সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

কাউন্সেলিং বিষয়ক চিন্তাভাবনা

বর্তমানে কাউন্সেলিং শব্দটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। সাধারণ ভাবে মনে হয় councelling -এই ইংরেজি শব্দটির অর্থ কাউকে পরামর্শ দেয়া। কিন্তু গুগল আংকেলের কাছে এই বিষয়টির ব্যাপারে জানতে চেয়ে ধারণা হল, এর ব্যাপ্তি আরো অনেক গভীর এবং এটা করতে চাইলে রীতিমত আলাদা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

গুগলে কাউন্সেলিং লিখে সার্চ দিলে এই সংজ্ঞাটি আসে
Counselling is a type of talking therapy that allows a person to talk about their problems and feelings in a confidential and dependable environment. A counsellor is trained to listen with empathy (by putting themselves in your shoes). They can help you deal with any negative thoughts and feelings you have.
অনলাইনে এ বিষয়ে বিভিন্ন রকম সাহায্যমূলক পোস্টও দেখলাম (বাংলা এবং ইংরেজিতে) – কয়েকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে যে কখন নিজেই বুঝতে পারবো আমার কাউন্সেলিং দরকার। আমার মনে হয়, একজনের পক্ষে নিজে নিজেই এই সমস্যা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারার বিষয়টা হল সবচেয়ে ভাল অবস্থা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অন্যেরা একজনের মাঝে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেও সেই ব্যক্তি নিজে কিন্তু সেটা অনুভব করতে পারেন না; এমনকি কেউ যদি বলে তোমার কাউন্সেলিং দরকার, তাহলে উল্টা মাইন্ড করে বসতে পারে। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই আরেকজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ চোখের দরকার হয়, যে শিশুদের আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকলে সেটা চিহ্নিত করতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা নিবে। আমার ধারণা, শিশুকে সরাসরি কিছু কাউন্সেলিং দেয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিবারকে কাউন্সেলিং দেয়া বেশি জরুরী হয়ে যায়।

অর্থাৎ সকলেরই হয়তো কাউন্সেলিং-এর দরকার নাই। কারো কারো দরকার আছে। কেউ যদি সেটা নিজেই বুঝতে পারে তাহলে তো ভাল, কিন্তু না হলে আরো কিছু চোখ দরকার যারা দেখে শুনে কিংবা তাদের অজান্তেই কিছু মানসিক বিষয় পরীক্ষা করে দেখে কাউন্সেলিং দরকার – এমন ব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারবেন। চিহ্নিত ব্যাক্তিটি প্রতিষ্ঠানের স্টাফ, কর্মকর্তা, শিক্ষক কিংবা ছাত্র হতে পারে।

আপনাদের হয়তো জানা আছে, সরকারী চাকুরীর মৌখিক পরীক্ষা বা সাক্ষাতকারের সময়ে সেই ভাইবা বোর্ডে একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ বসে থাকেন এবং চাকুরীপ্রার্থীর আচরণ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে থাকেন। একই রকম বা এর চেয়েও সিরিয়াসভাবে মানসিক গড়ন পরীক্ষা করা হয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। আমার বাচ্চার স্কুলেও এরকম পূর্ণকালীন সাইক্রিয়াটিস্ট আছে বলে শুনেছি।

কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা আমরা যে কেউ চিহ্নিত করতে পারি – যেমন ক্লাসে অমনোযোগী, বাচালতা, উগ্রতা, মনমরা হয়ে থাকা ইত্যাদি। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর সমাধানও সকলের জানা - যদিও সব ইস্যূতে প্যাঁদানি দেয়া কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না ... ... আবার, এখন তো স্কুলে মারধর করা আইনত নিষেধ (ইস্ আমাদের সময়ে যদি এমন থাকতো! ...); আর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মারধর তো দুরের কথা, বকা দিতেও এখনকার যুগে রীতিমত ভয় লাগে ... ...। আমি যতটুকু বুঝি, বকা দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হয় না। ভারতীয় নায়ক আমীর খানের ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটি হয়তো অনেকেরই দেখা আছে - এটা এবিষয়ে চিন্তার খোরাক যোগাবে।

কাউন্সেলিংএর কথা একটু বাদ থাক ... আমরা যে শিক্ষকতা করি সেটারই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কয় জনের আছে? আমি নিজে প্রকৌশলী হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি, শিক্ষকতা করার জন্য কিছু আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন আছে, যা বিকাশের জন্য কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষন পাইনি – আমাদের পাঠ্য সিলেবাসে ছিল না। সম্ভবত বেশিরভাগ বিষয়ের শিক্ষকগণেরও আমার মত একই অবস্থা – আমরা গান শিখে নয়, বরং গাইতে গাইতে গায়েন হয়েছি। আমার ধারণা, যাঁরা লেখাপড়া বিষয়ে লেখাপড়া করেন অর্থাৎ বি.এড, এম.এড করেন (কিংবা পুরানা আমলের বি.এ.বি.টি) তাঁদেরকে এই বিষয়গুলোর অনেকটাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আবার বিদেশী, বিশেষত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীর কোর্স কনটেন্ট ঘাটাঘাটি করে দেখেছি সেখানে ক্লাস ম্যানেজমেন্ট, প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ, গবেষণার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে রীতিমত কোর্সওয়র্ক করতে হয়। – এর উপরে যুক্ত হচ্ছে কাউন্সেলিং; কাউন্সেলিংকে আলাদাভাবে চিন্তা করছি তার কারণ আছে ...

কার কাউন্সেলিং-এর দরকার আছে সেটা চিহ্নিত করাটা একটা প্রাথমিক কাজ। এটার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার আছে। চিহ্নিত করার জন্য হয়তো কিছু ধাপে ধাপে করার মত প্রক্রিয়া আছে, হয়তো কিছু প্রশ্নপত্র আছে যার অনেকগুলো সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে – সেই উত্তরের প্যাটার্ন থেকে একেকজনের মানসিক গড়নটা বেরিয়ে আসবে, অস্বাভাবিকত্ব থাকলেও বেরিয়ে আসবে। হয়তো কিছু মানসিক পরীক্ষা আছে, যেগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেখে অস্বাভাবিকত্ব চিহ্নিত করা যাবে।

সম্ভবত, এর পরের কাজ হল সেই কাউন্সেলিং দেয়া অথবা তাকে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের কাছে পাঠানো। ছাত্র কাউন্সেলিং নিয়ে গুগল আংকেল ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে দেখলাম বিদেশি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং বিষয়ে রীতিমত আলাদা বিরাট সেটাপ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রকম বিষয়ে কাউন্সেলিং দেয়া হয়; বিষয়গুলোর নামের উদাহরণ দিচ্ছি -যেমন আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির (Iowa State University) কাউন্সেলিং বিষয়ক বিভাগের ওয়েব পেজ অনুযায়ী বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়:

- আত্মপরিচয় এবং নৈতিকতা (exploration of identity and values)
- পেশাগত উন্নয়ন – ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং? (exploration and development of career and majors)
- সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যা (relationship problems)
- হীনমন্যতা (low self-esteem)
- চাপ (stress)
- একাকীত্ব (loneliness)
- মানসিক অবস্থার সমস্যা, মনমরা থাকা (mood disturbances or depression)
- সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্য অভিযোজন বিষয়ক (cultural exploration or navigating differences)
- যৌননিপীড়ন থেকে আরোগ্য (sexual assault recovery)
- শরীরবৃত্তীয় অথবা খাদ্যাভাস বিকৃতি বিষয়ক (body image or disordered eating concerns)
- মানসিক আঘাত এবং/অথবা অত্যাচার (trauma and/or abuse)
- যৌনপ্রবৃত্তি বা পরিচয় বিষয়ক (questioning sexual identity or orientation)
- সম্পদের অপচয় (substance misuse)
- লেখাপড়া বিষয়ক কিংবা প্রেরণা (academic concerns or motivation)

এ্যাতসব বিষয়ে সম্যক জানা এবং কাউকে সঠিক পরামর্শ দেয়া এবং তাঁর মানসিক পর্যায়ে প্রভাবিত করা যে কোন একজনের পক্ষে বেশ কঠিন কাজ হবে বলেই মনে হয়। আর, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এটা করতে গেলে হীতে-বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে না - এমনটিও নিশ্চিত করা যায় না। ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ছাড়া দলগত কাউন্সেলিংও আছে বলে দেখেছি। এমনকি সমবেত সংগীতে অংশগ্রহণ করলেও কিছু বিষয়ে উপকার হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম। পরিবেশ, শব্দ, রং, সংগীত সবই মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা (এবং অসুস্থতা) প্রভাবিত করে বলে বেশ ভালো গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে। মানুষের মনের অলিগলিতে কত রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে। আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষিত একটা লোকবল যে কোন প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য একটা মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।

দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় গত ৩১-জানুয়ারী-২০১৬ সালে এ বিষয়ক একটা অসাধারণ উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় যা হুবহু নিচে তুলে ধরা হল। এখানে লেখকদ্বয় সরাসরি বলে দিয়েছেন কাউন্সেলিং মানে শুধু পরামর্শ দেয়া নয় …

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং
গ্লোরিয়া রোজারিও ও প্রিয়াংকা শঙ্কর দাস

একটি হাসপাতালের মানসিক বিভাগে আমার ভিজিটিং কার্ড দিতে গিয়েছিলাম, যাদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন তাদের যেন ‘রেফার’ করা হয়। কিন্তু মানসিক ডাক্তারের কথায় আমি হতবাকই হলাম। তিনি বললেন যে ‘আমিই কাউন্সেলিং করি। কারো কাছে আমার ‘রেফার‘ করার প্রয়োজন হয় না। ’

আরেক দিন একটি স্কুলে গিয়ে প্রচার চালাচ্ছিলাম, যেসব ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকের মানসিক সমস্যার জন্য সাহায্যের দরকার তারা যেন কাউন্সেলিংয়ের জন্য ‘রেফার’ করেন। দুজন শিক্ষক আমাকে মুখের ওপর ফের বলে দিলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের আমরাই কাউন্সেলিং করি। ’ এ তো একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়ে দাঁতের যন্ত্রণায় কাতর রোগীর দাঁতের অপারেশন করার শামিল। একজন স্কুল শিক্ষক যদি মানসিক সমস্যার জন্য কাউন্সেলিং করেন (প্রশিক্ষণ ছাড়া), তাহলে ওই রোগী বা ক্লায়েন্ট কি সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবে? তাঁদের কথা শুনে ভাবলাম, সবাই যদি কাউন্সেলিং করেন, তবে যাঁরা কাউন্সেলিংয়ের ওপর পড়াশোনা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাঁদের কাজ কী হবে!

অপ্রিয় হলেও সত্য যে এখনো পর্যন্ত অনেকেরই কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই ভাবেন, কাউন্সেলিং হলো পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু না, কাউন্সেলিং মোটেও পরামর্শ দেওয়া নয়। কাউন্সেলিংয়ে মূলত একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। তাই আমাদের এ লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউন্সেলিং সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল প্রাচীন সভ্যতার মিসর, মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক) ও পারস্যে (ইরান)। সেখানকার ধর্মযাজকরা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি দান করতেন। ঐতিহাসিক পণ্ডিতদের মতে, সমসাময়িক কাউন্সেলরদের আবির্ভাব ঘটে ১৮০০ শতকের পর। তখনকার কাউন্সেলররা মূলত ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক (বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক), যাঁরা ছাত্রদের শুধু একাডেমিক ফলাফল ছাড়াও তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা, যেমন আবেগীয় ও আচরণগত সমস্যা, এসব ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করে কাউন্সেলরের ভূমিকা পালন করতেন। আমেরিকার কংগ্রেস ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স এডুকেশন অ্যাক্ট (এনডিইএ) চালু করে এবং এর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং দেন, তিনিই কাউন্সেলর। একজন ব্যক্তি কাউন্সেলিং পেশায় সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্য তাঁকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি কিংবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর শিক্ষা অর্থাৎ মাস্টার্স, সেই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হয়। আর যে ব্যক্তি কাউন্সেলিং সেবা নেন তাঁকে বলা হয় ক্লায়েন্ট।

কাউন্সেলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি পেশাগত সম্পর্ক বিরাজ করে এবং ব্যক্তিগত, দলগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয়। ফলে তাদের মধ্যে নিজেদের ও অন্যদের সম্পর্কে এমন একটা স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যেটা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ও দ্বন্দ্বগুলো সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। অনেকেই কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি সমার্থক কিংবা একই অর্থে অদলবদল করে ব্যবহার করে। থেরাপি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেরাপিয়া থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘একসঙ্গে পথ হাঁটা’। কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কাউন্সেলর ও ক্লায়েন্ট একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তাহলে দুটি বিষয়ই অর্থাৎ কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির কাজ মোটামুটি একই রকম।

কাউন্সেলরের প্রাথমিক কাজ হলো ক্লায়েন্টকে তার নেতিবাচক চিন্তাপদ্ধতি পরিবর্তন, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন, জীবনের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সে যেন তার অনুকূল মাত্রায় মনঃসামাজিক কাজকর্মে সক্রিয় হতে পারে সে ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করা। এ জন্য কাউন্সেলররা মানসিক স্বাস্থ্য, মনোবৈজ্ঞানিক ও মানুষের বিকাশগত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করে চিন্তাভাবনা, আবেগীয়-আচরণীয় অথবা নিয়মতান্ত্রিক বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের ভালো থাকা বা সুস্থ থাকা, ব্যক্তিগত বিকাশ অথবা পেশাগত উন্নয়ন, এমনকি মনোরোগ থাকলে সে ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকেন।

কাউন্সেলরের ভূমিকা অন্যান্য পেশা থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে কাউন্সেলর সমস্যাটির দিকে খেয়াল করেন এই ভেবে যে এই সমস্যাটি ব্যক্তি, নিয়ম ও সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই বেড়ে চলেছে। কাউন্সেলররা রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের তুলনায় বেশি খেয়াল করেন ক্লায়েন্টদের মানসিক বিকাশ ও মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধ, দক্ষতা, গুণাগুণ, মানসিক শক্তির উৎস ও চাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

