বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৬

আমাদেরকে সীমিত সম্পদ অপচয় করা শিখানো হচ্ছে

(পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিলো)
আমি ঢালাও ভাবে এই মন্তব্য করছি না, কিন্তু এর চেয়ে ভালো শিরোনাম এই মুহূর্তে মাথায় আসছে না। এ লেখাটি আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার খারাপ দিক (ব্যক্তিগত মতামত) তুলে ধরার জন্য এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য।

স্কুল-কলেজে, বিশেষ করে স্কুলে অনেকগুলো বিষয় পাঠ্য আছে যাতে অনেক রচনামূলক প্রশ্ন পরীক্ষায় আসে। কিন্তু কখনোই ওগুলোর উত্তরে পূর্ণ নম্বর দেয়া হয় না। যেমন, ২০ নম্বরের একটি রচনাতে কখনই কাউকে ২০ দেয়া হয় না। আমারতো মনে হয়, একজন বাংলার শিক্ষকও যদি রচনাটি লিখেন, তিনি নিজের রচনাকেও পূর্ণ নম্বর দিবেন না। এর কারণ হিসেবে হয়তো তাঁরা বলবেন, রচনাটি পূর্ণাঙ্গ নয়, এতে আরো ভালো লেখার scope আছে। মানছি যে, এ ধরণের লেখাতে সবসময়ই আরো ভালো করার উপায় থাকে, কিন্তু তাই বলে একজন ছাত্রকে পূর্ণ নম্বর দেয়া যাবে না ‌- এ কথা মানতে আমি রাজি নই। একটু ব্যাখ্যা করি ---

আমরা নিশ্চয়ই একজন স্কুল ছাত্রের কাছ থেকে একজন সাহিত্যিকের মান আশা করব না। তার কাছ থেকে তার বয়স ও শ্রেণী অনুযায়ী যথোপযুক্ত উত্তর আশা করব; এবং সেই মান অনুযায়ী লিখতে পারলেই তাকে পূর্ণ নম্বর দেয়াটা যুক্তিসম্পন্ন হবে বলে আমি মনে করি।

ধরুন, একটি প্রশ্ন: এক বছরে কত দিন? - ধরা যাক এই প্রশ্নের মান ২; একজন ২য় শ্রেণীর ছাত্র ৩৬৫ দিন লিখলে পূর্ণ ২ নম্বর পাবে, কিন্তু একজন দশম শ্রেণীর ছাত্রের জন্য উপযুক্ত উত্তর হবে ৩৬৫.২৪২৫ দিন। একজন স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রকে সম্ভবত; সৌরবছর, চন্দ্রবছর, অধিবর্ষ ইত্যাদিও উল্ল্যেখ করতে হবে ওই ২ নম্বর পাওয়ার জন্য।

অপরপক্ষে, যখন ৩ ঘন্টায় ১০০ নম্বরের উত্তর দিতে হয়, তখন ২০ নম্বরের জন্য মোটামুটি ভাবে ৩৬ মিনিট বরাদ্দ থাকে। এটা আশা করা যুক্তিসম্পন্ন হবে না যে, ওই ৩৬ মিনিটের সম্পুর্ন সময় লেখার কাজে ব্যয় হবে, ছাত্রকে চিন্তা করে গুছিয়ে লিখতে হবে। কাজেই ধরা যায়, লিখার জন্য ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগবে। যদি কেউ পুরা সময় লিখে তাহলে সম্ভবত সে মুখস্থ লিখছে ‌-- এটা সমর্থনযোগ্য নয় কারণ আমরা নিশ্চয়ই ছাত্রকে মুখস্থবিদ্যা শিখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাই না।

কাজেই ওই সীমিত সময়ের মধ্যে একজন ছাত্র, গুছিয়ে তার শ্রেণীর মাণ অনুযায়ী যতটুকু লিখা সম্ভব, ততটুকু লিখলেই পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে। একজন শিক্ষক ছাত্রকে কার্যকর ভাবে কতটুকু শিখাতে চেয়েছে বা সক্ষম হয়েছে, সেটাও বিবেচনা করা উচিৎ। শিক্ষক যে জিনিষ ছাত্রকে শেখায়নি বা সার্থ কভাবে শিখাতে চেষ্টা করেনি, তা নিশ্চয়ই ছাত্রের কাছ থেকে আশা করবে না, এবং তা লিখতে না পারার জন্য নম্বর কাটবে না।

এবার বলি উপরের প্রসঙ্গটি কিভাবে অপচয় শিখায়:

পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো, সীমিত সময়ের মধ্যে একজন ছাত্র কতটুকু শিখলো তা বিচার করা। একটি রচনায় সবচেয়ে ভালো লিখলে যদি ২০ এর মধ্যে ১৬ দেয়া হয়, তাহলে আমার মতে ঐ ৪ নম্বর অপচয় করা হচ্ছে। কারণ ঐ ৪ নম্বর বিচারকার্যে ব্যবহ,ত হচ্ছে না কোনভাবেই। এই প্রচলিত নিয়ম খুব সূক্ষ্ণভাবে ছাত্রদের কচি ও অবচেতন মনে এই বার্তাই পৌছে দেয় যে, সীমিত সম্পদ অপচয় করা একটি গ্রহনযোগ্য প্রথা -- যার প্রতিফলন দেখতে পাই, সারাদেশের শিক্ষিত সমাজ যখন অবলিলাক্রমে রাষ্ট্রীয় সীমিত সম্পদ অপচয় করে, এবং যার জন্য কারো মনে কোন অপরাধবোধের উদয় তো হয়ই না বরং উৎসাহিত করা হয় – তার মধ্যে।

আশা করি সচেতন বিবেকবান ব্যক্তিগণ ব্যপারটি ভেবে দেখবেন এবং এই আত্মঘাতী প্রথা পরিবর্তনের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন।

1 টি মন্তব্য:

aman বলেছেন...

এই প্রবনতা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলাকে উৎসাহ দিচ্ছে। মনে করে দেখুন একটি গল্প্/কবিতা লাইনের ব্যাখ্যা লিখতে কত কষ্ট করতে হয়! আর নোট বই সেই কষ্ট থেকে মুক্তি দিচ্ছে বিনিময়ে কেড়ে নিচ্ছে সৃজনশীলতা।