমাদের ডাক্তার এ ধরণের কোন পরামর্শই দিয়েছে বলে কখনো শুনিনি। বরং সবসময়ই এমন কথা বলেন যে সব ঠিক আছে ইত্যাদি।

ফলে শুয়ে থাকতে থাকতে গর্ভবতীর ওজন বেড়ে গেল অস্বাভাবিক। ডেলিভারির সময়ে ঐ ক্লিনিকে ভর্তি করানো হল এবং বাচ্চার পজিশন ঠিক নাই এমন আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট দেখিয়ে সিজার করা হল। আমার ছোটচাচা হোমিওপ্যাথির ডাক্তার, থাকেন সেই কুড়িগ্রামে। উনি পরে বলেছিলেন যে, আসলে বাচ্চার পজিশনের যেই ব্যাপার দেখিয়ে সিজারিয়ান করানো হয় তার বেশিরভাগই ঠিক না। বাচ্চা শুরুতে উল্টা পজিশনেই থাকে। তারপর যতই প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে ততই বাচ্চা ঘুরে পজিশনে আসতে থাকে; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্লিনিকওয়ালাগণ সিজারিয়ান অপারেশন করে টাকা কামানোর জন্য এই পজিশনে আসার আগেই আল্ট্রাসনোগ্রাম করে উল্টা পজিশনের ছবি নেয়। পাশাপাশি ডেট পার হয়ে যাচ্ছে, ঠিক সময়ে প্রসব না হলে বাচ্চার ক্ষতি হবে -- এসব কানপড়া দিতে থাকে। পানি ভেঙ্গে গেলে বাচ্চার ক্ষতি হওয়ার কথাটা পুরাপুরি সত্য, কিন্তু সময় পার হয়ে যাচ্ছে ... এই কথাটা আতঙ্কিত করানোর জন্য বলা হয়; কারণ তা না হলে কয়েকদিন পরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রসব হবে ... ওদের সিজারিয়ানের দাও মারা হবে না। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল - আমার ছোটচাচীর ৫জন সন্তান (+১ জন জন্মের পর মারা গিয়েছিল) সকলেই স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।

যেদিন সন্ধ্যায় বাচ্চা হল, তার পরদিন দেখতে গেলাম। বাচ্চা কোলে নিয়েই মনে হল ওর গায়ে জ্বর। আঙ্গুল দিয়ে বাচ্চার ভ্রুর উপরে এবং কপালে একটু ঘষে ম্যাসেজ করে দিলে বাচ্চা আরামে চোখ বন্ধ করে ফেলে। বাচ্চার মা-বাবা, খালারা সকলের কাছেও তাই মনে হল। তখন বাচ্চার মা বলছিল যে গতরাত্রে যখন সিজারিয়ান করতে নিয়ে যাওয়া হল তখন ঐ কক্ষের তাপমাত্রা এত কমানো ছিল যে ও ঠান্ডায় কাঁপছিলো। এই ঠান্ডার মধ্যে বাচ্চা বের করে ওরা বলাবলি করছিলো যে দূর্বল বাচ্চা ... অবস্থা সুবিধার দেখছি না। তারপর ওর রূমে আসার পর জোর করে বাচ্চাকে একটা ইঞ্জেকশন দিয়েছে।

কাহিনী এখানে শেষ হলেও খুশি হতাম। কিন্তু তারপর আমি চলে আসার পর বাচ্চার নানী যখন বাচ্চার কাপড় পাল্টাতে গেল তখন ভক করে নাকে দূর্গন্ধ এসে লাগলো। বাচ্চা ভুমিষ্ট হওয়ার পর ওকে গরম পানি দিয়ে গোসল দেয়ানোর কথা ... কিন্তু এখানে তা-ও করা হয়নি। একেই তো এয়ার কন্ডিশনারের ঠান্ডায় বাচ্চা কুঁকড়ে ছিলো তার উপর গোসল না দিয়ে কোনো রকমে তুলা দিয়ে মুছিয়ে তোয়ালে জড়িয়ে দিয়েছে। স্তম্ভিত নানী তারপর তাড়াতাড়ি করে গরম পানিতে বাচ্চাকে ধুইয়েছে। শুরুতেই বাচ্চাকে এরকম অসুস্থ করানোর জন্য ক্লিনিকওয়ালারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি বলে মনে হল (প্রসুতিকে ঠিকভাবে গাইড করেনি, স্বাভাবিকের বদলে সিজারিয়ান, কনকনে ঠান্ডা রূমে প্রসব করিয়ে বাচ্চাকে ঠান্ডা লাগানো, গোসল না দিয়ে জীবানুদের সুযোগ করে দেয়া, ইঞ্জেকশন?)। ফলে বাচ্চা এর পর বেশ কিছুদিন জ্বর, নাড়ি কাঁচা থাকা এবং জন্ডিসে ভুগেছে।

