১।
উবুন্টুর নতুন ভার্সন রিলিজ উপলক্ষে রিলিজ পার্টি হবে - কখন হবে,
কোথায় হবে, কিভাবে হবে এগুলো নিয়ে যথেষ্ট মেইলে ইনবক্স সবসময়ই সরগরম।
আশিকুর নূর নামে একজন ছোট পাগল (মানুষের উপকার করে বেড়ানোর পাগলামী) এটা
আয়োজন করার জন্য সমস্ত ছোটাছুটি করছে, আর তাকে গাইড করছে বড় পাগল রিং।
কিন্তু নিজে অন্যরকম দৌড়ানির উপরে থাকার কারণে এমনকি মেইলগুলোও নিয়মিত পড়া
হয়ে উঠছিলো না। দেখা গেল যখন মেইল পড়ছি তখন অনেকগুলো কাজ ইতিমধ্যেই করা হয়ে
গেছে, যার জন্য আমাকে জিজ্ঞেসও করা হয়েছিলো। মেইলে আমার এরকম পশ্চাৎপদতা
দেখে নিয়মিত শরম পাচ্ছি। তবে, ১৯ তারিখ শুক্রবার ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে
৪-৭টা প্রোগ্রাম - সেটা ভুলিনি। এই প্রোগ্রাম আয়োজন নিয়ে যতটা চড়াই-উৎড়াই
পেরোতে হয়েছে -- তার কিছু অংশ মেইল থ্রেডটাতে এসেছিলো - ওটা নিয়েই একটা বড়
প্রবন্ধ রচনা করা যায়।
১৯ তারিখ দুপুর ২টা থেকে মানসিক প্রস্তুতি
চলছে, এখন রেডি হতে হবে। এর মধ্যে মেয়ে এসে আমাকে সাথে নিয়ে টিভিতে কার্টুন
দেখতে বসলো - উঠতে দেয় না। ৩টা সময় মনে হল, নাহ্ - এভাবে চলতে পারে না,
রেডি হই। ল্যাপটপটা গুটিয়ে ব্যাগে ঢুকালাম - অনুষ্ঠানে দরকার হতে পারে।
কিন্তু রেডি হওয়ার সবচেয়ে জরুরী অংশ হল ঠিকানা নিশ্চিত হয়ে রওনা দেয়া যেন
স্পটে গিয়ে হয়রানী না হতে হয়। নুর বা মেহেদী ভাইকে ফোন করলেই সহজে ল্যাটা
চুকে যায়, কিন্তু অভ্যাসবশত ডেস্কটপ খুলে গুগল ম্যাপ দেখতে চাইলাম। ইদানিং
কিউবির জঘন্য নেটস্পিডের (বাইরের কোনো কারণে সমস্যা হতে পারে এমন হলে এরা
মেসেজ দিয়ে সমস্যা জানায় - এইটার ব্যাপারে সেরকম কিছু জানায়নি) কারণে ৫
মিনিটেও ম্যাপের কিচ্ছু লোড হয় না, তাই ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি সার্চ দিয়ে
সেটার লিংক পেলাম। লিংকে গিয়ে অনেকগুলো ঠিকানা থেকে দুইটা ক্যাম্পাসের
ঠিকানা ১০২ শুক্রাবাদ দেখে মনে হল এটাই ঠিকানা - শুক্রাবাদ গেলেই খুঁজে
নেয়া যাবে। স্বাভাবিক অবস্থায় ১ মিনিটের কাজ করতে ২০ মিনিট খরচ করেও লাভ হল
না -- শালার ইন্টারনেট সার্ভিস! ফোন দিয়ে ঠিকানা জানলেই মনে হয় এ্যাত সময়
নষ্ট করতে হত না। যাক এবার বের হই ... ...