সাধারণত কাজে অনাগ্রহ, সামাজিক ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, যোগাযোগে অক্ষম, অবিরাম চিন্তা, দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন, যেকোনো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়া, শুচিবায়ু, বারবার হাত ধোয়া, হতাশাগ্রস্ততা, একাকিত্ব, আশাহীনতা, পেটে সমস্যা, মাথাব্যথা, অকারণে জ্ঞান হারানো, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, ভাঙচুর করা, মিথ্যা কথা বলা, অতি চঞ্চলতা, অমনোযোগী, অটিজম, মিশতে না পারা, দুঃখজনক ঘটনা থেকে প্রাপ্ত আঘাত, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিদ্রাহীনতা, ঘুমে ব্যাঘাত, মন মরা হয়ে থাকা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আনন্দ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করা হয়।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াটি যখন শুরু হয় তখন ক্লায়েন্ট তার মনের কষ্টের সব কথা খুলে বলতে থাকে। দুঃখের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই সে খুব কান্নাকাটি করে, ভেঙে পড়ে। তখন ক্লায়েন্ট নিজেও হয়তো মনে করতে পারে যে এখানে এসে সব কিছু খুলে বলে তো আমি আবারও আগের সেই আঘাত পাওয়া মুহূর্তের কষ্টটা পাচ্ছি। তাহলে আমার সঙ্গে এটা কী হচ্ছে? এটা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াতে ক্লায়েন্টের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ভয়ের কিছুই নেই; সেই বিপজ্জনক মুহূর্তটিতেও তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই কাউন্সেলররা আছেন। কাউন্সেলরই ওই মুহূর্তটিতে তাকে সহায়তা করবেন স্থির হওয়ার জন্য, ভালো থাকার জন্য।

কাউন্সেলিং সেশনটি সাধারণত হয় ৪৫-৫০ মিনিটের। আর কাউন্সেলিং সেশন সংখ্যার গড় হলো সাত-আটটি। তবে সমস্যার বিষয়ভেদে ও ক্লায়েন্ট অনুযায়ী সেশন সংখ্যা কমবেশি হতে পারে।

কাউন্সেলিং সেশনে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে ক্লায়েন্ট কাউন্সেলরের কাছে যেসব কথা বলবে সেসব কথা গোপন রাখা হয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ভাঙা হবে। প্রথমত, ক্লায়েন্টের যদি আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাহলে ক্লায়েন্টের মা-বাবা বা কাছের মানুষদের তার জীবন বাঁচানোর জন্যই তথ্যটি জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্ট যদি কাউকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তৃতীয়ত, যদি কখনো কোর্ট থেকে নির্দেশ আসে। তবে এ তথ্যগুলো জানানোর আগে অবশ্যই ক্লায়েন্টকে এ বিষয়ে বলে নেওয়া হবে।

আমাদের দেশে কাউন্সেলিং করাতে হলে ফি দিতে হয় ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে কিছু কিছু জায়গায় বিনা মূল্যেও কাউন্সেলিংসেবা পাওয়া যায়। যেমন—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য টিএসসির কাউন্সেলিং ও গাইডেন্স সেন্টারে।

কাউন্সেলিং হলো মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি পেশাগত প্রক্রিয়া। একজন পেশাদার কাউন্সেলরের এ পেশা চর্চা করার জন্য একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কাউন্সেলররা দক্ষতার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে কাজ করেন। কাউন্সেলিং নেওয়ার আগে কাউন্সেলরের যোগ্যতা সম্পর্কে জেনে নিন, যেন সঠিক সেবা পেতে পারেন।

লেখকদ্বয় : গ্লোরিয়া রোজারিও, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
প্রিয়াংকা শংকর দাস, কাউন্সেলর, হিলিং হার্ট কাউন্সেলিং ইউনিট, বসুন্ধরা, ঢাকা

ধৈর্যসহ এ্যাতদুর পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

সহায়কমূলক তথ্যসূত্রসমূহ:
http://www.kalerkantho.com/print-editio … /31/319282 (মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং)
https://bn.thecabindhaka.com.bd/10-sign … -health-2/ (১০ টি সংকেত যা নির্দেশ করে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং দরকার)
http://www.newsbangladesh.com/details/2399 (অনলাইনে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং)

সোমবার, ১ মে, ২০১৭

নিয়োগযোগ্যতার জরুরী গুণাবলী - জেনে রাখা ভাল


ভূমিকা

কিছুদিন আগে নিয়োগযোগ্যতা বিষয়ে একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারের কিছু অংশে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখান থেকে কিছু অংশ খুবই জরুরী মনে হওয়ায় সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এই ছোট্ট প্রয়াস। যদি ইতিমধ্যে জানা না থাকে তাহলে চাকুরীপ্রার্থী এবং চাকুরীদাতা উভয়পক্ষই হয়তো এই তথ্যগুলো জেনে উপকৃত হবেন। যেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো এই ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে এসেছে সেগুলো হল Employed, Employable, Hard Skill এবং Soft Skill। এর মধ্যে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল Soft skill - অথচ এই বিষয়টা সম্পর্কে আগে থেকে আমার কোন স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না। এই শব্দগুলো দিয়ে কী বোঝা যায় সেটা দেখা যাক।

Employed বনাম Employable

Employed অর্থ হল বর্তমানে একজনের একটা চাকুরী আছে; কিন্তু এই মূহুর্তে employed বলেই সেই চাকুরী থাকবে কি না, কিংবা একটা ছাড়লে আরেকটা পাবে কি না সেটার গ্যারান্টি নাই।

Employable অর্থ হল এই লোকের মধ্যে এমন কিছু গুনাবলী আছে যে সব প্রতিষ্ঠানই এঁকে চাকুরী দিতে চাইবে। এই গুনাবলীগুলোকে soft skill বা employability skill বলে। ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য এই গুনাবলীগুলো অপরিহার্য। কাজেই এই দক্ষতাগুলো থাকলে সেই ব্যক্তি ইচ্ছামত এক চাকুরী ছেড়ে আরেকটি নিতে পারবে। নিয়োগযোগ্যতার দক্ষতাগুলোকে কখনো সফট স্কিল, ফান্ডামেন্টাল স্কিল, ওয়র্ক-রেডিনেস স্কিল কিংবা জব-রেডিনেস স্কিল বলা হয়।

দক্ষতার প্রকারভেদ

কোন একজন ব্যক্তি Employable বা নিয়োগযোগ্য বলতেই তার দুই ধরণের দক্ষতার বিষয়টা সামনে চলে আসে। প্রথমটা হল Hard Skill আর অন্যটা Soft Skills। এর মধ্যে Hard Skill সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই মোটামুটি ভাল ধারনা রাখি, কিন্তু অতি জরুরী Soft Skillগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই মোটেই সচেতন নই।

Hard স্কিল সমূহ

যেই পেশার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, সেই পেশার নামের মধ্যেই সেই পেশা সংশ্লিষ্ট দক্ষতার বিষয়টা বোঝা যায়। এছাড়া নিয়োগের বিজ্ঞাপনে সাধারণত সেই Hard skill গুলোর ব্যাপারে উল্লেখ করা থাকে। যেমন: ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারীবিদ্যা, একাউন্টিং, টাইপিং-স্পিড, প্রোগ্রামিং দক্ষতা ইত্যাদি। 

চাকুরীপ্রার্থীদেরকে প্রাথমিক ভাবে বাছাই করতে এই hard skillগুলো ব্যবহৃত হয়। এক পেশার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন অন্য পেশায় ডিগ্রীধারী কেউ আবেদন করলে সেই আবেদনপত্র এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। অথবা একটা চাকুরীর জন্য নির্দিষ্ট টাইপিং স্পিড কিংবা নির্দিষ্ট প্র‌োগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ চেয়েছে - প্রার্থীর সেই দক্ষতাটুকু না থাকলে তার আবেদন করার যোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।  

সাধারণত Hard skillগুলো সার্টিফিকেট দেখেই বোঝা যায়, কারণ যাঁরা এগুলোর সার্টিফিকেট দেয় তাঁরা অনেক দীর্ঘমেয়াদে দেখেশুনে অনেকভাবে পরীক্ষা করেই এগুলো দিয়েছেন বলে আশা করা যায়। এই দক্ষতাগুলোকে যে কোন সাধারণ চাকুরী পেতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। 

প্রাথমিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই দক্ষতাগুলো অর্জনের পর নিজের ক্যারিয়ারকে আরো আগে বাড়াতে চাইলে কিংবা উঁচু পদে কাজ করতে চাইলে ক্রমান্বয়ে আরও কিছু বিষয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার। নিচে এই বিষয়গুলো এবং অর্জনের জন্য দরকারী ধাপগুলো উল্লেখ করা হল:

পেশায় উন্নয়ন
-- নতুন কিছু শেখা এবং বিভিন্ন রকমের প্রকল্পে কাজ করা
-- কার্যনির্বাহী কমিটিতে কাজ করা
-- নিজেই উদ্যোগী হয়ে এবং যৎসামান্য তত্বাবধানে কাজ করার সক্ষমতা/ বৈশিষ্ট
-- নিজের ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন এবং এর ব্যবসার ধরণ সম্পর্কে ধারণা রাখা
-- নিজ কাজের লক্ষ্য আর চাকুরীদাতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুসারে ঠিক করা
-- সহকর্মীদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা বুঝতে পারা

নেতৃত্ব
-- অন্যদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নততর পরামর্শ দেয়া
-- প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে রাজি/প্রস্তুত থাকা
-- দর কষাকষিতে সক্ষমতা
-- কর্মীদের কাজে পরিচালনা ও অনুপ্রাণিত করা
-- দক্ষতা প্রদর্শন করা
-- পদ্ধতি সরলীকরণের চেষ্টা করা
-- ব্যবসার প্রয়োজন বিশ্লেষনের মাধ্যমে অর্থ বা সময়ের সাশ্রয় করা।
-- সহকর্মীদের সাথে অংশীদারীত্ব এবং গোষ্ঠী গঠন করা।

সফট স্কিলসমূহ

পেশাগত দক্ষতাগুলো প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হতে সাহায্য করলেও চাকুরীদাতাগণ তাদের কর্মীদের মধ্যে অন্যরকম কিছু প্রবলভাবে প্রত্যাশা করেন - এই অন্যরকম দক্ষতাগুলো নির্দিষ্টি কোনো পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর, বাছাই প্রক্রিয়া শেষে চাকুরী পেতে এই অন্যরকম যোগ্যতাগুলোই তখন মূল চাবিকাঠি হয়ে যায়। তাই সেই অন্যরকম যোগ্যতাগুলোকে Employability Skill বা Soft Skill বলে। এই যোগ্যতাগুলো থাকলে একজন প্রার্থীর কখনোই চাকুরীর বা কাজের অভাব হবে না। এগুলি এমন কিছু দক্ষতা ও অভ্যাস-আচরণের সমন্বয় যা প্রতিটা কর্মক্ষেত্রই জরুরী।

কিন্তু soft skillগুলোর সাধারনত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট নাই। আর এগুলো দেখার জন্যই মূলত: ইন্টারভিউয়ে ডাকা হয়। যদিও আমাদের দেশে বেশিরভাগ জায়গায় চাকুরীর ইন্টারভিউ যাঁরা নেয় - তাঁরা এই ব্যাপারগুলোতে কতটুকু সচেতন এই বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কিন্তু বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলো লম্বা সময় নিয়ে (কিছুক্ষেত্রে কয়েকদিন) সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা সম্ভাব্য চাকুরীপ্রার্থীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এই বিষয়গুলোই বুঝে নেয়।

নিয়োগযোগ্যতার এই দক্ষতা থাকলে একজন প্রার্থী যা করতে পারে তা হল:
-- সহকর্মীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ
-- কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সমাধান
-- দলের মধ্যে নিজের ভূমিকা বুঝে কাজ করা
-- দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেয়া
-- নিজের ক্যারিয়ারের চালক হওয়া

অন্যের সাথে আপনার মিথস্ক্রিয়া কেমন হবে তা আপনার ব্যক্তিগত গুণাবলী, অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। এই দক্ষতাগুল‌ো চাকুরীদাতার কাছে গুরুত্ব বহন করে কারণ তার কর্মীগণের পারস্পরিক কিংবা সেবাগ্রহীতা/ক্রেতার সাথে সফল/সুন্দর মিথস্ক্রিয়া/ব্যবহার তার ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে উন্নতির জন্য জরুরী। তাহলে দেখা যাক ঠিক কোন বৈশিষ্টগুলোকে soft skillবলে:

মূল দক্ষতাসমূহ (Foundational Skills)
-- গোছানো (সুবিন্যস্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ)
-- নির্দিষ্ট সময়ে কিংবা আগেই কর্মস্থলে পৌঁছানো
-- নির্ভরযোগ্য
-- কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকা
-- হাল ছেড়ে না দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা ও লেগে থাকা
-- সময়মত সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা
-- দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টায় আরো তথ্য সংগ্রহ
-- ছাড় দেয়া এবং অভিযোজন করার ক্ষমতা
-- অপ্রীতিকর হলেও সমস্ত দায়িত্ব সম্পুর্ন করা
-- কর্মস্থলে পোশাকের রীতিনীতি এবং নির্দেশাবলী বুঝতে পারা
-- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

আন্তব্যক্তিগত দক্ষতা (Inter personal skills)
-- বন্ধুসুলভ এবং বিনয়ী
-- সহকর্মী এবং কর্মকর্তাদেরকে সম্মান করা
-- সেবাগ্রহীতার অনুরোধে সঠিক উপায়ে সাড়া দেয়া
-- (কাজের/সেবার) প্রতিক্রিয়া জেনে নেয়া
-- গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা
-- শান্তিপূর্ণ এবং সততার সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করা

যোগাযোগের দক্ষতা (Communication skill)
-- লিখিত নথি পড়তে ও বুঝতে পারা
-- অপরের কথা শোনা, বোঝা এবং প্রশ্ন করা
-- নির্দেশাবলী মেনে চলার সক্ষমতা
-- লিখিত বা মৌখিক ভাবে ধারণাকে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা
-- প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যথাযথ ব্যবহারে সক্ষমতা

সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষনের চিন্তাশক্তি (Problem solving and Critical thinking)
-- পরিবর্তন মেনে নেয়া
-- দায়িত্ব পরিবর্তন, আরম্ভ বা বিরত থাকতে রাজি থাকা
-- ব্যস্ত পরিবেশেও শান্তভাবে কাজ করা
-- বলার আগেই নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করে দেয়া
-- সমস্যার সমাধানে এবং আরও ভালভাবে কাজ করার লক্ষ্যে প্রশ্ন করা

দলগত কাজ (Team work)
-- বিভিন্ন প্রকৃতির লোকের সাথে সহজে কাজ করতে পারা
-- অন্যের দরকারের প্রতি সংবেদনশীলতা
-- নিজের অংশের কাজের ভালমন্দের দায়দায়িত্ব নেয়া
-- দলগত লক্ষ্যে অবদান রাখা

আইনগত এবং নীতিগত দায়িত্ব (Ethics and Legal responsibility)
-- নিজের সিদ্ধান্ত এবং কাজের দায়ভার গ্রহণ করা
-- কাজের বিধিমালা এবং কার্যপ্রণালী বোঝা এবং মেনে চলা
-- সৎ এবং বিশ্বাসী
-- পেশাদারীত্ব ও পরিপক্কতার সাথে কাজ করা

উপসংহার

উপরে তালিকা আকারে যেই বৈশিষ্টাবলীর কথা লেখা হল সেটা দেখে কেউ নিজের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সেটার উন্নয়ন করলে আশা করা যায় নিয়োগযোগ্যতার দিকে আরও এগিয়ে যাবে। আমি নিজেও এই তালিকা থেকে উপকৃত হয়েছি - বুঝতে পেরেছি আমার সমস্যাগুলো (আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখে) কী? আর সমস্যা বুঝতে পারলে সেটা সমাধান করার পথ বের করা সহজ হয়ে যায়।

খেয়াল করে দেখুন, আমাদের যে মাঝে মাঝে রিকমেন্ডেশন লেটার নিতে/দিতে হয়, সেখানে আসলে এই soft skillগুলোকেই হাইলাইট করা হয় যেন দুরে থাকা সম্ভাব্য সুপারভাইজার কাছ থেকে না দেখেই প্রার্থী সম্পর্কে একটা ভাল আইডিয়া পায়। বিয়ে-শাদী'র সময়ে বা পরেও আমরা পরিচিত সার্কেলে বৈবাহিক সূত্রে নতুন আসা মানুষের এই soft skillগুলো নিয়ে বেশ আলোচনা করি বলে মনে হয়। কাজেই এই দক্ষতাগুলোর প্রয়‌োজনীয়তা শুধু চাকুরীক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।


ইন্টারনেটে সার্চ করলে এই বিষয়ে প্রচুর লেখা পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও আরও সংক্ষেপে সুন্দরভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই কৌতুহলী হয়ে খুঁজলে আরও চমৎকার তথ্যবহুল লেখা পাবেন নিঃসন্দেহে।

তথ্যসূত্র:

১। International Summit on Employability and Soft Skills, 2017.
২। গুগল আংকেল
৩। https://www.careerwise.mnscu.edu/careers/employability-skills.html

শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭

এই প্রজন্মের সমস্যাটা কী?