যা হোক অপারেশনের ক্ষত শুকানো মাত্র ঐ ক্লিনিক থেকে ওদেরকে রিলিজ করিয়ে আনা হয়েছে। ঐ কসাইখানা থেকে জীবিত বাচ্চা এবং মা-কে নিয়ে বের হয়ে আসতে পেরে আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ। নানীবাড়ি থেকে ঢাকায় আনার পর ঐ কয়েকদিনের বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় রক্ত পরীক্ষা করানো হল ... বাচ্চা আমার কোলে, শাহেদ ক্লিনিকের কাউন্টারে কথা বলছে। যখন রক্ত নিল তখন বাচ্চা আমার কোলে --- সুঁইয়ের সাইজ ওর পায়ের পাতার চেয়ে বড়। পায়ের পাতা থেকে রক্ত নিল। রক্ত/সুঁই এই জিনিষগুলো আমি খুব ভয় পাই - দেখতে পারি না (যদিও নিজে আবার এদিক দিয়ে বেশ ভাল ছিলাম ... মাথা কামাইলে এখনও শুধু ঐটুকুতেই দুই ডজন দাগ দেখা যাবে, বাকী দেহের কথা না হয় বাদই দিলাম)। রক্ত নেয়ার সময় আমি বাচ্চাকে ধরে রেখেছিলাম .. .. যে লোক রক্ত নিল সে, শাহেদ সবাই আমাকে অভয় দিচ্ছে ... দৃশ্যটা বেশ মজার এবং করুণ। জন্মের সময় থেকেই বেচারীকে ভীষন প্রতিকূলতার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে - দূঃখ লাগে এজন্য যে সেই প্রতিকূলতাগুলো কৃত্রিমভাবে কিছু মানুষই(?!) সৃষ্টি করেছিলো।

মাঝে মাঝে ভাবি, বিদেশে যেখানে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য এ্যাত চেষ্টা করা হয় সেখানে আমাদের কিছু ডাক্তার/ক্লিনিকগুলো এ্যাত কসাইগিরি করতে চায় কেন? টাকা কি মানুষকে এ্যাতই খারাপ বানিয়ে দেয়? যাদের উপর জীবনের জন্য নির্ভর করে মানুষ, তারাই কিনা এটা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে! .... .... আরেকটু চিন্তা করলে বুঝি যে এটা আমাদের সিস্টেমের জন্যই হয়েছে। এদেশের বাস্তবতায়, এই সিস্টেম ভুল না শুদ্ধ সেই তর্ক তোলা থাক আপাতত। অন্য দেশের ডাক্তারগণের স্বাভাবিক প্রসবপ্রীতির পেছনেও টাকার ক্ষুধা কাজ করে - সেটা কেন তা ব্যাখ্যা করি একটু। জাপান বা অন্য উন্নত দেশে সকলের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা থাকে। চিকিৎসা খরচ দেয় সরকার, কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে খরচের সামান্য অংশ বহন করতে হয়। অন্য দেশের কথা জানিনা, জাপানে প্রতি সন্তান প্রসবের জন্য ঐ ক্লিনিক/হাসপাতাল/ডাক্তার বেশ ভাল একটা টাকা পায় সরকার থেকে। এই টাকার পরিমান নির্দিষ্ট। কাজেই স্বাভাবিক প্রসবের বদলে যদি সিজারিয়ান করানো লাগে তাহলে ঐ ডাক্তার/ক্লিনিকের খরচ বেড়ে যাবে - ভাগের টাকা কম পড়ে যাবে। তাই ওরা প্রানান্ত চেষ্টা করে যে স্বাভাবিক ডেলিভারি হউক। অনেকক্ষেত্রেই সিজারিয়ান দরকার এমন রোগীকেও স্বাভাবিক প্রসব করানোর চেষ্টা থাকে। যেটা আমাদের দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য ভ্যাসেকটমি করানোর সেই প্রজেক্টের কথা মনে করিয়ে দেয়।