কিসের কী - মেয়ের দাবী
দাওয়া শেষ হয় নাই। এর আগে বের হতে পারলে তো! মেয়ে বলছে মাথা চুলকাচ্ছে -
এ্যাত যত্নের পরও মাথা চুলকায় কেন -- সুক্ষ্ণ চিরুনী অভিযান চালিয়ে মাথা
থেকে অনেকগুলো বদমাশকে বের করে পটাপট মারা হল। এমতাবস্থায় ওর মাকে সমস্ত
দায়িত্ব হস্তান্তর করে রওনা দিলাম। ততক্ষণে ৪টা পার হয়ে গিয়েছে ... ...
২।
বাসার
বাইরে বের হয়েই খালি রিকশা দেখে বললাম - শুক্রাবাদ চলো। আমার বাসা
গ্রীনরোডে বসুন্ধরা সিটির পেছনের এলাকায় - তাই রিকশা দিয়ে যাওয়া যায়।
রাজাবাজারের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি শুক্রাবাদের কাছে রাস্তার (গলির)
মাঝে কেটে সম্ভবত সুয়ারেজ লাইন বসিয়েছে - এর জন্য উঁচু উঁচু ম্যানহোলের
মাথা রাস্তা থেকে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি বের হয়ে আছে, তার উপর পাইপ বসানোর জন্য
কাটা জায়গায় শুধুমাত্র খোয়া ফেলা হয়েছে - রিক্সা চলতে খুবই অসুবিধা! সম্ভবত
২০ মিনিটে অক্ষত অবস্থায় শুক্রাবাদ পৌঁছালাম। ঠিকানাতো জানিনা -- এদিক
ওদিক তাকিয়ে ভাবলাম ফোন করেই ফেলি! এমন সময় পাশেই হোটেল নিদমহলের ভবনে দেখি
ডেফোডিল ইউনিভার্সিটি -- আহ্ পাইছি।
ধুর! এটা তো দেখি তালাবদ্ধ,
রাস্তা থেকেই দেখা যাচ্ছে। ফোনটা তাহলে করতেই হয়। ফোনে মেহেদী ভাইকে পেলাম
-- প্রথমেই গতকাল উনার মিসড কলে রিং ব্যাক না করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম;
উনি অনুষ্ঠানস্থলেই আছেন। এটা প্রিন্স প্লাজায়, আন্ডারগ্রাউন্ডে ... ... ।
আচ্ছা --- --- --- এই সময়ে পাশ দিয়ে যাওয়া পথচারী আমার ফোনালাপের অংশবিশেষ
শুনে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে বসলো -- প্রিন্স প্লাজা ঐদিকে। অর্থাৎ
সরকারী কলোনী, ডেন্টালের ছাত্রাবাস ও সোবহানবাগের মেইন রাস্তার উপর
অসভ্যভাবে বের হয়ে থাকা মসজিদটা পার হয়ে, পেট্রলপাম্পের পর। আমি ধন্যবাদ,
থ্যাঙ্কইউ বললাম। একবারে দুইজনকেই - উপকারী পথচারী এবং ফোনের লাইনে থাকা
মেহেদী ভাই দুজনকেই। ফোন কেটে হাটা দিলাম। ল্যাপটপের ওজন কম না -- এর আগে
এটা নিয়ে হাঁটাহাটি করার সময় একদিন সুন্দর ভদ্রলোকের মত ঘাড় থেকে ব্যাগের
বেল্ট ছিড়ে মাটিতে ডাইভ দিয়েছিলো, তাই এখন কাঁধে ঝুলানোর কোনো অপশন নাই।
ব্রিফকেসের মত হাতে নিয়ে ঘুরতে হয়।
প্রিন্স প্লাজায় আন্ডারগ্রাউন্ডে
--- এই রকম কী জানি বলেছিলো। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি ডেফোডিল আছে। নিচে
মার্কেট। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং থেকে ড়্যাম্প দিয়ে গাড়ি বের হয়ে আসছে। ওহ্
... ... এই ড়্যাম্প দিয়ে নিচে গিয়ে লিফট ধরতে হবে। ব্যাপারটা অপরিচিত না,
কারণ ধানমন্ডির ১৫র আনাম ড়্যাংগস প্লাজার বুমারসে যাওয়ার সময়ও এই তরিকা;
সিলেটে আলহামরাতে মেট্রোপলিটন ইউনিতে যাওয়ারও একই তরিকা। তা এই পাথরের মত
ভারী ল্যাপটপ হাতে (কাঁধে না) এতদুর হেঁটে এসে ড়্যাম্প দিয়ে নিচে নামতে
ইচ্ছা করছে না। পাশেই চকচকে মার্কেটের প্রবেশপথ দেখে ওটা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম
-- নিশ্চয়ই এখান থেকেও সিড়ি বা লিফট পাওয়া যাবে ... ...