১।
কিছুদিন আগে ঠিক এই ইংরেজি শিরোনামে একটা বক্তব্যের ভিডিও দেখেছিলাম (লিংক শেষে)। অসাধারণ এই বিশ্লেষনটা আমি পরে পরিচিত অনেক জনকেই দেখিয়েছি। এই বক্তব্য যিনি দিয়েছেন তাঁর নাম Simon O. Sinek – একজন ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা (জন্মসাল: ১৯৭৩)। তাঁর লেখা তিনটা বই আছে। আচ্ছা এবার মূল বিষয়ে ফেরত আসি: এইখানে তাঁর বক্তব্যের একটা কাছাকাছি বাংলা দেয়ার চেষ্টা করছি কারণ: মনে হয়েছে যাদের দেখার সুযোগ হয়নি বা ইংরেজিতে সমস্যা তাঁরা এই বিশ্লেষনটা জানুক।

২।
এবার আসি সংক্ষেপে সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনটিতে:
বর্তমানের যে প্রজন্ম অর্থাৎ ৮৪ সাল বা এর পরে যাদের জন্ম তাঁদের চারটা বৈশিষ্ট আছে যা আগের প্রজন্মগুলো থেকে সম্পুর্ন আলাদা। এঁদের নামে অনেক অভিযোগ – এরা নবাবজাদা মানসিকতার; এদেরকে ম্যানেজ করা কঠিন; এরা আত্নকেন্দ্রীক; লক্ষ্যহীন; অলস ইত্যাদি।

এঁদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: জীবনে কী হতে চাও? এঁদের জবাব হবে - আমি একটা মহৎ কাজ করতে চাই; সবার জীবনে প্রভাব ফেলতে চাই (বিখ্যাত?), ফাও খেতে চাই ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা যা চায় সেগুলো দেয়া হলে, এমনকি ফ্রী খাইতে দিয়েও তাদেরকে খুশি করা যায় না দেখা যায় কিছু একটা বাকী আছে। এরকম হওয়ার পেছনে চারটি মূল কারণ বের করেছেন তিনি।

প্রথম কারণ হল ভুলভাবে বাচ্চা লালন-পালন। এদের বেশিরভাগের বাবা-মাগণ ছোটকাল থেকে এঁদেরকে বার বার বলেছে যে তাঁরা স্পেশাল; বলেছে যে তোমরা যা হতে চাও তাই হতে পারবে - ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এমন যে শুধুমাত্র চাইলেই হবে; কিন্তু এর জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে সে ব্যাপারে কিছুই বলে না। এদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে কারণ এমন নয় যে এরা এর যোগ্য (মানে রেজাল্ট এ্যাত ভাল যে উচ্চতর ডিগ্রী করানো যায়), কারণ হল এটা এঁদের বাবা-মা’ চায় তাই। কেউ কেউ ক্লাসে এ গ্রেড পেয়ে এসেছে - যোগ্যতার কারণে নয়, বরং এই কারণে যে শিক্ষক এঁদের অতি নাক-গলানো স্বভাবের বাবা-মা’কে এড়াতে চায়। কেউ কেউ এমনকি ক্লাসে দেরিতে আসার জন্যও পুরষ্কার পায় – কাজেই যা হয় তা হল যারা সত্যিই পরিশ্রম করে তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে করে - পরিশ্রম করার আগ্রহ কমে যায়। আর যে শেষে আসার জন্য পুরষ্কার পায় সে একটু বিব্রত বোধ করে - কারণ সে জানে সে পুরষ্কারের যোগ্য না; তাই হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু এই গ্রুপের পোলাপানগুলো যখন বাস্তব জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে এঁরা দেখে - তাঁরা ম‌োটেও স্পেশাল নয়; মামা-চাচার লবিং ছাড়া প্রমোশন পাচ্ছে না; দেরিতে বা শেষে আসার জন্য কোন পুরষ্কার নাই; আর শুধুমাত্র চাচ্ছে বলেই কোন কিছু পাওয়া যায় না – ফলে মুহুর্তেই তার নিজেকে নিয়ে গড়া স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। ফলে একটা পুরা প্রজন্ম, তাদের পূর্বসূরীদের চেয়ে অনেক বেশি হীনমন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে।

৩।
দ্বিতীয় কারণ হল বাধাহীনভাবে সামাজিক মাধ্যম যথা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া। লোক-দেখানি ভাব নিতে এগুলোর জুড়ি নাই। অসাধারণ জীবন যাপনের একটা ভূয়া ভাব নেয়া যায় সেখানে, যদিও যে চরম ভাব নিচ্ছে আদতে হয়তো তাঁর মন খারাপ। ফলে এখানে ঘুরলে মনে হয় সবাই কী দারুন জীবন যাপন করছে, আর তাদের কথাবার্তা দেখলে মনে হয় জীবনে তাঁরা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে যা বাস্তবের পুরা বিপরীত। আরেকজনের কাজ কারবার দেখলে মনে হয় আমারও এমনই করতে হবে - কিন্তু আদতে সেরকম হওয়া বা করা সম্ভব না। ফলে হীনমন্যতায় ভোগা একটা প্রজন্ম আরো বেশি হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে - যদিও এতে তাঁদের কোন দোষ ছিল না।

একজনের হয়ত কিচ্ছু করার নাই, বা ভাল লাগছে না - তাই মেসেঞ্জারে গ্রুপকে লিখলো “হাই ...”। একটু পরেই আবার মেসেজ চেক করে দেখে দশটা রেসপন্স এসেছে …. “হাই”, “হাই”, “হাই”, “হাই” … … … … … । এতে আসলে কী হল!? মনে হল কিছুই না, কিন্তু আসলে এটাতে প্রথম ব্যক্তির বেশ ভাল লাগলো। এই যে ভাল লাগা, এই অনুভুতিটার পেছনে একটা হরমোন কাজ করে - যেটার নাম হল ডোপামিন। এজন্যই আমরা বার বার চেক করি, কয়টা লাইক পড়লো, কয়টা রেসপন্স আসলো ইত্যাদি। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের ডোপামিন নিঃসরণ ঘটাতে সাহায্য করে। তবে জেনে রাখা ভাল, এই সামাজিক যোগাযোগের ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া আরো অনেক যে যে জিনিষগুলো আমাদের ড‌‌োপামিন নিঃসরণ ঘটায় সেগুলোর মধ্যে আছে – সিগারেট, মদ, জুয়া এবং অন্যান্য মাদক দ্রব্য। অর্থাৎ মাদকতার আনন্দ যে ডোপামিনে, যা আসক্তি সৃষ্টি করে - ঠিক সেই একই রকম আসক্তি এই সামাজিক মাধ্যম সৃষ্টি করে। ছোটরা যেন অবুঝের মত আক্রান্ত না হয়ে পড়ে সেজন্য বিদেশে মদ, সিগারেট কিনতে এবং জুয়া খেলতে বয়সের বিধিনিষেধ আছে - দোকানে নির্দিষ্ট বয়েসের কমবয়সী কেউ সেগুলো কিনতেই পারে না; অথচ একই রকম আসক্তিদায়ক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বাচ্চাদের কোনো বাধা নাই। এর মানে হল অনেকটা এরকম: একজন কিশ‌োরকে বা বালককে নিজের সিগারেট প্যাকেটে/মদের ভাণ্ডারে বাধাহীন অধিকার দেয়া।

৪।
কাজেই এই প্রজন্ম বিশেষত কৈশ‌োরের মানসিক পরিবর্তনের সময়ে যখন বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক চাপ সামলাতে খাবি খায় তখন তাঁদের সামনে এরকম একটা নেশাদ্রব্য দিয়ে দেয়া হচ্ছে সেই চাপ ভুলে থাকার জন্য। সেই আবেগ মানসিক চাপ ইত্যাদি সামলাতে যখন বাবা-মা কিংবা বন্ধুদের সাহায্য দরকার ছিল, তখন তাঁরা নেশার সাহায্য নেয় – নেশা মানে এই সামাজিক মাধ্যম – ফেসবুক ইত্যাদি। আর এই ব্যাপারটা যখন তাঁদের মাথায় গেঁথে যায়, তখন জীবনের যে কোন পর্যায়ে সামাজিক, অর্থনৈতীক কিংবা পেশাগত চাপ সামলাতে তাঁরা কোন বন্ধু বা গুরুজনের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে নেশার বোতল তথা ফেসবুক টাইপের জিনিষপাতি খুলে বসে। আর এ-তো জানা কথাই, নেশা কখনই দীর্ঘমেয়াদে ভাল কিছু করতে পারে না; এটা জীবন ধ্বংসকারী একটা বস্তু।

আর এই আসক্তির কারণে দেখা যায়, এই প্রজন্মের বড় একটা অংশ সত্যিকারের বন্ধুত্ব, গভীর সম্পর্কের অর্থই বোঝে না। তাদের বন্ধুত্বগুলো ভাসা ভাসা; যে বন্ধুর উপর নির্ভর করা যায় না – আর এমনও হতে পারে যে মজা শেষে তাকে খুব সহজেই আনফ্রেন্ড করে দিতে পারে। বাস্তব জীবনে ঝগড়া, মারামারি, মান অভিমানে যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার কথা সেরকম গভীর বন্ধুত্ব হওয়ার মত সুযোগই তাদের হয়না। বন্ধু তৈরীর যে পথ, যে কৌশল: সেটা শেখারই কোন সুয‌োগ তারা পায় না। আর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন চাপ সামলাতে নেশাতে ডুবে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায়ও থাকে না।

নেশার যে দ্রব্যগুলো - সেগুলো কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারেই নেশা হয়। বুঝে শুনে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সেগুলো কিন্তু আনন্দের উৎস হতে পারে। কিন্তু এই সময়ে যেটা হচ্ছে ২৪ ঘন্টাই সেলফোনের প্রভাবে নেশাগ্রস্থ থাকছে একটা প্রজন্ম। আরেকজনের দিকে মাথা তুলে তাকানোর পর্যন্ত সময় নাই। খুব জরুরী দুই একটা কথার বাইরে যে কেমন আছেন, মুরগী ডিম পারছে কি না, কিংবা বাসায় মশার উপদ্রব – বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরীর শুরুতে জরুরী এই জাতীয় নির্দোষ আলাপচারিতা করার মত সময় বা দক্ষতা তাদের থাকেনা। বন্ধুদের সাথে খেতে বসে যদি সেদিকে মনযোগ না দিয়ে আরেকজনের সাথে ফোনে চ্যাট করতে থাকে কেউ – তাহলে সেটা অবশ্যই একটা নেশা, একটা সিরিয়াস সমস্যা। একটা অফিসিয়াল মিটিংএ যদি মনোযোগটা ফোনের মেসেজে বেশি থাকতে হয়, তাহলে সেটা সমস্যা। ঘুম থেকে উঠে পাশে শুয়ে থাকা প্রিয়জনের খবর নেয়ার আগে যদি ফোনের মেসেজ চেক করে কেউ – তাহলে সেটা নেশা – অবশ্যই একটা সমস্যা।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে যাদের আত্মসম্মানবোধ গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি; আরও দেখা যাচ্ছে চাপ সামলানোর টেকনিকগুলো শেখার সুযোগ আমরা তাদেরকে দেই নাই – নেশাগ্রস্থ হওয়াটা কোন টেকনিক হতে পারে না।

৫।
এবার আসা যাক তৃতীয় কারণে (যেটার সমস্যাটা হল অসহিষ্ণুতা) – তাৎক্ষনিকভাবে চাহিদা মিটে যাওয়ার অভ্যাস। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেউ কিছু কিনতে চাইলে আয়োজন করে টাকা পয়সা জোগাড় যন্ত্র, হাটের দিন কবে ইত্যাদি খোঁজ নিয়ে সময় করে বাজার/হাটে যেতে হয় না; অনলাইনে তখনি কিনে ফেলতে পারে, টাকা না থাকলে অসুবিধা নাই – কারণ এজন্য ক্রেডিট কার্ড আছে, পেমেন্ট অন ডেলিভারি আছে, ইনস্টলমেন্টের সুবিধা আছে; আর একদিনের মধ্যেই সাধারণত জিনিষটা বাসায় চলে আসে। কেউ সিনেমা দেখতে চাইলে ইউটিউব বা অন্য মিডিয়াতে সাথে সাথে দেখতে পারে, কিংবা পে-চ্যানেলে গিয়েও দেখতে পারে। সিনেমাটা কাছের সিনেমাহলে আছে কি নাই, শো-এর টাইমটেবল, টিকেট আছে কি না – এসব নিয়ে কোন ঝামেলাই নাই। একটা টিভি সিরিজ দেখার ইচ্ছা হলে সাথে সাথেই ইন্টারনেটে সেটা দেখে ফেলা যায়। পরের পর্বের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস অপেক্ষার ফলে সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সেটার কোন বিষয়ই আর নাই এখন। কেউ কেউ তো আবার এতই অধৈর্য যে, মাঝের পর্ব বাদ দিয়ে একেবারে সিজনের শেষ পর্ব দেখে ফেলে।