অসুখ বিসুখ হলে তাই পারতপক্ষে ডাক্তারের কাছে যাই না। ওমুখো না হওয়ার জন্য নিয়ম কানুন মেনে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দাবার খাওয়ার চেষ্টা করি। আর, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা নেয়াটা হল আমার সর্বশেষ অপশন। দরকার হলে হোমিও ঔষধ খাই। অপেক্ষাকৃত কম প্রচারওয়ালা এই চিকিৎসা পদ্ধতিটা সম্পর্কে আজেবাজে কথা প্রচলিত থাকলেও জার্মানিতে আবিষ্কৃত এবং জার্মানি /আমেরিকা /পাকিস্থান /ভারত /বাংলাদেশে তৈরী ঔষধওয়ালা এপদ্ধতিতেই বেশি আস্থা রাখি (এক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচ এবং সুঁই-এর অনুপস্থিতি আমার জন্য একটা বিরাট ইস্যূ)।

দেশে ভাল অনেক ডাক্তার আছেন ... যাঁরা সত্যিকারের চিকিৎসার উদ্দেশ্য নিয়েই চিকিৎসা করেন (এই মুহুর্তে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাগ্রহণরত স্ত্রীর পাশে বসে লিখছি)। তাঁদের অসম্মান করা এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। নীতিগত ভাবে আমি হোমিও চিকিৎসা নেয়ার পক্ষপাতি হলেও বেশ কিছু ডাক্তার (এলোপ্যাথি) চিরজীবনই আমার কৃতজ্ঞতা পাবেন। আমার খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা; এতে, ডাক্তার বা চিকিৎসাপদ্ধতি খারাপ - এমন কোনো জেনেরালাইজেশনে না যাওয়াই ভাল।

(৭-মার্চ-২০০৯, বিকাল ৩:৩০)

সচলায়তনে প্রকাশিত

Friday, March 6, 2009

বাচ্চা ভয়ংকর ডাক্তার ভয়ংকর!

(বাঁচতে হলে জানতে হবে টাইপ কথাবার্তা আছে ভেতরে ... বেশি ছোটরা না পড়াই ভাল)

আমার বিবাহিত জীবন প্রায় ছয় বছর ছুঁই ছুঁই করছে। বাচ্চা কাচ্চা নেয়ার কোন রকম অবকাশ পাই নাই এর মধ্যে। যখন বিয়ে করি তখন বউয়ের বুয়েট লাইফের ৩য় বর্ষ ... ২১তম বিসিএস-এর কল্যানে আমি কেবল গণপূর্ততে যোগদান করেছি আর ওদিকে পি.এইচ.ডি করার জন্য জাপান সরকারের বৃত্তি হবে হবে করছে। মাত্র চার মাস চাকুরী করেই একা জাপান চলে গেলাম। জাপান থাকাকালীন সময়েও গবেষণার নমুনা সংগ্রহের জন্য গড়ে প্রতি ৩ মাসে একবার করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে আমার প্রফেসর .... কাজেই দৌড়ের উপরেই ছিলাম। বাংলাদেশে ঘন ঘন আসার ফলে হোম সিকনেস কেটে যেত - এই সুবিধা থাকলেও ঘন ঘন আসার ফলে জাপানে জীবন ধারণ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে জটিলতা দেখা দিত -- একবার তো লম্বা ভ্রমনের কারণে ঠিক সময়মত স্বাক্ষর করতে পারিনি বলে এক মাসের বৃত্তিই পাইনি।