৩।
খুব
স্মার্ট ভঙ্গিতে শপিং সেন্টারে ঢুকেই ডানে বামে তাকিয়ে কোনো সিড়ি বা লিফট
দেখলাম না। আচ্ছা ..... ... তাহলে একটু ভেতরের দিকে যাই, ওদিকে নিশ্চয়ই
আছে, যা দিয়ে অন্তত বেসমেন্টে নামা যাবে। নাহ এদিকেও দেখা যাচ্ছে না। ধ্যাত
ড়্যাম্প দিয়েই গরম বেসমেন্টে নামতে হবে নাকি!! এই ভেবে বের হওয়ার সময় হঠাৎ
দেখি প্রবেশদ্বারের ঠিক পাশেই লিফট। ঢোকার সময় সেটা ডানদিকে ৯০ ডিগ্রীর
বেশি কোনে পেছনের দিকে পড়েছিলো তাই দেখিনি। ইউরেকা ... ... লিফটটা B বা
বেসমেন্টে আছে। কল দিতেই G বা গ্রাউন্ড ফ্লোরে মানে আমি যেখানে - সেখানে
চলে আসলো।
প্রথমেই যেই ধাক্কাটা খেলাম সেটা হল লিফট খালি। লোকজন
থাকলে ড্যাফোডিল কোন ফ্লোরে জিজ্ঞেস করে নেমে যাওয়া যেত। তো-ও-ও, শপিং
সেন্টারতো মনে হয় ৪ তলা, ৭ এ চাপ দেই, যদি ঐ ফ্লোরে না হয়, তাহলে নেমে
আসবো। ওরে বাবা এটাতো ক্যাপসুল লিফট দেখি। উপরে উঠলে বাইরের দিকে তাকিয়ে
একটু কেমন যেন লাগে। ৭ এ পৌঁছে লিফট খুলেই দেখি এ-মা লিফটের ঠিক বাইরে একটা
শাটার দরজা সেটা বন্ধ। লিফট থেকে বের হওয়ারই জায়গা নাই - দেখেই কেমন
দমবন্ধ একটা অনুভুতি হয়। ওকে ... মিস কল হয়ে গেছে, এটা মনে হয় কোনো অফিস
তাই শুক্রবার বন্ধ। ঠিক আছে ৫ এ যাই।
ওরে আব্বা রে! এটাও তো একই
স্টাইলে বন্ধ। এবার গন্তব্য ৪। এটাও বন্ধ। ধ্যাত্তরি, দেখি ৮ এ গিয়ে - যদিও
অত উঁচুতে বাইরের দিকে তাকাতে একটু অস্বস্তি হচ্ছে। মোবাইলের মেসেজে
মেহেদী ভাইকে লিখলাম 'which floor?' ৮ এ গিয়ে দেখি সেটা একটা রেস্টুরেন্ট
.... .... ওরে ... এ দেখি মিস না একেবারে রং কল। তাড়াতাড়ি বাকী থাকা ৬ এ
চাপ দিলাম। এখানেও শাটার বন্ধ। মনে হচ্ছে একটা হরর মুভির ভেতরে ঢুকে পড়েছি
(ইনসেপশন?)।
নাহ্ এ চলতে পারে না।

অসহ্য ... ... ... এবার গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাই - ঐটা দিয়ে লিফটে চড়েছিলাম
তাই ওটা খোলা আছে এটা তো নিশ্চিত। নিশ্চয়ই আমি ভুল লিফটে চড়েছি, ড্যাফোডিলে
যাওয়ার অন্য কোন ডেডিকেটেড লিফট আছে মনে হয়।
৪।
এইবার সুবোধ
বালকের মত ড়্যাম্প দিয়ে নেমে বেসমেন্টে গেলাম। ভবনের বেসমেন্টের কার পার্কং
এর পেছনের দিকে ড্যাফোডিল লেখা একটা কাঁচঘেরা ঘর -- ভেতরে লাইট জ্বলছে
কিন্তু কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। এর আশে পাশেও কোন লিফট নাই। আরে! -
বেসমেন্টের অন্যপাশে দেখি আরেকটা ড়্যাম্প। আরে আরে .... .... ওর পাশে
আরেকটা লিফট দেখা যাচ্ছে, যার দরজায় ড্যাফোডিল লেখা। সামনে গার্ড বসে আছে,
এছাড়া লিফটে ওঠার জন্য ছাত্রদের মত বয়সি কয়েকজন পোলাপানও দাঁড়িয়ে আছে
দেখলাম। আহ্ আমি ইহাকে পাইলাম ... ... হরর মুভি শেষ হল মনে হয় ... ...