এমনকি, কাউকে প্রপোজ করাটাও এখন এঁরা শিখতে পারে না। কিভাবে হাত ঘষে ঢোক গিলে বোকা বোকা কথা শুরু করবে ডিজিটাল যুগে এধরণের সামাজিকতা শেখারও প্রয়‌োজন নাই। ডেটিং সাইটে গিয়ে শুধু ক্লিক করলেই সব ঠিক। এই যুগে যাই চাওয়া হয়, সাথে সাথে পাওয়া যায়, শুধুমাত্র যা পাওয়া যায়না সেটা হল – পেশাদারিত্ব আর গভীর সম্পর্ক। কারণ, এগুলোর জন্য কোন অ্যাপ নাই। এগুলোর অর্জন হয় ধীরগতির, আঁকাবাঁকা, বন্ধুর পথে – যা পেরোতে দরকার ধৈর্য আর একাগ্রতা। কিন্তু এই প্রজন্মের এই অর্জনগুলোর জন্য যে প্রশিক্ষণের দরকার ছিল তা হয়নি। কর্মস্থলে গিয়ে এরা হতাশ হয়, গভীর সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ হয় / পিছিয়ে যায়: কারণ ধৈর্য ধরে সফলতার জন্য অপেক্ষা আর লেগে থাকা, তিল তিল করে সফলতার ভিত্তি গড়ে তোলা বা কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চর্চা - এ ধরণের কোন প্রশিক্ষণই বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এরা পায় না। ব্যাপারটা অনেকটা পর্বতের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে চূড়াতে যাওয়ার কামনার মত – এঁরা শুধু চূড়া দেখে আর সরাসরি সিরিয়ালের শেষ পর্ব দেখার মত স্টাইলে সেখানে যেতে চায়। কিন্তু বাস্তব তো এমন নয়: এর জন্য পাহাড় ডিঙানোর পরিশ্রম, ধৈর্য, পরিকল্পনা, দক্ষতা এইসব দরকারী বিষয়গুলোর কোন ধারণাই এদের মধ্যে থাকে না। ফলাফল আরো বেশি হতাশা, হীনমন্যতা।

এইসব কারণে হতে পারে যে সমাজে আত্মহত্যা, মাদকাসক্তির হার বেড়ে যাবে। ডিপ্রেশনের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার হার বেড়ে যাবে। মন্দের ভাল হিসেবে সবচেয়ে ভাল যেটা হতে পারে, তা হল: পুরা সমাজের একটা বড় অংশ রোবটের মত একঘেয়ে একটা জীবন পার করবে কিন্তু কখনই জীবনের আনন্দঘন দিকগুলো সেভাবে উপভোগ করতে পারবে না। কখনই তাদের মধ্যে জীবনবোধের গভীরতা কিংবা পরিপূর্ণতার অনুভূতি আসবে না।

৬।
শেষ বা চতূর্থ পয়েন্টটা হল পরিবেশ। কর্পোরেট কালচারেও সবকিছু স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে করা হয়। এঁরা যে নতুন কর্মী যোগ দিয়েছে তার কোন উন্নয়ন হল কি না সেটা মোটেও ভাবে না বরং নিজেদের স্বল্পমেয়াদী অর্জনের লক্ষ্য ঠিক আছে কি না সেটা নিয়েই চিন্তিত। এটা এমনই একটা পরিবেশ যেটা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে মোটেই সাহায্য করছে না। এই কর্পোরেট পরিবেশ তাদেরকে পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব স্থাপনের যে কৌশল তা শিখতে সাহায্য করছে না। অসহিষ্ণুতা থেকে বেরিয়ে আসতে যে প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং দরকার – ধৈর্যধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যস্থির করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার – সেটার কোন ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে না এই কর্পোরেট সংস্কৃতি। যে ধরণের অর্জনগুলো করতে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে এক লক্ষ্যে কাজ করতে হয় এবং সেটা অর্জনের পর যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, সেটা অনুভব করার কোন সুযোগই তাদেরকে এখানে দেয়া হয় না। এসব কারণে দিনকে দিন তারা আরও হতাশ হয়ে যায়, মনে করতে থাকে তাঁদের কোন যোগ্যতাই নাই।
বাব-মা’র ভুল, সমাজ-ব্যবস্থার ভুলের ফলে এই প্রজন্ম ক্রমেই আত্মকেন্দ্রীক, অসহিষ্ণু এবং অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে – অথচ তার দায় কেউ নিতে রাজি হয় না। … … … …

৭।
সাইমন ভাইয়ের বিশ্লেষনের পরিপ্রেক্ষিতের সাথে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত হয়তো পুরাপুরি মিলবে না। কিন্তু কিছুটা শিক্ষনীয় চিন্তা-জাগানিয়া বিশ্লেষনী দৃষ্টিভঙ্গি যে সেখানে আছে - সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। এই যে আমাদের পোলাপানগুলোকে না চাইতেই গণহারে উচ্চতম জিপিএ দিয়ে পাশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে সেটার দীর্ঘমেয়াদে প্রায় একই রকম খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কথা। কারণ এতে যাঁরা সত্যিকারের পড়াশোনা করতো তাঁরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তেল আর ঘি’য়ের যখন একই মূল্যায়ন হবে তখন কেন কষ্ট করে ঘি উৎপাদন করবে কেউ? আর এই না চাইতেই পাওয়ার ফলে তাঁদের অবচেতন মনে এমন ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে এই ডিগ্রীগুলো ছেলের হাতের মোয়া, সহজলভ্য বস্তু - যা না চাইতেই পাওয়া যায়। এর জন্য পরিশ্রম, অধ্যবসায় এসবের কোন প্রয়োজন নাই। শুধু আসবো যাবো, ফূর্তি করবো, ফেসবুকিং করবো, চকচকে ক্যাম্পাসে ফ্যাশন করে ছবি তুলবো – কয়দিন পর প্রসেসের কারণে ডিগ্রী এমনিই পাওয়া যাবে।

জানি, উচ্চশিক্ষার কিছু জায়গায় এই চর্চাটাই চলছে। কিন্তু অবচেতন মনে হীনমন্যতা ঢুকে আত্মসম্মানবোধহীন যে প্রজন্ম আমরা তৈরী করছি তাতে করে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। কর্মক্ষেত্রে এঁদের বড় অংশ শুধু খাবি খাবে। কোত্থাও টিকতে পারবে কি না জানিনা, তবে হতাশা বাড়তেই থাকবে।

==
ইউটিউবে সাইমন ভাইয়ের ভিডিও লিংক

রবিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৬

ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ৪

(আগের পর্বগুলো:
ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ১
ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ২
ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ৩)

৩৩।
এই ফাঁকে একটা বিষয় জানিয়ে রাখা ভাল। আমার মোবাইলের সিম কার্ডের স্লটটা ট্রে টাইপের। ফোনের সাথে একটা পিনের মত জিনিষ দিয়েছে, যেটা দিয়ে একটা ছিদ্রে গুতা দিলে ট্রে টা আনলক হয়ে বের হয়ে আসে। বিদেশ বিভূঁইয়ে যে সেই পিনটার দরকার হয়ে যাবে সেটা আগে কখনো চিন্তায় আসেনি; তাই এখানকার সিম কার্ড খুব সহজে পাসপোর্ট দেখিয়েই কিনে ফেলতে পারলেও সেই সিম কার্ড ফোনে লাগানোর ব্যাপারটা বেশ অসম্ভব/জটিল মনে হতে থাকলো। তবে একটু ম্যাকগাইভারি করে সেই সমস্যার চমৎকার সমাধান হয়েছে। গিন্নির কানের ফুলের পেছনের দন্ডটা যেটা কিনা কানের লতির ফুটা দিয়ে পাস করে – সেটা অনায়েসে এখানে ব্যবহার করতে পেরেছিলাম। বলে রাখা ভাল, এ ধরণের অ্যাডভেঞ্চারাস কাজ চুপচাপ করে ফেলতে হয়: গিন্নিগন সাধারণত এ্যাত টেনশন নিতে পারেন না। ;)

৩৪।
ফুকেটের শেষ দিন। গতকাল বেশ ভালই ঘোরাঘুরি হয়েছে। তাই আজ সকালে গতকালের তুলনায় একটু দেরী করে ঘুম থেকে উঠলাম। নিচের রেস্টুরেন্টের ব্রেকফাস্ট সেরে প্রথম কাজ হল বীচে গ‌োসল করা। কারণ এসেছি পাতং সি বীচে আর সেই বীচে কিনা শুধু সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘোরাঘুরি করে পোষাবে? নাকি ফেসবুকে ইজ্জত থাকবে! সুতরাং তিনজনে রওনা দিলাম বীচে; আরেব্বাহ! রাতের দেখা বাংলা রোড দেখি সকালে একেবারে নরমাল। সেটা রাতে শুধু হাঁটা পথ হলেও দিনে সেখান দিয়ে গাড়িও চলে! (২য় পর্বে সেটার ছবিও দিয়েছিলাম) বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ, চারিদিক বেশ শুনশান - কেমন যেন মফস্বল মফস্বল ভাব। আবহাওয়া মেঘলা, তাই কোনো রোদ নাই; কিন্তু বেশ বাতাস আছে - আগের দুই দিনের তুলনায় একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। যা হোক, আমরা বীচে পৌঁছিয়ে দেখি কিছু জায়গায় লাল পতাকা আর ডানে কিছু জায়গায় সবুজ পতাকা লাগিয়ে রেখেছে। লাল পতাকার জায়গায় ‘নো সুইমিং’ সাইনও লাগানো। কেন পাশাপাশি জায়গায় এরকম সাইন বুঝতে পারলাম না – আগের দুই রাতে পা ভিজিয়ে হাঁটার সময় এ ধরণের কিছু পার্থক্য বোঝা যায় নি।

যা হোক আমি আর কন্যা পানিতে নামলাম। বাংলা রোড বরাবর বীচের যে অংশটুকু সেখানে নো-সুইমিং ছিল। প্রথমে এ্যাতসব খেয়াল না করে সেখান দিয়েই পানিতে নেমে পরে ফ্ল্যাগের ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলাম। বাংলাদেশের খবরাখবর জানি, কাজেই ডুবন্ত চোরাবালি বা এই ধরণের কিছু সমস্যা থাকতেই পারে ভেবে তখন আস্তে আস্তে সবুজ পতাকাওয়ালা জোনে চলে আসলাম। চলে আসার পর বুঝতে পারলাম, এদিকে পানির গভীরতা একটু কম। ওপাশে যে দুরত্বে গেলে কোমর পানি হওয়ার মত অবস্থা হত, এদিকে সেখানেও হাঁটু পানি। অর্থাৎ বহুদুর পর্যন্ত পানিতে ডুবানো চওড়া প্রায় সমতল জায়গা। কোমর পানিতে যেতে হলে তিন-চারশ ফুট ভেতরে যেতে হয় – আমরা অতদুর নামিনি, কিন্তু ওখানেও দুয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।

৩৫।
মেয়ের এটা প্রথম সমুদ্রে নামা। ভীষন উপভোগ করলো। এক জায়গায় পা ছড়িয়ে পানির দিকে পিঠ দিয়ে বসলে ঢেউয়ের ধাক্কায় প্রায় ৪-৫ ফুট সামনে চলে যাচ্ছে, আবার নেমে যাওয়া পানির টানে এর চেয়ে বেশি দুরে টেনে নিতে চাচ্ছে। আমার ভূমিকা সেখানে বেড়ার মত – যেন টেনে ওর নিয়ন্ত্রনের বাইরে না নিয়ে যায়। গিন্নি বহুক্ষণ একটু দুরে শুকনা বালুর উপরে বসে ছিল – কারণ পানিতে ওনার ঠান্ডা লাগছে। কিন্তু পরে আর আসা হবে না - এরকম কিছু ভেবে কিংবা আমাদের ফূর্তি দেখে, একটু একটু করে গোড়ালি পানিতে নামলো। তীরের কাছে পা ছড়িয়ে বসে ঢেউয়ের ধাক্কা খাওয়ার একমাত্র সমস্যা হল পানির সাথে প্রচুর বালু কাপড়ের মধ্যে ঢুকে পরে। পানি এমনিতে পরিষ্কার, তবে মাঝে মাঝে দুয়েকটা প্লাস্টিকের ছোট টুকরা যে পাইনি সেটা বলা যাবে না।

আরেকটু ওপাশেই প্যারাশুট পরে দড়ি দিয়ে বেঁধে ব‌োট দিয়ে টেনে ঘুড়ির মত উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থায় কিছু মানুষ উড়া-উড়ি করছিল। বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছিলো, কিন্তু মেয়ে তো পানি থেকে আর বের হতে চায়না - বরং আরো গভীরে যেতে চায়। আমাদের দুপুর ১২টায় চেক-আউটের সময়। তাই মোটামুটি ঘন্টাখানেক বা তার চেয়ে একটু কম সময় বীচের পানিতে দাপাদাপি করে আবার হোটেলে ফিরে আসলাম।





৩৬।
হোটেলে ফিরে ফ্রেস হয়ে প্যাকিং শেষ করা হল। ভেজা কাপড়গুলো একটা পলিথিনে ভরে সেগুলোও স্যূটকেস ভারী করলো। নিচের লবিতে এসে চেকআউট করে সেখানেই সামনে আমাদের লাগেজগুলো কিছুক্ষণের জন্য রেখে বাইরে সুভ্যেনির শপিং-এ বের হলাম। বাংলা রোডের মোড়ের আগেই একটা সুভ্যেনির শপ ছিল জিনিষপাতি দিয়ে এক্কেবারে ঠাসা - আগের দিন সেটা রেকি করে এসেছিলাম। কাজেই আজকে সেখানে গিয়ে বেশ কিছু সুভ্যেনির কেনা হল।

ঠিক দুপুর ১টায় আমাদের নিতে গাড়ি আসার কথা। কিন্তু প্লেন সেই রাত ৭টায়। কাজেই গাড়ি আমাদেরকে এয়ারপোর্ট ড্রপসহ মোটামুটি ৪ঘন্টা সার্ভিস দিবে - এরকম কথা হয়েছিল ফোনে। এতে গাড়ির খরচ হল আড়াইহাজার বাথ – ঘোরাঘুরির জন্য দেড়, আর এয়ারপোর্ট ড্রপ এক – এই হল আড়াইয়ের হিসাব। আগের দিন ওয়াইফাইয়ের কল্যানে একটু সার্চ করে দেখেছিলাম ফুকেটে দেখার মত কি কি জিনিষ আছে। ফেসবুকের স্ট্যাটাসের পরিস্থিতি, দূরত্ব, সময় - সব বিবেচনায় মনে হয়েছিলো যে একটা বড় বৌদ্ধ মূর্তি আছে - সেটা দেখে যাব। এছাড়া গিন্নির দাবী হল – যাওয়ার পথে পাথুরে বীচ দেখবে - নাহ্ বীচে নামবে না, শুধু একটু উঁচু জায়গা থেকে দেখবে!