যা হোক, জাপানে আমার বয়স দেড় বছরের মাথায় আমার স্ত্রী তাঁর বুয়েটের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই চলে এল ... এর আগেও দুই সেমিস্টারের মাঝের বন্ধগুলোতে ৪৫ দিন করে দুইবার বেড়িয়ে গিয়েছিলো। বাকী আড়াই বছরেও বাচ্চা কাচ্চা নেয়ার চিন্তা করি নাই, কারণ আমার পি.এইচ.ডি.'র ঐ ক্রিটিকাল সময়ে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সাপোর্ট দিতে তো পারতামই না বরং আমারই অতিরিক্ত সাপোর্ট দরকার ছিল।

দেশে ফেরার পর স্ত্রী আড়াই বছর পড়ালেখাবিহীন কাটানোর পর এখানে বুয়েটেই মাস্টার্স করতে ভর্তি হল। সমস্ত থিওরী কোর্স শেষ .... থিসিসও শেষ হওয়ার পথে। জন্ম নিয়ন্ত্রন বড়ি খেলে বা অন্য কোন ব্যবস্থা নিলে সেটার রাসায়নিক প্রভাব স্ত্রীর দেহে পড়ে তাই, উভয়ের সম্মতিতেই আমার বউ কোনরকম জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি নেয়নি .... ইন্টারনেটের কল্যানে স্বাভাবিক নিয়ম আর আমার দিক থেকে প্রোটেকশন নেয়া হয়েছে। এদিকে পরিচিত আত্মীয় স্বজন সবাই কথা বার্তায় ডাক্তার দেখানো, বিভিন্ন জটিলতার কথা বলা শুরু করে দিয়েছে। আড়ালে হয়তো, আমাদের দুইজনের মধ্যে কে সন্তান নিতে অক্ষম সেই বিষয়েও ফিসফাস আলোচনা চলে!

বউয়ের মাস্টার্স শেষের পথে, চাকুরী করে না .... তাই অনেকটা সামাজিক চাপে বাধ্য হয়েই বাচ্চা নেব বলে ঠিক করলাম কিছুদিন আগে। পরের মাসেই বউএর স্বাভাবিক জীবন ব্যহত হল। স্টিক টেস্টে গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই বমি ইত্যাদি হয়ে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো। কাজেই নিজের বাসা ছেড়ে মাসাধিককাল যাবৎ শ্বশুর মহাশয়ের অন্ন ধ্বংস করে চলেছি চোখ টিপি । অবস্থা এ্যাত বেশি খারাপ হল যে, পানি খেলেও এক মিনিটের মধ্যে বমি হয়ে বেরিয়ে আসছিলো। শরীরে পানির অভাবে প্রশ্রাব লালচে হয়ে গেল। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলাম। এদিকে নিজ বাসার বাইরে থাকার কারণে আমার ঘুম এবং টয়লেট ব্যহত হচ্ছে .... অনুভুতিটা সুখকর নয় .... কিন্তু বাচ্চার জন্য তো সারা জীবনেই কত কিছু ত্যাগ করতে হবে - এই চিন্তায় ওসব পাত্তা দেই না, শ্বশুর বাড়িতে আছি - এই আনন্দে মনটাকে ভরানোর চেষ্টা করি।

সারারাত আর দিন আমি বউয়ের দেখাশোনা করি, সন্ধ্যায় অফিসে যাই (বিকাল ৬টা থেকে ১০টা আমার ক্লাস নিতে হয়) ... ঐ সময় শুধু শাশুড়ি দেখাশোনা করেন। চোখের সামনে বউয়ের অমানুষিক কষ্ট দেখতেও খারাপ লাগে।