লাইনে
দাঁড়ানোর পর গার্ড জিজ্ঞেস করে ইউনিভার্সিটি যাবেন। আমি বলি হ্যাঁ -- এতে
উনিও হ্যাঁ সূচক ভঙ্গি করলেন। হয় আমার ইতিউতি ঘোরাঘুরি কিংবা বেকুব চেহারা
দেখে সন্দেহ হয়েছিলো। লিফট নামতেই ওখান থেকে এক দঙ্গল ছাত্র বের হয়ে আসলো
আর আরেক দঙ্গলের সাথি হয়ে আমি উঠে পড়লাম। এবার নিশ্চিন্তে নামা যাবে।
কিন্তু কেউ ৪ এ আর কেউ ৬ এ যেতে চায় -- মানে ২-৩ ফ্লোরের থেকে খুঁজে নিতে
হবে! মাথা ঠিকমত কাজ করছে না, তাই ৬ এ নামলাম। নেমে পরিচিত ভঙ্গিতে মিস্টার
বিনের মত এদিক যাই, সেদিক যাই সবদিকেই ক্লাসরুম, কোন পরিচিত মানুষ নাই।
মনে হল এই ফ্লোরে না। লিফটের দরজার বাইরে কাগজে লেখা আছে ৪র্থ ফ্লোরে মসজিদ
কিন্তু অডিটোরিয়াম কোথায় লেখা নাই। একদিকে দেখি সিড়ি দেখা যাচ্ছে, পাশে
আরেকটা লিফটও আছে। এবার সিড়ি দিয়ে নিচে নামবো ভেবে এগিয়ে গেলাম। এক ফ্লাইট
নেমে ৫ম ফ্লোরে দেখি সব তালাবদ্ধ, তবে সিড়ি দিয়ে আরও নামা যাবে। যাব কি
যাবোনা ভাবছি। উপর থেকে কেউ একজন কি সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকালো?
মেহেদী
ভাই মেসেজের উত্তর দেয়নি। ওনাকে ফোনে কল দিতে দিতে ভাবলাম ৪র্থ ফ্লোরে
দেখি। কিন্তু উনি কল ধরছেন না। নামতে নামতেই মেহেদী ভাই কল ব্যাক করলেন।
বললেন ৪-এ; এর মধ্যে আমিও ঐ ফ্লোরে পৌঁছে গেলাম, একটু এগিয়ে দেখি মেহেদী
ভাই অডিটোরিয়ামের বাইরে এসে আমাকে রিং দিচ্ছিলেন। ওনাকে দেখে কিযে শান্তি
লাগলো -- অবশেষে হরর যাত্রা পর্ব শেষ করতে পেরেছি। ভেতরে বেশ জমজমাট
অনুষ্ঠান চলছে বলে মনে হল বাইরে থেকেই। তখনও জানতাম না যে ভেতরে আরো চমক
অপেক্ষা করছে ... ...
(শেষ)
পূর্বপ্রকাশ: প্রজন্ম ফোরাম