৩৭।
এয়ারপোর্ট পাতং থেকে উত্তর দিকে, আর এই বৌদ্ধ হল দক্ষিন-পূ্র্বদিকে একটা পাহাড়ের উপরে। প্লেন নিয়ে একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলেও গাড়ি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন কমপ্লেন করার সুযোগ হয় নাই। এবারেরটা একটা টয়োটা করোলা Altis 1.8l – আর ওখানে আমাদের মত সিএনজিতে চলার কারবার নাই জন্য গাড়ির পেছনে মালপত্র রাখার বুট স্বাভাবিক সাইজের। গাড়ির ড্রাইভার বয়সে যুবক, হাসিখুশি ভোলাভালা চেহারার। পথে একটা জায়গায় দুই-মিনিটের জন্য গাড়ি থামিয়ে ওর বাসা থেকে জ্যাকেট পরে আর জুতা পাল্টিয়ে আসলো। জানালো এয়ারপোর্টের পথে কোনো বীচ-টিচ নাই বরং এখন বৌদ্ধ মূর্তিতে যাওয়ার পথে একটু সৈকত পেতে পারি।

পথে পাতংএর মত আরেকটা বীচ পড়েছিলো, সেখানে গাড়ি থেকে নেমে দুই মিনিটের মধ্যে উত্তাল বাতাসে বীচ/সমূদ্র ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে দুটা ফটো খিচে চলে এসেছিলাম। শহর, চড়াই-উৎরাই আর পাহাড় চড়তে চড়তে গাড়িতে বসেই আমরা হালকা খাওয়া দাওয়া করে নিলাম (7-ইলেভেন জিন্দাবাদ)। প্রায় ৫০ মিনিট লাগলো সেই বৌদ্ধ মন্দিরে পৌঁছাতে।

পথে যেতে যেতে আমাদের ড্রাইভার এই পথেই পরে এমন কয়েকটা টুরিস্ট স্পটে যেতে চাই কি না সেটা খোঁজ নিল। একবার তো একটা হাতির রাইডে প্রায় ঢুকেই পড়েছিল। বৌদ্ধ মন্দির (বিগ বুদ্ধা) যাওয়ার ১০-১৫ মিনিট আগে পাহাড়ের উপরেই একটা জায়গায়, কাঠের সিড়ি আর ফ্রেম বানানো হাতিতে চড়ার জন্য। বেশ কিছু টুরিস্ট সেই হাতিতে চড়ে পাহাড়ি পথে ঘুরতেও যাচ্ছে দেখলাম। কাছেই আরেক জায়গা থেকে দেখি চার-চাকার মটর-বাইকে চড়ে ১৩-১৪ জনের একটা গ্রুপ রাস্তার পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে এক লাইনে উপরের দিকে যাচ্ছে; সকলের সামনের বাইকে সম্ভবত ওদের গাইড। গাড়িতে বসে এই রাইডটাকে খুব বেশি আকর্ষনীয় কিছু মনে হল না - ওদের গন্তব্য জানা গেলে হয়তো অন্যরকম মনে হত। (এখন নেটে quad bike tour Phuket লিখে খুঁজে ছবিটবি দেখে অবশ্য বেশ এক্সাইটিংই মনে হচ্ছে)। এর আগে একটা জায়গায় নাকি সাপ, বান্দর আর পাখির তিনটা আলাদা শো আছে বলেছিল।

৩৮।
বিগবুদ্ধা জায়গাটা একটা পাহাড়ের উপরে। ওয়েবসাইটে যেমন বলেছিল, তেমনই এখান থেকে পুরা ফুকেটের ৩৬০ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। জায়গাটা অবশ্য এখনও আন্ডার কনস্ট্রাকশন। এখানে ঘুরাঘুরি করতে কোন পয়সা লাগে নাই – ভবিষ্যতে লাগবে কি না কে জানে। এই বিরাট সাদা রঙের ধ্যানেমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তিটি নাকি ৪৫ মিটার উঁচু! এর নিচে প্রায় চারতলার সমান ভবনের মত স্পেস আছে (সম্ভবত এই নিচের পুরা স্ট্রাকচার সহ ৪৫ মিটার)। সামনের দিক থেকে উপরে মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য বিরাট চওড়া সিঁড়ি। সিঁড়ির পাশে বিরাট আঁকাবাঁকা পাইপ/সাপের মত রেলিং - সেটার কাজ তখনও চলছিল। আসলে এই সিড়ি বেয়ে প্রায় চারতলার সমান উচ্চতায় উঠতে হয়। দুরের পথ থেকে যেমন দেখাচ্ছিল, সিঁড়ির নিচ থেকে তার চেয়ে অনেক সুন্দর সম্পুর্ন আবয়বটা দেখা যায়। আর সিঁড়ি বেয়ে উঠার সাথে সাথে চারপাশে পুরা ফুকেট আরও চমৎকারভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে।









একেবারে উপরের চত্বরে একতলার সমান উঁচু গোলাকার ভবনের ছাদে বিরাটাকার বৌদ্ধ মূর্তি। নিচের ভবনটা ফাঁকা, এখনও ভেতরে কিছু নাই। চারপাশে বারান্দায় বিভিন্ন রকম মূর্তি রাখা। এই চত্বরটায় বাতাস বেশ ঠান্ডা - ব্যাপারটা হয়ত ভৌগলিক কারণে; কিন্তু আসলেই এখানে উঠলে অসম্ভব একটা শীতল প্রশান্তি কাজ করে মনে। এই বিরাট চত্বরটার নিচে আরও তিন তলা আছে, যা ঐ সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময় খেয়াল করা যায় না – কারণ ভবনের আরেকপাশে পাহাড়ের একটা অংশ আর গাছপালা এই চত্বরের সাথে সমান সমান হয়ে এমনভাবে মিশে আছে, মনে হয় যে এই পুরা চত্বরটাই একটা পাহাড়ের মাথা।



৩৯।
এখানেও দেখলাম কিছু জায়গায় পানপাতার মত আকারের চকচকে কাগজ বা কোন একটা টুকরায় শিরি+ফরহাদ, লাইলি+মজনু টাইপের লেখা লিখে একটা উইশট্রিতে ঝুলিয়ে রেখেছে মজনুগণ। আরেকটা মজার বিষয় খেয়াল করলেন গিন্নি, সেটা হল এখানে আগত অনেক বিদেশিনীর পরনেই একই রকম ডিজাইনের কাপড়। আসল ঘটনা হল এঁরা নিচ থেকে আসার আগেই ডেকে নিয়ে এই কাপড় জড়িয়ে দিয়ে ধ্যান-ভঙ্গকারী উন্মুক্ত উত্তেজক অংশ ঢেকে দিয়েছে এখানকার সেবক-সেবিকাগণ। কারও কারও উপরের দিকেও কাপড় জড়িয়ে দিয়েছে! ফিরে যাওয়ার সময় নিচে সেগুলো আবার ফেরত নিতেও দেখেছিলাম।





বিগবুদ্ধা ছাড়াও এর পেছন দিকে দুটো প্রায় ৩ তলার সমান বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়ানো মূর্তি ছিল। আর বামদিকে পেছনে আরেকটা প্রায় দোতলার সমান উঁচু সোনালী রঙের বৌদ্ধ মূর্তি ছিল। অবস্থা দেখে মনে হল, এই সোনালী মূর্তিটি অনেক আগের তবে ধর্ম-ব্যবসা বা ট্যূরিজম আরও বাড়ানোর জন্য এই নতুন বিশালাকৃতি বিগবুদ্ধার সংযুক্তি।

বারান্দার মূর্তিগুলো আরও ইন্টারেস্টিং। এক জায়গায় শোয়া-বসা-দাঁড়ানো বিভিন্ন ভঙ্গিতে দেড় মানুষ সমান কিছু সোনালী মূর্তি। সেগুলোর প্রতিটার সামনে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন (রবি-সোম ….) লেখা। সাথে কারে সুন্দর পাত্র আছে – চাইলে সেখানে দান করা যাবে!





৪০।
‘বুদ্ধের পায়ের ছাপ’ লেখা সাইনবোর্ডটা দেখে ভেতরটা বেশ নড়েচড়ে উঠল। ওয়েল ওয়েল ওয়েল … সব ধর্মেই বুজরুকি আছে তাহলে! তারপর হাত আর পায়ের ছাপ তো সোনালী রঙের, সম্ভবত ছাপগুলো বাঁধায় রাখছে; আর ছাপের সাইজ দেখে মনে হল এই সাইজের হাত আর পা হলে মানুষটার উচ্চতা কমপক্ষে ৮ ফুট হওয়ার কথা। হাতের তুলনায় পা বেশ বড় – বিগফুটের মত অনেকটা। ছাপের উপরে কিছু কয়েন আগে থেকে রাখা আছে – সেই পিকে মুভির সহজ ইনভেস্টমেন্টের মতই মনে হয়েছিল সবকিছু। এটা বেশ শিক্ষনীয় সফর হয়ে থাকবে বলে মনে হল।

যুগে যুগে প্রকৃতির শক্তি আর অসুস্থতার কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব অনুভব করে মানুষ সুপেরিয়র কোনো শক্তির কাছে সারেন্ডার করে আশ্রয় লাভ করতে চেয়েছে। ভক্তিভারে নতজানু লোকজন তাই লালসালুওয়ালা মজিদদের খুব পছন্দনীয়।ভক্তি ব্যবসা একটা দারুন ব্যবসা। এখানে আমাদের মত শখের টুরিস্ট যেমন আছে, তেমনি তীর্থস্থানে আসা ভক্তিভারে নতজানু কিছু টুরিস্টও চোখে পড়েছে।







৪১।
এখানে চারপাশের দৃশ্যাবলী আসলেই মনমুগ্ধকর। যত দেখি ততই চেয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। সেরকম ভিউগুলো উপভোগ করার জন্য বেশ কিছু পয়েন্টও আলাদাভাবে তৈরী করা আছে। ছবি তুলে মন ভরে না, ছবিতে আসল সৌন্দর্য আসে না।

মঠ বা মন্দির থেকে নামার/ফেরার পথ এখানে প্রবেশ করার সিড়ি থেকে আলাদা। প্রবেশ পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া নিষেধ। বের হওয়ার সময় ডানে এখানকার সন্যাসী বা মন্কদের একটা আশ্রম আছে। অবশ্য সেটা গাছপালা বা ল্যান্ডস্কেপিং দিয়ে যত্ন করে আলাদা করা। সেখানে একরঙা কাপড় জড়ানো লোকজন আছে, যাঁরা সম্ভবত এই মন্দির নাকি মঠের পূজারী। এইখানেও একটা বেড়ালের সাথে দেখা, যে কিনা মানুষজনকে পাত্তাই দিল না। হঠাৎ এই কালো বেড়ালটাকে দেখলে মনে হয় সেও এখানকার কোনো ধ্যানরত পূজারী।

বের হওয়ার পথে সিড়ি দিয়ে কিছুটা নামলে একটা পাবলিক টয়লেট আছে। যতদুর মনে পড়ে এখানে রানিং ওয়াটার ছিল না - তারপরেও পরিছন্ন ছিল। সবশেষে নিচতলায় মূল মূর্তির ঠিক নিচে একটা সুভ্যনির শপের ভেতর দিয়ে বের হতে হয়। বেগম সাহেবা সেখান থেকে বেছে এমন একটা সুভ্যেনির কিনলো যা অন্য জায়গাগুলোতেও আছে। অথচ এই স্থানের ইউনিক সুভ্যনিরও ছিল। যাক, ব্যাপার নাহ্।

এই পর্যায়ে আমাদের ট্যাক্সির চালক দেখি আমাদের খুঁজতে খুঁজতে এসে হাজির। হয়তো আমাদের লেট দেখে চিন্তায় পরে গিয়েছিলো। আমরা বের হওয়ার সময় তিনজন নারকেল দেয়া আইসক্রিম খেলাম – ঐ মুহুর্তে যা অমৃতের মতই লেগেছিলো।













৪২।
সর্বমোট ১ ঘন্টার মধ্যে এই জায়গাটা দেখা শেষ। গাড়িতে উঠতে উঠতে ভাবলাম এবার তাহলে এয়ারপোর্ট। কিন্তু পাহাড় থেকে নামার আগেই ড্রাইভার মোটামুটি আমাদেরকে ফুসলিয়ে ঐ সাপ কিংবা পাখির শো যেখানে, সেখানে গাড়ি ঠেকাল। বাইরে থেকে পার্কিংএর জায়গাটা দেখে বড়সড় একটা নির্জন জায়গা মনে হচ্ছিলো। যার বাম পাশে সাপের আর ডানপাশে পাখির শো। কন্যা কালবিলম্ব না করে পাখি বেছে নিল (Phuket Bird Paradise)। ৩জন ঢুকতে নিল মোট ১৩০০ বাথ (৫০০*২+৩০০)। টিকিটের দাম দেখে একটু আক্কেল গুড়ুম হলেও কোন দ্বিধা করলাম না - কারণ এসেছি তো ঘুরতে আর গাছে ধরা টাকা উড়াইতে।

যেই মেয়ে দুইজন টিকেট কাউন্টারে ছিল; তাদের একজন আবার ভেতরে মশা আছে বলে হাতে পায়ে মশা-তাড়ানি স্প্রে দিয়ে দিতে চাইলো। দেশ থেকে এ্যাত দুরে আসতে পারলাম তাই এইসব ছোটখাট মশাটশাকে ভয়টয় পাওয়ার কোনো কারণ দেখলাম না। তারপরও যখন দিতে চাইছে, কন্যার হাতে পায়ে দেয়ায় নিলাম। তারপর ওরা বললো, বার্ড শো শুরু হতে আরও ২০ মিনিট বাকি আছে, তোমরা এই সময়টায় ভেতরে অন্য পাখি দেখ। ভেতরটা আহামরি তেমন বড় কিছু না; ১ একরের মত জায়গা হবে পুরাটা – সেখানে বিভিন্ন খাঁচায় বিভিন্ন রকম সুন্দর সুন্দর পাখি রাখা। ওটা ঘুরে দেখতে ১০ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। আমরা ঘুরে যখন আসছি তখন আরেক মহিলা কন্যাকে ছবি তোলার স্পট দেখিয়ে দিল। সেই মহিলা তখন শো-এর স্থানের বাইরের দিকটা ঝাড়ু দিচ্ছিলো।