খালা শাশুড়ি ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার, নিজের ক্লিনিকও আছে .... উনি পরামর্শ দিলেন যে গ্রীনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে প্রফেসর (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) ফারহানা দেওয়ানকে দেখাতে। দেখালাম ... রক্ত পরীক্ষা এবং আলট্রাসনোগ্রাম করালেন। তারপর অতিরিক্ত বমির জন্য একটা ট্যাবলেট আর স্বাভাবিক ফলিক এসিডের জন্য আরেকটা ট্যাবলেটের ব্যবস্থাপত্র দিলেন। ১৪ মি.মি. বাচ্চার ছবি দেখে আমরা খুশি হই ... রিপোর্ট বলে ৬-৮ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা, বাচ্চার হার্টবিট নাই; আমাদের হিসেবে যখন টেস্ট করা হয়েছে তখন বাচ্চার ভ্রুণের বয়স সর্বোচ্চ ৪ সপ্তাহ (স্বাভাবিক জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম বলে ফার্টাইল পিরিওড সম্পর্কে ঠিক ঠাকভাবেই জানি)। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সব করলেও অবস্থা একটু ভাল হয়ে আবার খারাপ হতে থাকলো। বউ বারবার বলছে যে তাঁরটা স্পেশাল কেস যেখানে অবস্থা বেশি খারাপ থাকে এবং স্যালাইন নিতে হয়। আমরা (আমি, শাশুড়ি, শ্বশুর ইত্যাদি) এসবে পাত্তা দেই না ... কারণ এ্যাত বড় একজন প্রফেসরকে দেখিয়ে এনেছি ... পরবর্তীতে আরো দুইবার রিপোর্ট করেছি -- এরপরে কথা থাকা উচিত না ... যে ভোগে সে তো সহানুভুতি পাওয়ার জন্য অনেক কথাই বলে।

একমাসে অবস্থা আরো খারাপ হল ... প্রফেসর বললেন যে আরেকবার আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে, বাচ্চার হার্টবিট এসেছে কি না সেটা নিশ্চিত হতে হবে -- এটাই বড় চিন্তার বিষয়। ওর খালা মেডিসিন থেকে পাশ করলেও স্পেশালাইজেশন হল মানসিক/মাদকাসক্ত চিকিৎসায় -- তাই নিজে আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করেন না; কিন্তু ভাগ্নির অবস্থা এবং রিপোর্ট দেখে একটু ভ্রু কুঞ্চিত করলেন। তারপর বললেন যে তুমি একটু গ্লুকোজ খাও ... আর তোমাকে আমার ক্লিনিকের পাশেই আরেকটা ক্লিনিকে গাইনোকোলজিস্ট আছেন তাঁর সাথে পরামর্শ করি, তোমাকে একটু সেখানেও দেখাই। ইস্কাটনের সেই ক্লিনিকে দেখাতে নিয়ে গেল আমার শ্বশুর-শাশুড়ি এবং খালা শাশুড়ি .... উনি (ডাক্তার) দেখেই হলি ফ্যামিলিতে ভর্তি করাতে বললেন। কারণ উনি মূলত হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ/হাসপাতালের ডাক্তার এবং ঐ ক্লিনিকটা রাস্তার উপরে হওয়াতে শব্দ বেশি।

ক্লাস নেয়া শেষ করে আমি সোজা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এসে দেখি হাতে স্যালাইন লাগিয়ে ওকে শুইয়ে রেখেছে, কয়েকটা ইঞ্জেকশনও দিয়েছে স্যালাইনের ঐ পথে (ক্যানোলা)। অবাক হয়ে দেখলাম, ওর সেই অস্বস্তিগুলো নেই। গত কয়েকদিনে রক্ত, প্রস্রাব ইত্যাদি পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা গেল যে, ওর শরীরে গ্লুকোজ, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি মারাত্নক রকম কমে গেছে। বাচ্চা ঠিক আছে ... সাইজে আরেকটু বড় হয়েছে (১৭ মি.মি.) আর হার্টবিট এসেছে।

এখানে যেই জিনিষটি অবাক লাগলো যে, প্রথমবার টেস্টেই কিন্তু ওর রক্তে গ্লুকোজ কম ধরা পড়েছিল। ওটার বিরূদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় আস্তে আস্তে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। আমার বউয়ের ঐ কথাটাই ঠিক ছিল .... আসলেই ওর স্পেশাল কেস ... এই অবস্থাটার নাম হাইপারেমেসিস(সম্ভবত এরকমই কিছু খটমটে নাম) আর কারণ সম্ভবত:হাইপোগ্লাইসিমিয়া, পরিসংখ্যানগত ভাবে যেটা হাজারে ৫ জন গর্ভবতীর হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা কেন এ্যাত বড় প্রফেসরের চোখ এড়িয়ে গেল সেটাই খালাশাশুড়িকে চিন্তিত করে তুলেছে। মামা শ্বশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক - মামী শাশুড়ির সূত্রে ওনার ঐ অধ্যাপকের বাসায় পরিচিতি আছে, উনি বললেন সম্ভবত প্রফেসরের বাসায় কিছু ঝামেলা চলছে, তাই একটু অমনোযোগী। আমি খারাপ মানুষ তাই খারাপ চিন্তাটাই আগে মাথায় আসে .... প্রফেসর সাহেব হয়তো চেয়েছিল যে আমার বউয়ের অবস্থা খারাপ হউক... তারপর নিজেরাই সুড়সুড় করে গিয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হব। কে জানে আসলে কী জন্য এমন করলো‍! এদিকে হলি ফ্যামিলিতে বেশ ভাল যত্ন নিচ্ছে .... এটা কী খালা শাশুড়ির পরিচয়ের সুবাদে, নাকি কেবিনে থাকি বলে ... নাকি হাসপাতালের গুনে সেটা বুঝতে পারি না।