৪৩।
শো এর জায়গায় বসে আছি। আমরা ছাড়া আর কেউ নাই। একটু পর দেখি আরো দুয়েকজন আসলো। সব মিলিয়ে ১০ জন দর্শকও হয়নি। কিন্তু ‘শো মাস্ট গো অন’। এক কথায় অসাধারণ একটা শো – হয়তো তেমন কিছু আশা করি নাই দেখে; হয়তো দর্শক কম থাকায় মনযোগ বেশি পেয়েছি দেখে – নাহ্, আসলেই ভাল ছিল শোটা। বিভিন্ন রকম পাখি, খেলার মধ্যে দুষ্টামি, আর কন্যাকে ডেকে নিয়ে অংশগ্রহণ করানো। মনে হয় আমরা প্রায় সবাইই কোনো না কোনো ব্যাপারে পার্টিসিপেট করেছি। হাতে, মাথায় পাখি নিয়ে ছবি-টবি তোলার ব্যাপারও ছিল। কন্যা তো গোসলের পর সারাদিন মূর্তি-টূর্তি দেখে একটু ফিউজ হয়ে ছিল, এখানে তার মুড পুরা ভাল হয়ে গেল – আমাদের টাকা পুরা উসুল। মাত্র কয়েকজন মহিলা মিলে একটা স্পট চালাচ্ছে কিভাবে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন - আর যে মহিলাকে বাইরে ঝাড়ু দিতে দেখেছিলাম -- উনিই কিন্তু পোশাক পরিবর্তন করে এসে শোটা পরিচালনা করলেন! গুগলে একটু Phuket Bird Paradise লিখে সার্চ দিয়ে ছবি দেখলে আরও একটু ভাল ধারণা হবে।

শো শেষে ফুরফুরে মেজাজে বের হওয়ার সময় চমৎকার প্রিন্ট করা ছবি পাওয়া গেল, সেগুলোও কেনা হল। এরপর গাড়িতে চড়ে সোজা এয়ারপোর্ট চলে আসলাম।





৪৪।
দিনের বেলা এখানকার রাস্তাঘাটের ধারের জীবনযাত্রা আরেকটু বিস্তারিত দেখা গেল। এখানে একটা বিষয় বেশ মজা লেগেছে সেটা হল মটরসাইকেলের পাশে (পেছনে নয়) ফ্রেমের মত করে চাক্কা সহ একটা গাড়ি লাগানো – অনেকটা আমাদের ভ্যানের মত। এই সাইকেল-মাইক্রোট্রাকে করে ওরা বিভিন্ন স্ট্রিট-শপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আরেকবার একটা পিকআপ ভ্যানের পেছনে ছোট ছোট প্যাকেটে ঝুলানো মালপত্রওয়ালা মুদি দোকানটাও বেশ ভাল আইডিয়া মনে হল।





এয়ারপোর্টে বেশ আগেই পৌঁছেছি। কাজেই সেখানকার একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকে বকেয়া খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম। এবার আর প্লেন ডিলে ছিল না।

৪৫।
ব্যাংকক এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর ৩ নং গেটের সামনে মিস প্লা-এর সাথে যোগাযোগ করার কথা। আমরা লাগেজ সংগ্রহ করে ৩ নং গেট খুঁজে পৌছাতে পৌছাতেই দেখি সেখানে আমার নাম লেখা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়স্ক একজন লোক। সেই লোককে পরিচয় দিয়ে ফলো করতে করতে এয়ারপোর্ট বিল্ডিং থেকে সরাসরি রাস্তার অন্যদিকে পার্কিং বিল্ডিংএ চলে আসলাম একটা ব্রিজ দিয়ে। আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে গাড়ি নিয়ে আসলো। গাড়িটা বাইরে থেকে খুব দামী লাক্সারি মডেলের ব্যক্তিগত গাড়ি মনে হচ্ছিলো। ভেতরে দেখলাম সেটা টয়োটা, কিন্তু আসলেই ভেতরটা সেইরকম দামী এবং প্রশস্ত। মেয়ে তো বলেই বসলো - সাচ এ নাইস কার!

ব্যাংককে তখন বেশ রাত। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল পৌঁছুতে ৩০ মিনিটের মত লাগলো। রাস্তার মধ্যে ফ্লাইওভারের মত হাইওয়েই ছিল বেশি - সেখানে গাড়ি চলেছে ১২০-১৩০ কিমি গতিতে। মূল শহরে একটা জায়গায় দেখি একদিকে রং ওয়েতে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল -- অবশ্য সামনে পিছে আরও গাড়ি ছিল। পরে একসময় খেয়াল করলাম রাস্তার ৮ লেনের জন্য ৮টা সিগনাল বাতি - তার মধ্যে সবচেয়ে বামের ১টাতে (কোথাও ২টাতে) সবুজ আর বাকীগুলো লাল-কাটা দেয়া - কাজেই আমরা আসলে ঠিকই আছি, রংওয়েতে না। অর্থাৎ কোনরকম ডিভাইডার ছাড়াই একটা ৮ লেনের রাস্তা কোনরকম ঝামেলা ছাড়া লেন মেনে সকলে ব্যবহার করছে। নিশ্চিতভাবেই ট্রাফিক ডিমান্ড অনুসারে দিনের বিভিন্ন সময়ে আসা এবং যাওয়ার লেনের সংখ্যা পরিবর্তন করে দেয় সেখানে।

৪৬।
এক্কেবারে শেষ পর্যায়ে বেশ কিছু চিপা গলি দিয়ে হোটেল অ্যাম্বাসেডরে এসে পৌঁছালো -- এই এয়ারপোর্ট পিকআপ আমাদের প্যাকেজের অন্তর্গত ছিল। এই এলাকাটার রাস্তা (গলিগুলো) এখনও লোকজন, দোকানপাটে গমগম করছে। ৪-স্টার হোটেল অ্যাম্বাসেডরের লবিটা এত বিশাল যে অবাক হয়ে গেলাম। যা হোক চেকইন করে টরে রুমে মালপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়েই বের হলাম খাদ্যের সন্ধানে। হোটেলে প্রবেশের আগেই গাড়ি থেকে 7-Eleven দেখেছিলাম। কাজেই তিনজনে মিলে গিয়ে ঠিক সামনের গলির উল্টাপাশেই সেইখান থেকে বিপুল পরিমানে খানা-খাদ্য কিনে নিয়ে আসলাম।

মজার ব্যাপার হল হোটেলের লবি থেকে বের হয়ে সামনে আরেকটা ভবনের মাঝের করিডোর দিয়ে গিয়ে গলি ক্রস করলেই দোকান। আর হোটেলর অংশ যেই ভবনটার মধ্য দিয়ে আসলাম সেটার মধ্যেই আমাদের ট্রাভেল এজেন্টের অফিস। বাংলাতে সাইনবোর্ড লেখা আরও ৪-৫টা ট্রাভেল এজেন্টের দোকান সেখানে। এমনকি বাংলা খাবার পাওয়া যায় এমন লেখাও দেখলাম। ট্রাভেল এজেন্টের অফিস খোলা ছিল, তাই পরদিনের ট্যূর সম্পর্কে জেনে তারপর রুমে চলে আসলাম।

(চলবে)

শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬

ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ৩


(আগের পর্বগুলোর লিংক:
ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ১
ফুকেট ও ব্যাংকক ভ্রমণ - ২ )

১৬।
এখানে এসে প্রথমে যে বিষয়টা অনুভব করলাম সেটা হল বিশেষত আমি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পোশাকআশাক পরে আছি। রাস্তাঘাটে ছেলেরা সাধারণত থ্রী-কোয়ার্টার বা হাফ প্যান্ট আর চপ্পল পরে ঘুরছে। অনেক মেয়েরা যে হাফপ্যান্টগুলো পড়ে ঘুরছে ওগুলো সাধারণত ছেলেদের প্যান্টের তুলনায় অর্ধেক দৈর্ঘের, ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্যান্টের কাপড় ছাড়িয়ে নিচ দিয়ে পকেটের নিচের অংশ দেখা যাচ্ছে। অবশ্য স্বাভাবিক পোশাকে কিংবা এমনকি বোরখা পরা লোকজনও দেখলাম ওখানে। অধিকাংশের পায়েই চপ্পল বা হালকা টাইপের স্যান্ডেল। তাই প্রথম সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার পথে আমরা তিনজনের জন্যই হালকা দুই ফিতার চপ্পল কিনে নিয়েছিলাম বাংলা রোডের একটা দোকান থেকে। পরবর্তী সময়ে ফুকেটে পুরা সময় এই চপ্পল পরে ঘুরেছি। শুধুমাত্র প্লেনে ট্রাভেলের সময়ে জুতা পরেছি – তাও সেটা ব্যাগেজে বেশি জায়গা নেয় বলে। ২য় দিন সন্ধ্যায় আরও জ্ঞান বৃদ্ধি পাওয়াতে নিজের জন্য একটা হাফ-প্যান্টও কিনে নিয়েছিলাম – আমার বেঢপ সাইজ পেতে একটু ঘুরতে হয়েছিল অবশ্য।

১৭।
২য় দিন ছিল ঢাকা থেকে ক্রয়কৃত ট্যূর প্যাকেজ – ফী ফী আইল্যান্ড ট্যূর। সকালে অতি কষ্টে বিছানা ছেড়ে নিজেরা এবং মেয়েকে রেডি করে নিচে নেমেছি এমনভাবে যেন নাস্তা করে রওনা দিতে পারি। যখন নেমেছি তখন ঠিক ৭টা বাজে। নিচের রেস্টুরেন্ট, যেটাতে গত দুপুরে খেয়েছিলাম সেখানেই নাস্তার আয়োজন। সেই রেস্টুরেন্টে ঢোকার আগেই হোটেলের লবিতে এক লোক জিজ্ঞেস করে ফি ফি আইল্যান্ড? ---- ইয়েস! একটা কাগজ দেখিয়ে বললো - ইয়োর নেম?, দেখি একটা লিস্টে ভুল বানানে আমার নাম লেখা আছে, পাশে ২+১ এরকম কিছু সংখ্যা - পরে বুঝেছি ওটা হল ২জন + ১জন বাচ্চা’র সিম্বল – কাজেই ঐ লোক সহজেই প্র‌োফাইল মিলিয়ে আমরাই যে যাত্রী সেটা লবিতে আন্দাজ করে নিতে পেরেছে। ‘টেক ব্রেকফাস্ট, কার ইন ফ্রন্ট’। মনে মনে ভাবলাম, কি গিরিঙ্গি – এই ব্যাটার আরো ১৫ মিনিট পরে আসলে কি সমস্যা হইতো? আমরা নাস্তা করতে ঢুকলাম।

কোনোরকমে একটু খাওয়ার পরই ঐ লোক রেস্টুরেন্টে হাজির। বলে ৫ মিনিট শেষ, গাড়ি সামনে আছে। মেজাজটা একটু খারাপ হলেও চা না খেয়েই রেস্টুরেন্টের সামনে বের হলাম। একটা উঁচু ছাদের বড় মাইক্রোবাস সেখানে অপেক্ষায়। সামনে ড্রাইভারের সিটের সারি বাদে পেছনে চার সারি সিট – অর্থাৎ ১৩ জন যাত্রী নিতে পারে এটি। মাইক্রোবাস ছাড়ার পর যেই না ভেবেছি ‘বাপরে! আমাদের জন্য এ্যাত বড় গাড়ি দিয়েছে’ – তখনই আমাদের হোটেল থেকে বড়জোর ৫০০ ফুট সামনে আরেকটি হোটেলে প্রবেশ করলো। ওখানে কিছুক্ষণের মধ্যে আরো ৩/৪ জন ককেশান (সাদা বা লালচে চামড়ার) টুরিস্ট উঠলো। গাড়ি সেখান থেকে বের হয়ে আরো হাফ কিলোমিটার পর আরেকটা হোটেলে ঢুকলো। সেখান থেকে আরো ৭/৮ জন উঠলো – গাড়িটার একটা সিটও খালি থাকলো না। এরপর গাড়িটা পাতং থেকে বের হয়ে পূর্ব-উত্তর দিকে আগাতে থাকলো। মেয়ের ঘুম পুরা হয়নি, তাই নতুন মানুষ দেখা কৌতুহল মিটিয়ে ও ঘুমাতে থাকলো।

১৮।
আমাদের হোটেলের সামনের রাস্তাটা ওয়ান ওয়ে। সম্ভবত সেই কারণে গাড়িতে ওঠার সিরিয়ালে আমরা প্রথমে ছিলাম। সব যাত্রী নিয়ে গাড়িটা যেতে যেতে রাস্তার একটা সিগনালে দাঁড়ালে দেখি আশে পাশে একই সাইজের আরো ৬-৭টা গাড়ি। বুঝলাম টুরিস্টদের জন্য এখানে এটা একটা কমন বিষয়। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট চলার পর এটা একটা নৌবন্দরের সামনে পৌঁছুলো। আমাদের আগে পিছে একই রকম আরো অনেকগুলো গাড়ি। ড্রাইভার আমাদেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথা গুনে ওখানে থাকা আরেকজনের দায়িত্বে দিল। সেখানেও আরেক লিস্টে নাম মিলিয়ে আমাদের প্রত্যেকের কাপড়ে একটা করে হলুদ রঙের ফি ফি আইল্যান্ড লেখা স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে বলল‌ো এগিয়ে যেতে আর একেবারে লাস্ট জাহাজে উঠতে।

দুইটা জাহাজের ডেকের উপর দিয়ে গিয়ে আমাদের তিনতলা জাহাজে (নাকি লঞ্চ?! ক্রুজার?) উঠলাম। এখানে এক ক্রুজার থেকে আরেকটাতে যাওয়ার সময় উঁচা সাইডগুলো পার হওয়ার জন্য সিড়ি লাগিয়ে রেখেছে যেন কোনরকম হাইজাম্প-লংজাম্প না করেই স্মুথলি হেঁটে যাওয়া যায়। এই ক্রুজারগুলো টপকানোর সময় খেয়াল করলাম দুইবার দুইজন লোক আমাদের ছবি তুললো। আন্দাজ করলাম আসার সময়ে ছবি বেঁচবে …

ক্রুজারে সেখানকার ক্রু বলছে যেখানে খুশি বস (এর ইংলিশ উচ্চারণ একটু ভাল ছিল)। আমরা দোতলায় উঠে দেখি ইতিমধ্যে গুটিকয় লোক সেখানে বসে আছে। এটার উপরে ছাদ আছে, সেখানে যাওয়ার সিড়িও আছে। পেছনের এদিকটা খ‌োলা, সামনের দিকে একটা দোকানের মত, আর তার পেছনে প্রায় অর্ধেক ক্রুজার জুড়ে সম্ভবত হলরুমের মত বড় কেবিন। এই খোলা জায়গায় সারি সারি আরামদায়ক/বড় সাইজের প্লাস্টিকের চেয়ার বিছানো। দুই সাইড আর পেছনের রেলিং ঘেষে বেঞ্চের মত বসার জায়গা। ক্রুজারের বামসাইড - পূর্বদিকে প্রচুর র‌োদ, তাই ছাদে ওঠার সিড়ির ডান পাশে ছায়া দেখে একটা জায়গায় বসলাম তিনজন।

১৯।
আমাদের কারোই গতরাতে যথেষ্ট বিশ্রাম হয়নি - তাই বসে বসে ঝিমুচ্ছি। মাঝে মাঝে ভেঁজা বাতাসের ঝাপটা একটু আরাম দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্রুজারের ছাড়ার নাম নাই। এর মধ্যে কন্যার ক্লান্তি এবং ঘুমজনিত সমস্যা - দুয়েক পশলা বমি হয়ে গেল। এর মধ্যে ক্রুজারে আরো লোক উঠছে তো উঠছেই। আমাদের নাস্তা পুরা না করে এ্যাত আগে নিয়ে আসলো আর এদিকে দেরী করতেছে -- ব্যাপারটা হোটেলওয়ালাদের ষড়যন্ত্র কি না ভাবছিলাম বসে বসে।

নতুন নতুন মানুষ দেখতে খারাপ লাগছিলো না। বিশেষত যখন পুরা রান দেখানো মানুষজন থাকে তখন কে আর এ ব্যাপারে কমপ্লেইন করবে :D। খেয়াল করে দেখলাম, আমাদের আশেপাশে যাঁরা বসেছে তাদের কারো কারো স্টিকারগুলো নীল রঙের। এরপর সবুজ রঙের স্টিকারওয়ালা কিছু যাত্রীকে ক্রুজারের ক্রুগণ দেখি গাইড করে এই দোতালার সামনের দিকে কেবিনে ঢুকিয়ে দিল। আশেপাশের কথাবার্তায় বুঝলাম - সবুজ স্টিকারওয়ালারা এসি কেবিনে থাকবে। বাইরে একটু গরম-গরম ছিল তা সত্য - সেটা আবহাওয়া আর ছোট ছোট পোশাকের দুই কারণেই। কিন্তু তাই বলে চমৎকার ক্রুজে ওদের ওরকম কেবিনে ঢুকে যাওয়াটা আমার কাছে একটু বোকামীই মনে হচ্ছিলো। যা হোক, প্রায় ৫০ মিনিট অপেক্ষার পর আমাদের ক্রুজার ছাড়লো -- নাস্তা মিস করানোর জন্য ইতিমধ্যেই গাড়িওয়ালাকে শাপ-শাপান্ত করা হয়ে গিয়েছে কয়েকবার।
২০।
ক্রুজার ছাড়ার পর বাতাস আরো আরামদায়ক হয়ে উঠলো। প্রায় ঘুম ঘুম পরিবেশ - কিন্তু চারপাশে এ্যাত চমৎকার দৃশ্যাবলি ছেড়ে কে ঘুমায় ;) । সামনের দোকান থেকে গিন্নি আর কন্যা গিয়ে কন্যার জন্য চারপাশে কার্নিশওয়ালা একটা হ্যাট কিনলো। মাঝে মাঝে দুয়েকজনকে ডিসপোজেবল কাগজের কাপে করে চা কিংবা কফি খাইতে দেখে তদন্তে বের হলাম -- কারণ সামনের দোকানে চা-কফির কোনো আয়োজন ছিল না। রেলিঙের ফাঁক দিয়ে লক্ষ্য করলাম নিচতলার ডেকে এই চা-কফি ওয়ালাদের বিচরণ বেশি।

নিচের তলায় একটু ঘুরে এসে যা যা আবিষ্কার করলাম তা হল - আমাদের ঠিক নিচেই দুপাশে মহিলা এবং পুরুষদের বেসিন সুবিধা সহ একাধিক টয়লেটের ঝকঝকে তকতকে ইউনিট আছে। এছাড়া, আরেকটু সামনে কেবিনের মত চারপাশ বন্ধ ডেকে ঢুকলে সেখানে স্কুবা-ডাইভিং টাইপের জিনিষপাতি ভাড়া দেয়ার দোকান আছে বামপাশে, আর, ডানপাশের দোকানে চমৎকার চা-কফি সাজানো --- এবং তা-ও বিনামূল্যে। বাঙালি তো ফ্রীতে আলকাতরাও খায় -- চা-কফি বাদ্দিবো কেন! তবে কফি খাওয়ার আগে কোন আকৃতির কাগজের গ্লাসে ঠান্ডা পানি খেয়ে প্রাণ জুড়ালাম (জ্বী, সেটাও ফ্রি :) )। অবশেষে নাস্তা তথা চা মিস করা দূঃখ ভুলে গেলাম।

২১।
উপরে এই খবর আমার পরিবারে পৌঁছালে তারাও এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলো। গোপাল ভাঁড় আর রাজার গল্প জানা কে না জানে টয়লেট একটি জরুরী বস্তু ... । গিন্নি নিচতলায় অভিযানে গেলে -- এটা অভিযান কারণ খাড়া সিড়ি বেয়ে চলন্ত ক্রুজারের দুলুনী এবং সিনেমাটিক উপায়ে ছিটকে বাইরের অথৈ সমূদ্রে পড়ে যাওয়ার আশংকা উপেক্ষা করে নামতে হয়েছে ওনাকে ---- আমরা: মানে আমি এবং কন্যা ক্রুজারের ছাদে অ্যাডভেঞ্চারে গেলাম ... ;)

ইয়াল্লা! মারহাবা! ছাদে দেখি আরো এলাহি কারবার। একই রকম প্লাস্টিকের চেয়ার বিছিয়ে রাখা ছাড়া কিস্যুই নাই -- কিন্তু ওখানেই বেশ কিছু লোকজন সূর্যালোক পোহাচ্ছে! বিশেষ করে ছাদের সামনের দিকে একটু উঁচু জায়গাটায় সংক্ষিপ্ত পোশাকে আধশোয়া মিছিল -- এ্যাতদিন জানতাম বিচে টিচে গেলে এসব দেখা যায়; কিন্তু সেটা আসলে সমুদ্রের পাড় - এই মাঝ সমুদ্রের তিনতলার রৌদ্রের তুলনায় নিঃসন্দেহে কম গ্রেড পাবে। আমরা গরমে মরি আর এরা র‌‌োদে পোড়ে কেন সেটা বুঝতে আরো কিছুক্ষণ উপরে ঘোরাঘুরি করলাম। ওখানে আমাদের মতই বেশি কাপড়-চোপড় পরা বাঙালাদেশী বিশাল পরিবার দেখলাম একটা - বিশাল মানে মা-বাবা থেকে আন্ডা বাচ্চা সবই ছিল - প্রায় ফুটবল টিমের সমান। আবার দোতালায় নেমে দেখি গিন্নি ইতিমধ্যেই সিটে ফিরেছেন আর আমাদের খোঁজে ইতিউতি তাকাচ্ছেন।

২২।
যখন দুর থেকে নিচের ছবির মত খাঁড়া একটা দ্বীপ দেখলাম; ভাবলাম আহ পৌঁছে গেলাম মনে হয়। কিন্তু এটা আসলে মোটেই আমাদের গন্তব্য নয়। এর পাশ দিয়ে চলে আসলাম। পুরা পথে এরকম আরো কয়েকটা খাড়া পাড়ের মনোমুগ্ধকর ছোট দ্বীপ পার হয়েছিলাম। ছবি তোলার এমন চমৎকার উসিলায় ছাদে যাব না তা কি হয়!




২৩।
ছাদের গরমে -- মানে আসলেই রোদের গরমের কথা বলছি -- ক্লান্ত হয়ে নিচতলায় আবার পানি খেতে এসে আবিষ্কার করলাম ঐ দোকানদ্বয় যেই এয়ার কন্ডিশনড স্পেসে সেটার ভেতরে পুরা জায়গাটাতেই বহু যাত্রী বসে আছে। ওখানে যাত্রীদের জন্য সারি সারি চেয়ার ফিট করা আছে। ভেতরে ঐ বাংলাদেশি পরিবারটার লোকজনও আছে মনে হল। প্রতিটা চেয়ারের হেলান দেয়ার জায়গায় একটা করে লাইফ জ্যাকেট কায়দা করে পেঁচিয়ে রাখা। কাজেই উপরে গিয়ে গিন্নি আর কন্যাকে নিচে নিয়ে আসলাম আর খালি চেয়ার খুঁজে বের করে সেখানে বসে পড়লাম। আসলেই বাইরের হিউমিড জায়গার চেয়ে এই জায়গাটা এখন আকর্ষনীয় মনে হতে থাকলো।

বসে বসে ঝিমাচ্ছি, আর ওদিকে দেখি মেয়ে অবশেষে ঘুমিয়েই পড়লো। তবে আমাদের এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না -- স্পিকারে ক্রুজারের ক্যাপ্টেন কি কি জানি ঘোষনা দিল; সম্ভবত ইংরেজিতেই বলেছিলো, কিন্তু তা বোঝে কার বাপের সাধ্য! ভাবসাবে যা বুঝলাম আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। But I was wrong!

২৪।
আমরা যেখানে বসেছিলাম সেটা ছিল প্রায় সামনের দিকে, ডানপাশে। কাজেই সামনের এবং দুইপাশের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে বাইরের দিকটা বেশ ভালই দেখা যাচ্ছিলো। লাউডস্পিকারের কথা শুনে চোখ খুলে সামনে যা দেখলাম তা এক-কথায় অসাধারণ। বাম থেকে ডানে বিস্তৃত খাড়া পাহাড়ের মাঝে একটা চওড়া ফাটলের মত জায়গার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। পাহাড়গুলো খাড়াভাবে এ্যাত উঁচুতে উঠে গেছে (কিংবা আমরা এ্যাত কাছে চলে এসেছি) যে সামনের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছিলো না। মাঝখানের ফাটলের মত খাড়িতে ডানদিকে একটা ছোট্ট বিচ দেখা যাচ্ছে, সেখানে কিছু মানুষ ঘোরাঘুরি করছে, কিছু ছোট ছোট নৌকায় আশে পাশে ঘুরছে – একেবারে যেন কল্পনার দেশের দৃশ্য।

এখানে ক্রুজার কোথায় ভিড়াবে সেটা নিয়ে একটু চিন্তা চিন্তা ভাব হচ্ছিলো। এই পর্যায়ে দেখি আমাদের ক্রুজারটা ১৮০ ডিগ্রি এবাউট টার্ন করিয়ে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখলো। কিভাবে নামানামি হবে, কোথায়ই বা লাঞ্চ করাবে এসব খোঁজ করতে ক্রুজারের পেছনের দিকে খোলা ডেকে বের হয়ে আসলাম। দেখি দুয়েকটা নৌকা ক্রুজারের কাছাকাছি এসেছে, আর ওগুলোতে কয়েকজন উঠেও পড়ছে। কিন্তু পরিষ্কার কোনো তথ্য কোথায়ও কাউকে ঘোষনা করতে শুনলাম না। অবশ্য তেমন দুশ্চিন্তা হয়নি, কারণ ঝাঁকের কৈয়ের মত সবাই যেদিকে যাবে সেদিকেই তো যাব। এমন সময় আবার লাউড স্পিকারে দূর্বোধ্য ইংরেজিতে কি কি জানি বললো। বলতে না বলতেই আবার ক্রুজার ছেড়ে দিল … … … আরে! এটুকুই নাকি? লাঞ্চ ক‌োথায় ভাবতে ভাবতে বুঝলাম ক্রুজারটা ডানদিকে পাহাড়ের ধার ঘেষে যাচ্ছে। তখন মেমরি রিওয়াইন্ড করে যতদুর বুঝলাম, ক্যাপ্টেন বলেছে যে এই জায়গাতে ঢেউ খুব বেশি - ক্রুজার স্টেডি রাখতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে; আমরা অন্যদিকে নামবো।

২৫।
পাহাড়ের ধার ঘেষে একটু আগাতেই মনে হল এদিকে সাগর অনেকটাই শান্ত, কারণ দুলুনী কমে গেছে। আর পাহাড়টা ঘুরে একটা উপসাগরের মত জায়গায়, অর্থাৎ তিনদিকে পাহাড় বা ল্যান্ড আর একদিকে সমূদ্র - ঘুরতেই দুলুনি পুরাপুরিই নাই হয়ে গেল। আসার পথে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে খাড়ির মত জায়গায় ছোট ছোট ট্রাডিশনাল নৌকা আর আধুনিক স্পিডবোট দুরকম বাহনে আরো অনেক পর্যটককে বিভিন্ন পানির অ্যাডভেঞ্চারে আছে বলে মনে হল। পাহাড়ের গায়ে পানির কাছাকাছি কিছু গুহার মত জায়গাও দেখলাম।

কেবিনের ভেতরে এসে এই তথ্য দিয়ে বসতে বসতে আশেপাশে আরেকটু নজর দেয়ার অবসর মিললো। অনেক লোকজনই কেবিনের চারদিক দিয়ে সরু বারান্দার মত জায়গায় বের হয়ে বাইরের দৃশ্য আরও ভালভাবে উপভোগ করা চেষ্টা করছে। কেউ কেউ সামনের দিকের ছোট্ট ডেকে পৌঁছে গিয়ে ছবি তুলছে। কন্যা যেহেতু ঘুমাচ্ছে, আমরা মিয়া-বিবি ওকে রেখেই একপাশের একটা দরজা দিয়ে বের হয়ে ঐ সরু বারান্দা হয়ে সামনের ডেকে গেলাম ছবি টবি তুলতে। ততক্ষণে আমরা একেবারে শান্ত উপসাগরে, ঘাটের দিকে অগ্রসরমান।
কেবিনের ভেতরে লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু যাত্রী মোটামুটি কলছেড়ে দিয়ে ওয়াক্ ওয়াক্ চালিয়ে যাচ্ছে। মুখের সামনে একটা পলিথিন যে ধরেছে আর সরানোর নাম নাই। এই সামান্য দুলুনি বা রোলিং-এ আমাদের বা অন্য বাঙালি ফ্যামিলির কারোই কিস্স্যূই হয় নাই। "হুঁ হুঁ বাবা -- সমূদ্র লাগবে না, বিদেশীরা পারলে আমাদের রাস্তায় গাড়িতে চড়ে ঘোরাফিরা করে আইসো, বুঝবা রোলিং কত প্রকার ও কী কী!"