সেন্ট্রাল হাসপাতালে খালা শাশুড়ির পরিচয়ের সূত্র ব্যবহার করি নাই। আর এখানকার সম্পর্কে ধারণাটা এমনিতেই ভাল না -- ব্যস্ত সড়কের উপরে অবস্থিত বলে আর সন্ধ্যায় কনসালটেন্সি রোগী/মেডিকেল প্রমোশন অফিসারদের ভীড়ে এটার যতদুর দেখেছি সেটা বাজারের মত সরগরম মনে হয়েছে। এছাড়া শাশুড়ির কলিগের আত্মীয়ের কাহিনীটাও সুখকর নয়। ঐ কলিগ (যার ছেলে বুয়েটে আমার রুমমেট/ক্লাসমেট ছিল ... ওর সূত্রেই শ্বশুরপক্ষের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছিল) এর আত্মীয়ের ছেলের একটা ফোঁড়া হয়েছিল। হাউ কাউ করে ছেলেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো। ওখানে ফোঁড়া গালিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে .. তারপর ঐ হাতটাকে গলার সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছে (হাঁড় ভাঙ্গা রোগীদের যেমন দেয়) ---- এই পর্যন্ত কাহিনীতে কোন সমস্যা ছিল না .... কিন্তু এই কাজের জন্য ১২০০০ টাকা বিলটাই সব কেমন জানি করে দিল (হ্যাঁ ভাই, I repeat: বার হাজার টাকা!!)।

বর্তমানে গত রাত বাদ দিলে (আজ শুক্রবার বলে রাতে শাশুড়ি ছিলেন) চার রাত ধরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালটাই আমার বাড়ি ঘর। এখানেই থাকি, খাই, ঘুমাই, গোছল করি ... এখান থেকেই সন্ধ্যায় অফিসে যাই (তখন শ্বশুর/শাশুড়ি পাহারা দেয়), অফিস শেষে এখানেই ফেরৎ আসি। বউ-এর রক্তের সমস্ত প্যারামিটারগুলো স্বাভাবিক হয়ে এসেছে .... তারপরেও কিছুটা অসুস্থ আছে। আগামী আরো দুই/এক মাস এমন যাবে, তারপর স্বাভাবিকভাবেই শরীরের হরমোন লেভেল এডজাস্ট হয়ে ঠিক হয়ে যাবে। এখন শরীরের অভাবগুলো স্যালাইন দিয়ে মিটিয়ে দিচ্ছে .... এ অবস্থায় বাসায় গেলে সমস্ত যত্নের মধ্যেও আবার এরকম হবে ... ১০/১২ দিন পর আবার এসে স্যালাইন নিতে হবে --- পরিচিতের মধ্যে দেশে/বিদেশে যারা এইরকম লক্ষণের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা তাই বলে। ব্যাপারটা অনেকটা ব্যাটারি চার্জ করার মত। একবার রক্তে পুষ্টির চার্জ দিলে এতে ১০/১২ দিন যায়।

বাবা হওয়ার পথটা মোটেও সুখকর নয় .... না জানি সামনে আরো কী কী সইতে হবে। মন খারাপ

(এই লেখাটা গতকাল কেনা HP mini 1001TU নেটবুক কম্পিউটার ব্যবহার করে হাসপাতালে বসে লেখা। ৬ই-মার্চ-২০০৯, শুক্রবার দুপুর আড়াইটা)

সচলায়তনে প্রকাশিত