২৬।
ক্রুজারটা অবশেষে ঘাটে ভিড়লো। ডান-বাম দুদিকেই পাহাড়। মাঝের একটু জায়গায় বেশ কিছু স্থাপনা দেখা যাচ্ছে। ঘাট থেকে বামদিকে একটা ছোট বীচ। ক্রুজারের একজন কর্মী একটা বাক্সের উপর দাঁড়িয়ে কি কি জানি বলে যাচ্ছে। শুনলাম লাঞ্চ দুপুর একটায় একটা হোটেলে, এখন বাজে সাড়ে ১১টার মত। অতশত শোনার সময় নাই, ঝাঁকের সাথে যাব ভেবে আমরা নেমে পড়লাম। ঘাটে টোল দিতে হয় জনপ্রতি ২০ বাথ। এটা নিয়ে দুয়েকজনকে ক্রুজারের মধ্যেই হাউকাউ করতে দেখলাম -- তাদের প্যাকেজে সব খরচ দেয়া আছে, এগুলার কথা বলা নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।

জায়গাটা সম্ভবত কিছুদিন আগে বড়সড় কোনো ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছিলো। কারণ ঘাটের রেলিংয়ের সাথের লাইটপোস্টগুলো মুচড়িয়ে ভাঙ্গা হয়েছে মনে হচ্ছিলো। ঘাট থেকে বের হলেই বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের হাটের মত পায়ে হাটা পথ আর দুপাশে দোকানপাট। কোন দোকানে ট্যূর প্যাকেজ বিক্রয় হচ্ছে, কোনটাতে স্কুবা গিয়ার, কোনটাতে সুভ্যনির, কোনোটাতে খাবার। হঠাৎ সেখানেই ডানদিকের গলিতে একটা 7-Eleven চোখে পড়লো। তাড়াতাড়ি সেটাতে ঢুকে কিছু খাবারদাবাড় কিনলাম। এই খাবারগুলো সেই হোটেল বা কোথাও বসে খাওয়া দরকার। আমার জামাতে লাগান‌ো ফিফি আইল্যান্ড স্টিকারটা কোথায় জানি খসে পড়েছে। একই রকম স্টিকার লাগানো একজনকে জিজ্ঞেস করে লাঞ্চের স্থানের দিক পেলাম। সেটা আসলে সেই সেভেন ইলেভেন থেকে সামান্য একটু সামনেই -- নাম ফি ফি হোটেল।

২৭।
হোটেলের সামনে ডানে বামে সুন্দর বসার জায়গা। সেখানে সোফা, চেয়ার পাতা আছে। বামদিকের জায়গাটাতে আমরা বসলাম। আরো স্টিকার লাগানো গেস্ট এদিক সেদিক বসে ছিল। পাশেই একটা সুইমিং পুল। আমরা সেখানে বসে আগে কেনা খাবারগুলো খেলাম -- আহ্ শান্তি। অন্যপাশে বিড়াল দেখতে পেয়ে মেয়ে সেদিকে গেল। এখানেকার বিড়ালগুলো মানুষ দেখলে ভয়ও পায়না পাত্তাও দেয় না। মেয়ে গিয়ে বেড়াল ছুঁয়ে আদর টাদর করে আসলো। হাত ধুইয়ে নিয়ে আসলাম তারপর। সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে ওদিকেই খাওয়ার আয়োজন। সেখানে প্রচুর ল‌োক খাচ্ছেন। সবুজ স্টিকারযুক্ত লোকজনের জন্য ১২টায় লাঞ্চ শুরু হয়েছে।

এর মধ্যে কেউ একজন ঝপাং করে সুইমিংপুলে লাফ দিলো। সাথে সাথে কোত্থেকে হোটেলের এক লোক এসে তাকে কড়া ভাষায় বললো - নো সুইমিং হেয়ার; সুইমিং ৫০০ বাথ। ঐ পর্যটকও আমাদের মত ট্যুরের অংশিদার; খাওয়ার আগে বীচে টিচে ভিজে এসে এখানে ফ্রেশ হতে চেয়েছিলো। হোটেলের দুইজন গেস্ট সেখানে ইতিমধ্যেই সাঁতার কাটছিলো; তারা এবং আমরা যারা খাওয়ার জন্য অপেক্ষায় - সবাই বেশ অবাক হয়ে পুরা ঘটনা দেখলাম। যা হোক এদিকে লাঞ্চের প্রথম পর্ব শেষে আবার টেবিল রেডি করতে থাকলো। কিছু অতি উৎসাহী টুরিস্ট সেখানে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে গেল - যদিও ১টার আগে তাঁদের ঢুকতে দেয়া হয়নি।

২৮।
এ্যাতক্ষণ নিশ্চিন্তে বসে থাকলেও যখন লাঞ্চের জন্য যখন হেলেদুলে নিচতলার রেস্টুরেন্টে ঢুকতেছিলাম তখন দেখি সকলের হাতেই টিকেট। কোত্থেকে পেল কে জানে। আমার তো শার্টে লাগানো স্টিকারও নাই। তারপরও নিষ্পাপ বেশে স্বাভাবিক মুখে এগিয়ে যেতেই সেখানকার একজন হাতের লিস্ট থেকে বললো তোমার নাম এটা? আমি দেখি ৪/৫ জনের সাথে আমার নামও আছে। হ্যাঁ বলতেই বললো ৩ আর ৪ নম্বর টেবিলে ত‌োমাদের আয়োজন। উফ্ফ্ টেনশনে পড়তে গিয়েও বেঁচে গেলাম ... আর ওদের টুরিস্ট ব্যবস্থাপনায় অবাক হয়ে গেলাম।

খাওয়ার টেবিলগুলো গোলাকৃতির, চারপাশে ১২জন বসার আয়োজন। টেবিলের মাঝে একটা ঘুরতে সক্ষম ট্রের মত আংশ আছে; সমস্ত খাবার-দাবাড় সেখানেই সার্ভ করা হয়েছে। খুব আহামরি কিছু খাবার না হলেও সবগুলোই ছিল উপাদেয়। ভাত, নুডলস্, চাইনিজ ভেজিটেবল, মুরগী, সাধারণ ভেজিটেবল, কেশ‌‌োনাট সালাদ, ক্লিয়ার স্যূপ -- সবকিছুই গরম গরম। আমার মেয়ের দেখলাম ডোনাটের মত দেখতে গোল গোল পেঁয়াজের টুকরা বেসনে (বা আটা টাইপের কিছুতে ) ভাজা বেশ পছন্দ হয়েছে। সেখান থেকে পেঁয়াজটুকু বাদে বাকি অংশটুকু খাচ্ছে! সামনে দুই বাচ্চাওয়ালা একটা মিডল-ইস্টের ফ্যামিলি বসেছিলো। ওরা তেমন কিছুই খেল না -- হয়তো এদিকের ভাত-নুডুলস, রান্না বা ফ্লেভার ওদের ভাল লাগেনি। ডানে এক বাচ্চাওয়ালা বাংলাদেশি একটা পরিবার বসেছিলো - তারা আর আমরা গল্পসল্প করতে করতে বেশ মজা করেই খাওয়া দাওয়া করলাম।

২৯।
ঠিক আড়াইটায় ক্রুজার ছেড়ে যাবে। কাজেই খাওয়া দাওয়ার পর সব মিলিয়ে মাত্র ৪৫ মিনিট সময় পাওয়া গেল ঘুরাঘুরি করার জন্য। ঠিক করলাম ঘাট থেকে দেখা বামদিকের বীচটায় একটু পা ভিজিয়ে আসবো। তাই ওদিকে রওনা দিলাম। হোটেলের পাশে নিচের ছবির মত পাদি, তাও কিনা ফাইভ স্টার - লেখা দেখে ভাবলাম ছবি তুলে রাখি। আগে অন্য হোটেলের মেনুতেও পাদি দেখেছিলাম -- আমার ধারণা এটা ভাতের স্থানীয় নাম; বউয়ের হিসাবে এটা আসলে ইংরেজি পেডি (Paddy) থেকে আসা অপভ্রংশ - কাজেই গন্ধযুক্ত পাদি নয়, বরং উচ্চারণ হতে পারে পাডি!

৩০।
খাওয়া দাওয়ার পর গরম দুপুরে খুব জোরে হাটা সম্ভব নয়। আর ছুটিতে রিলাক্স করতে বেড়াতে এসেছি, দৌড়াতে নয়। তাই ধীরে ধীরে যখন ঐ বীচে পৌঁছুলাম তখন ২টা বেজে গেছে (প্রতিটা ছবিতেই টাইমস্ট্যাম্প দেয়া আছে)। এখানকার বীচটা পুরা অন্যরকম। ঘাটের স্ট্রাকচারের পর পাড় বাধানো ফুটপাথ। বাধানো ফুটপাথের নিচেই এক দুই ফুট বালু দেখা যায় আর তারপরেই পানি। দেখতে দেখতেই একজন সাদা চামড়ার লোক সেখান দিয়েই নেমে টুকুস করে পানিতে নেমে গেল। আর পাড়ের কাছেই পানি যথেষ্ট গভীর।

বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে পানির দিকে তাকানোও মুশকিল। নারী-পুরুষ জড়াজড়ি করে পানিকে বেডরুম বানিয়ে ফেলেছে। আবার সাথে ক্যামেরায় আরেকজন সেগুলো তুলছে। যা হোক কিছুদুর আগালে পাড় বাধানো ফুটপাথ শেষ। কিছুটা বালুর সৈকত দেখা গেল। রোদের দৌরাত্নে আমাদের ছাতা আর হ্যাটগুলোর কাজের অভাব হল না। পানির ধারে পা ভিজানোর জন্য সর্বমোট ৫মিনিট সময় খরচ করতে পারলাম।

এখানকার বালুগুলো অন্যরকম। বেশ ভারী মনে হয়, কারণ পানি একেবারে সুইমিং পুলের পানির মত স্বচ্ছ টলটলে। তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সাধারণ বীচে ঢেউয়ের চোটে নিচের বালুতে পানি ঘোলা লাগে, কিন্তু এখানে তেমন নয় -- বালুর ঘোলা তীরে আছড়ে পরা ৩-৪ ফুট পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর তীর থেকেই খাড়া গভীর হওয়ার কারণে এখানকার টুরিস্ট স্পীডবোটগুলো একেবারে পাড়ের কাছে নোঙর করে রেখেছে। প্রাকৃতিক জলাধারের তীরে পানি এ্যাত স্বচ্ছ হতে পারে নিজের চোখে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করা কষ্টকর।
৩‍১।
ফিরে আসতে আসতে এ্যাত কম সময়ের জন্য আফসোস হতে থাকলো। জোর কদমে পা চালিয়ে আমরা মোটামুটি ঠিক আড়াইটায় ক্রুজারে উঠে পরলাম। আর ৫ মিনিটের মধ্যেই সেটা ছেড়েও দিল।  কেবিনে ঢোকার আগে দেখি সকালের ছবি চমৎকার প্লেটে প্রিন্ট করে বিক্রয়ের জন্য অফার করছে। দুই পিস করে কিনলাম -- একেকটা ১০০ বাথ। মেয়ে তো পুরাই অবাক - বলে মা-বাবা আমরা তো দেখি ফেমাস হয়ে গেলাম!

ফেরার সময়ে আর উপরে না গিয়ে নিচের তলার এয়ার কন্ডিশন্ড জায়গায় বসবো বলে সেখানে ঢুকেও কোনো সিট খালি পেলাম না। সবার শেষে আসলে তো এমনই হওয়ার কথা। তবে সবগুলো সিটের সামনে হেলানো উইন্ডস্ক্রিনের নিচে অনেকগুলো প্লাস্টিকের হালকা চেয়ার স্ট্যাক করে রাখা ছিল। সেখান থেকে কয়েকটা খুলে নিয়ে ঐ হেলানো নিচু জায়গার আশেপাশেই তিনজন বসে পড়লাম। বামে ৩জন মধ্যবয়স্ক জাপানি আর ডানে ৩/৪ জন ককেশান যুবক যুবতি বসলো।

এই সময়ে সাগরের ঢেউ একটু বেশিই মনে হচ্ছিলো। কারণ আমরা যখন চেয়ারে বসে ভাতঘুম দেয়ার চেষ্টায়, তখন সামনের উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির মত ঢেউ আছড়ে পড়ছিল‌ো। মাথার উপরে একটু পেছনে বিশাল টিভির স্ক্রিনে তখন মিঃ বিন দেখাচ্ছিলো। নিজের দিকে খেয়াল করে বুঝতে পারলাম সাগরে পা ভিজিয়ে আসার সময়ে আমাকে এমনি ফিরিয়ে দেয়নি, প্যান্টের পায়ের গুটানো ভাজে কয়েকশ গ্রাম বালুও দিয়ে দিয়েছে।

৩২।
ঝিমাতে ঝিমাতে রোলিংএর কারণে পেছনে আর কেউ কল ছেড়েছে কি না সেটা আর দেখার সুযোগ হয়নি। ফুকেটের কাছাকাছি আসার পর ঢেউ একটু কমেছিলো। ফুকেটের ঘাটে ভেড়ার মিনিট দশেক আগে একজন ক্রু এসে হাজির। হাতে লিস্ট। নাম মিলিয়ে বলে গেল নেমে ২২ নম্বর বাসে উঠতে। এদের ম্যানেজমেন্টে আবার অবাক হলাম। নামার সময়ে আরেকজন ফটোগ্রাফারের তোলা ছবি নিয়ে বসেছিলো সেগুলোও কিনলাম।

ফিরতি পথের গাড়িতে আবার মাথাগুনে লোক উঠলো - কোন সিট খালি থাকলো না। গাড়িও আলাদা, যাত্রীও আলাদা। আমাদের সামনে তিনটা বাচ্চা - সম্ভবত আফ্রিকান কোন দেশের হবে। এর মধ্যে ১৩ বছরের মেয়েটা যে পটর পটর কথা বলতেছিলো বাকী দুইটা খুব একটা বেশি সুযোগ পাচ্ছিলো না (সেই কথাবার্তার মধ্যেই ওর বয়সটা জানা গিয়েছিলো)। মেয়েটা ইংরেজিতেই খুব সুন্দর অ্যাকসেন্টে কথা বলছিলো। আমার কন্যাও খুব মজা করে শুনলেও ওদের সাথে অংশগ্রহণ করলো না। পথিমধ্যে অন্য একটা হোটেলে সেই পরিবার নেমে গেল।

হোটেলে ফিরে শাওয়ার নেয়ার সময় প্যান্টের পায়ার ভাজের সেই বালু পরিষ্কার করতে গিয়ে পুরা একাকার অবস্থা। মেয়ে গোসলের সময় শুনি গুনগুন করে কি যেন গান গাচ্ছে -- অর্থাৎ এই ভ্রমণে তার মুড খুবই ভাল। আজ সন্ধ্যাতেও হালকা শপিং চললো; বাংলা স্ট্রিট ভেদ করে বীচে গেলাম আসলাম। পরদিনের জন্য ফোনে ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে গাড়ি ঠিক করলাম কারণ আজ রাত এখানে থেকে পরদিন সন্ধ্যার ফ্লাইটে আমাদের ব্যাংকক যাত্রা আছে।

(চলবে)